মা আর বাবা বাসে মামাবাড়ির পথে বেশ খানিকটা চলে গেছেন, আমি আর বোন বাসায়, তখনই খবর এল, দিদিমা মারা গেছেন ফতেজঙপুরে তার বাবার ভিটেতেই। তার বড় ছেলে তখন চাপরাশিরহাট বাজারে, অথচ মায়ের এ সন্তান এতই মায়ের ন্যাওটা, মায়ের পাশছাড়া হননি। এ শতবর্ষী ভদ্রমহিলার এখনো জীবিত সন্তান ছয়জন, কারো সাথেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলার সময় দেখা হলো না রেনুবালার। আমি তখন আমার ঘরে, অবাক হয়ে ভাবছিলাম— কাঁদতে পারছি না কেন! এই যে বেঁচে আছি, তাতে এ মানুষটির অবদান তো অশেষ। অন্তত বার দুয়েক জলে ডোবার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। কোনো এক সন্তান, অল্প ক’দিন পরেই চলে যায়, আমার সেই মামা বড় সন্তান, আমার সুবোধ মামা, যাকে কেউ দেখেনি, কিন্তু অকালপ্রয়াত শিশুটি নিজের নাম অমর করে যায় মায়ের নামটি মুছে দিয়ে, সেই সুবোধ, টমেটোর মতন লাল সুবোধের ঘোর কৃষ্ণবর্ণের মা আমার দিদিমা, আমার উেসর উৎস। অথচ এই আমি কোনোদিন তাকে নিয়ে একটি বাক্যও লিখলাম না। এই একজন সম্ভাব্য পাঠক আমার, যিনি জানতেন আমি লিখতাম কিন্তু তার কোনো নমুনা তিনি পড়ে যেতে পারেননি। সুতরাং আমি এ লেখার ভেতর দিয়ে তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি, আমার শিশু বয়সটির দিকে।
***
আমার মা-বাবার বিয়েটি আকস্মিক প্রেমের। বাবা গেছেন ছোট বোনের বিয়েতে, গিয়ে দেখলেন বরের ছোট বোনটির মায়া চেহারা। রীতিমতো চিঠি লিখে প্রেম। তারপর বিয়ে। তারপর আমি। স্কুলজীবনে ডিসেম্বরে পুরো মাস গ্রামে। বাবা দুটো চিঠি লিখতেন। একটা মাকে, আরেকটা আমাকে। আমারটা ছন্দকবিতায়, মায়েরটা জানি না। আমি টের পাই তখন, বাবা কবিতা লিখতে জানতেন, ছাপাননি কখনো।
***
মামাবাড়ির বিশাল উঠোনে পাটি পেতে শুয়ে সন্ধ্যায় রাতের তারা দেখতাম। তখন চোখ সুস্থ ছিল অনেক। আর দিদিমা তার ভাইয়ের বউকে নিয়ে অনবরত পিঠে বানিয়ে যেতেন। এ ভাইটি হলেন বিনোদবিহারী। অবাক সুন্দর এক রঙিন লোক। গ্রামে যাত্রা পার্টিতে হারমোনিয়াম বাজাতেন। বিভূতিভূষণের দিনপঞ্জি থেকে উঠে আসা। আমাকে নিয়ে যেতেন।
***
নব্বইয়ের শুরুর গ্রামের শীতকাল ভরে ছিল অজস্র বহুরূপী, গাজীর গান আর যাত্রাপালায়। সন্ধ্যা নেমে আসা মৃদু আলোয় আমি একবার মানুষ হনুমানকে কাঁদতে দেখেছিলাম, তখন বড়জোর নয় কি দশ। আমাদের নতুন পুকুরপাড়ের ঘাসের ওপর বসে সেই আকুল কান্না আমার জীবনে দেখা প্রথম বেদনা। শিশুমন সহ্য করতে পারেনি। তার মুখে হাত বুলিয়েছি। দেখি মুখোশ খুলেছে, আমার বয়সীই প্রায়। সেই একদিন তাকে আমি দেখেছি, স্বপ্ন না বাস্তব আজ আর মনে নেই। আমার বিনোদ দাদু সীতার বেদনা দেখে হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে কাঁদতেন। শিশুবেলায় কত নরম দেখেছি মানুষের মন! আমার দিদিমা খুব সুন্দর করে পুরাণের গল্প বলতেন। তাতে পুরে দেয়া থাকত নানা রকম লোকজ সুরের গান। আমি আর বোন দুপাশে শুয়ে আছি, আর দিদিমা একটার পর একটা গল্প বলে যাচ্ছেন। আমার মাটির সাথে কথা বলা সময়ের গল্প শুনি। আমার দিদিমা সারা শরীরে তেল মেখে রোদে ফেলে রাখতেন। পাশে বসে গান শোনাতেন। মনে হয় সেসব ভুলে যাওয়ার গানের শরীর আমার মনের কোথাও না কোথাও বীজ হয়ে আছে।
****
ও সখিনা গেছস কিনা ভুইল্লা আমারে— এ গানটি তখন মুখে মুখে। আমার মায়ের ছোট মামি সখিনা দিদিমার সাথে এ ছিল পুরনো ঠাট্টা। উনার চন্দ্রপুলির স্বাদ আমার শৈশবের জিহ্বা জানে। তারিণী মাস্টার দিদিমার বড় ভাই। আমার সেই দাদু অনেকবার আমাকে শব্দের উৎস সন্ধানের কৌশল শেখাতে চেয়েছিলেন। বালকের চাপল্যহেতু স্থির হয়ে থাকিনি। আমার ভালো লাগত টানা আকাশের দিকে তাকিয়ে বিকেল ফুরিয়ে যাওয়া দেখতে। স্ত্রীর হাতে মার খাওয়া অসুখী পণ্ডিত মানুষটিকে আজ ভাবি। তার মৃত্যুর খবরে কাঁদিনি। অনেক জানা-অজানা শব্দের শরীর তার সাথেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। শব্দ সুন্দর, বুঝেছ দাদু?— এ বাক্যটি ভাবলে মনে হয় আজ তার মতো আন্তরিক হয়ে কেউ সুন্দর শব্দটি উচ্চারণ করেনি। তার লেখা কাগজপত্র স্রেফ ফেলে দেয়া হয়েছিল। সেই বয়সেই বুঝেছিলাম, একজন ভাবুক সত্যতর অর্থেই ব্যর্থ জীবন কাটান। এ সংসার ও সভ্যতার চিন্তা করা কাজ— এ কথা বুঝতে অনেক সময় লেগে যাবে।
***
পুকুরের ওপর যেন সর জমেছে। ঘাটের কাছেই কলার ভেলা। ইচ্ছে হলো, উঠে ওই পারে যাই। মনে সদ্য পড়া হাকলবেরি ফিনের স্মৃতি। গায়ে মৃদু বাতাস, শীত। এ এক রোমাঞ্চ। অদূরে বাঁশবন। সেখানে কয়েকটা নরম ভূত আছে, কারো ক্ষতি করে না। দিদিমা বলেছেন, ভূতেরা মানুষের বন্ধু হতে না পারলে কাঁদে। এসব ভাবছি আর হঠাৎ ভেলা উল্টে আমি অগাধ জলে। সাড়ে ৭টা নাগাদ। কেউ নেই। সাঁতার জানি না। হাবুডুবু খেতে খেতে বোনের জন্য খারাপ লাগছিল। এখনো দাদা ডাকল না। চোখে ক্রমশ জলটা সবুজ থেকে কলাপাতা সবুজ ও হলুদ হতে হতে লাল আর কালো হচ্ছে। ফুসফুস ব্যথা করছে। এমন একটা সময়ে চিন্তাশূন্যতা আসে। জ্ঞান ফিরল পুকুরপাড়ে। আমার দিদিমা রেনুবালা তার শীর্ণ শরীর নিয়ে লাফিয়ে পড়েছেন, উদ্ধার করেছেন আমাকে, কান্নায় তার চোখ ভিজে যাচ্ছে, চোখ খুলে এ দৃশ্য দেখলাম। আমার দিদিমার সাথে আমার চোখের জলের সম্পর্ক। আমার দিদিমার সাথে পৌরাণিক গল্পের হাসাহাসির সম্পর্ক।
****
সাঁইত্রিশ বছর আগের এই বর্ষাভার রাত। একটি শিশু জন্মে অনেক সময় চুপ। সবাই বলছে মরা বাচ্চা। বাচ্চার মাকে মন্দ কথা। দিদিমা বসে আছেন, পুঁটলির পাশে। এক সময় তারস্বরে কেঁদে উঠল। দেখো দুনিয়া, এসে পড়েছি। দেরি করে হাঁটা শিখেছি। তখনো বিয়ে না হওয়া মাসি আর দিদিমা হাঁটা শিখিয়েছেন। চারদিকে বড় নরম আর মায়ার মানুষ পেয়েছিলাম জীবনের শুরুতে। আজ লিখতে লিখতে বাবার আদুরে মেয়ে রেনুবালার অসামান্য হাসিমুখ মনে পড়ে যাচ্ছে। কান্না পাচ্ছে না তাই।





