অমিয় দাশগুপ্ত মারা গেছেন ১৯৯২ সালের ১৪ জানুয়ারি। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী এবং সৃষ্টিশীল একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি উন্নয়ন অর্থনীতির একজন সত্যিকার পথপ্রদর্শক। অর্থনৈতিক ধারণার ইতিহাসে তিনি সারগর্ভ অবদান রেখেছেন। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা আছে। এসবের মধ্যে আছে— অর্থনৈতিক তত্ত্বে ‘সারপ্লাস’ ধারণার ব্যবহার, মজুরি নীতির তত্ত্ব, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের অর্থনীতি, ‘কৃচ্ছ্রতার অর্থনীতি’র চাহিদা ও সীমাবদ্ধতা।
যশস্বী গবেষক পরিচয়ের বাইরে দাশগুপ্ত ছিলেন একজন মহান শিক্ষক। তিনি কল্পনা, কৌতুক, সহজবোধ্য বর্ণনা দিয়ে বিষয়কে বিদ্যার্থীর সামনে বাস্তব করে তুলতে পারতেন। শিক্ষক হিসেবে তার আরেকটি গুণ ছিল, যাকে আমি বলতে চাই দরদ। অর্থনীতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে সমাধানযোগ্য দুনিয়াজুড়ে মানুষের দুর্দশা।’ তিনি তার ছাত্রদের গভীর বিশ্লেষণ ও মানবিক প্রেরণার সমন্বয় ঘটাতে সবসময় উৎসাহ দিতেন। এ কঠোরতা ও মানবিক দৃষ্টি নীতিনির্ধারণে দাশগুপ্তের উপদেষ্টার ভূমিকায়ও দেখা গেছে।
অমিয় দাশগুপ্তের জন্ম ১৯০৩ সালের ১৫ জুলাই, বর্তমান বাংলাদেশের গৈলা গ্রামে। তাদের পরিবারটি সেখানে বাস করছে সপ্তদশ শতক থেকে, পরিবারটির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ঐতিহ্য ছিল। দাশগুপ্ত পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, দ্রুতই তিনি অসম্ভব মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দশগুপ্তের জন্মই হয়েছিল একাডেমিক হওয়ার জন্য, কারণ তার ছিল প্রখর মেধা, যোগাযোগের ক্ষমতা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করার আগ্রহ। তার ছেলে পার্থ দাশগুপ্তও একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ। পার্থ লিখেছেন, ‘আমার বাবা বহু বছর ধরে একটি কথা বারবার বলতেন যে, তিনি জীবনে সচেতনভাবে শুধু একটি জিনিসই চেয়েছেন। আর তা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ।’ তার সেই ইচ্ছা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পূরণ হয়েছিল। অমিয় দাশগুপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এতটাই মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন যে, এমএ ডিগ্রি হাতে পাওয়ার আগেই তাকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
১৯২৬ থেকে ১৯৪৬— এ ২০ বছর অমিয় দাশগুপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। ১৯৩৪-৩৬ দুই বছরের বিরতি ছিল, যে সময়টায় তিনি দ্রুতগতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে এ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে তিনি কাজ করেন লিওনেল রবিনসের সঙ্গে। ১৯৪৬ সাল নাগাদ দেশ ভাগ-পূর্ব নৈরাজ্য শুরু হয়ে যায় (পরের বছর দেশ ভাগ হয় এবং স্বাধীনতা আসে)। ধারাবাহিক দাঙ্গা ও রক্তপাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছিল। অমিয় দাশগুপ্ত তখন কটকের রাভেনশ কলেজের অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশে চলে যান।
পরের বছর দাশগুপ্তকে প্রাচীন বেনারস শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপকের পদ অফার করা হয়। এখানে অধ্যাপক ও অর্থনীতির বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনি এক যুগের কিছু বেশি সময় কাটিয়েছেন। তিনি এ প্রাচীন কিন্তু একাডেমিক চর্চায় নিদ্রালু শহরটিকে ভারতের অর্থনীতি বিদ্যাশিক্ষায় অন্যতম অগ্রসর কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করতে চেষ্টা করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পেয়েছেন। ১৯৫৮ সালে দাশগুপ্ত ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর অ্যাপ্লাইড ইকোনমিক রিসার্চের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে যোগ দেন। এ নতুন দায়িত্ব আরামদায়ক হলেও তার জন্য পুরোপুরি সন্তুষ্টির নয়। বিশেষত তিনি তার সত্যিকার প্যাশন শিক্ষকতাকে মিস করছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন এবং আবার শিক্ষকতা শুরু করেন। এবার তিনি ইন্ডিয়ান স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগ দেন।
১৯৬৫ সালে তিনি পাটনায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত এএন সিনহা ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল স্টাডিজের পরিচালক পদে যোগ দেন। এখানে তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণা দুই-ই করতে পারতেন। এখান থেকে অবসর নেয়ার পর ১৯৭৬ সালে তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। এখানে পাঁচ বছর কাটান। ১৯৮১ সাল থেকে স্ত্রী শান্তিকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে সুন্দর একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ বিশ্ববিদ্যালয় শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাশগুপ্ত শান্তিনিকেতনেই ছিলেন। সে সময়টায় বিকালে তিনি ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে কাটাতেন। ডান হাতে ডায়াগ্রাম আঁকতেন আর বাঁ হাতে মশা মারতেন।
প্রাথমিকভাবে সবাই অমিয় দাশগুপ্তকে স্মরণ করবেন একজন সৃষ্টিশীল ও প্রতিভাধর গবেষক, একজন অসাধারণ শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি নীতিনির্ধারণে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। বেনারস থেকে ছুটিতে ১৯৫০-৫৩ মেয়াদে তিনি ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬-৫৮ মেয়াদে তিনি স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বোর্ডে ছিলেন, ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স করপোরেশনের বোর্ডে ছিলেন ১৯৬২-৬৩ মেয়াদে। ১৯৭০-৭৩ সময়কালে ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় পে-কমিশনের প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও অমিয় দাশগুপ্ত তার লেখালেখির মাধ্যমে ভারতের নীতিনির্ধারণীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছেন। তার অনেক লেখাতেই সরকারি নীতির কঠোর সমালোচনা পাওয়া যায়।
অমিয় দাশগুপ্তের আরেকটি অবদানের কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন। ভারতে অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা— তত্ত্বীয় ও গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়ে— বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে একটি সাপ্তাহিক দি ইকোনমিক উইকলি। এটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৪৯ সালে, দারুণ সাফল্য পাওয়া এ সাপ্তাহিকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন শচীন চৌধুরী। ১৯৬৬ সালে এর নতুন নামকরণ করা হয় ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি। এ সাপ্তাহিক প্রতিষ্ঠা, টিকে থাকা এবং নতুন করে ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করা সম্ভব হতো না অমিয় দাশগুপ্তের বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া। তিনি ছিলেন শচীন চৌধুরীর পুরনো বন্ধু এবং সহপাঠী। শচীন চৌধুরী সবসময় দাশগুপ্তের অবদান উল্লেখ করতেন। শচীন চৌধুরী একবার আমাকে বলেছিলেন, দাশগুপ্তের মতো আর কেউ গণ-আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে অর্থনীতি বোঝা ও চর্চাকে উৎসাহিত করেননি।
অমিয় দাশগুপ্ত প্রশাসনের নির্ধারণ করা একাডেমিক নেতৃত্বের পদ নিয়ে মানসিকভাবে উৎসাহী ছিলেন না। ১৯৬০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। দক্ষতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করলেও কাজটি নিয়ে তার সেভাবে আগ্রহ ছিল না। তার মনোযোগ এবং আগ্রহ ছিল একেবারে ভিন্ন দিকে। নিজের কাজের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা এবং তার অবদানের বিষয়ে পেশাদার বন্ধুদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে আগ্রহ ছিল। তিনি জানতেন এবং এ নিয়ে তার কোনো আপত্তি ছিল না যে, তার প্রজন্মে তাকে ভারতের সেরা অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ভারতে অমিয় দাশগুপ্ত অর্থনীতিবিদদের অর্থনীতিবিদ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিলেন। তার ভারতীয় পরিচয় বিদেশে স্বীকৃতি অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। যদিও দেশে তিনি অসংখ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার বিদেশী স্বীকৃতির মধ্যে আছে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে সম্মানীয় ফেলোশিপ পাওয়া। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কমনওয়েলথ ভিজিটিং ফেলোশিপে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার স্মরণে অনেক সম্মানিত আন্তর্জাতিক পণ্ডিত লিখেছেন, যেসব লেখা ভারতে এক জায়গায় করা হয়েছে। এ পণ্ডিতদের মধ্যে আছেন— জন হিকস, জোয়ান রবিনসন, জেমস মিডে ও রিচার্ড গুডউইন।
কিন্তু অমিয় দাশগুপ্তের ধারণা ও কাজ আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট পরিচিত নয়। এটা সত্য যে, ভারত এবং পশ্চিমের ওয়াকিবহাল মহল অমিয় দাশগুপ্তকে তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু এ স্বীকৃতি অমিয় দাশগুপ্তের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান নিয়ে সিরিয়াস আগ্রহে রূপান্তর হয়নি। বাড়তি শ্রমশক্তি নিয়ে অনুন্নত অর্থনীতির কাঠামোকে নিয়ে দাশগুপ্ত পথপ্রদর্শক একটি বিশ্লেষণ হাজির করেছিলেন ডব্লিউ. এ. লুইসের সমকালেই, কিন্তু বিষয়টি ভারতের বাইরে তেমন কোথাও স্বীকৃতি পায়নি। এ বিষয়ে (কেইনেসিয়ান ইকোনমিকস অ্যান্ড আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রিজ) ১৯৪৯ সালে দাশগুপ্ত ভারতে একটি লেকচার দিয়েছিলেন। এটি ভারতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। একই বছর ডব্লিউ. এ. লুইস ব্রিটেনে তার বিখ্যাত রচনা ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট উইথ আনলিমিটেড সাপ্লাইজ অব লেবার’ প্রকাশ করেন। লুইসের এ কাজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী হয়েছিল (কিন্তু দাশগুপ্তের কাজ হতে পারেনি) এবং এজন্য তিনি উপযুক্ত স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন।
পশ্চিমা একাডেমিয়ার একটি অসাধারণ ব্যাপার হচ্ছে, বিদেশী একাডেমিকদের উদারমনে স্বাগত জানানোর মানসিকতা। তবে তৃতীয় বিশ্বের স্কলার, যারা পশ্চিমে বসবাস করতে চান, তাদের গ্রহণে কিছু সমস্যা আছে। অমিয় দাশগুপ্ত দেশে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিদেশে বসবাসের লোভ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। তবে তার কাজ ও অবদানের অত্যন্ত কম বিদেশী স্বীকৃতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তৃতীয় বিশ্ব থেকে কেন মেধাবী একাডেমিশিয়ানরা পশ্চিমে চলে যেতে চান।
অমিয় দাশগুপ্ত ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন লিওনেল রবিনসের সঙ্গে। দুই বছরের কম সময়ে তিনি পিএইচডি শেষ করেন। অর্থনৈতিক অবস্থা এবং প্রিয়জন (স্ত্রী শান্তি তখন ভারতে) দাশগুপ্তের এত দ্রুতগতিতে থিসিস শেষ করায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু এত পাণ্ডিত্যপূর্ণ থিসিস এত কম সময়ে তিনি শেষ করতে পেরেছিলেন কারণ ‘মতবাদ বা তত্ত্ব গঠন করাটা ছিল অমিয় দাশগুপ্তের সহজাত প্রতিভা’ (অনেক বছর পরে লর্ড রবিনস আমাকে এটাই বলেছিলেন)।
তার অভিসন্দর্ভ ‘দ্য কনসেপশন অব সারপ্লাস ইন থিওরেটিক্যাল ইকোনমিকস’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তিনি এতে কনজিউমার থিওরি ও উৎপাদন বিশ্লেষণে উদ্বৃত্তের ধারণার প্রাসঙ্গিকতাকে পরীক্ষা করে দেখেছেন। এটা ছিল এক বিস্তৃত বিশ্লেষণ।
ত্রিশের দশকের মধ্যভাগে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে বেশ প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে তখন আছেন রবিনস, হিকস, কালডোর, হায়েক, অ্যালেন, লার্নার, কালেকি, শ্যাকলেসহ আরো অনেকে।
উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি নিয়ে দাশগুপ্তের পথপ্রদর্শনমূলক কাজের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে তার অনেক অবদান রয়েছে। তিনি তৃতীয় বিশ্বে ‘ছদ্ম বেকারত্ব’র অস্তিত্ব ও সারার্থ নিয়ে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির সঙ্গে তার সংযোগ তাকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, যথেষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ ব্যতীত উদ্বৃত্ত শ্রমের উৎপাদনমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ বিনিয়োগ শুধু অর্থে হলেই হবে না, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ভোগ সৃষ্টি করতে হবে। ‘ক্যাপিটাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গ্রোথ’ বিষয়ে তার প্রবন্ধগুলো পরবর্তীতে ‘প্ল্যানিং অ্যান্ড ইকোনমিক গ্রোথ’ গ্রন্থে ১৯৬৫ সালে সংকলিত হয়।
দাশগুপ্তের রচনার একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, বিভিন্ন ধারার অর্থনীতিবিদদের ধারণা, যা আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন মনে হয়, সেগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা। উদ্বৃত্তের ওপর তার প্রাথমিক কাজটি এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপনে সুযোগ সৃষ্টি করে। দাশগুপ্ত অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রকল্প আরো অনেক বিস্তৃত হয়। তিনি সুচারুভাবে রিকার্ডো ও মার্ক্স থেকে মার্শাল, আধুনিক অর্থনীতিবিদ এবং তিনি এদের প্রত্যেক ধারণাকেই সূক্ষভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনিই একমাত্র লেখক, যিনি একই সঙ্গে ‘দাস ক্যাপিটাল শতবর্ষ সংকলন’ এবং রয়্যাল ইকোনমিক সোসাইটির আহ্বানে আলফ্রেড মার্শালের ‘শতবর্ষ প্রবন্ধ’ সংকলনে লিখেছেন।
একগুচ্ছ ধারাবাহিক মননশীল প্রবন্ধে দাশগুপ্ত ক্লাসিক্যাল ও নিওক্লাসিক্যাল ঘরানার অর্থনৈতিক যুক্তিকে বিচার করেছেন এবং সেগুলোর মধ্যে আদৌ কোনো ফারাক আছে কিনা, থাকলে সেটা কেন ও কোথায় সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। অর্থনৈতিক তত্ত্বের আলোচনায় তিনি তার বিশ্লেষণকে সবসময় সমসাময়িক দুনিয়ার বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত করতে চেয়েছেন।
একটি ধারণাকে তিনি তার বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন। আর সেটা হলো, ‘অর্থনৈতিক তত্ত্বের সমস্যাকে একটি ধারণায় প্রকাশ করা যায়— সম্পদের অভাব থেকে বিকল্পের উত্থান, কারণ অভাব সবসময় সমাজের চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত।’
নীতিনির্ধারণ-সংক্রান্ত সব লেখায় দাশগুপ্ত বৈচিত্র্যের বোঝাপড়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনাকে তিনি অনেকটা ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অর্থনীতির ক্ষেত্রে দাশগুপ্তের দৃষ্টিভঙ্গির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুত্ববাদ। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ধারণার ইতিহাস চর্চায়ও তার এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ দেখা যায়।
শিক্ষক হিসেবে অমিয় দাশগুপ্ত একজন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। ভারত ও বাংলাদেশের অনেক অর্থনীতিবিদ তার হাতে প্রশিক্ষিত হয়েছেন। গবেষক গাইড হিসেবে তার দক্ষতার প্রমাণ আমি পেয়েছিলাম ক্যামব্রিজে। আমি তখন জোয়ান রবিনসন ও অমিয় দাশগুপ্তের যৌথ তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা করছি। রবিনসনের সঙ্গে তর্কগুলো আমার জন্য শিক্ষামূলক ছিল। কিন্তু তার পড়ানোর ধরন ছাত্ররা কী আলোচনা করতে চায়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিত না। তিনি মনে করতেন, তিনি কী ভাবছেন সেটাই শিক্ষার্থীদের জন্য জানা সবচেয়ে জরুরি। বিপরীতক্রমে অমিয় দাশগুপ্ত বিদ্যার্থীদের এজেন্ডা নির্ধারণ করতে দিতেন, তার কাছে জমা পড়া সব লেখাই তিনি যত্নসহকারে পড়ে ফেলতেন। এরপর তিনি ছাত্রদের সেগুলো নিয়ে পুনরায় নিরীক্ষা করা এবং উপস্থাপিত যুক্তিগুলো যাচাই করতে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দিতেন। কোনো অনুসন্ধানে তার মর্মভেদী, তীক্ষ ও কৌশলী মন্তব্য পাওয়াটা ছিল দারুণ ব্যাপার।
প্রাথমিকভাবে দাশগুপ্ত ছাত্রদের জমা দেয়া বিষয়ে মনোযোগ দিতেন কিন্তু পরবর্তীতে যখন তিনি সেসব নিয়ে আলোচনা করতেন, তখন তার গণ্ডি ছাত্রদের সেই বিষয় থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ছাড়িয়ে পড়ত। শেষমেশ তার যেকোনো আলোচনাই অর্থনীতির প্রকৃতি নিয়ে শিক্ষামূলক হয়ে উঠত। তার একটি আলোচনার কথা আমার খুব মনে আছে, যেখানে তিনি আমাকে মেথডোলজি পড়াতে গিয়ে তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছিলেন (এর আগে আমি ঠিক এ মতের উল্টোটা শিক্ষা পেয়েছিলাম)। তাত্ক্ষণিকভাবে প্রয়োগযোগ্য হলে সেটা ভালো তত্ত্ব তো নয়ই, বরং তার সন্দেহ করা উচিত যে, সেই তত্ত্বে গভীরতার ঘাটতি রয়েছে। তত্ত্বকে একটি ডিসিপ্লিন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, প্রয়োগ থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন কিন্তু সম্পর্কহীনভাবে নয়।
অমিয় দাশগুপ্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিবিদরা একজন স্মরণীয় তাত্ত্বিক, একজন মহান মেথডোলজিস্ট, চিন্তার ঐতিহাসিক, একজন প্রাজ্ঞ নীতি বিশ্লেষক, একজন অসাধারণ শিক্ষাবিদ এবং একজন উষ্ণ হূদয়, সহানুভূতিশীল সহকর্মীকে হারিয়েছেন। তার সমালোচনা করার প্রাজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতার গভীরতার অভাব বিশেষভাবে অনুভূত হবে।
ইংরেজি রচনাটি দি ইকোনমিক জার্নাল-এ ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর: এসএম রশিদ





