স্কুল মিলনায়তনে সব শিক্ষক ও ছাত্রের সামনে একটা উঁচু টেবিলে উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল সে। দুজন শিক্ষক তার মাথা ও পা টেবিলে চেপে ধরে ‘বানর’ বলে গাল দিচ্ছিল আর তৃতীয়জন পাছায় বেত্রাঘাত করছিল। শরীর মুচড়ে সে যত ভয়ার্ত স্বরেই আর্তনাদ করুক না কেন, তাকে যেতে দেয়া হচ্ছিল না। চেঁচাক না বানরটা। একপর্যায়ে তার প্যান্ট ছিঁড়ে যায়, রক্ত বেরিয়ে আসে, এর কয়েক ফোঁটা চেপে ধরে রাখা শিক্ষকদের শার্টে এসে লাগলেই কেবল তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কান্নার শক্তিরহিত সে, কোনোমতে উঠে দাঁড়ায়, লেংচে লেংচে বেরিয়ে যায়, তাকে আর দেখা যায়নি সেই সরকারি কিংবা অন্য কোনো স্কুলেই। তার অপরাধ? তাকে স্কুল প্রাঙ্গণে মাতৃভাষা গিকুয়ুতে কথা বলার সময় হাতেনাতে ধরা হয়েছে, একবার নয় একাধিকবার। তা শিক্ষকরা কী করে তার এ পাপাচার সম্পর্কে জানতে পারলেন?

স্কুল প্রাঙ্গণে আফ্রিকি ভাষায় কথা বলা অপরাধ। একজন ছাত্র যদি আরেকজনকে আফ্রিকি ভাষায় কথা বলতে দেখত, তাহলে সে তাকে একটা চাকতি ধরিয়ে দিত, যা তাকে গলায় পরে থাকতে হতো, যতক্ষণ না সে তার মতো আরেকজন অপরাধীকে ধরতে পারত; সে তখন এ ভীতিকর জিনিসটি তার গলায় ঝুলিয়ে দিত, এইভাবে, সারা দিন ধরে শিশুরা পরস্পরের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালাত, এমনকি কেউ কেউ কৌশলে অন্যকে এ নিষিদ্ধ ভাষা বলার ফাঁদে আটকাতেও দ্বিধা করত না। দিন শেষে চাকতি গলায় যাকে পাওয়া যেত, সে-ই হতো সেদিনের আসামি, যাকে পরে শাস্তি দেয়া হতো। ওপরে বর্ণিত বেত্রাঘাতপ্রাপ্ত ছাত্রটি পরপর কয়েক সপ্তাহ আসামির মর্যাদা পাওয়ায় নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, সে সচেতনভাবেই গিকুয়ু ভাষা উচ্চারণের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করছিল। শিক্ষকরা অন্যদের শিক্ষা দেয়ার জন্য তাকে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।

এই ছিল গত শতকের পাঁচের দশকের কেনিয়া। দেশটি তখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, আর তার চাষযোগ্য কেন্দ্রভূমিটি ছিল বেশ বড় শ্বেত জনগোষ্ঠীর বাসস্থল, যাকে তারা বলত সাদা পাহাড়। তবে উপনিবেশের সূত্রপাতের সময় অর্থাৎ ১৮৯৫ সাল থেকেই কেনিয়ার অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে ঔপনিবেশিক দখলদার শক্তির, পাঁচের দশকের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে যা চূড়া স্পর্শ করে, যখন মাও মাও (যার অর্থ কেনিয়া ভূমি) অনুসারী ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পাহাড়, জঙ্গল থেকে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এ যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই কেনিয়াজুড়ে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সচেতনতার উন্মেষ হয়, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় আফ্রিকি ভাষায় রচিত অসংখ্য গান, কবিতা ও সংবাদপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে। অবশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেসব সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে আফ্রিকি ভাষায় পরিচালিত স্কুলগুলোও উচ্ছেদ করা হয়।

আমি ১৯৪৭ সালে কামান্দুরা নামে একটি মিশনারি পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যাই। কিন্তু ততদিনে নতুন জাতীয়তাবাদী চেতনার ঢেউ এসে লাগে সেখানেও, কেননা গুজব ছিল যে, মিশনারি স্কুলগুলোয় সচেতনভাবেই আমাদেরকে প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল। আফ্রিকিদের যথেষ্ট ইংরেজি না শেখানোর অভিযোগে অভিযুক্ত এসব স্কুল থেকে আমাদের কাউকে কাউকে বের করে নিয়ে মাঙ্গুতে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে আফ্রিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি শেখানোর ওপর জোর দেয়া হতো। ধর্মের ক্ষেত্রে কিছু জাতীয়তাবাদী স্কুল, যারা নিজেদের স্বনির্ভর বলে দাবি করত, রক্ষণশীল গির্জার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রথম ও চতুর্থ শতাব্দীর খ্রিস্টীয় যুগের মিসর ও ইথিওপীয় খ্রিস্ট ঐতিহ্যের ধারাবাহিক পরম্পরার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে।

এ সম্পর্ক সূত্রের কথা জানার মতো বয়স আমার ছিল না, আমি শুধু জানতাম আমি যে স্কুলে পড়তে যাচ্ছি, সেখানে আমাদের অন্যান্য বিষয় ও ভাষার (আমার ক্ষেত্রে গিকুয়ু) সঙ্গে ‘গভীর’ ইংরেজিও শেখানো হবে। আমি মনে করতে পারি না জাতীয়তাবাদী স্কুলে আমাদের যে ইংরেজি শেখানো হয়েছিল, সেটা আগের স্কুলগুলোর চেয়ে ‘গভীর’ ছিল কিনা— আমার সন্দেহ হয় ইংরেজি শেখানোর পদ্ধতির ক্ষেত্রে আদৌ কোনো পার্থক্য ছিল না— তবে আমার মনে আছে গিকুয়ু ভাষায় লেখা আমার একটি রচনা এতটাই ভালো হয়েছিল যে, গোটা ক্লাসের সামনে আমাকে প্রশংসিত করা হয়েছিল।&dquote;&dquote;

শ্রেণিকক্ষে গিকুয়ু ও ইংরেজির এ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কয়েক বছর পরে একদিন হঠাৎ করে পাল্টে গেল, যখন আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হলো, কয়েকটিতে পরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানরূপে পুনর্জন্ম দেয়া হলো। মাঙ্গু ছিল তাদেরই একটি, ইংরেজি শেখার পূর্বশর্ত হিসেবে গিকুয়ু ভাষাভাষীদের অপমান করা ছিল, এ পরিবর্তনের তাত্ক্ষণিক ফসল। এ নতুন ব্যবস্থার ছত্রচ্ছায়াতেই গিকুয়ু ভাষার ওপর সন্ত্রাস শুরু হলো। চিত্কাররত সেই ছাত্রটিকে পীড়ন করা হচ্ছিল তাকে তার মাতৃভাষার অন্ধকার থেকে ইংরেজি বিদ্যার আলোর অভিমুখে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সব শিক্ষা ব্যবস্থাতেই আমি ইংরেজি ভাষাটা উপভোগ করেছি, তবে চিত্কার করা সেই ছাত্রটির দৃশ্য আমাকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে, এমনকি ধন্ধে ফেলে দিয়েছে। সেই ছাত্রটিকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল গিকুয়ু ভাষায় কথা বলার জন্য, যে ভাষায় সুন্দর করে লেখার জন্য একদা আমাকে প্রশংসা করা হয়েছিল। আমাকে যে-শিক্ষকরা প্রশংসা করেছিলেন সম্ভবত তাদের কোনো সমস্যা ছিল, কেননা ইংরেজি শিক্ষানির্ভর নতুন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় তারা সবাই চাকরি হারিয়েছিলেন। নতুন শিক্ষকরা আফ্রিকি, কৃষ্ণাঙ্গ, গিকুয়ুভাষী; আফ্রিকি ভাষাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার জন্য নানা কায়দা-কসরত উদ্ভাবন করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ভাষা-অপরাধীদের দিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন করানো যার ভাষ্য ছিল, ‘আমরা সবাই গর্দভ।’ এটা ছিল এক আত্মক্ষয়ী যুদ্ধ, যার মাধ্যমে ক্রমেই আমাদের মাতৃভাষার প্রতি সব গর্ব ও আস্থাকে খুইয়ে দেয়া হচ্ছিল। এ ভাষার মাধ্যমে আমাদের কিছুই শেখানোর নেই, অন্তত এমন কিছু নয়, যার মাধ্যমে আলোকিত ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারি। যারা গিকুয়ু বলে, তাদের জন্য যাবতীয় নিন্দা আর সব প্রশংসা ইংরেজি ভাষায় দক্ষদের জন্য। মাতৃভাষার বলয় থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে ইংরেজির গৌরব অর্জনের মধ্য দিয়ে আমি বড় হয়ে উঠি। তার পুরস্কারও ছিল। ইংরেজিতে ভালো করার অর্থ ছিল শিক্ষার মই বেয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়া। এই আপ্তবাক্যই আমাকে ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান মাঙ্গু থেকে নিয়ে যায় সেই সময়ে আফ্রিকিদের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স হাইস্কুলে এবং কালক্রমে সেখান থেকে উগান্ডার কাম্পালার মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আমি ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করি।

এই মাকেরেরেতেই ছয়ের দশকে বিউপনিবেশীকরণের যুগে, যখন আফ্রিকা মহাদেশের একের পর এক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করছিল, তখন আমি দ্য রিভার বিটুইন ও উইপ নট চাইল্ড উপন্যাস দুটি এবং বেশকিছু ছোটগল্প ও নাটক লিখি, সবই ইংরেজি ভাষায়। পরে যখন আমি ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, তখন আ গ্রেইন অব হুইট উপন্যাসটি লিখি, ইংরেজি শব্দকে নাচিয়ে, খেলিয়ে আমার জীবনের সব রঙ ও রেখা ধারণ করতে গিয়ে আমি সত্যিকার আনন্দ উপভোগ করি আ গ্রেইন অব হুইট লেখার সময়, যা রচিত হয়েছিল ইয়র্কশায়ার মুরস্-এর কাছে (যে প্রেক্ষাপটে ব্রন্টির উইদারিং হাইটস লেখা হয়েছিল) ব্রডিংটনে অবস্থিত ছাত্রাবাসের এক কক্ষে; আমি নেপথ্যে বিটোভেনের পঞ্চম সিম্ফনি বাজাতাম এবং চেষ্টা করতাম একইভাবে অনেকগুলো গল্পকে একসঙ্গে ক্রমে একটা অখণ্ড এককে গেঁথে তুলতে। ইংরেজি শব্দের ওপর ভর করে আমি মানব অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার উচ্চাশা পূরণের বাহন হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে বেছে নেয়া কেন? এখানে কোনো পছন্দের প্রশ্ন ছিল না। ততদিনে আমার শিক্ষাজীবনে, আফ্রিকা ও বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ইংরেজিতে লেখাটাই ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়। ইংরেজিতে লেখাকে স্বাভাবিক ও আকাঙ্ক্ষিত মনে করার জন্যই আমাকে সামাজিকভাবে তৈরি করা হয়েছিল, এমনকি আমার লেখার বিষয় যখন বিউপনিবেশীকরণ ও স্বাধীনতার নাটক ও সংঘাত, তখনো।

আমার লেখার রসদ আমি জোগাড় করেছি গিকুয়ুভাষী ও আফ্রিকার জনগণের জীবন ও সংস্কৃতি থেকে। তাদের ইতিহাস, বিশেষত উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ছিল আমার লেখার কেন্দ্রীয় বিষয়। এ ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভাষামাধ্যম ছিল গিকুয়ু ও অন্যান্য আফ্রিকি ভাষা। ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগঠিত মাও মাও বিদ্রোহীরা পর্বত ও জঙ্গলের আস্তানায় বসে ইংরেজি ভাষায় তাদের যুদ্ধের পরিকল্পনা করেনি, তারা গিকুয়ু কী সোয়াহিলি ও অন্যান্য আফ্রিকি ভাষায় কথা বলত। তার পরও আমি এমনভাবে লিখেছি যেন তারা ইংরেজিতেই আলাপ করত। আমি তাদের কণ্ঠ শুনেছি গিকুয়ুতে, কিন্তু তা লিপিবদ্ধ করেছি ইংরেজি ভাষায়। আমি যা করেছিলাম, সেটা এক ধরনের বানানো অনুবাদ। তার অর্থ এই যে, আমি যতটা ইংরেজি উপন্যাস লিখেছি, তার প্রতিটারই একটা আদি ভাষ্যরূপ ছিল। যা কখনো লেখা হয় না, যা শুধু মানসজগতে অস্তিত্বশীল, সেই আদি রূপটির তাহলে কী হয়? এটা হারিয়ে যায়, আমরা কেবল ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই তাতে প্রবেশাধিকার লাভ করি। আমার শিক্ষিত হাতে গিকুয়ু ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইংরেজির মুখোশ পরে ভূমিষ্ঠ হয়।&dquote;&dquote;

আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি ভাষারই রয়েছে নিজস্ব প্রতিভা। ক’জন মানুষ সে-ভাষায় কথা বলে, তাতে কিছু আসে যায় না। ভাষাপ্রতিভা ভাষাভাষীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। আমি গিকুয়ু ভাষার প্রতিভা হরণ করে ইংরেজি ভাষাপ্রতিভার সঙ্গে যোগ করছিলাম। কিন্তু ভাষা তো কেবল কিছু ধ্বনির বিন্যাস নয়। ভাষা খোদ সেই ভাষায় কথা বলা মানুষেরাই। গিকুয়ুকে বঞ্চিত করে ইংরেজিকে ঋদ্ধ করার চেয়েও বড় কিছু যুক্ত ছিল আমার ইংরেজিতে লেখার সঙ্গে। গিকুয়ু ভাষাপ্রতিভা যারা তৈরি করেছিল, আমি তাদেরকে নিজ ভাষা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম, যাতে করে তারা শুধু অন্য এক বিজাতীয় ভাষার মাধ্যমেই তাদের ইতিহাসের স্বাদ পেতে পারে। আমার গোড়ার দিকের লেখায় আমি এটা নিয়ে ভাবিনি, আমি আমার লেখাকে ছাপার অক্ষরে দেখতে পেয়ে, আফ্রিকা ও বিদেশে ইংরেজি পত্রিকায় আমার লেখার প্রশস্তিবাচক আলোচনা দেখতে পেয়ে রোমাঞ্চিত ছিলাম। তবে এই অবস্থা ক্রমে আমাকে ক্ষুব্ধ করতে শুরু করল। আমি কাদের জন্য লিখছি?

আ গ্রেইন অব হুইট প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। লেবাননের বৈরুত ভ্রমণকালে আমার হাতে লন্ডন অবজারভার পত্রিকার একটা কপি আসে, যেখানে সেই উপন্যাসটির প্রশস্তি ছাপা হয়। তাতে প্রকাশিত উষ্ণ অনুভূতিটুকু অন্য সব প্রশস্তিবাচক আলোচনারই অনুরূপ ছিল। কিন্তু এত প্রশংসা সত্ত্বেও আমার ব্যবহূত ভাষিক আঙ্গিক বিষয়ে যে ইঙ্গিত ছিল, তা আমাকে বিব্রত করে। লিডস-এ ফিরে একটি ছাত্র-পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাত্কারে আমি বলেছিলাম, আ গ্রেইন অব হুইট-এর পর আমি হয়তো আর কোনো উপন্যাস লিখব না। কেন? কারণ কেন লিখছি, সেটা আমার জানা থাকলেও কাদের জন্য লিখছি, সেটা বুঝতে পারছিলাম না। যাদের জন্য আমি এমন সুচারুরূপে লিখে যাচ্ছিলাম, তারা তাদের নিজেদের জীবনের সেই গল্প নিজের ভাষায় পড়ার মতো অবস্থায় ছিল না। এখন পেছন ফিরে যেটা আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর মনে হয় সেটা হচ্ছে, তাদের জন্য বোধগম্য একটি ভাষায় লেখার পরিবর্তে আমি একেবারেই আর না লেখার কথা ভাবছিলাম! আমি তখনো যেকোনো সাহিত্যিক সদগতির মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকেই একমাত্র সম্ভাবনা বলে গণ্য করছিলাম। আমার প্রত্যুত্তরের মধ্যে কী এক আজগুবি পছন্দেরই না ইঙ্গিত ছিল। হয় ইংরেজিতে লিখো, না হয় লিখোই না এবং সত্যি সত্যি আমার পরবর্তী উপন্যাস পেটালস অব ব্লাড, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালে, ইংরেজিতেই লেখা হয়েছিল, যদিও তাতে ছড়ানো ছিটানো ছিল কিছু গিকুয়ু ও সোয়াহিলি শব্দ— যেনবা ভাষা ব্যবহারের ভেতর দিয়ে আমি আমার অবস্থান ও চর্চার স্ববিরোধটুকু প্রকাশ করে দিচ্ছিলাম।

আমার জীবনের দুটি ঘটনা গিকুয়ু ও ইংরেজির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা পাল্টে দেয়। ১৯৭৬ সালে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অধ্যাপক থাকাকালে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় নাইরোবি থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে লিমুরু শহরের নিকটবর্তী কামিরিথু গ্রামের স্থানীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রে কাজ করার জন্য। শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক এ প্রকল্পের কাজ ছিল সাক্ষরতা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রদান। নাটকীয় উপস্থাপনাই হয়ে দাঁড়ায় এ দুই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান মাধ্যম। কামিরিথুর অধিবাসীরা গিকুয়ু ভাষায় কথা বলত এবং এই গ্রামে কাজ করতে গিয়ে গ্রামবাসীদের ভাষায় কথা বলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। বাস্তবতার প্রয়োজনে জীবনে প্রথমবার আমি গিকুয়ু ভাষার মুখোমুখি হতে বাধ্য হই। ন্গুগি ওয়া মিরির সহযোগিতায় ন্গাহিকা নিদন্দা (ইংরেজিতে আই উইল ম্যারি হোয়েন আই ওয়ান্ট) লেখা ছিল তার তাত্ক্ষণিক ফসল, যা গ্রামবাসীদের দ্বারা উষ্ণভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাকে গ্রহণ করে শত্রুতার সঙ্গে। নাটকটির অভিনয় হয় ১৯৭৭ সালের ১১ নভেম্বর আর ডিসেম্বরের ৩১ তারিখে আমাকে গ্রেফতার করে কেনীয় সরকার এবং কামিতির সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক কারাগারে আটক করে রাখে। আমি এ বিষয়ে আমার অনেক বইয়ে লিখেছি, বিশেষ করে ডিটেইনড: আ রাইটার’স প্রিজন ডায়েরি বইয়ে।&dquote;&dquote;

আমি সেই লেখাগুলোয় যা উল্লেখ করিনি তা হলো, ১৯৭৭ সালের কামিরিথুর সেই ঘটনা এবং এরও ৩০ বছর আগে সংঘটিত আমার প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যকার সমান্তরালতার কথা। জাতীয়তাবাদী পর্বের মাঙ্গু পর্যায়ের পর এটাই ছিল আমার গিকুয়ু ভাষায় কিছু লেখার প্রথম সৎ প্রচেষ্টা। জাতীয়তাবাদী স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্ররা আমার লেখা গিকুয়ুর খুব প্রশংসা করেছিল। একইভাবে বহু বছর পরে কামিরিথুর গ্রামবাসীদের কাছে আমার নাটকটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল দারুণ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই প্রশস্তির প্রতিক্রিয়া ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক স্কুলের কর্তৃত্ব গ্রহণ ও স্কুল প্রাঙ্গণে গিকুয়ুভাষীদের ওপর পীড়নের অভিযান। চিত্কাররত সেই ছাত্রটিকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে গ্রামবাসীদের প্রশংসাস্তুতির ফসল হিসেবে আমার ভাগ্যে জোটে কারাবাস, আমাকে শিক্ষাকক্ষ থেকে বের করে দিয়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

এটা বলা যেতে পারে যে, কামিরিথুর সঙ্গে যোগাযোগের ফলে গিকুয়ু ভাষাপ্রতিভার সঙ্গে আমার পুনঃসংযোগ ঘটে। এটা কিঞ্চিৎ পরিমাণে সত্য। কৃষিজীবী মানুষেরা তাদের ভাষার প্রতি বিশ্বাস বজায় রেখেছিল। ব্যবহারের মাধ্যমে তারা একে জীবন্ত রেখেছিল। আমি তাদের কাছ থেকে অনেক শিখেছি। তবে সেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগারের ১৬ নম্বর কক্ষেই আমি গিকুয়ু ভাষার প্রতিভার সত্যিকার সংস্পর্শে আসি। আমি একটা আফ্রিকি ভাষায় লেখার অপরাধে আরেকটি অফ্রিকি সরকার কর্তৃক বন্দি হয়েছিলাম। কেন? এ প্রশ্ন আমাকে ভাষা, ঔপনিবেশিকতা এবং এই দুয়ের সম্পর্ককে নতুন করে খতিয়ে দেখতে উদ্ধুদ্ধ করে। আমাকে সেই ভাষার সঙ্গে একটা সংযোগসূত্র খুঁজে বের করতেই হচ্ছিল, যার জন্য আমাকে অত্যাচারিত হতে হয়েছিল। এটা কোনো স্মৃতিকাতরতার বিষয় ছিল না। আমি আবেগপ্রবণভাবেও কাজ করছিলাম না। আমার অস্তিত্বের তাগিদেই আমাকে সেই সম্পর্কটা খুঁজে বের করতে হচ্ছিল। এটা ছিল এক ধরনের প্রতিরোধ তত্পরতা। আমি তাই, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক সরবরাহকৃত বিনামূল্যের ঘরে বসে গিকুয়ু ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাসটি রচনা করি এক তাড়া শৌচপত্রের ওপর। সাইতানি মুথারাবা-ইনি নামের এ উপন্যাস ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়ে মৌখিকভাবে প্রশংসিত হয়। ১৯৮২ সালে এটা ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ডেভিল অন দ্য ক্রস নামে প্রকাশিত হলে ইংরেজি কাগজগুলোয় সাহিত্যিক প্রশংসা পায়— যদিও এবার, আমার সম্প্রদায় কর্তৃক আলোচিত হওয়ার পরই। ১৯৭৮ সালে জেল থেকে বের হওয়ার আগেই আমার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গিয়েছিল। আমি আর কখনো ইংরেজি ভাষায় গল্প-উপন্যাস রচনা করব না (গিকুয়ু ভাষা থেকে করা অনুবাদ ছাড়া)। এখন থেকে গিকুয়ুই হবে আমার সব সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের ভাষা। এরপর থেকে আমি আর পেছনে ফিরে তাকাইনি। ডেভিল অন দ্য ক্রস-এর পর লেখা হয় মাতিগারিমা নিজরুঙ্গি আর সম্প্রতি আমি ১৯৯৭ সালের মে মাসে শুরু করা একটি পাণ্ডুলিপি পরিমার্জনার কাজ শেষ করেছি। মুরোগি ওয়া কাগোগো প্রকাশিত হলে এটা হবে গিকুয়ু ভাষায় লেখা দীর্ঘতম উপন্যাস, যার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হবে উইজার্ড অভ দ্য ক্রো নামে।

অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গিকুয়ু ভাষায় আরো কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারের উদ্ভব। একটা নতুন সাহিত্যের জন্ম হয়েছে। এ ঐতিহ্যের যদি কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য সূচনা থেকে থাকে, তাহলে সেটা ১৯৭৭-৭৮ সালে, কেনিয়ার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কারাগারের ১৬ নম্বর কক্ষ। কিংবা এরও আগের সে দিনটি, যেদিন আমি সেই চিত্কার করা ছাত্রটির দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। তার দুর্দশা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আমি সম্ভবত তার নিয়তির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। একমাত্র ভাষাপ্রতিভাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল এ গল্পটি বলার জন্য।

 

* লেখাটি ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে পত্রিকার সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০০৪ সংখ্যায় Recovering the Original  শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

** বর্তমান প্রবন্ধের লেখক ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ওর সঙ্গে এ অনুবাদকের সাক্ষাৎ হয়েছিল নিউইয়র্ক শহরে, ১৯৯৫ সালে। এই প্রবন্ধে উল্লিখিত ও Will Marry When I Want নাটকটি ন্গুগির অনুমতিক্রমে এ অনুবাদক কর্তৃক রূপান্তরিত হয়ে শরিয়তি শাদি নামে মঞ্চস্থ হয় নিউইয়র্কে একই বছরে, পরবর্তীতে যা বাংলাদেশ থেকে গির্জা বিয়ে নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।