সাহিত্যিক শ্রী পারাবতের আসল নামটি হয়তো অনেকেরই জানা নেই। অনেক লেখকের ছদ্মনাম জনপ্রিয় হলেও তাদের মূল নামটিও পাঠকের কাছে পরিচিত। কিন্তু শ্রী পারাবতের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। বেশকিছু জনপ্রিয় ঐতিহাসিক উপন্যাসের জনক শ্রী পারাবত তার লেখক নামেই সমাধিক পরিচিত। আমি সিরাজের বেগম (১৯৬০), মমতাজ দুহিতা জাহানারা (১৯৭২), আরাবল্লী থেকে আগ্রা (১৯৬৫), অযোধ্যার শেষ নবাব (১৯৯১), আলাউদ্দিন খিলজি (২০০২), কিতাগড়, মহাপ্রেম (১৯৬৭), বাহাদুর শাহ (১৯৭১), চিতোর গড় (১৯৭৭), রানাদিল (১৯৭৬), মহম্মদ বিন তুঘলক (১৯৯৮)—শ্রী পারাবতের উপন্যাসগুলোর নাম বলে দেয় এ উপমহাদেশের আলোচিত অনেক ঐতিহাসিক চরিত্র ছিল তার লেখার বিষয়। এর মধ্যে প্রথমটি আজ থেকে ৬২ বছর আগে প্রকাশ হলেও পাঠক সমাজে এখনো পঠিত। ১৯৭৩ সালে এ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল সিনেমা। এমনকি হাল আমলে ২০১৮ সালে ভারতীয় বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল স্টার জলসায় শুরু হয় ধারবাহিক ‘আমি সিরাজের বেগম’।

সমকালীন ঐতিহাসিক বিবরণীতে নারীদের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও তাতে তাদের ব্যক্তিজীবন, চিন্তার দুনিয়ার হদিস পাওয়া যায় না। শ্রী পারাবত ‘আমি সিরাজের বেগম’ উপন্যাসে ঐতিহাসিক উপাদান আর কল্পনাকে মিলিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের স্ত্রী লুৎফুন্নেসার কণ্ঠকে হারেমের দেয়াল ভেঙে পাঠকের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিয়েছেন। সেই অন্দরমহলের আরো অনেক চরিত্র আর রাজনীতির দাবাখেলার বিবরণীও শোনা যায় লুৎফুন্নেসার বয়ানে।

উপন্যাসের শুরুতেই লুৎফুন্নেসা তার পরিচয় জানাতে চেষ্টা করেন এবং প্রথম দুই পাতাতেই পাঠকের বোঝা হয়ে যায় আলিবর্দির হারেমে লুত্ফাকে সে সময় কেমন অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছিল। ‘আমি জারিয়া—ক্রীতদাসী। শুধু এইটুকুই জানি নিজের সম্বন্ধে। নবাব আলিবর্দির বিরাট মহলে অসংখ্য জারিয়াদের মধ্যে আমি একজন। কোথা থেকে এলাম, কে আমার মা, কে আমার বাবা, তাও জানি না। স্বপ্নের মতো শুধু একটা ছবি মনের মধ্যে মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে। সে ছবি ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো। গ্রামে খড়ে ছাওয়া এক শান্তির নীড় দানবীয় আক্রমণে দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল একদিন।...ব্যস, এইটুকুই। আর কিছু মনে নেই। কিন্তু এ হয়তো শুধু স্বপ্নই। কোথা থেকে এলাম—এ কথা বয়স্ক জারিয়াদের জিজ্ঞাসা করলে তারা রেগে ওঠে। বেগম সায়েবাকে প্রশ্ন করতে সাহস হয় না।’

লুৎফুন্নেসার পরিচয় নিয়ে ইতিহাসচর্চার ময়দানের নীরবতা আমরা দেখি শ্রী পারাবতের চরিত্রটির কণ্ঠে। ১৪ বছরের বালিকা লুৎফুন্নেসা তার অসামান্য সৌন্দর্যের কারণে মহলে অন্য দাসীদের রোষানলে পড়েন, অন্যদিকে আলিবর্দির স্ত্রী তাকে পছন্দ করতেন। তাই দাসী মহলে সবাই তাকে হিংসা করত।

লুৎফুন্নেসা আমাদের শোনালেন মহলে প্রবল প্রতাপশালী আলিবর্দি কন্যা ঘসেটি বেগমের কথা। উপন্যাসের শুরুতেই লুত্ফার চোখে দেখা যায় ঘসেটির প্রভাব। ‘একদিন ঘসেটি বেগমকে এদিকে আসতে দেখে বুকের ভেতরে ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাকে সব জারিয়ারাই ভয় করে। তাকে দেখলেই সবার পা কাঁপে। জারিয়াদের দেখে দেখে আমার মনেও তার সম্বন্ধে একটা অজ্ঞাত ভীতিভাব জন্মেছিল। অথচ তার ওই রূপ, অমন টানা টানা চোখের দিকে চাইলে মনে হয় না যে তাতে ভয় পাওয়ার মতো কিছু রয়েছে। অমন রূপ হয় শুধু বেহেশতের পরীদের।’

জারিয়াদের দেখাদেখি আমার মনে ভয় জন্মালেও তাদের মতো থরথর করে আগে কখনো কাঁপতাম না আমি। কিন্তু যেদিন দেখলাম, অমন অপরূপ চোখও আগুনের মতো জ্বলে ওঠে, অমন সুন্দর নাসারন্ধ্র রাগে বীভৎস দেখায়। যেদিন দেখলাম নবাব নিজে ও বেগম সায়েবা কন্যার প্রতাপের কাছে অসহায়ের মতো বোবা হয়ে গেলেন, সেদিন থেকে অন্য জারিয়াদের মতো আমিও তার নামে কাঁপতে শুরু করলাম।

সেদিনের কথা আজও আমার মনে মধ্যে জ্বলজ্বল করছে। মহলের ৫০টা আরশি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল ঘসেটি। আর সেই ভাঙা কাচ আমরা সবাই মিলে পরিষ্কার করেছিলাম। আমাদের কারও মুখে বিরক্তির মৃদু গুঞ্জনও শোনা যায়নি। কাচে অনেকের হাত ক্ষতবিক্ষত হলো, কিন্তু কেউ দাওয়াইয়ের জন্যে হাকিম ডাকতে সাহস পায়নি। আরশির কাচে বিষ থাকে জেনেও টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি কেউ।

অথচ সেদিন ঘসেটিকে অন্যায় কিছু বলেননি বেগম সায়েবা। নওয়াজিস মোহম্মদ খাঁর সঙ্গে শাদি হয়েছে তার, কিন্তু তার কাছে ঢাকায় যাবে না ঘসেটি, এ কেমন কথা? নওয়াজিস খাঁ মুর্শিদাবাদে এলে সে কথা বেগম সায়েবা বলেছিলেন কন্যাকে। তাতেই এত কাণ্ড। যে নবাবের রাজ্যে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খায়, সেই নবাবের চোখের সামনে ঘসেটি উন্মাদের মতো একটার পর একটা আরশি ভেঙে ফেলল। চোরের মতো দাঁড়িয়ে দেখলেন নবাব আলিবর্দি স্বয়ং।

আরশি ভেঙে নবাবের সামনে ছুটে এসে ঘাড় বেঁকিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে ঘসেটি বলল, ‘নওয়াজিস যদি কখনো নবাব হয়, তবেই আমি তার কাছে যাব, নইলে নয়।’

ক্ষমতার সিংহাসনে প্রতি ঘসেটির যে আকাঙ্ক্ষা তার প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট হলো। আর সেকালে নবাব বাড়ির অন্দরে নারীরা যে নেহায়েত ঘরের পুতুল ছিলেন না তারও আওয়াজ পাওয়া গেল।

হারেমে তার মতো সাধারণ দাসীরা যে অকিঞ্চিত্কর এক জীবনযাপন করছিলেন সেটাও শোনান লুৎফুন্নেসা। ‘জারিয়াদের মধ্যে আমি সর্বকনিষ্ঠ। তার পরই সোফিয়া। তার বয়স ১৬। শরীরে তার স্বাস্থ্য আছে, দেহের গঠনও সুন্দর, কিন্তু রঙটা বড় কালো। কালো রঙের জন্যে তার দুঃখের সীমা নেই। তার দুঃখ দেখে আমার হাসি পায়। সে আমাকে চুপি চুপি একদিন বলেছিল, রঙ যদি তার আমার মতো হতো, তাহলে সে কোনো নবাবজাদাকে শাদি করতে পারত। নবাবজাদাদের শাদি করার জন্যে এদের এত লোভ কেন বুঝি না। চুনি-পান্নার অলংকারে নিজেকে সজ্জিত করা যায় বটে, মসলিন দিয়ে শুভ্র দেহকে ঢেকেও রাখা যায়, কিন্তু তাতে কি সুখ আছে? আমার ধারণা, বেগমদের সুখ নেই। সবাই ঘসেটি বেগমের মতো ভেতরে ভেতরে জ্বলে মরছে। ঘসেটি শুধু প্রকাশ করে, অন্য সবাই মনের মধ্যে চেপে রাখে। সত্যি কিনা জানি না, কতটুকুই বা আমার অভিজ্ঞতা, তবু বুঝতে পারি, বেগমদের মন বড় নিচু, বড় কুিসত। নিজেদের সাজিয়ে রাখলেও এদের নাসারন্ধ্র দিয়ে পচা মনের দুর্গন্ধযুক্ত দীর্ঘশ্বাসই শুধু বের হয়।...বেগমরা যেন মাটির পুতুল। এদের যেন প্রাণ নেই, মন নেই, সুখ নেই, সাধ নেই। অবসর মতো এক-আধ দিন পুরুষ এসে একটু নাড়া দিয়ে গেলে তারই স্মৃতি নিয়ে তারা আনন্দে জাবর কাটবে বাকি দিনগুলো। তবু যদি বোঝা যেত পুরুষদের মন বাঁধা রয়েছে তাদের কাছে। অথচ আশ্চর্য, বেগমরা ঠিক সেইভাবেই জাবর কাটে। একদিন এসে পুরুষ যদি দুদণ্ড কারও ঘরে কাটিয়ে যায়, তবে দেমাগে সেই বেগমের এক মাস মাটিতে পা পড়ে না।’

নবাবদের মহলে নারী যে কেবল সাজিয়ে রাখা, আর ভোগের বস্তু সে রকম চিত্রটিও সামনে আসে লুত্ফার এ বয়ানে।

সিরাজ যখন তার প্রেমে মজে গেছেন, তখন লুত্ফার মনে অন্য রকম বেদনা আর শঙ্কা—‘সোফিয়ার কথা মনে হলো। কষ্ট হলো তার জন্যে। তার বেগম হওয়ার সখ। রঙটা ময়লা না হলে আজ আমার জায়গায় হয়তো সে থাকত। কিন্তু সিরাজ কী রঙে ভুলল? রঙ তো অনেক দেখেছে সে। আমার চেয়েও রূপসী বেগম তার রয়েছে। সিরাজ যদি রঙে ভুলে থাকে, তাহলে আজ আমিই সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হলাম।’ এমন আশঙ্কা নিয়েই সিরাজের প্রেমে সাড়া দিয়েছিলেন লুত্ফা।

অন্য বেগমরা সবসময় পাশে না থাকলেও লুত্ফা কখনো সিরাজকে ছেড়ে যাননি। পাটনায় আফগানদের হাতে নিহত হন সিরাজের পিতা। এ ঘটনায় পুরো পরিবার বেসামাল হয়ে পড়ে। তরুণ সিরাজ নিজেও। ঠিক সে সময় লুত্ফা তাকে সান্ত্বনার বাণী শোনানোর পাশাপাশি তার দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন করে দেন। ‘যে আঘাত তুমি পেলে, নবাবরাই সে আঘাত পায়। তুমি তো সাধারণ মানুষ নও। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখও সাধারণ। তোমার সুখ যেমন অসাধারণ, দুঃখও তেমনি অসাধারণই তো হবে। তোমার বুক যেমন বিরাট, মন যেমন বিরাট, সহ্যশক্তিও তেমনি বিরাট হওয়া চাই। নইলে তুমি সিরাজউদ্দৌলা কিসে?’ শেষ বাক্যটিতে লুত্ফা তার স্বামীকে স্মরণ করিয়ে দিলেন ভবিষ্যৎ নবাবের তাজ মাথায় নিতে সিরাজকে সিরাজউদ্দৌলা হয়ে উঠতে হবে। লুত্ফার কথায় সিরাজও মন শক্ত করলেন। শ্রী পারাবত লুত্ফার যে চিত্র এঁকেছেন তাতে ইতিহাসের অস্পষ্ট রেখা ভেদ করে তার ব্যক্তিত্বকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়ে যায় পাঠকের জন্য।

 

এসএম রশিদ: লেখক