কি, ব্যাপার কি তোমার, কতবার বলেছি, বেলা ১২টার আগে এখানে ফোন করবে না!

মিসেস অ্যান্ড্রুকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘরে ঢুকে গেল রেবুতি সেন। সোজা গিয়ে দেয়ালের তাক থেকে ব্ল্যাক লেবেলের বোতলটা নামিয়ে গ্লাসে ঢেলে ঢক ঢক করে গিলে নিয়ে মেঝেতে সটান হলো। কোনো কথা বলল না আর। বুকটা ওঠানামা করছে তুমুল বেগে। মিসেস অ্যান্ড্রু হতবাক রেবুতির এ আচরণে। প্রথমত সোডা ছাড়া হুইস্কি ছোঁবে না ও। তাও এ রকম খাপছাড়া সময়ে। ধীরে-সুস্থে দরজা লাগিয়ে বসার ঘরের পাশে দেয়ালের ঝুলন্ত মিনিবার থেকে আরেকটা গ্লাস নামিয়ে মিহি শব্দে রেড ওয়াইন ঢালল। একটু বেশি উঁচু করে বোতলটা থেকে মদ ঢালার এ কায়দাটা একেবারেই মনের অজান্তে করে মিসেস অ্যান্ড্রু।

নাও এটা খাও। আরাম পাবে। ইশ! কি ঘামছ তুমি। শাওয়ার নেবে কি!

রেবুতি এক ঝটকায় গ্লাসটা খালি করে জামাটা খুলে ফেলল। পরনে শুধু ব্রা আর জিন্স। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক। ঠোঁটের ভাঁজে গতকালের লিপস্টিক লেগে রয়েছে এখনো। বুকের নরম মাংসে এঁটে বসে থাকা নীল রঙের ব্রা ভেদ করে দুটো বালি হাঁস উড়ছে। নিখুঁত ট্যাটু।

 

কটা বালি হাঁস তোমার বুকে?

সাতটা!

নির্বিকার উত্তর রেবুতির।

দেখবে তুমি!

সিগারেট ধরাতে ধরাতে মিসেস অ্যান্ড্রু বললেন,

আই অ্যাম নট স্টুপিড লেসবিয়ান! টেল মি হোয়াই ইউ ডিড নট টেক লিপস্টিক অন ইওর লিপ!

মিসেস অ্যান্ড্রু, সকালে পুলিশ এসেছিল আমার বাড়ি। ভাবতে পারেন কেন?

সিগারেটে লম্বা টান দিল মিসেস অ্যান্ড্রু। মুখটা প্রশ্নহীন, কৌতূহলহীন।

গতকাল রাতে মি. এনাম মারা গিয়েছেন। পুলিশ বলছে, খুন হয়েছেন। মিসেস এনামকে মেসেঞ্জারে পাচ্ছি না। আজই ফেরার কথা থাইল্যান্ড থেকে অবশ্য। ব্যাটা মরবি তো মর, মরার আগে আমাকেই লাস্ট কল করতে হবে!

তাই বলে সব ভুলে নিয়ম ভঙ্গ করে এখানে ফোন করবে তুমি। এখন ল্যাজ তুলে হারামির দল এখানে না এলেই হলো। ওদের গায়ের গন্ধে বমি পায় আমার জানো না তুমি। চার চারটে বছর তো কাটিয়ে দিলে এখানে, ভুলে যাও কেন সবচেয়ে ঘৃণা করি পুলিশ।

স্যরি! তবে আমি বাইরে থেকে ফোন করেছি। কেউ টের পাবে না।

নাও, যাও তো এবার শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াও। খিদে পেয়েছে আমার, তোমার মতো চিকন কোমর করার ইচ্ছে নেই আমার।

আপনার চিন্তা হচ্ছে না একদম আমাদের জন্য! পিয়াসা দেশে ঢুকলেই ওকে পুলিশ ধরবে। আমাকে কত বিশ্রী বিশ্রী কথা শুনতে হচ্ছে জানেন।

আগে পেট ভরে খেতে চাই রেবুতি। আর পিয়াসা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। ও জানে কী করে কোন মাছ বঁটিতে বাগাতে হয়। সবার ছাই লাগলেও ওর লাগে না। জাস্ট বছরটা ঘুরতে দাও, পার্লামেন্টে ওর গলা শুনতে পাবে তুমি। চলো আর দেরি করো না। আমাকে ভেটের কাছে যেতে হবে বিকালে, মাইকেলের মুড অফ হয়ে আছে।

রেবুতি খুলে ফেলা জামা হাতে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে খেয়াল করল, বারান্দার এক কোণে গোল পাকিয়ে শুয়ে আছে মাইকেল। চোখ দুটো খুলল কি খুলল না। মিসেস অ্যান্ড্রুর একমাত্র দেহরক্ষী মাইকেল। শাওয়ারের নবে আস্ত বিছে বসানো। কোত্থেকে যে এই অদ্ভুত জিনিস জোগাড় করে মিসেস অ্যান্ড্রু কে জানে। তার ধারণা পোকামাকড়ের ভয় যতদিন মেয়েদের কাবু করে রাখবে, ততদিন পুরুষরা ঠাট্টা-তামাশা জারি রাখবে মেয়েদের নিয়ে। তাই বলে সারা ঘরময় এসব পোকামাকড়ের সুইচ, নব দিয়ে ঠাসা রাখতে হবে!

যত্তসব।

এখানে যারা আসে সবাই জানে মিসেস অ্যান্ড্রুর মতো সাহসী মহিলা এ শহেরে আর একটাও নেই। রেবুতির জীবনের কত কি যে পাল্টে গেছে এই চার বছরে, সেটা রেবুতির কাছেরজনেরা খুব ভালোভাবে টের পাচ্ছে। ভেবেছিল মডেল হবে। সারা শহরের বিলবোর্ডে ওর ছবি জ্বলজ্বল করবে। কিন্তু কিসের কি! রেবুতি সেন এখন সফল ব্যাংকার। বিজনেস ম্যাগাজিনের পাতায় রেবুতি সেনের একেকটা ছবি যখন আসে, ইনবক্স ভরে মেসেজ আসে। ও যখন পার্লারে যায়, তখন মেয়েরা ওর মতো চুল কাটাতে চায়। এর সবই সম্ভব হয়েছে মিসেস অ্যান্ড্রুর সদয় দৃষ্টিতে। নইলে কোথায় ভেসে যেত রেবুতি। দরজায় নক হচ্ছে, তার মানে অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ার নিচ্ছে ও। দুধ সাদা টাওয়েলটা শরীরে পেঁচিয়ে বের হলো রেবুতি।

তোমার বয়স বাড়ছে না কমছে বলো দেখি! এখনো সময়ের ব্যবহার শিখলে না ঠিকমতো।

রেবুতি মিটমিট করে হাসছে। টেবিলের আয়োজন সীমিত। ফ্রুট সালাদ আর টক দই। সামান্য ভেজানো বাদাম। দেয়ালের বিশাল স্ক্রিনে স্কাইপিতে উপস্থিত মি. অ্যান্ড্রু গ্লাস উঁচু করে চুমু ছুড়ে দিলেন মিসেস অ্যান্ড্রুর দিকে। কাঁটাচামচে গাঁথা স্ট্রবেরির আধখানা উঁচু করে মিসেস অ্যান্ড্রুও লাঞ্চ শুরু করলেন। দেখে দেখে চোখ পচে গেল রেবুতির। কথা সাক্ষাৎ সবই স্কাইপিতে, এ আবার সংসার নাকি! একজনের বরফ রাত তো আরেকজনের তাপদাহ দিন। অথচ মিসেস অ্যান্ড্রু নাকি এ বিয়েতেই সবচেয়ে সুখী। রেবুতি সেনের মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক মিনিটেই বুঝে ফেললেন ওর মনোভাব। শান্ত আর দরদ মাখা স্বরে বললেন,

আমি বেরোলে সোজা ঘুমোবে। তারপর ইয়োগা করে সন্ধ্যার পর মদ ছোঁবে। তোমার মন গোয়ালার বালতির মতো অর্ধেক পানি অর্ধেক দুধের হয়ে আছে। পুরোপুরি এক বস্তুতে না থাকতে পারলে বুঝবে এ জীবন বৃথা।

রেবুতি সেন এ সুযোগ কোনোদিন পায়নি। এ বাড়িতে ও একা থাকবে বেশ কয়েক ঘণ্টা তাও মাইকেলের মতো অমন ষণ্ডামার্কা কুত্তাহীন। মিনিট পাঁচেকের ভেতর তৈরি হয়ে সদর দরজার হাতলে হাত রাখলেন মিসেস অ্যান্ড্রু। হাতল বলতে সেখানে ঝুলছে ধাতব কাল কেউটে। আহা! কি মিষ্টি লাগছে দেখতে। সাদা কাতান সরু পাড় লাল স্লিভ লেসে মাখনের মতো মসৃণ ত্বকে একটা উল্লাস ছলকে ছলকে উঠছে। চোখে কোমল দৃষ্টি। রেবুতির প্রতি গভীর মমতা বোধ করেন মিসেস অ্যান্ড্রু। তাই তো গড়েপিটে নিতে চান। ভেট জগতের নামকরা ডক্টর মি. সাবের। তার ক্লিনিকে ওয়েটিং রুম গমগম করে সবসময়। মিসেস অ্যান্ড্রুর এ জায়গাটা বেশ লাগে। কত রকম মানুষ আর তাদের কত রকম যে পোষ্য। মাইকেলের বন্ধুবান্ধব বলতে যা আছে, সব এ ক্লিনিকেই পাওয়া। ডানের শেষ মাথায় পার্সিয়ান বেড়াল কোলে বসে আছেন সেই ড্যাম স্মার্ট ভদ্রলোকটি। বাহ আরো সুন্দর হয়েছেন তিনি দেখতে। যখনই দেখা হয়, মন ভরে দেখেন তাকে মিসেস অ্যান্ড্রু। নিজের ভেতর শক্তি সঞ্চয় করে নেন এসব শক্ত-সামর্থ্য চিরসবুজ মধ্যবয়সীদের দেখে। তাকে দেখে হাসলেন। চোখে সানগ্লাস। কদিন আগেই চোখ অপারেশন করিয়েছেন। ছেলেমেয়েরা সবাই দেশের বাইরে। স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন বহুকাল। চমত্কার রাঁধতে জানেন। অন্তত মাইকেল দারুণ পছন্দ করে। গত মাসে মাইকেলের জন্য রান্না করে এনেছিলেন। কমলার রস আর ওয়াইনের মিশ্রণে সমৃদ্ধ সে স্টেক যদি বাঁধাই করে রাখা যেত, তবে তা-ই রাখতেন মিসেস অ্যান্ড্রু।

ওদের ভেতর ফোনের যোগাযোগ নেই একেবারে, তবে অদ্ভুত এক সংযোগ হয় এখানেই। দুজনের পোষ্যই একই সময়ে অসুস্থ হয়। কেউই তারা নাম জানে না তাদের, কিন্তু ঢের আলাপ হয়। মিসেস অ্যান্ড্রু সদাহাস্য এ মানুষটিকে কখনো পিতৃস্নেহে কখনোবা তার সাহসী জীবনের জন্য দারুণ ভালোবাসেন। আজকাল এরকম বয়সে এত প্রাণের দেখা পাওয়াই মুশকিল। সিরিয়াল আগে থাকায় চেয়ার ছেড়ে উঠলেন যখন, একেবারে সোজা টানটান ভঙ্গি। বুকের ভেতর লেপ্টে আছে কাঁঠাল রঙের বেড়ালটি। মিসেস অ্যান্ড্রুর জীবনের লম্বা একটা কালের রঙ ছিল এ রকম ক্ষয়িষ্ণু হলুদ। ধীরে ধীরে সেই রঙের আস্তর খসে গিয়ে এখন সবুজ রঙে থিতু তার জীবন। তাই সেখানে যত সবুজ প্রাণের মানুষের দেখা পান, আঁকড়ে ধরে বাঁচেন। আর যাদের জীবন থেকে সবুজ মুছে যাচ্ছে দেখতে পান, তাদের জন্য দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত থাকে। বের হয়ে এলেন প্রাণদীপ্ত মানুষটি। বেশিক্ষণ ছিলেন না ভেতরে। মাইকেলের গলায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে জানালেন, তার একটা এক্সিবিশন আছে পরশু। সাদা খামে পোরা কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললেন,

আপনি কিন্তু দারুণ গুনগুন করেন। ঠুমরি আপনার খুব প্রিয় তাই না?

চমকের পর চমকে মিসেস অ্যান্ড্রু ত্বকে টান খেলেন। কিন্তু মাইকেলের তর সইল না, পারলে দরজা ফুঁড়ে ডক্টরের কোলে গিয়ে বসে। হাসির মিষ্টি একটা তরঙ্গ আর ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণায় লবিটা জমজমাট করে চলে গেলেন তিনি। মাইকেল আর ড. সাবের গল্প বলছেন, তার কোনো কিছুই ঢুকছে না কানে মিসেস অ্যান্ড্রুর। মনের ভেতর স্মৃতির হাতাপাতা! ঠুমরি? কোথায়? কোথায়? মাইকেলের সুখী গড়গড় আর ড. সাবেরের আহ্লাদের বিরতিতে কি একটা প্রশ্ন যেন করলেন? হুঁ-হ্যাঁ করে উত্তর দিচ্ছেন তিনি, আর মনের তলা থেকে ভুস করে উঠে এল বিদুষী গিরিজা দেবীর ঠুমরি শোনার সেই আসরের কথা! হ্যাঁ সেদিনও ঠিক তার পেছনেই বসেছিলেন মানুষটি। সে তো প্রায় বছর তিনেক আগের কথা। এরপর তো ক্লিনিক নয়তো আগোরার ক্যাশ কাউন্টারে দেখা হয় তার সাথে। তবু কি প্রখরভাবে মনে রেখেছেন সেদিনের সেই গুনগুন। এজন্য পুরুষ জাতটাকে এত ভালো লাগে মিসেস অ্যান্ড্রুর। কুকুরের পর এরাই এত মনোযোগ দেয় নারীকে। একটা নিবিড় ভালো লাগা নিয়ে গাড়িতে উঠলেন যখন, তখন ঢাকার জনপদে পাথর পড়ে থাকা ট্রাফিক জ্যাম।

রেবুতি ইয়োগায় বসে কোনোদিনও মন ডুবিয়ে দিতে পারে না। ওর মগজের ভেতর শুধুই ঘড়ির কাঁটার টিক টিক আওয়াজ তোলে! বিয়ের পরদিন থেকে প্রতি রাতেই ওর মগজ গুনে চলত টিক টিক টিক! কিছুতেই প্রণবের দখলদারি আচরণ মেনে নিতে পারত না ওর শরীর-মন। লাবণ্যহীন প্রেমহীন সেই রাতগুলোয় নিঃশব্দে কাঁদত রেবুতি। বিয়ের বছর দেড়েক পর অবশ্য সেসব জান্তব রাতের রহস্য উন্মোচন হয় ওর কাছে। প্রণবের নিষ্ঠুরতা সে সময় আরো তুঙ্গে। ঘরকন্নায় উদাসী রেবুতিও মডেল হওয়ার নেশায় পুরো বুঁদ। এখানে সেখানে ফটোশুট আর পার্লারের স্পায় নিজেকে ভাসিয়ে রাখাই ছিল সমস্ত দিনের ব্যস্ততা। সেদিন বৃষ্টি ছিল খুব। শ্যুট ভেস্তে যাওয়ায় বাড়ি ফিরতেই ছোটবেলায় মামাবাড়িতে খড়ের গাদায় আগুন লাগা দেখেছিল যেমন, তেমনি এক আগুন দেখতে পায় বাথরুমে ঢুকে। শাওয়ার ছাড়া ছিল বলে রেবুতির আসার শব্দ ওরা পায়নি। লক করার কথা মনে না থাকারই কথা। সেদিনের দাউ দাউ জ্বলতে থাকা দৃশ্যের সাথে আবছায়া একটা আলাপন বহু আগেই ছিল মাথার ভেতর। হোস্টেলের দিনগুলোয় এলটন জনের গান শোনার সময় পেপার পড়তে পড়তে কে একজন বলেছিল, রেবুতি— দ্যাট ম্যান ইজ গে ইউ নো?

গে কথাটার মানে প্রিন্সেস ডায়ানা মারা যাওয়ার সময় পুরোপুরি জেনেছিল এরপর। কিন্তু নিজের বেডরুমের বাথরুমে প্রণবকে তারই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সাথে এভাবে দেখার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না রেবুতির মস্তিষ্ক। দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘরের সিংকে গড়গড় করে বমি করছিল যখন, তখন সিংকে শিং মাছের বরফ জমা পোঁটলা ওর দিকে তাকিয়ে ছিল ঠাণ্ডা কুিসতভাবে। সেদিন রাতের ডিনারে বমিতে লেপ্টে থাকা সেই মাছই সুন্দর করে রেঁধে খাইয়েছিল রেবুতি। পরিতৃপ্ত আত্মীয় ভদ্রলোকটি চেটেপুটে খাচ্ছিল যখন, রেবুতির আবার বমি পেল। রান্নাঘরের মেঝে ততক্ষণে টক দই আর ওটসের থকথকে গরম লাভার স্রোতে বিদ্ঘুটে গন্ধে ভরপুর। ডিভোর্স ফাইল করার আগেই অবশ্য প্রণব শক্ত কামড় বসিয়েছিল ওর জীবনে। বিষযুক্ত সে কামড়ে বিষময় যখন ওর জীবন, মডেল হওয়া লাটে উঠেছে। আদালত পাড়ার ধুলো মেখে মেখে পায়ে খড়ি জমে যাওয়ার দশা, সে মুহুর্তে রেবুতিকে মিসেস অ্যান্ড্রুর এখানে নিয়ে আসে ওরই উকিল পারমিতা দত্ত। বিধ্বস্ত ভেঙে চুরমার রেবুতির জন্য মিসেস অ্যান্ড্রু দুদিনের মধ্যে একটা রুম ছেড়ে দিলেন। বিশাল কালী মূর্তি ছাড়া আর কিছু ছিল না সে ঘরে। অথচ তখন রেবুতির ভগবান নয়, টাকার দরকার ছিল বড্ড। কে জানে কীভাবে অত বড় কালী মূর্তি জোগাড় করেছিলেন মিসেস অ্যান্ড্রু, কিন্তু ঘরে ঢুকিয়ে বলেছিলেন,

কান্না ও খাদ্য দুটোই তোমার জন্য সবার আগে দরকার। দুদিন সময় দিলাম। জীবনের সব কান্না একবারে কেঁদে নাও। আর যখন ক্লান্ত হবে, টেবিলে এসে খেয়ে যাবে।

সত্যি, দুদিন লাগেনি রেবুতির; মাত্র এক সন্ধ্যা পরই চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল ও। এরপর তো একে একে বীথি, মৌসুমী, গায়ত্রী কতজনকে চিনল-জানল, যারা কিনা ওরই মতো জীবনের কাছে পরাস্ত হতে হতে, ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করতে করতে ফ্যাকাসে হয়ে ফের জলে টইটম্বুর। প্রণবকে মাঝে মাঝে বলে দিতে ইচ্ছে করে সেই বমি মাখা শিং মাছের ঝোলের কথা! কিন্তু ইউটিউবে ছেড়ে দেয়া ভিডিওর কথা মনে পড়লেই ওর প্রণবের প্রতি দারুণ ক্রোধ জমে। কি সাঙ্ঘাতিক ঘাতক তার জীবনে এসেছিল, যে কিনা নিজের ঘরে ক্যামেরা পেতে আটঘাট বেঁধে লিপ্ত হয়েছিল যুদ্ধে। এত বোকা ও, কোনোদিনও টের পায়নি। গোটা পরিবার, সমাজ ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই জ্বালা এখনো ওকে পোড়ায়। মিসেস অ্যান্ড্রুই অবশ্য আজকের রেবুতি সেনের ঈশ্বর। কিছু জিনিস এখনো আয়ত্তের ভেতর আনতে পারেনি ও। যেমন বিছে আকৃতির নব, হাতলে ধাতব সাপের ফনা, তেলাপোকার বিচিত্র লাইটার! ইয়োগার চেয়ে অতীত রোমন্থনে ও এত বেশি মগ্ন ছিল যে, বসার ঘরে বীথি এসে নখে নেলপলিশ দিয়ে হাওয়ায় হাত মেলে বসে আছে টেরই পায়নি।

তুমি দিন দিন ইয়োগায় ভালোই মন দিচ্ছ।

হ্যাঁ! তোমার নেলপলিশের ঘ্রাণেই তো ধ্যানভঙ্গ হলো বলো। তা খবর জেনেছ নিশ্চয়ই, আমাদের পিয়াসা সাকসেসফুল হয়েছে।

কোন খবর?

ওহ! তুমি তো খবর দ্যাখো না, পড়ও না।

আই হেট জার্নালিস্ট!

কথাটা এত জোরে প্রতিধ্বনি তুলল যে, ঘরে ঢুকেই মাইকেল ঘেউ করে উঠল। আরি বাপরে! মিসেস অ্যান্ড্রুর পেছনে ঝলমলে পিয়াসার আগমন। দৌড়ে গিয়ে চুমু খেল রেবুতি।

কংগ্র্যাচুলেশন। ফাইনালি ইউ ডান ইট।

মিসেস অ্যান্ড্রু শাসনের চোখে তাকালেন। পিয়াসা ডিভানে গা এলিয়ে দিতে দিতে বলল,

ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে! ওসব বাদ দাও তো। বল চুলের রঙটা কেমন হলো এবার?

রেবুতি বুঝল, ওর বেলায় যেমন স্বপ্নের মতো সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তার মানে এবারো কোনো এক অদৃশ্য শক্তিবলে জলভাত হয়ে গেছে মি. এনামের মৃত্যুও জটিল অংকফংক সব। গায়ত্রীর ফ্যাকাসে মুখের আবির্ভাব ঘটলো আবারো। শ্রীদেবীর ট্রমা থেকে বের হতে পারছে না এখনো। এ মেয়ে একটু নরমসরম, কিন্তু প্রয়োজনে দারুণ মারকুটে। নামকরা বুটিকস হাউজ চালায় সে। তিনটে বাচ্চার মা। প্রথম বিয়ের দুটো। পরের বিয়ের আরেকটা। দুটো বিয়েই জমেনি। তাতে কি, রাত-দিন প্রেমে পড়েই চলেছে গায়ত্রী। ওদের ভেতর একমাত্র ওই মদ ছোঁবে না, সিগারেট ছোঁবে না। মনকাড়া না হলেও বলিষ্ঠ দেখতে শুনতে। নাকের ডগায় কড়া লেন্সের চশমায় রেবুতির বেশ লাগে গায়ত্রীকে। মিসেস অ্যান্ডু্র জানালেন, আজ আর কেউ আসবে না। ফলে পিয়াসার থাইল্যান্ড সফরের গল্প শোনা যেতে পরে এখন। পিয়াসার গল্পে সবসময় একটা সাফল্য থাকে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। ৪৪ ছুঁই ছুঁই বয়সে ফের স্কুবা ডাইভিং করে এসেছে। আরো কত কি। হাতের কড়ে আঙুলে জ্বলজ্বল করছে নতুন কেনা ডায়মন্ড রিং। হাসিতে ভাঙছে লাখো কাঁচ। মিসেস অ্যান্ড্রুর চোখে পানি চলে আসে ওদের আনন্দ দেখে। তিনি সমস্ত ক্ষমতা ঢেলে এদের ঘাড় থেকে বিপদের দানবীয় ছায়া সরিয়ে ফেলেন। যার যা খুশি তাকে তাই দিয়ে খুশি রাখেন। পিয়াসা চেয়েছিল পার্লামেন্টে বসতে, ওকে তা-ই দেবেন। গায়ত্রীর পরনের কাপড় কেড়ে নিয়ে ঘরছাড়া করেছিল যে শ্বশুরবাড়ি, তাদের বাড়ি কিনে নিয়ে এখন সেখানে কাপড়ের কারখানা বসিয়ে দিয়েছেন তিনি। বীথির ক্যান্সারের পুরো চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করছেন তিনি। আপন সন্তানরা হাসপাতালে ফেলে চলে গিয়েছিল একদিন। আজ বীথি ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তুলেছে। স্বামী নামকরা সংবাদিক। দিব্যি নতুন সংসারে মেতে আছে। ছেলেমেয়েরা এখন যে যার মতো। খুব সাজেগোজে ও। ৫০ ছোঁবে এ বছর গেলেই, কিন্তু জীবন ওর কাছে রঙিন। মিসেস অ্যান্ড্রু ওদের গল্পের ভেতর বাঁচার রসদ পায়।

অ্যান্ড্রুর সাথে দেখা হওয়ার আগে তিনি আরো দুজনের মিসেস ছিলেন। প্রথম স্বামী ছিল আস্ত একটা মাতাল খুনি। অবশ্য তার সাথে দীর্ঘদিন লড়তে হয়নি। ক্রসফায়ারের একটি মাত্র বুলেটই মিসেস জামালের অধ্যায় শেষ করে দিয়েছিল। ছেলে তখন বিদেশে পড়ছিল। তাকে আর দেশে ফিরতে দেননি। অন্ধকার খুব ভয় পেতেন তিনি। তাই প্রথমেই টানা এক সপ্তাহ ঘর অন্ধকার করে ছিলেন। তেলাপোকা ভয় পেতেন, সেই তেলাপোকা ব্লাউজে পুরে সারা বাড়ি ঘুরতেন। দিনের পর দিন নিজের সাথে লড়াই করে গেছেন। ক্ষমতা আর শক্তির মালিক হতে গেলে আগে নিজের ভেতরের সবটুকু ভয়কে মুছে ফেলতে হয়, এ কথা বেদবাক্যের মতো মেনে চলেছেন তিনি। কিছুই ছিল না তার, না অর্থ না বাড়ি। পাওনাদারদের সব মিটিয়ে সর্বস্বান্ত যখন, হাতের ওয়েডিং রিংটাই অবশিষ্ট ছিল শুধু। ততদিনে পুলিশের হয়রানি, সমাজের আদেখলাপনা কৌতূহলে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। আংটি বিক্রি করতে গিয়েই কাজ পেয়ে যান একটা। আঙুল থেকে প্রথম দিন কিছুতেই নামানো যায়নি সামান্য সোনার আংটিটিকে। দোকানদার রোগা হয়ে আসতে বললেন। কিন্তু দুদিনের জন্য সময় ছিল না তার হাতে। আঙুল ক্ষত-বিক্ষত করে আংটিটি বের করে তবেই ছেড়েছিলেন। অমন বেপরোয়া কাণ্ডের পর দোকানদার তার প্যারালাইজড বউয়ের সেবার জন্য তাকে রাখতে চাইলে একবাক্যে রাজি হয়ে যান।

সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা!

বিছানায় হাগা-মোতা বউয়ের জন্য যত্নের কোনো কমতি ছিল না ভদ্রলোকের। নিঃসন্তান ভদ্রমহিলাটি তাকে দেখে ভেবেছিল, স্বামী বুঝি বিয়ে করে এসেছেন। দুটো দিন কিছুতেই খাওয়ানো যায়নি তাকে। শরীরে বল না থাকলেও ঠোঁট দুটিতে প্রবল শক্তি ছিল তার। এঁটে ছিল তো ছিলই। ভুল ভাঙল যখন, কি অপার্থিব হাসি সেই ঠোঁটে। মন-প্রাণ দিয়ে সেবা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি বেশি দিন। চাকরি হারানোর ভয়ে বুক শুকিয়ে এসেছিল সেদিন। এরপর ভদ্রলোকের আত্মীয়রা মিলে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন। ক্ষত-বিক্ষত সেই আঙুলেই দেড় বছরের মাথায় নতুন ওয়েডিং রিং চড়ল। হয়ে উঠলেন মিসেস বাশার। ক্যাশিয়ারের চেয়ারে বসা শুরু করতেই মিসেস বাশার অদ্ভুত সব ক্ষমতার স্বাদ পেতে লাগলেন। স্বামী হিসেবে অপরাগ হলেও বন্ধু হিসেবে দারুণ মানুষ ছিলেন মি. বাশার। ব্যবসায়িক সমস্ত বুদ্ধি শেখাতে লাগলেন মিসেসকে। দোকানের নামও পাল্টে ফেললেন মিসেস বাশার একদিন। এর পেছনের কারণটি বড্ড নির্মম ছিল যদিও। সকালে যে কাস্টমারটি দামি ওয়েডিং রিং নিয়ে যাচ্ছেন যার জন্য, বিকালে সেই একই ব্যক্তি অন্য এক মাপের রিং কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বামীকে প্রশ্ন করলে তিনি চুপ থাকতে বলতেন। যত বিক্রি তত লাভ তার, অন্যের গল্প জেনে কাজ নেই অত। কিন্তু মিসেস বাশারের ভেতর তোলপাড় চলত খুব।

বীথিই এল একদিন তার দোকানে ওয়েডিং রিং বেচতে। ক্যাশ মেমোতে স্বামীর সাইন। বুঝল ওদের দোকানেরই। টাকা দিতে গেলে বীথি বলেছিল, আমাকে একটু ঘুমের ট্যাবলেট এনে দিতে পারবেন? টাকা চাই না আমার। ভাগ্যক্রমে মি. বাশার সেদিন ব্যাংকে গিয়েছিলেন। টেনে ঘরে নিয়ে মাছ-ভাত খাইয়ে মরার প্রতি আগ্রহের কারণ জানতে চান মিসেস বাশার।

আমি তো এমনিও বাঁচব না, ক্যান্সার হয়েছে আমার।

কিন্তু স্বামীর অত্যাচার, সন্তানদের অবহেলা সবকিছু থেকে এখনই মুক্তি পেতে চাই আমি। দিনের পর দিন গোপনে বীথির চিকিৎসা ব্যয়সহ বীথিকে শক্তমনের ভিতে দাঁড় করিয়ে তবেই শান্তি পেয়েছিলেন মিসেস বাশার। ততদিনে শিশু মাইকেলের দেখাশোনা, দোকানের পসার বাড়ানো সব একহাতে সামলে ঝানু ব্যবসায়ীর খাতায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। পুলিশের চোয়ালের ভাঁজে ততদিনে দিঘল হাসির রেখা তাকে দেখলে। রাজনীতির মঞ্চেও কাতান শাড়ির আঁচল উড়িয়ে বসেছেন চেয়ারে। ব্যবসায়িক সমিতির নির্বাচনে চার-চারবার সভাপতির মুকুট উঠেছে তার মস্তকে। শহরের সবচেয়ে ডাকসাইটে চাঁদাখোরের বাড়িতে একা মাইকেলকে নিয়ে বন্দুক উঁচিয়ে দিয়ে এসেছেন হুঁশিয়ারি। মিসেস বাশারের নামের পাশে ততদিনে অনেকগুলো বুলেট হিসাব কষছিল। কিন্তু মানুষ বন্দুকের চেয়ে কুকুর ভয় পায় বেশি। কেন জানেন না মিসেস বাশার। তাই তো বেঁচে গেছেন বারবার। মাইকেলের সামনে সবাই পরাস্ত। একদিন ছেলে স্কাইপিতে গির্জায় চুমু খেল ফিনিশ বউকে। কয়েক রকম গয়না পাঠালেন তিনি। এক সকালে মি. বাশার হাঁটতে বেরিয়ে গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে ময়লার ভাগাড়ে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা পড়ে ছিলেন। পুলিশের গায়ের বিকট গন্ধে আবার মিসেস বাশারের বসার ঘর ভরে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে স্কাইপিতে ছেলের মদের পার্টনার মি. অ্যান্ড্রু দেখা দেয়ায় পুলিশ ব্যাটার যা-তা অবস্থা। সামান্য ইংরেজি কয়েকটি বাক্যেই নাজেহাল তদন্ত অফিসার। তিনি সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, ইংরেজির ক্ষমতা হস্তগত করতেই হবে। প্রায় পাঁচ বছর সময় দেয়ার পর মিসেস বাশার শুধু ইংরেজিতেই পাকা নয়, নামের পরিবর্তনটাও ক্ষমতার পোক্ত সাইনবোর্ড এখন। অ্যান্ড্রুর বউ এখন সে। মিসেস অ্যান্ড্রু। ওয়েডিং রিং সোসাইটির কর্ণধার তিনি। মি. অ্যান্ড্রু একসময় আমেরিকার সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিল। এখন ট্রাভেল ব্লগার। ইরাকের নির্মম যুদ্ধ ওকে ঠেলে দিয়েছিল মানসিক রোগের দিকে। এরপর মদ আর মেয়েতে আসক্ত হতে হতে মৃতপ্রায় যখন, মিসেস অ্যান্ড্রুর ডাক্তার ছেলের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। সংসার চলছে দারুণ তাদের। দুবেলা স্কাইপিতে দেখাদেখি, ব্যস। মিসেস অ্যান্ড্রুর আসল নাম এ শহরের কেউ জানে না। যদি কোনো মেয়ের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, সবটুকু শক্তি দিয়ে সেই দেয়াল ভেঙে দেন মিসেস অ্যান্ড্রু। তাই তার নামের চেয়ে কাজের প্রশংসা চলে বেশি। নীরবে গ্লাসের ঠোকাঠুকিতে মিসেস অ্যান্ড্রুর নাম ধ্বনিত হয় মেয়েদের নিজস্ব আলিঙ্গনে। আজো রেবুতি, বীথি, পিয়াসার গ্লাসে মিসেস অ্যান্ড্রুর নামে জয়ধ্বনি হলো। গায়ত্রী কেঁদেকেটে ঘুমের দেশে। ওর মুখে-চোখে তৃপ্তির রেখা।

আকাশে জুলাইয়ের মেঘে ডোবা চাঁদ। একবার বের হচ্ছে তো আবার লুকিয়ে পড়ছে।