আমার বাবা, অমিয় কুমার দাশগুপ্ত ১৯২২-এ বরিশালের বিএম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় অর্থনীতি। বিশ্ববিদ্যালয় তখন নতুন, সবেমাত্র ১৯২১-এ শুরু হয়েছে। বিলেতের অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ ঘেঁষা শিক্ষা পদ্ধতি, ইংরেজি কায়দার বিশাল সুদৃশ্য দালানে কলেজ, ছাত্রদের আবাস, খোলা মাঠ, পুষ্পশোভিত গাছপালা, ছাত্রদের কাছে সবকিছু রোমাঞ্চকর, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের গ্রাম বা ছোট শহর থেকে যারা আসতেন তাদের কাছে। পূর্ববঙ্গে এই প্রথম ইউনিভার্সিটি, সবার পক্ষে কলকাতা গিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব হতো না, আর্থিক সংকট ছিল প্রধান বাধা, তাদের কাছে এ নতুন শিক্ষাকেন্দ্র এনে দিল উচ্চশিক্ষার বিরাট সুযোগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ অনুশীলন করে চিন্তা করতে শেখানো।
অনেকে প্রশ্ন করেছেন, কলকাতা না গিয়ে বাবা অচেনা-অজানা, আনকোরা নতুন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কেন এলেন। প্রথম কারণ নিশ্চয়ই আর্থিক— মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, যৌথ সংসার চলে বড় দাদার উপার্জনে, উপায় না থাকলে কলকাতা পাঠাতেন জেঠামশায়, তবে দেনা হতো প্রচুর। শুধু তাই নয়, বড় ভাই চিন্তা করে দেখলেন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি নতুন, শিক্ষকরা অতুলনীয়, শিক্ষার ধাঁচ আলাদা— ছাত্র সংখ্যা অল্প, গড্ডলিকা প্রবাহের মধ্যে পড়াশোনা না করে স্বচ্ছ পরিবেশে তার ছোট ভাই উচ্চশিক্ষা পাবেন। ঢাকা শহর সুন্দর; ঢাকা ইউনিভার্সিটির কোনো ইতিহাস নেই— এ কথা ঠিক, তবে ভবিষ্যৎ থাকবে না, সে কথা কেউ বলতে পারে না। বাবা বলতেন, ‘দাদার এই একটি সিদ্ধান্ত আমার জীবন বদলে দিল। আমি যা শিখেছি, যা হতে পেরেছি, তা দাদার যুক্তিযুক্ত এই বিচারের জন্য।’
বাবার পক্ষে ঢাকায় পড়তে আসা রোমাঞ্চকর ব্যাপার ছিল। গৈল গ্রামের ছেলে, ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বরিশাল শহর ছাড়া কোথাও যাননি। গ্রামগঞ্জ থেকে আসা অন্য ছাত্রদের মতো নানা নদীর ঢেউ ভেঙে বড় জাহাজে বুড়িগঙ্গার ঘাটে এসে নামা সোজা কথা ছিল না। রোমাঞ্চের সঙ্গে আশঙ্কা নিশ্চয়ই ছিল, তবে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এদের এত তীব্র ছিল যে, ভালো লাগবে ঠিক করেই পরিবারের বাঁধন ছেড়ে উৎসাহ-উদ্যম নিয়ে আসতেন। বাবার মনোভাব না জানলেও সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিতে কিছুটা আভাস পাই। করিম সাহেব এসেছিলেন ১৯৪০-এ, আঠারো বছর পর, বয়স ছিল কম (ওর পনেরো, বাবার উনিশ); কিন্তু দুজনেই ছিলেন বরিশালের, অর্থের টানাটানি নিয়ে বড় হয়েছেন, দুজনেরই ‘মুরব্বি’ বড় ভাই; যাদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা এদের কথায়-লেখায় সর্বদা ফুটে উঠেছে।
সরদার ফজলুল করিম লিখেছেন, (১৯৪০ সাল) ‘আমি (ঢাকা) এসেছিলাম বলাটা ঠিক নয়। বরিশালের একটি ‘পোলা’ এসেছিল ঢাকা, ঢাকা কলেজে পড়তে।’
ঢাকার আজীবন তাকে গৈলা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি, না ১৯২২-এ, না শেষ জীবনে। আকর্ষণ আকর্ষণই থেকে যায়, কলেজ জীবনের নতুন করে পৃথিবী দেখতে পাওয়ার দিনগুলো কখনো ভুলতে পারেননি, ভুলতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কুড়ি বছর। গৈলা— সে তো নিজের দেশ, মাটি।
বাবা অর্থনীতি কেন পড়লেন জানি না, জিজ্ঞাসা করিনি। আইসিএস বা সরকারি চাকরির ইচ্ছা ছিল না, থাকলে অর্থনীতি পড়ার কারণ বুঝতাম।
সংগীত, নাটক, ছবি আঁকা, সাহিত্যচর্চা, রাজনীতি; সর্বোপরি আড্ডা— সবই ছিল ঢাকার শিক্ষার বা জীনযাপনের অঙ্গ, রমনা ছিল বড় সুন্দর। ঢাকার আপ্যায়ন, বিখ্যাত শহর ও ইউনিভার্সিটিকে নিজের করে নিতে এবং বন্ধুমহল পেতে বাবার সময় লাগেনি। ‘বাসন্তিকা’, ‘শতদল’ তখন শুরু হয়েছে কিনা জানি না, অন্যান্য হলের সঙ্গে রেষারেষি ছিল বলে মনে হয় না, তবে ঢাকা হলের ছাত্র বলে যথেষ্ট গর্ব ছিল। আড্ডাপ্রিয় মানুষ, বন্ধুগোষ্ঠী ঢাকা হল বা অর্থনীতির সহপাঠীর মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি।
সমসাময়িক বেশি কারো কথা জানি না। আসলে ছোটবেলা থেকে বাবার এত বন্ধু দেখেছি, কে ঢাকায় ছাত্রাবস্থার, শিক্ষক অবস্থার, কে কলকাতার মেসবাড়ি থেকে বা বিলেত থেকে— ঠিক রাখা মুশকিল। ঢাকার কথায় বিশেষ করে বলতেন হাফিজুর রহমানের কথা, অর্থনীতি বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরের সর্বোত্তম ছাত্র— এ কৃতিত্ব আলাদা, ইতিহাসের পাতা। এক বছরের সিনিয়র হলেও দুজনের বন্ধুত্ব ছিল; পাস করে হাফিজুর রহমান সাহেব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন, যোগাযোগ রইল না। ১৯৭৫-এ ছেলে আনিসুর রহমানের বাবাকে লেখা চিঠি, ‘আপনার ও মাসিমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আব্বা ও আম্মারও খুব ভালো লেগেছে।’ আশ্চর্য লাগে ভাবতে, ছাত্রজীবনে কত সময় একসঙ্গে অর্থনীতিচর্চা করেছেন, হয়তো চায়ের আড্ডা দিয়েছেন; কর্মজীবন, দেশভাগ পথ আলাদা করে দিল। অর্ধশতাব্দী পর দেখা, যখন ছেলে নামকরা অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক। বারবার বলি তাই জীবনের নানা অধ্যায় সময়ে গোলাকার হয়ে ফিরে আসে।
বাবার দুজন বন্ধুকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি। ঢাকা হলের সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত— তীক্ষ বুদ্ধি, রসিকতায় তুখোড়, নাটকের স্টেজ বাঁধতে পারদর্শী, আমার অতি স্নেহপ্রবণ মামা। অন্যজন শচীন চৌধুরী, সহপাঠী। বাবা তাদের প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনা দিতেন। ‘শচীন ক্লাসে আসতে শুরু করল একটু দেরিতে। একদিন ক্লাসরুমে বসে আছি, দেখি একটি ছিপছিপে লম্বা ছাত্র ঢুকছেন, পরনে লুটিয়ে পরা কোঁচানো ধুতি, শৌখিন পাঞ্জাবি, উস্কোখুস্কো চুল, মোটা ফ্রেমের চশমার পেছনে জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল চোখ। প্রথম দিনই বুঝতে পারলাম, এর মেধা অসাধারণ।’ যে যুক্তি, তর্ক, আলোচনা শুরু হয়েছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাগানে, ক্লাসে, চায়ের দোকানে, তা শেষ হলো শচীন কাকার জীবনের সঙ্গে ১৯৬৬-এর ডিসেম্বরে। বাবার অনুশীলন করার আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বলেছেন অশোক মিত্র, শচীন কাকার মধ্যে বাবা পেয়েছিলেন তার জুড়ি। দাশগুপ্ত ও চৌধুরী পরিবারের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ঢাকার জিন্দাবাজার লেনের চৌধুরী বাড়িতে, তা আজো অটুট রয়েছে।
খামখেয়ালি শচীন কাকা ১৯২৬-এ হঠাৎ করে পরীক্ষা না দিয়ে ঢাকা ছেড়ে কোথাও চলে গেলেন। বাবা বলতেন, ‘এমএতে প্রথম হলাম ঠিক, তবে শচীন না থাকায় ঠিক জমল না।’ পরের বছর পরীক্ষার ঠিক আগে ফিরে বাবাকে বললেন, ‘দেখুন না, নোট-টোট কিছু আছে কিনা— পরীক্ষাটা দেব ভাবছি।’ পরীক্ষা দিলেন, ফল আশানুরূপ হলো না, একেবারেই ভালো নয়। ১৯২৭, ঢাকা ছেড়ে দিলেন চিরকালের মতো, চলে গেলেন বোম্বাই। গতানুগতিকভাবে হয়তো এমএর ফল ভালো হলো না, তবে তা প্রতিভা কেড়ে নিতে পারে না। ১৯৪৯-এ Economic Weekly শুরু করে ভারতের চিন্তাশীল, বিদ্বান সমাজে আলোড়ন তুললেন। এর উত্তরসূরি Economic and Political weekly আজ সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। ছুরির কাটার ধারে তিনি বিষয়ের গভীরে যেতে পারতেন। বলতেন, ‘বুঝলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউটোরিয়াল আর তোমার বাবার সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডায় সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।’ মা তাতে যোগ করতেন, ‘হ্যাঁ, আর কম্বলের লোম বাছা!’
অর্থনীতির শিক্ষক কারা ছিলেন, আমার বিশেষ জানা নেই। অশোক মিত্র লিখেছেন, ‘ঢাকায় অর্থনীতিতে অধ্যাপকরা নিজেরা নামকরা না হলেও বিষয়ের ভিত্তি পোক্ত করে দিতে পারতেন।’ প্রফেসর পানান্ডিকর, বাবাদের প্রথম বছরের বিভাগীয় কর্তা, খুব ভালো পড়াতেন। পড়ানোর সঙ্গে ছাত্ররা কে কেমন, কী করছে নিরীক্ষণ করতেন। বহু বছর পর তিনি যখন নব্বইয়ের ঘরে, ওর জামাতা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঢাকার ছাত্র অমিয় দাশগুপ্তকে মনে আছে কিনা। জবাব দিলেন, ‘মনে আছে, কেন মনে থাকবে না? কৌতূহলী ছাত্র ছিল, ভালো প্রশ্ন করত। আরেকটি কথা বেশি করে মনে আছে, ওর অভ্যেস ছিল খাতায় নিজের সই বারবার মকশো করা।’ বাবা বললেন, একেবারে ঠিক কথা, সাধারণ ব্যাপার, ‘সই!’ তাকে সুন্দর করার প্রচেষ্টা লেগেই থাকত। আশ্চর্য, ষাট-পঁয়ষট্টি বছর পার হয়ে গেছে, প্রফেসর সাহেব ভোলেননি। অমনোযোগী ছাত্র নয়, বুদ্ধিমান অথচ সই নিয়ে মকশো করে ক্লাসে সময় কাটাচ্ছে, এর জুড়ি পাওয়া দুষ্কর।
ইকোনমিক থিওরি পড়াতেন কৃষ্ণবিনোদ সাহা, কড়া শিক্ষক। নির্দেশ দিতেন, প্রশ্নের উত্তরে বা প্রবন্ধতে অবান্তর কথা যেন না থাকে, সোজাসুজি বক্তব্য লেখা চাই। ‘থিওরি অব ডিমিনিসিং মার্জিনাল ইউটিলিটির ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন, পরিমল কাকা সাহিত্যিক, ভদ্রতায় বিশ্বাসী— লিখলেন, “তৃষ্ণা নিবারণ করতে কারো কাছে জল চাইলে প্রথম গ্লাস তৃপ্তির সঙ্গে খাব, দ্বিতীয়টি কম তৃপ্তিতে, তৃতীয় গ্লাস দেয়া হলে ‘ধন্যবাদ’ বলে ফিরিয়ে দেব।” খাতা ফিরে এল, মন্তব্য: ‘ধন্যবাদ’ অবান্তর, ফিরিয়ে দেয়াটা আসল। মূল্যবান শিক্ষা, হুকুম কাজ করেছিল। বাবা ও পরিমল কাকার অবান্তর কথা ও অতিরঞ্জনবর্জিত লেখায় বিশেষ্যের ব্যবহার কদাচিৎ, সোজাসুজি এরা চলে যেতেন মূল তথ্যতে। পরে শচীন কাকার ইকোনমিক উইকলির সাপ্তাহিক সম্পাদকীয় বা প্রবন্ধের সম্পাদনায় একই জিনিস লক্ষ করেছি। সুবোধ মামা একে বলতেন, ‘হোমিওপ্যাথিক ডোজ’। ১৮১৭-তে ইংল্যান্ডে লেখা ডেভিড রিকার্ডোর Principles of Economics-এর ইংরেজি এ রকম আড়ম্বরহীন; সাহা সাহেব প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন। ১৯২০-এর দশক ছিল ক্লাসিক্যাল ইকোনমিকসের যুগ। অ্যাডম স্মিথ দাদা মহাশয়, রিকার্ডো পরের প্রজন্মের সর্বোচ্চ, ওর তত্ত্ব ক্লাস, বাড়ি, বাবাদের চিন্তাভাবনা, এমনকি আমার ছোট্ট বাগানেও ছেয়ে থাকত।
১৯২২-এ পরিবেশ ভিন্ন ছিল না। যতই সাহিত্য, সংগীত, আড্ডা, ‘সই’র মকশো করার শখ থাকুক, মূল লক্ষ্য পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। শুধু বড় দাদার নানা আশা বা নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, পুরো পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার সিদ্ধান্ত বহু আগে তিনি নিয়েছিলেন, পরীক্ষার ফল ভালো করা প্রয়োজন ছিল। ছুটিতে গ্রামে, বাকি সময় ঢাকায়, চারটি বছর বড় আনন্দে কাটল। এমএ পরীক্ষার শেষ দিন, কলেজের শেষ দিন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবনা করার দিন; হঠাৎ করেই এল দুসংবাদ, দুঃখ, বিষাদ। পরীক্ষা শেষে বিকালে হোস্টেলে ফিরে এসে জানতে পারলেন দুদিন আগে ঠাকুরদামশায় মারা গেছেন। বাবাকে জানানো হয়নি পরীক্ষার জন্য, এটা নিজস্ব পারিবারিক দুঃখ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এর পরের ঘটনা ঢাকা হলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত; লিখছি কারণ শিক্ষকরা যে সবসময় ছাত্রদের সহানুভূতির সঙ্গে দেখতেন, তা নয়; নিষ্ঠুরও হতেন। পিতা হারানোর পর বাবার ঢাকা হলের অভিজ্ঞতা তারই এক নিদর্শন।
১৯২৬-এ নিয়ম ছিল যে, পরীক্ষা হয়ে গেলেও ছুটি না হওয়া পর্যন্ত ছাত্রদের হোস্টেলে থাকতে হবে। অনুমতি ছাড়া হোস্টেল ছাড়া সম্ভব নয়। ঠাকুরদামশায় নেই— সে খবর বাবা যখন পেলেন, ছুটি হতে তখনো কিছু বাকি। বাবা তিনবার ওয়ারডেনের ঘরে গিয়ে তাকে পেলেন না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাদামতলী না পৌঁছলে সে রাতে স্টিমার পাবেন না। যখন কিছুতেই ওয়ারডেনের সঙ্গে দেখা হলো না, পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে, কেন ছেড়ে যেতে হচ্ছে জানিয়ে ওয়ারডেনের ঘরে চিঠি লিখে রেখে কোনোমতে স্টিমার ধরলেন— বরিশাল হয়ে গৈলা যাবেন, দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ সময়।
শ্রাদ্ধশান্তির পর কলেজে ফিরে এসে দেখেন, রূঢ় ভাষায় ওয়ারডেনের কড়া চিঠি, ‘তুমি অনুমতি না নিয়ে ছুটির আগে চলে গিয়েছ, তোমাকে ৫ টাকা দণ্ড দিতে হবে।’ দণ্ড দিতে হলো, তা নইলে হয়তো ডিগ্রি পাবেন না। কে জানে। দুঃখিত ও অপমানিত হয়ে বাবা চিফ ওয়ারডেনকে সবিস্তারে লিখলেন। চিফ ওয়ারডেনের লম্বা উত্তর এল, ‘অল্প বয়সে পিতৃহারা হওয়ার দুঃখ আমি জানি।’ এরপর নানা উপদেশ— যাতে বাবা নিরাশ না হয়ে যান। চিঠির শেষে লেখা, ‘তোমাকে দণ্ড দিতে বলা উচিত হয়নি। আমি নিজে তোমাকে এ টাকা ফিরিয়ে দেব।’ বলা বাহুল্য, সে টাকা কখনো আসেনি, তার অপেক্ষাও কেউ করেননি।
বাবার আসল ক্রোধ ছিল ঢাকা হলের ওয়ারডেনের ওপর। প্রতিশোধ নেয়ার পথ নেই। পথ বের হলো কিছুদিন পর। ছুটির পর কলেজে খুলেছে, বাবা এখন শিক্ষক। কলেজের বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, মুখে সিগারেট। সেই (ঢাকা হলের) ওয়ারডেন উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসছেন। কাছাকাছি আসতেই সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে বাবা এগিয়ে গেলেন। ওয়ারডেন বিষচোখে বাবার দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া সরাতে সরাতে চলে গেলেন; একজন শিক্ষককে কিছু বলা সম্ভব নয়। হলো প্রতিশোধ নেয়া। বাবারও একসময় ছেলেমানুষি ছিল, তা আমাদের বিশ্বাসের বাইরে।
গরমের ছুটি কাটালেন গ্রামে, মাকে থান পরা অবস্থায় দেখতে কষ্ট হয়, বেশি করে সময় কাটালেন মায়ের কাছে। ছুটি প্রায় শেষ, পরীক্ষার ফল বের হওয়ার অপেক্ষা; বাবা এখন সাবালক, চাকরির চিন্তা, পরিবারের ভরণপোষণের চিন্তা। এমএর ফল প্রকাশ হয়নি, চিঠি এল বাবাকে লেকচারার ক্লাস টু (মাইনে ১২৫-২০০ টাকা) নিযুক্ত করা হয়েছে। জীবনে আমরা কিছু না কিছু হতে চাই, বাবার স্বপ্ন ছিল কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হওয়ার। না চাইতেই তা পেয়ে গেলেন, তাও ঢাকায়। এ সৌভাগ্য কয়জনের হয়। দুঃখ ছিল তার বাবা দেখে গেলেন না, পুত্র এবারো প্রথম ভাগে প্রথম, তার কর্মজীবনের শুভ অধ্যায় শুরু হচ্ছে।
বাবার মতো অল্প বয়স্ক, অনভিজ্ঞ একজনকে কী করে নিযুক্ত করা হলো? রাজ্জাক সাহেব বলেছেন, ‘অমিয় দাশগুপ্ত এমএ পরীক্ষা দিয়েছেন, রেজাল্ট এখনো বেরোয়নি। এমন সময়ে ডিপার্টমেন্টে লেকচারার নেয়ার কথা উঠল। ডিপার্টমেন্টের হেড তখন জে সি সিংহ। তিনি রিকমেন্ড করলেন কলকাতার এক লোককে। কিন্তু ভিসি হারটগ হস্তক্ষেপ করলেন। তিনি বললেন, বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে ডিপার্টমেন্টের। ডিপার্টমেন্ট থেকে ছাত্র বেরিয়েছে। তাহলে তাদের কেন নেয়া হবে না। অমিয়বাবুর কথা উঠল। হারটগ বললেন, If he gets first class in his M.A. He will be appointed. (ও যদি এমএতে ফার্স্ট ক্লাস পায় তাহলে ওকে চাকরিতে নেয়া হবে)। এভাবে অমিয়বাবু লেকচারার হলেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকের ইতিহাসে দেখতে পাই, এখানকার দূরদর্শী কর্ণধাররা যেমন প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ করতেন, তেমনি সদ্য পাস করা মেধাবী ছাত্রদের নিযুক্ত করতে দ্বিধা করতেন না। একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, অর্থনীতি বিভাগের প্রথম প্রমুখ, এস এস পানান্ডিকর। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এডউইন ক্যাননের ছাত্র হয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে ডিএসসি করে চব্বিশ বছর বয়সে সোজা চলে এলেন ঢাকায় অর্থনীতি বিভাগের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে। শিক্ষকতা ও গবেষণার দিকে মন বেশি ছিল, ‘ডিন’ হতে রাজি হলেন না; খুব বেশি দিন ঢাকায় না থাকলেও অর্থনীতি বিভাগকে পোক্তভাবে গড়ে তুললেন। বিশ ও তিরিশের দশকে দেখি নানা বিভাগের অধ্যাপকরা অল্পবয়সী, সদ্য পাস করা, যেমন— অর্থনীতিতে অমিয়কুমার দাশগুপ্ত, বীরেন গাঙ্গুলী, ইংরেজিতে মন্মথ ঘোষ, অমলেন্দু বোস, ইতিহাসে পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অজিত সেন। এরপর দেখা যায় এদের ছাত্রদের— অর্থনীতিতে পরিমল রায়, আব্দুর রাজ্জাক, মজরুল হক, সমররঞ্জন সেন, এমএন হুদা, নরেশ রায়। এরা নিযুক্ত হতেন তাদের মেধার জন্য, বয়স বা অভিজ্ঞতার জন্য নয়।
প্রায় সমবয়সী, ধীরে ধীরে সবাই মিলে গবেষণা ও আড্ডার একটি চমত্কার একটি গোষ্ঠী তৈরি করে নিলেন; দিনে একত্র হতেন কলেজের কমনরুমে, সন্ধেয় কারো বাড়িতে। আড্ডা চলত রোজদিন। গান-বাজনা, সাহিত্য, থিয়েটার, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুই ছিল এর অঙ্গ। এরা ঢাকা শহর ও তাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালোবাসতেন; কৃষ্ণচূড়ায় ছায়ায় রমনা ও পল্টনের মাঠের মতো মনোরম জায়গা তাদের নজরে বিশেষ আসত না। কাজকর্মের সঙ্গে সঙ্গে এদের পরস্পরের একটি বন্ধন হয়ে উঠেছিল, যা সচরাচর দেখা যায় না। আমাদের ছোটদের কাছে এরা কাকা-কাকি, মাসি-মেসো, একই পরিবার, একই গ্রন্থিতে বাঁধা। পরের দিকের ছাত্রছাত্রীরা হলেন দাদা-দিদি, যেমন সমরদা; শুধু আব্দুর রাজ্জাক রয়ে গেলেন রাজ্জাকসাব, অথচ তিনি চিরকালই কাছের মানুষ!
আমার বাবার প্রথম জীবনের অর্থনীতির তাত্ত্বিক লেখা ঢাকা থেকে শুরু এবং তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত প্রবন্ধ, যাতে তিনি দেখিয়েছেন Keynes-এর General Theory আমাদের দেশে কেন প্রযোজ্য নয়, এর চিন্তাধারা ১৯৪২-এ তার ক্লাসে কোনো ছাত্রের প্রশ্ন থেকে শুরু হয়েছিল। বাবাকে যে ভারতবর্ষে তাত্ত্বিক আলোচনার প্রদর্শক বলা হয়েছে, তার অঙ্কুর ও বিকাশ ঢাকায়।
রমনার রাস্তা পার হয়ে প্রায় দিনই আলোচনা আমাদের বাড়িতে পৌঁছত। আসতেন রাজ্জাক সাহেব, পরিমল কাকা, সমর সেন, এমএন হুদা, মজরুল হক, নরেশ রায়, অমিতা দত্ত। শুধু অর্থনীতি কেন, অন্য বিষয়ের অধ্যাপকরাও আসতেন— মন্মথ ঘোষ, পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, অমলেন্দু বোস; মাঝেসাঝে ছাত্রছাত্রীরা। আড্ডা চলত দীর্ঘ সময় অবধি। শুধু মনে আছে আমার কাজ ছিল বইয়ের আলমারি থেকে বই আনা। Hicks-এর Value And Capital সোনালি অক্ষরে নাম লেখা। আর তার মাঝে ছবির মতো ডায়াগ্রাম। খুব অল্প বয়সে শিখেছিলাম দুটি ইংরেজি শব্দ— ডিমান্ড আর সাপ্লাই। থিওরি অব ভ্যালু নিয়ে এরা আলোচনা করতেন, লিখতেন। সুতরাং এ দুটি শব্দ তো শিখবই।
শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে ঢাকায় এদের সুনাম ছিল; বাইরে নাম হয়, সে ইচ্ছে থাকা অস্বাভাবিক নয়। খ্যাতি অর্জন করার একটিই রাস্তা ছিল, মনোযোগ দিয়ে অধ্যাপনা করা এবং প্রবন্ধ লেখা। নাম কেনার জন্য এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করার ইচ্ছে বা অভ্যেস তাদের ছিল না।
বাবার শিক্ষকজীবন ১৯২৫ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সংস্কৃত কলেজের ছাত্র, অধ্যাপক এবং অধ্যক্ষ হওয়ায় তিনি খুব তৃপ্তি লাভ করেন। ঢাকা, কলকাতা, বিশ্বভারতী, যাদবপুর প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারেননি। বাঙালির সাহিত্য, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক পীঠস্থান এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিজ্ঞানী জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, রমেশচন্দ্র মজুমদার, মোহিতলাল মজুমদার, সুশীলকুমার দে, নলিনী ভট্টশালী, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শহীদুল্লাহ সাহেব প্রমুখ গুণীজনের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে। মোহিতলাল মজুমদারের স্ত্রীকে আমাদের পরিবারের লোকেরা ‘বড় মা’ বলে ডাকতেন। শরীর ভেঙে পড়লেও বৃদ্ধ বয়সে সুদূর বেহালা থেকে আমাদের সিঁথির বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে, বিশেষ করে আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। অদ্ভুত আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা ছিল এ গুণী পরিবারগুলো।
বাবার কথা শেষ করার আগে আমার মায়ের কথা না বললে এ লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই উদারমনা অসামান্য ভদ্রমহিলা সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে সাধ্যাতীত পরিশ্রম করে সংসারের সব বোঝা নিজে বহন করে বাবার পড়াশোনার সুযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। রন্ধন শিল্পে ও সংগীতের প্রতি ছিল মায়ের অসীম অনুরাগ। বৈচিত্র্যপূর্ণ রন্ধনকার্যে অনেকজনকে খাইয়ে আনন্দ পেতেন।
বাবার অগণিত ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীর জন্য আমাদের বাড়িতে যেকোনো সময়েই ছিল অবারিত দ্বার। আমার মা হাসিমুখে সাধ্যাতীত পরিশ্রমে নিজেকে বাবার সুযোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। মনে হয় দাশগুপ্ত বাড়ির কথা, আমার মা-বাবার কথা।
ঢাকার বেতনের হার ছিল স্বল্প, কোনো কারণে পদোন্নতি ছিল সময়সাপেক্ষ বা উপেক্ষিত, তাও বাবা-কাকারা ঢাকায় থাকতে ভালোবাসতেন। কারণ ছাত্র, পরিবেশ ও সহকর্মী নিয়ে কলেজের আবহাওয়া ছিল গবেষণার পক্ষে অনুকূল। বিশ-তিরিশের দশকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে লেখা অর্থনীতির প্রবন্ধ পড়লে বোঝা যায়, বই ও দেশী-বিদেশী পত্রিকায় (জার্নালে) ওখানকার গ্রন্থাগার কত সমৃদ্ধ ছিল। বই আনানো বোধহয় অপেক্ষাকৃত সহজ, কিন্তু দেশ-বিদেশ থেকে খোঁজ করে বিভিন্ন পত্রিকা আনানো সহজসাধ্য নয়। কত জায়গা থেকে জার্নাল আসত, তার নিদর্শন পাই বাবার প্রথমদিকের লেখা সূত্র/টীকা থেকে। ১৯২৮ সাল থেকে বিভিন্ন প্রবন্ধে বিবিধ সূত্র: American Economic Review, Economica, Economic Journal, Journal of the Royal Statistical Society — লম্বা ফর্দ। বইয়ের ভাণ্ডার অফুরন্ত। জানতে ইচ্ছে করে কে বা কারা গ্রন্থাগার শুরু করেছিলেন, রক্ষণাবেক্ষণ করে এত শিগগিরই একে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ ছিল দূরদর্শী। ভালো বই, জার্নাল পড়ার সুযোগ না দিলে ভালো ছাত্র তৈরি হয় না; ভালো গবেষণা হয় না। উপার্জন কম, অনেক ক্ষেত্রে টানাটানির সংসার, তবু বাবা-কাকারা অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবেননি। একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল গ্রন্থাগার, এমনটি চট করে পাওয়া যায় না। কর্মজীবন এখানে কাটাবেন, এর বাইরে কেউ ভাবেননি।
অন্যত্র যাওয়ার কথা বাবা-কাকারা ভাবেননি এ কথা ঠিক, ঢাকার জীবনে তৃপ্তি বোধ করতেন, সে কথাও ঠিক। তবে এ-ও মনে রাখা উচিত যে, স্বাধীনতার আগে ভারতবর্ষে ইউনিভার্সিটির সংখ্যা ছিল মুষ্টিমেয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চাকরি ছিল না।
যা ছিল তা দূরে, যেমন বোম্বাই, মাদ্রাজ, এলাহাবাদ— ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন চলন— এমন জায়গায় যাওয়া খুব সুখপ্রদ ছিল না। এ-ও মনে রাখা দরকার যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রায় সীমার বাইরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হয় ১৯২১-এ। তবে এ নিয়ে কথাবার্তা চলছিল অন্তত ১০ বছর ধরে। শেষ পর্যন্ত ‘সেন্ট্রাল লেজিসলেচারের অ্যাক্ট অনুযায়ী ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্যার আশুতোষ ঘোর বিরোধিতা করলেন, ফট ইট টুথ অ্যান্ড নেইল... দ্বিতীয় ইউনিভার্সিটি হলে তার জমিদারি খাটো হয়ে যাবে।’ বিরোধিতা সংক্রামক ব্যাধি, সেই যে ঢাকার স্নাতক বা অধ্যাপকদের প্রতি কলকাতার তরফ থেকে অবজ্ঞা শুরু হলো, কোনোদিন মুছে গেছে কিনা জানি না।
অশোক মিত্রের মতে, ঢাকার ছোঁয়া থাকলে কলকাতা তাকে ছুঁয়ে দেখবে না। বাবা দেশ-বিদেশে বহু জায়গায় বক্তৃতা দিয়েছেন, অতিথি প্রফেসর হয়ে গেছেন, কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ, বেঙ্গল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন ও অন্যান্য সংস্থায় বক্তৃতা দিয়েছেন বহুবার, বাবার জীবনের শেষ বক্তৃতা কলকাতায়, জীবনের শেষ সংবর্ধনা কলকাতায়— ‘বঙ্গীয় অর্থনীতি পরিষদে’, কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে কখনো ডাকেনি। ঢাকার ছাত্র-মাস্টারদের কলকাতায় চাকরি পাওয়া একসময় প্রায় অসম্ভব ছিল। ঢাকা ইউনিভার্সিটি যখন নতুন, উচ্চপদে অনেককেই কলকাতা থেকে আনা হয়। সবাই তো জ্ঞান ঘোষ বা সত্যেন বোস মশায়ের মতো নন, সংকীর্ণ মনের অধ্যাপকও ছিলেন। তারা পশ্চিমবঙ্গ-পূর্ববঙ্গ রাজনীতি ভেদাভেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এনেছিলেন, যদিও শুনেছি ধর্মীয় ভেদাভেদ করতেন না।
উন্নাসিকতা একতরফা ছিল না। ঢাকার ছাত্রদের মনে হতো কলকাতায় বইবিদ্যে প্রচুর, কিন্তু বিশ্লেষণ, চিন্তা, প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয় না। এ নিয়ে চূড়ান্ত একটি গল্প প্রচলিত ছিল। কলকাতা থেকে প্রথম বিভাগে বিএ অনার্স পাস করে কোনো মেধাবী ছাত্র ঢাকায় এমএ পড়তে ইচ্ছুক। বিভাগীয় হেড, সম্ভবত রেন সাহেব তার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। নানা প্রশ্নের পর ছাত্রটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শেক্সপিয়র পড়েছ?’ উত্তর এল, ‘হ্যাঁ স্যার, পড়েছি।’ প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বই পড়েছ?’ শোনা যায় ছাত্রটি বলেছিলেন, ‘Seven Ages of Man’। হয়ে গেল তার ঢাকার ছাত্র হওয়ার ইচ্ছে। সত্য ঘটনা কিনা জানি না, তবে উন্নাসিকতার পরিচয় পরিষ্কার হয়ে আসে।
ঢাকায় বলা হতো, কলকাতার ছাত্রছাত্রীরা রাশি রাশি বই পড়ে, তবে সারমর্ম বুঝে নিজের মতামত তৈরি করতে পারে না।
ঢাকায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বিভাগীয় কর্তা বা ‘সিনিয়র’ যারা ছিলেন, তাদের কূট রাজনীতির সঙ্গে বাবা-কাকারা পাল্লা দিয়ে উঠতে পারতেন না। আর ব্যঙ্গ-কৌতুকের অস্ত্র গোপন তূণে রেখে দিতেন, সময়মতো ছুড়ে দেয়ার জন্য। আগস্ট ১৫, ১৯৪৭-এর পর ব্যঙ্গ বাক্যই রয়ে গেল, বাকি সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার ঝুলিতে।
বাবার দিনপঞ্জি থেকে জানতে পারলাম কীভাবে একটি ছাত্র হঠাৎ করে আহত হয়ে কমনরুমে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কপালে, মাথায় লাঠির বাড়িতে তার শরীর রক্তাক্ত। কে, কেন বুঝতে পারলাম না। এটুকু বুঝলাম কলেজ নিরাপদ স্থান নয়। বাবা-কাকাদের জন্য চিন্তা শুরু হতে লাগল। চিন্তা আশঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে ‘কমনরুম’ সম্পর্কে কিছুটা স্বপ্নভঙ্গ হলো। বাবা যেভাবে ছেলেটির আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে ছুটে এসে দরজার কাছে পড়ে যাওয়ার কথা বলেন, মনে হলো দোতলা নয়, ঘরটি নিচতলায়। দরজা ঘরের মাঝে, একদিকে নয়, ছবিটা বদলে দিতে হলো। মনে তো কত কিছু কাজ করে। সন-তারিখ জানি না— এটা অনেক আগের কথা, ৫ নং-এর আগে, যখন অনেকগুলো সিঁড়ি দিয়ে ওঠা ছোট বারান্দা দেয়া এক বাড়িতে থাকতাম। কলেজে অশান্তি, শহরে অশান্তি, রাস্তায় লোক চলাচল কম, রোজ সন্ধেবেলা উত্কণ্ঠা নিয়ে মা ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতেন, বাবা কখন বাড়ি ফিরবেন সে চিন্তা নিয়ে। বাবা ফিরলে দিনপঞ্জি।
কমনরুম রাজনীতির আলোচনায় সরগরম থাকত। আব্দুর রাজ্জাক, মজরুল হক, সমররঞ্জন সেন অভিন্নহূদয় বন্ধু। তিনজনেই পড়াচ্ছেন। প্রথম দুজন মুসলিম লীগ, তৃতীয়জন গান্ধীবাদী— দেশভাগে মত নেই। আলোচনা উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতো, ঘোর বিবাদ দুই পক্ষে, কিন্তু বন্ধুত্বে এর আঁচ পড়েনি। ঢাকা থেকে জোড়া ইলিশ দিল্লিতে সমরদার বাড়িতে নিয়মিত পৌঁছেছে, রাজ্জাক সাহেব পাঠাতেন।
রাজনীতির কথায় মনে পড়ে একদিনের আলোচনা। কমনরুমে জোর তর্ক হচ্ছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও বিশ্বের রাজনীতি নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চালু, পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কী? এ ঘরের দেয়ালে বিশ্বের মানচিত্র টানানো থাকত। বাবার ভাষায়, হঠাৎ রাজ্জাক উত্তেজিত হয়ে লাফ দিয়ে ম্যাপের কাছে গিয়ে বলল, সব লাল হয়ে যাবে, লালে লাল হয়ে যাবে। এ কথা চীন লাল হওয়ার অনেক আগে; ভবিষ্যদ্বাণী আশা না নিরাশা থেকে, তা অবশ্যি জানা হয়নি কখনো। রাজ্জাক সাহেবের উত্তেজিত হতে সময় লাগত না, ছেলেবেলায় যখন দেখেছি। পরে ধীরস্থির মানুষটিকেও দেখেছি। ‘লালে লাল হওয়া’ আশা বা নিরাশা জিজ্ঞেস করিনি, কেন করিনি, তার উত্তর নিজেই দিয়েছি। আমার অভ্যেস হচ্ছে খবর, ঘটনা, মন্তব্য, গ্রহণ বা সংগ্রহ করে স্মৃতির ঝুলিতে ভরা, কেউ কেউ একে স্মৃতির সংগ্রহালয় (Museum of Memories) বলেন, কৌতূহল দেখিয়ে প্রশ্ন করা ধাতে নেই।
রাজ্জাক সাহেব আর সমরদা মতবিরোধ ও বন্ধুত্ব নিয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে গেলেন পিএইচডি করতে। রাজ্জাক সাহেব প্রফেসর ল্যাস্কির সঙ্গে, সমরদা প্রফেসর হায়েকের সঙ্গে। ওখানে পরিচয় এবং গভীর বন্ধুত্ব হলো মেধায় দোর্দণ্ডপ্রতাপ অর্থনীতির ছাত্র ফ্র্যাংক হানের সঙ্গে। এত নিকট বন্ধু যে ফ্র্যাংকের বিয়েতে এরা দুজন হলেন সাক্ষী। ফ্র্যাংক হাঙ্গেরিয়ান, স্ত্রী ডরথি খাঁটি ইংরেজ, সাক্ষীদের একজন পাকিস্তানি, অন্যজন পাকিস্তানি/ভারতীয়। এমন আন্তর্জাতিক বিয়ে অনুষ্ঠান চল্লিশের দশকে শোনা যেত না।
একসময়, এখন জানি চল্লিশের দশকে সান্ধ্য আলোচনায় মুনীর নামটি প্রায়ই শুনতাম। তখন ছাত্র আন্দোলন, রাজনীতি নিয়ে উত্তেজনা চতুর্দিকে। মুনীর কে, কী করেন জানি না, শুধু কথার মধ্যে নামটি ঘন ঘন এসে পড়ে। রাজ্জাক সাহেব বলতেন, ‘মুনীর কইছে।’ বুঝতে পারলাম মুনীরের কথার গুরুত্ব আছে। কখনো দেখিনি একটি মানুষ। সর্বদা যা করতাম, মনে মনে ঠিক করলাম একটি তীক্ষ বুদ্ধির কেউ, যাকে ইংরেজিতে বলা যায় firebrand ছাত্র, চেহারাও নিশ্চয়ই এঁকেছিলাম, আজ খেয়াল নেই। সত্যি firebrand ছিলেন কিনা জানি না, তবে ভাবতে ভালো লাগত বহু বছর, আমার অনেক বয়স হওয়া অবধি, এ মানুষটির ওপর কৌতূহল থামেনি— রাজ্জাক সাহেবের কথায় এমন জাদু ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করার অভ্যেস ছিল না; বাবাকে তো জিজ্ঞেস করতে পারতাম, করিনি। অথচ তার ব্যক্তিত্ব বাবাদের আলোচনা থেকে বালিকা মনে পৌঁছে গিয়েছিল, তাই এত বছরের প্রশ্ন। যখন জানতে পারলাম তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, দেরি হয়ে গেছে।
অন্য কৌতূহলের পাত্র ছিলেন হায়দারদা— শান্তিনিকেতনের হায়দারদা। দেখতে ছোটখাটো, একটু খাটো সাদা পাজামা আর খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে পুরো আশ্রম ঘুরে বেড়াতেন। আড়ম্বরহীন ভালো মানুষ। বিদ্যা ভবনের ছাত্র, বিদ্যা ভবন সম্পর্কে এটুকুই বুঝতাম, সবচেয়ে উঁচু ধাপের ছাত্র। এর বেশি জানার কৌতূহল ছিল না। তিনি যা-ই পড়াশোনা করুন না কেন, গুরুগম্ভীর লেখাপড়া করেন, বন্ধুর মতো আমাদের সঙ্গে গল্প করতেন। কত চড়ুইভাতিতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একসঙ্গে খোয়াইতে হেঁটে গিয়েছি। শুকনো দিন হলে আমাদের জন্য নেহাতই অকেজো শুকনো খেজুরপাতা পেড়ে দিয়েছেন। একবার গরমের ছুটির পর শান্তিনিকেতন গিয়ে শুনলাম হায়দারদা ঢাকা চলে গিয়েছেন। কিঞ্চিৎ ঈর্ষা হয়েছিল বৈকি— ঢাকা, পুরানা পল্টন, গেন্ডারিয়া তো আমার। সে ছিল ক্ষণিকের জন্য, আমরা ছোটরা একটি বন্ধু হারিয়েছি, মন কেমন করত। অমন ভালো মানুষটির কথা ভেবেছি, ওর পাণ্ডিত্য সম্পর্কে কৌতূহল ছিল না কোনোদিন— কোথায় আছেন, কেমন আছেন তা জানার রাস্তা আমাদের জানা ছিল না। এ তো গুগলের দুনিয়া নয় যে হায়দারদা, শান্তিনিকেতন করে খবর পাব। যতদিনে জানতে পারলাম, তিনিও এক প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক, নাম মফজ্জল হায়দার চৌধুরী। আবার দেরি হয়ে গেছে।
ইউনিভার্সিটি শিক্ষকদের জীবনের কেন্দ্র হলেও আমাদের সম্পর্ক মুখে মুখে শুনে। প্রফেসর সত্যেন বোসের বাড়ির বাগান, বিশেষ করে খর্বকায় মোটা সবুজ ডাঁটায় লাল, গোল বল লিলি ছাড়া কোনো কিছুর সঙ্গে পরিচয় ছিল না। স্পোর্টসের দিন একটি দিন পরিবারসহ সবাইকে নেমন্তন্ন করা হতো। মহিলা, ছেলেমেয়েরা একদিকে তাঁবুর নিচে, পুরুষরা অন্যদিকে। মাঝে খেলার মাঠ। আমরা এদিক-ওদিক হেঁটে বেড়াই, পরিচিত কাউকে দেখলে মা সম্ভাষণ জানান। দেখা হলো প্রফেসর সুশীলকুমার দের সঙ্গে— মা তার ছাত্রী ছিলেন। মায়ের কোলে ভাই, খুব ছোট, তার তখনো নামকরণ হয়নি। মা তার মাস্টারমশাইকে অনুরোধ করলেন ভাইয়ের জন্য একটি ভালো নাম দিতে। মনে পড়ে লম্বা, দোহারা চেহারা, অত্যন্ত সুপুরুষ, একটু চিন্তা করে বললেন, ‘পার্থ— পার্থসারথী, অর্জুনের সারথী, শ্রীকৃষ্ণের নাম— এই নাম দাও।’ বড় সুন্দর নাম হলো ভাইয়ের। সময়টা ছিল ১৯৪২-এর ডিসেম্বর বা ১৯৪৩-এর শুরু।
সেদিনেরই আরেকটি ঘটনা। মা ভাইকে কোলে নিয়ে তাঁবুর নিচে বসা, আমি যথারীতি পাশে দাঁড়িয়ে। এক বয়স্ক মহিলা ভাইকে দেখতে এসে প্রচুর উৎসাহের সঙ্গে বেশ জোরগলায় বললেন, ‘দেখো, দেখো, শান্তির ছেলে কেমন হয়েছে। কী সুন্দর হয়েছে, কী সুন্দর দেখতে! যেমন রঙ, তেমন চুল।’
১৯৭৬-এ ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি বিভাগে উচ্চপদে (বোধহয় প্রফেসর) নিযুক্ত করার জন্য বাবাকে করা হলো ‘এক্সটারনাল এক্সপার্ট’। বিরাট ফাইল আছে; বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে অ্যাপ্লিকেশন পড়েছেন ও বিশদ উত্তর দিয়েছেন। বলতেন, ‘পাস করানো সোজা, কাউকে তৃতীয় বিভাগ দিতে বা ফেল করাতে হলে খুব ভলো করে পড়ে, চিন্তা করে নির্ণয় নিতে হয়।’ এখানেও একই ব্যাপার— যাদের উপযুক্ত মনে করতেন না, কারণ জানিয়ে বিস্তারিতভাবে লিখতেন। এমনও আছে, ‘এই নামে আমার এক ছাত্র ছিল, এ কি সেই ছেলেটি? খুব বুদ্ধিমান।’ এত বছর পরও ছাত্রদের নাম মনে আছে। তারা যে আর ‘ছেলে’ নেই, মধ্যবয়সী, সে কথা ভুলে গেছেন।
শান্তিনিকেতনে বাবার জীবনের শেষ ১০ বছর ঢাকার অনেকের সঙ্গে দেখা হতো— পরিচিত অনেকের খোঁজ পেতেন। কারো মৃত্যুসংবাদ শুনলে চিঠি চলে যেত হুদা সাহেবের কাছে, ‘এই দুঃসংবাদ শুনলাম। বিচলিত বোধ করছি, সত্যি কি? সত্যি যদি হয়, ওর পরিবারকে আমার সমবেদনা জানিয়ো।’
ঢাকা এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আবার যোগাযোগ হওয়ায় শুধু খুশি নয়, মনে শান্তি পেয়েছিলেন— বাবা তো অন্তরের গভীর থেকে ঢাকা কখনো ছেড়ে আসতে পারেননি।
বাবার অধ্যাপনার জীবন ১৯২৬-৮২, মাঝে দিন গুনে তিন বছর ওয়াশিংটনে আর ২৬ দিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারে। কোনো কমিশনের সভ্য হলেও অধ্যাপনা ছাড়েননি। অর্ধশতাব্দীর শিক্ষকতা জীবনে যেমন লিখেছি, কোনো ছাত্র দেখিনি, যার সঙ্গে বাবার সুসম্পর্ক নেই বা স্নেহ করেন না। এটাও মানতে হবে, ঢাকার ছাত্রদের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এক কাশীতে অশোক মিত্র ছাড়া আর কোথাও হয়নি। ঢাকার সব নাম জানি না, তবে চিঠিপত্রে বুঝতে পারি এমএন হুদা সাহেবের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল। খুব কাছের ছিলেন মজরুল হক, সমর সেন, সত্যব্রত বসু, মীরা আইচ, অমিতা চৌধুরী, তোজাম্মল হক। এদের নাম নিচ্ছি কারণ আমি নিজে দেখেছি তাদের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক। চারজন ছাত্রছাত্রীর নাম আলাদা করে নিতে হয়। কারণ তাদের সঙ্গে যা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা ছাত্র-শিক্ষকের বাইরে অনেক গভীরে— পরিমল রায়, আব্দুর রাজ্জাক, আশোক মিত্র ও আমি। আশোকদা কাশীতে ছাত্র, এ লেখার বাইরে, আমি কন্যা, তদুপরি কাশীতে ছাত্র, আমিও বাইরে। অন্য দুজনের কথা আলাদা করে লেখা প্রয়োজন। পরিমল কাকা বাবার ছাত্র, পরে সহকর্মী লিখলে কিছুই বলা হয় না। ওদের বন্ধুত্ব কিংবদন্তি রূপ ধরেছিল, তা বললেও অপূর্ণতা থেকে যায়। স্নেহ, সম্ভ্রম, সম্মান, বিশ্বাস, নির্ভরতা, পারিবারিক সান্নিধ্য, ইউনিভার্সিটি— বিশেষ করে অর্থনীতি বিভাগের রাজনীতি, একজনের (বাবার) প্রাণখোলা হাসি, অন্যজনের মুচকি হাসি দিয়ে যেন আলতো করে রসিকতা, গম্ভীর হয়ে অর্থনীতি বা সাহিত্যের আলোচনা, পরিচিত সহকর্মী বা প্রতিবেশীদের নিয়ে মন্তব্য, সবকিছু মিলিয়ে ছিল এদের সম্পর্ক। আত্মিক নৈকট্য ছিল, যা বোঝানো সম্ভব নয়। আমার অভিজ্ঞতাভরা দীর্ঘ জীবনে এমন ‘অহম’ বা ‘আমিত্ব’ বর্জন বন্ধুত্ব দেখিনি। পারিবারিক সান্নিধ্যের উদাহরণ দিই। ১৯৪৭-এ কটকে আমাদের বাড়ি বিভ্রাট। ৪-৪-৪৭-এ পরিমল কাকা লিখছেন, “শুনলাম আপনি গৃহচ্যুত হয়েছেন। কারণ বুঝলাম না। শ্রীমতী দাশগুপ্ত লিখেছেন কোনো সমাধান না হলে ‘পরমভবনে’ (ঢাকায় পরিমল কাকাদের বাড়ি) দোতলায় গিয়ে বসবাস করবেন। বাহুল্য হলেও আমার আগ্রহ জানিয়ে রাখি।”
মা যে সহজে ‘পরমভবনে’ থাকার কথাটা বলতে পারলেন, সেটাই সান্নিধ্যের নিদর্শন।
অর্থনীতিতে পরিমল কাকার প্রবন্ধের তালিকা ছোট, যা লিখেছেন তা প্রশংসিত। তবে বাবার মন্তব্য বা ‘হ্যাঁ’ না পেলে তিনি কোনো লেখা সম্পূর্ণ করতেন না বা জার্নালে পাঠাতেন না। ১-৪-৪৭-এ বাবাকে লিখেছেন, ‘আমার হাতের লেখাটা আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। পদে পদে সেই স্বরচিত ছড়াটা মনে পড়ছে:
‘লিখতে আমি যা চাই—
এবং লিখতে যাহা না চাই,
তা ঝুঁটা কিংবা সাঁচা-ই
করতে চাই যাচাই।
অর্থাৎ আপনার ‘হাঁ’ কি ‘না’ চাই—
আর সঙ্গে এক কাপ চা চাই।’
পরিমল কাকাকে হারানোর শোক নিজের দিদি-দাদাদের হারানোর চেয়ে কম ছিল না। নিউইয়র্কের হাসপাতাল থেকে মুত্যুসংবাদের ফোন বাবার কাছে এসেছিল। খবর পেয়ে দিশেহারা হয়ে বসে পড়লেন। মনে হলো পড়ে গেছেন। দুহাতে মাথা রেখে বলতে লাগলেন, ‘পরিমল নেই, আমি এখন কী করব, আমি এখন কী করব!’ এই ভ্রাতৃসম বন্ধুত্বের দ্বিতীয় উদাহরণ আমি দেখিনি।
রাজ্জাক সাহেব বাবার থেকে বয়সে অনেক ছোট, তিনি যখন ছাত্র হয়ে এসেছেন, বাবা পাঁচ বছর ধরে পড়াচ্ছেন। তাদের সম্পর্ক নিবিড় হলেও বন্ধুত্ব বলব না। ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছি, ওর প্রতি বাবার অপত্য স্নেহ আর গুরুর প্রতি ছাত্রের অপরিসীম শ্রদ্ধা। প্রায় দিন বাড়ি আসতেন কোনো না কোনো উত্তেজনা নিয়ে। বিশ্ব রাজনীতি, লীগ-কংগ্রেসের সম্পর্ক, সর্বোপরি ছাত্রদের মঙ্গল (ততদিনে তিনি সহকর্মী)— সবকিছু আগ্রহ নিয়ে বিচার করে কথা বলতেন। এই যে জড়িয়ে যাওয়া, বিশেষত ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ, তাদের পাশে থাকা, পরামর্শ দেয়া, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে দেখার চেষ্টা করা, বুঝতে পারা— রাজ্জাক সাহেবের এ উদ্যমকে বাবা সম্মান করতেন, প্রাণ দেখতে পেতেন। তিনি এলেই বাড়ি সরগরম, তার জন্য মা-বাবার মনে আলাদা জায়গা ছিল। ‘বাবা’ ওরফে ‘টিচার’ রাজ্জাক সাহেব লেকচার দিতে ভালো না বাসলেও ছিলেন ‘টিচার’— তিনি ছাত্রদের প্রেরণা দিতে জানতেন। গুরু-শিষ্যের মধ্যে যে আলাদা সম্পর্ক ছিল, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। চুলচেরা বিচার, অনুশীলন এদের মধ্যেও ছিল, তবে তা hicks, Marshall নিয়ে নয়; ছিল শিক্ষা, উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ও উন্নতি নিয়ে। আজকাল higher education নিয়ে কত লেখালেখি হয়, তখন কজন মাস্টারমশাই এ নিয়ে ভাবতেন? যখন ওদের দুজনের কথা, ওদের তর্ক, আলোচনা, মায়ের জলখাবার নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে দু-চার কথা বলা মনে পড়ে, ভাবি কী মধুর সহজ-সরল সম্পর্ক ছিল তাদের।
রাজ্জাক সাহেব পিএইচডি করলেন না, এ নিয়ে তখন প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে— যদিও কাকারা সবাই ঢাকা ছেড়েছেন। চিঠিপত্রেও এ কথা পড়েছি— বাবার এ নিয়ে মন্তব্য অপছন্দ ছিল। ‘রাজ্জাকের’ প্রচণ্ড পড়াশোনা, লেখাপড়া নিয়ে থাকা, তার প্রখর বুদ্ধি দিয়ে চিন্তাভাবনা করা— এই ছিল মুখ্য, ডিগ্রি নয়। প্রসঙ্গত, জেমস মিড, যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭৭-এ, তার পিএইচডি ছিল না, ক্ষতি হয়নি। রাজ্জাক সাহেব যা সম্মান পেয়েছেন, ডিগ্রির খোঁজ কি কেউ করেছিল? কত গর্ব করে বাবা বলেছিলেন, ‘রাজ্জাক ন্যাশনাল প্রফেসর হয়েছে।’
ছোটবেলায় চারপাশে ঘুরঘুর করতাম, রাজ্জাক সাহেব কতটা নজর করতেন জানি না। তার সঙ্গে সময় কাটিয়েছি ১৯৬০-এ হার্ভার্ডে। বাবার মেয়ে বলে আমার স্থান আলাদা ছিল, নিজে রান্না করে খাইয়েছেন। খাদ্যরসিক ও আড্ডাপ্রিয় প্যাটেল সাহেবের সঙ্গে রাজ্জাক সাহেবের বন্ধুত্ব হয়েছিল। তিনি সবকিছু খেতেন, আমার বাছবিচার আছে (সেটা ধর্মীয় না অনভ্যাস, মনস্থির করতে পারিনি), এ ব্যাপারে রাজ্জাক সাহেবের নজর থাকত পুরো, কেউ নজর না দিলে তিরস্কার করতেন। রাজ্জাক সাহেবের অন্য নাম ‘খেয়াল রাখা’। এতদিনে তিনি শান্ত-ধীরস্থির।
বাবা, সমরদা কেউ তো ঢাকায় নেই, অপ্যায়ন কী করে করবেন রাজ্জাক সাহেব; নিজেই ব্যবস্থা করলেন, সম্ভব হলেই মাছ পাঠিয়ে দিতেন। ২০০২-তে যখন ঢাকা গেলাম, কোনো সাবেক বা তখনকার মন্ত্রী সাহেব বলেছিলেন, ‘আপনার মা-বাবার সঙ্গে পরিচয় ছিল, রাজ্জাক সাহেব মাছ পাঠিয়েছেন, নিয়ে গিয়েছি।’
দিল্লি বা শান্তিনিকেতন, মাছ পাঠানো বন্ধ হয়নি। শান্তিনিকেতনে বাবার সেক্রেটারি শিবনারায়ণ ভাই বলেছিলেন, ‘রাজ্জাক সাহেবের পাঠানো মাছের ভাজা, ঝোল আমিও খেয়েছি, মা রাঁধতেন। অপূর্ব স্বাদ পূর্ব বাংলার মাছে।’ অবাক লাগে, কোথায় ঢাকা, কোথায় দিল্লি, শান্তিনিকেতন, বাবার অতি স্নেহাস্পদ ছাত্রটি তার গুরুভক্তি, শ্রদ্ধা কত ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন।
রাজ্জাক সাহেব এত কাছের ছিলেন যে, চিঠি লেখেন না বলে ক্ষুণ্ন হয়ে বাবা অভিযোগ করতেন। চিঠি চলে যেত হুদা সাহেবের কাছে। ‘রাজ্জাক চিঠি লেখে না, লিখলে উত্তর দেয় না, ঠিক করেছি আমিও আর লিখব না!’ অগাধ স্নেহ-ভালোবাসা না থাকলে এমন চিঠি লেখা যায় না। চিঠি দিতেন না ঠিক, তিনি তো লিখতেই ভালোবাসতেন না। বিরাট পাণ্ডিত্য ছাত্রদের সঙ্গে মৌখিক আলোচনায় ভাগ করে নিতেন, তাও বাবার কাছে লেখা তিনটি চিঠি আবিষ্কার করেছি। ১৯৭৭-এ অতীতের কথা ভাবছেন। লিখছেন, ‘আপনাদের কথা প্রায়ই বলাবলি করি। আশ্চর্য কালকের কথা মনে থাকে না, অথচ তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের পূর্বের ঘটনা পরিষ্কার মনে হয়। আশা করি আবার দেখা হবে। আশীর্বাদ করিবেন, স্নেহের আব্দুর রাজ্জাক।’ দেখা হয়েছিল দিল্লিতে।
১৯৭৫-এর প্রথম দিকে রাজ্জাক সাহেব ব্যবস্থা করে মা-বাবাকে দিয়ে গেলেন ঢাকায়, Grants Commission- এর নিমন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বক্তৃতা দিতে হবে। যাওয়ার আগে মা জানতে চেয়েছিলেন ওখানে থাকার ব্যবস্থা কী হবে এবং এই মর্মে বাবা রাজ্জাক সাহেবকে লিখেছিলেন। মর্মাহত বা অভিমান করে তিনি জবাব দিলেন, যা একজন অতি প্রিয়জন, কাছের মানুষ দিতে পারেন। ২/১/১৯৭৫-এ কিঞ্চিৎ অভিমানের চিঠি।
‘স্যার, আপনার চিঠি পাইয়া দুঃখিত হইয়াছি। আপনারা দুইজনে ঢাকা আসিবেন, আপনাদের থাকার ব্যবস্থা হইবে কিনা, ইহা চিন্তার বিষয়! Grants Commission আপনাদের থাকার ব্যবস্থা অবশ্য করিবে— যদি মেহেরবাণী করিয়া আপনারা দুইজন আমার সঙ্গে থাকেন, আমি অত্যন্ত বাধিত হইব। যদি বিশেষ অসুবিধা হয়, পরে Grants Commission-এর ব্যবস্থা অনুযায়ী থাকিলেই হইবে। আশা করি আর চিন্ত করিবেন না। ... ইতি স্নেহের আব্দুর রাজ্জাক।’
মা-বাবা তার কাছেই ছিলেন। পুরোপুরি ‘লাল গালিচা’ অভ্যর্থনা, যত্ন। কুলসুম আপা, বেগম এমএন হুদার কাছে শুনেছি, সন্ধ্যাবেলা সবাই একত্র হতেন তাদের বাড়িতে। বাবা একটু উঁচু চেয়ারে বা খাটে, বাকিরা নিচে গালিচায় বসা, আলোচনা-প্রশ্নোত্তর নানা বিষয়ে, সবারই চেহারা উজ্জ্বল। বছরের পর বছর ঢাকায় উত্সুক, কৌতূহলী, মেধাবী ছাত্র পেয়েছেন, আর কোথাও তা পাননি বাবা। অন্তর থেকে তৃপ্তি আমি বুঝতে পারি। জীবনে নাম-যশ প্রচুর পেয়েছেন, তবে ঢাকার ছাত্রদের সঙ্গে সময় কাটানো দিয়েছে ভিন্ন আনন্দ, পূর্ণতা।
মা-বাবা ঢাকা কখনো ফিরে যাবেন কল্পনা করেননি। রাজ্জাক সাহেবের বাড়িতে ভ্রাতৃবধূ হেলির যত্নে প্রচুর আনন্দে কটা দিন কাটিয়েছেন। নিরাশ হলেও বাপের বাড়ি উমা কুটির দেখে এসেছিলেন, ৫ নং পুরানা পল্টনে আপ্যায়ন পেয়েছেন, সর্বোপরি বহু অতীতের বন্ধুত্ব স্নেহ-ভালোবাসার দেশে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এর চেয়ে বড় গুরুদক্ষিণা বাবাকে কেউ দিতে পারতেন না।
২০০৮-এ যখন ঢাকা যাই, অনেকে আমাকে বলেছেন, আপনার বাবা, তিনি তো প্রবাদপ্রতিম, তিনি তো ঢাকা ইউনিভার্সিটির Legend— এমন শিক্ষক ছিলেন। ১৯৪৫-৪৭-এর কথা মনে করে ভেবেছিলাম, এ কি পরিহাস? নিজের ভুল বুঝতে সময় লাগেনি— সে তো ছিল রাজনীতি, বাবার স্মৃতি ঢাকায় থাকবে Legend হয়ে। রাজ্জাক সাহেবের মতো ছাত্র, নতুন প্রজন্মের ছাত্রদের মধ্য দিয়ে।





