হার্মাদের হাতে
বন্দি হয়েছিলেন
আলাওল। প্রাচীন
বাংলা সাহিত্যের
অন্যতম এ
মহাকবির ইতিহাস
অনেকের জানা।
মাগন ঠাকুরের
পৃষ্ঠপোষকতায় আরাকান
রাজসভায় নিজের
আসন লাভ
করেছিলেন তিনি।
আলাওল নিজের
কথা লিখে
রেখেছিলেন বলে
তার কথা
জানা যায়,
কিন্তু উপকূলীয়
ভারতের দাস
ব্যবসা ইতিহাসে
বিস্তারে আলোচনা
হয় না।
অন্যথায় আলাওলের
মতো বহু
ভারতীয়কে দাস
হিসেবে পৃথিবীর
বহু স্থানে
পাঠানো হয়েছে।
এ দাস
ব্যবসার সঙ্গে
যুক্ত ছিল
পর্তুগিজ ও
ডাচ নাবিকরা।
নাবিক হয়ে
এসে তাদের
বহুজনেরই ব্যবসা
হয়ে উঠেছিল
দাস কেনাবেচা।
এ কেনাবেচার
আগে দাস
হিসেবে ব্যবহারের
জন্য মানুষকে
অপহরণ ছিল
তাদের কাজ।
কেননা স্বভাবতই
কোনো মানুষ
স্বেচ্ছায় দাস
হতে চায়
না। ভারত
(বর্তমান) ও
বাংলাদেশের উপকূলে
জলদস্যুতা এবং
তাদের কুকীর্তি
নিয়ে কবিতা,
গল্প, উপন্যাস
লেখা হয়েছে।
একাডেমিক গবেষণাও
হয়েছে। তবে
এতসবের মধ্যে
বাংলা থেকে
আফ্রিকায় দাস
নিয়ে যাওয়া
সম্পর্কিত আলোচনা
তুলনামূলক কম।
দাসের কথা
বললে কৃষ্ণাঙ্গ
দাসদের ছবিই
আপনা থেকে
চোখের সামনে
ভেসে ওঠে।
ভারতীয় উপমহাদেশেও
সুলতানি, মোগল
আমলে রাজদরবারে
আফ্রিকান দাসদের
ব্যবহার করা
হতো। কিন্তু
এ বাংলার
মানুষও দাস
হিসেবে বিক্রি
হয়েছে আফ্রিকায়।
দাস ব্যবসা
উপমহাদেশে নতুন
নয়। ইবনে
বতুতা থেকে
তাভেরনিয়ে সব
পর্যটকই ভারতের
বাজারে দাস
বেচাকেনার কথা
উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু সেসব
মূলত ভারতের
অভ্যন্তরের বাজার।
ভারত থেকে
মানুষকে নিয়ে
আফ্রিকায় দাস
হিসেবে ব্যবহারেরও
নজির রয়েছে।
এদের মধ্যে
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দাস
বাংলা থেকে
নেয়া হতো।
তাদের চালান
করা হতো
আফ্রিকায়। বাংলা
থেকে দক্ষিণ
আফ্রিকায় দাসদের
নিয়ে যাওয়ার
কাজটির হোতা
ছিল মূলত
ডাচরা। ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির সঙ্গে
সরাসরি যুক্ত
না হলেও
তাদের নীরব
ছত্রচ্ছায়ায় এ
ব্যবসা পরিচালিত
হতো।
ডাচদের দাস
ব্যবসা পরিচালনার
পদ্ধতি সম্পর্কে
বরার্ট রসের
বক্তব্য হলো
এখানে নির্দিষ্ট
একটি সরবরাহ
ব্যবস্থা বর্তমান
ছিল। সে
সরবরাহ শৃঙ্খলে
বাঙালি বেনিয়া
থেকে শুরু
করে ইন্দোনেশিয়া,
চীনা জলদস্যু,
গোয়ার পর্তুগিজ
জলদস্যু, এমনকি
দক্ষিণ ভারতের
অপহরণকারীরাও যুক্ত
ছিল। বাংলায়
আলাওলের কাব্য
থেকে শুরু
করে ভারতচন্দ্রের
অন্নদামঙ্গল এমনকি
অন্যান্য মঙ্গলকাব্য
ও লোকগাথায়
বিদেশী জলদস্যু
কর্তৃক স্থানীয়দের
অপহরণের কথা
পাওয়া যায়।
উপকূলে এদের
কর্মপদ্ধতি ছিল
সহজ, সরাসরি
ও দ্রুত।
কখনো নদীর
পাড়ে কর্মরত
নারীকে ঝটিকা
অপহরণ, কখনো
কোনো গ্রামে
ঢুকে কিশোর-যুবকদের
অপহরণ করা।
তারপর তাদের
অনেককে দেশীয়
বাজারে বিক্রির
পাশাপাশি একটা
অংশকে নিজ
ভূমি থেকে
দূরে পাঠানো।
সপ্তদশ ও
অষ্টাদশ শতাব্দীর
দাস ব্যবসায়
ডাচরা ছিল
সবার চেয়ে
এগিয়ে। ভারত
ও আটলান্টিক
মহাসাগরে ছিল
তাদের রাজত্ব।
আটলান্টিকের দাস
ব্যবসা বহুল
আলোচিত হলেও
এর নিচে
চাপা পড়ে
গিয়েছে ভারতের
দাস ব্যবসা।
এ ব্যবসার
আলোচনার অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অংশ
হলো ডাচ
ব্যবসায়ী কর্তৃক
ভারতীয়দের নিয়ে
গিয়ে দক্ষিণ
আফ্রিকায় কলোনি
তৈরি। গবেষণা
থেকে দেখা
যায়, ইউরোপীয়দের
আগমনের আগে
দক্ষিণ আফ্রিকায়
দাসত্ব বা
দাসপ্রথা ছিল
না। এ
কারণে ইউরোপীয়রা
যখন কলোনি
বসাতে আসে,
তখন বাইরে
থেকে দাস
আনা প্রয়োজন
হয়ে পড়ে।
কোথা থেকে
আসবে সে
দাস? ডাচরা
ভারতীয় উপমহাদেশে
ব্যবসা করতে
এসে এখান
থেকে দাস
নিয়ে যাওয়ার
মতো সুযোগ
খুঁজে পায়।
ডাচরা ভারতের
দক্ষিণে মারাঠা
ও নায়েকদের
অঞ্চল থেকে
প্রথমে কিছু
দাস নিয়ে
বিক্রি করতে
থাকে। পরবর্তী
সময়ে তাদের
নজর বাংলায়
পড়লে এখান
থেকে দাস
নেয়ার চিন্তা
করে। কোম্পানির
সঙ্গে দাস
ব্যবসায়ীদের সংযোগ
ছিল সেটা
বলা যায়।
কারণ এ
দাসদের কোম্পানির
জাহাজ কিংবা
তাদের সহায়তায়ই
পরিবহন করা
হতো। বিশেষত
যে সময়
দাসদের সংখ্যা
বেশি হতো
সে সময়
কোম্পানির জাহাজ
বা কার্গো
প্রয়োজন হতো।
কখনো মালপত্র
পরিবহনের জাহাজে
মসলা, কাপড়ের
সঙ্গেই পরিবহন
হতো দাস।
দাসদের ঠিক
কী রীতিতে
দাসত্বে বাঁধা
হতো, সে
সম্পর্কে স্পষ্ট
কোনো তথ্য
নেই। তবে
ধারণা করা
হয়, অপহরণ
বাদেও অনেককে
চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক
হিসেবে নেয়া
হতো, যারা
পরবর্তী সময়ে
প্রতিকূল পরিবেশে
দাস হিসেবে
কাজ করতে
বাধ্য ছিল।
কখনো সরাসরি
কেপ টাউনে
নিয়ে যাওয়া
হতো। আবার
কখনো তাদের
পরিবহন করা
হতো বাটাভিয়া
হয়ে। বাটাভিয়া
সে সময়
ছিল ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির ব্যবসার
প্রধান কেন্দ্র।
তবে দাস
ব্যবসার সম্পূর্ণ
বিষয়টির সঙ্গে
ডাচ ব্যবসায়ীদের
পাশাপাশি স্থানীয়
ব্যবসায়ীদের সংযোগ
অবশ্যই ছিল।
যদিও সরাসরি
দাস ব্যবসার
সঙ্গে তাদের
যোগসূত্র পাওয়া
যায় না।
তবে সমুদ্র
বাণিজ্যে তাদের
অংশগ্রহণ ছিল।
দিল্লি ইউনিভার্সিটির
প্রফেসর ওম
প্রকাশ জানিয়েছেন,
বাণিজ্যের সঙ্গে
যুক্ত ৪১
শতাংশের বাস
ছিল বাংলায়।
এদের মধ্যে
বিভিন্ন পর্যায়ের
মোগল কর্মকর্তা
ও কর্মচারীরা
অন্তর্ভুক্ত।
রেশম, মসলা
ও নানা
ধরনের পণ্য
বাণিজ্যের সঙ্গে
গুজরাট, বোম্বে,
বালাসোর, সাতগাঁওয়ের
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা
বিদেশী বণিকদের
সঙ্গে যুক্ত
ছিল। দাস
ব্যবসায় তারা
কোনো না
কোনোভাবে ডাচদের
সহায়তা দিত।
আর ডাচরা
যে দাস
কেনাবেচা করত,
সে সম্পর্কে
১৯৯১ সালের
ডাচ বই
Ole Feldbaek-এ
বলা হয়েছে,
জলদস্যুতার মাধ্যমে
অপহরণ ও
যুদ্ধবন্দিদের দাস
হিসেবে বিক্রি
করা ডাচদের
নৈমিত্তিক কর্মে
পরিণত হয়।
জানা যায়,
১৬৪০ সালে
উড়িষ্যার পিপলি
বন্দরে একটি
ডাচ জাহাজ
তীরভূমিতে বিপদের
মুখে পড়লে
স্থনীয়রা কোনো
রকম সাহায্য
করেনি। তারা
পণ্য উদ্ধারে
সাহায্য করেনি,
কিন্তু নিজেরা
যা দখল
করেছিল তার
অধিকারও ছাড়েনি।
এর প্রতিশোধ
হিসেবে পরবর্তী
৩০ বছর
ডাচরা বাংলার
উপকূলে ছোট
ছোট নৌকা,
জাহাজ প্রভৃতি
আক্রমণ, মালপত্র
ডাকাতি ও
মানুষ অপহরণ
করত। প্রতিটি
ডাকাতির সময়েই
অপহূত মানুষকে
দূরের কোনো
বাজারে দাস
হিসেবে বিক্রি
করা হতো।
পরবর্তী সময়ে
আফ্রিকা থেকে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
পক্ষ থেকে
বাংলার এ
‘ডাকাত’দের
কাছ থেকে
দাস কেনা
শুরু হয়।
ডাচদের এ
দাস ব্যবসা
বা দাস
ব্যবহারের ক্ষেত্রে
মাদাগাস্কার, মোজাম্বিক
প্রভৃতি অঞ্চলে
অভিযান করা
হতো। অভিযানের
মাধ্যমে পাওয়া
দাসদের প্রথমত
কোম্পানির কর্তারা
ব্যবহার করত।
১৬৫৮ সালে
কোম্পানির অনেক
সৈন্যকে জমি
দান করা
হয়। সে
সময় তারা
দাস রেখে
জমিতে কাজ
করানোর ইচ্ছা
পোষণ করতে
শুরু করে।
দাস ব্যবসায়
অংশগ্রহণের জন্য
১৬৮৭-১৭৮৪
এরা অন্তত
পাঁচবার আবেদন
করে।
ডাচদের তৈরি
করা উপনিবেশে
নানা অঞ্চলের
দাসদের এনে
একত্র করা
হয়েছিল। এর
মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক
দাস বাংলা
অঞ্চল থেকে
নেয়া হয়েছিল।
বাংলার এ
দাসদের মধ্য
থেকে আবার
অনেকে নিজেই
সামন্ত হয়ে
ওঠে। জমি
ও ব্যবসার
মালিক হয়ে
তারাও দাস
ব্যবসার সঙ্গে
যুক্ত হয়।
দাস ব্যবসার
তথা দাস
কেনা-বেচার
সঙ্গে সরাসরি
যুক্ত না
হলেও অনেকে
জমিতে কাজ
করানোর জন্য
দাস রাখতে
শুরু করে।
সোজা কথা,
দাস থেকে
তারা দাস
মালিক হয়ে
ওঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার
‘বাঙালি’
দাস মালিক
সম্পর্কে আলোচনা
করতে গিয়ে
ইতিহাসবিদরা প্রায়
এক ডজন
বাঙালির কথা
উল্লেখ করেন।
গবেষক অংশু
দত্ত নানা
উৎস থেকে
তথ্য সংগ্রহ
করে দেখিয়েছেন,
সপ্তদশ শতাব্দীর
মধ্যভাগ থেকে
ঊনবিংশ শতাব্দীর
মধ্যভাগ পর্যন্ত
সেখানে প্রায়
৪৮ জন
বাঙালি দাস
মালিক ছিল।
এর মধ্যে
১৬৭৬ সালে
অ্যান্টনি নামে
একজন দাস
মালিকের উল্লেখ
পাওয়া যায়।
কেপ গ্যারিসন
তৈরি হওয়ার
২৪ বছর
পর তাকে
একজন free local resident
হিসেবে উল্লেখ
করা হয়।
ইউনিভার্সিটি অব
ওয়েস্টার্ন কেপের
অধ্যাপক হেটিং
১৯৮২ সালে
একটি তালিকা
দেন। সে
তালিকায় বাংলার
ডোমিঙ্গো, বাংলার
অ্যান্থনি ও
লুইসের উল্লেখ
পাওয়া যায়
(সে সময়
দাসদের নামের
সঙ্গে তাদের
আদি বাসস্থান
উল্লেখ করা
হতো, যেমন
লুইস অব
বেঙ্গল)।
লুইস ১৬৮৭
সালে মাত্তিজস
জাভা নামে
২৭ বছর
বয়সী একজন
দাস কেনে।
অর্থাৎ লোকটি
ছিল জাভার
আদি বাসিন্দা।
১৯৯১ সালে
অ্যান্ড্রু ব্যাঙ্ক
তার এমএ
থিসিসের জন্য
একটি হিসাব
তৈরি করেন।
সে হিসাব
অনুসারে ১৩১
জন দাস
মালিকের মধ্যে
১৫ জনের
আদি বাসস্থান
ছিল বাংলা
অঞ্চল। সব
মিলিয়ে তাদের
অধীনে দাসের
সংখ্য ছিল
মোট ৪৪।
দাস মালিকদের
মধ্যে প্রধান
তিন ভাগে
ছিল কেপ
৪৭ দশমিক
৩৪ শতাংশ,
বাংলা ১১
দশমিক ৪৫
ও বাটাভিয়ার
৯ দশমিক
৯২ শতাংশ
বাসিন্দা। এদের
সংখ্যা ছিল
যথাক্রমে ৬২,
১৫ ও
১৩। এর
বাইরে বুগি
ও সিলনের
ছিল যথাক্রমে
আট ও
পাঁচজন। বাংলা
থেকে নিয়ে
যাওয়া দাসদের
মধ্যে কয়েকজন
পরবর্তী সময়ে
বেশ উন্নতি
করেছিল। এদের
মধ্যে অ্যাঙ্গেলা
বাঙালি (Angela van Bengalen, যার
ইংরেজি অনুবাদ
Angela of Bengal) সর্বাধিক
পরিচিত।
অ্যাঙ্গেলার প্রথম
জীবন সম্পর্কে
তেমন কিছু
জানা যায়
না। তার
বন্দিজীবন সম্পর্কেই
তথ্য বেশি।
মোটামুটি ১৬৫০
সালের দিকে
পিটার কেম্প
তাকে দাস
হিসেবে কিনে
নেন। তার
সঙ্গে ছিল
তার স্বামী
বা উপপতি
ও তিন
সন্তান। এরপর
তাদের জঁ
ভ্যান রিবেকের
কাছে বিক্রি
করে দেয়া
হয়। রিবেক
তখন ছিলেন
কেপের গভর্নর।
১৬৬২ সালে
রিবেক পরিবারটিকে
আব্রাহাম গ্যাবেমার
কাছে বিক্রি
করেন। গ্যাবেমা
যখন বাটাভিয়ায়
বদলি হন,
তখন তিনি
অ্যাঙ্গেলা ও
তার তিন
সন্তানকে মুক্ত
করে দেন।
১৬৬৯ সালে
অ্যাঙ্গেলা একজন
মুক্ত দাস
আরনল্ডস উইলেমসকে
বিয়ে করেন।
এইচএফ হেসসহ
কয়েকজন ইতিহাসবিদ
আরনল্ডের সঙ্গে
অ্যাঙ্গেলার বিয়ের
বিষয়ে বিস্তারিত
লিখেছেন। অ্যাঙ্গেলার
পরবর্তী জীবনও
তাদের লেখায়
এসেছে।
অ্যাঙ্গেলার অতীত
সম্পর্কে তারা
নিশ্চিতভাবে জানিয়েছেন
যে তার
আদি নিবাস
বাংলা। তাকে
পর্তুগিজদের কাছে
দাস হিসেবে
বিক্রি করা
হয়। অ্যাঙ্গেলাকে
আফ্রিকায় এনে
ডাচ কমান্ডারের
কাছে ফের
বিক্রি করা
হয়। এখানে
গায়ের রঙ
থেকে শুরু
করে নানা
কারণে এবং
নানাভাবে নির্যাতিত
হয়েও সে
টিকে ছিল
এবং পরবর্তী
সময়ে নিজের
অবস্থান শক্ত
করে। একসময়
মুক্তি অর্জন
করে অ্যাঙ্গেলা।
১৬৯৮ সালে
তার স্বামী
আরনল্ড মারা
যায়। কিন্তু
অ্যাঙ্গেলা ১৭২০
সাল পর্যন্ত
জীবিত ছিলেন
এবং মৃত্যুর
আগ পর্যন্ত
তিনি টেবল
ভ্যালিতে নিজের
বাড়িতে বসবাস
করতেন। অ্যাঙ্গেলাকে
ইতিহাসে একজন
‘বিজনেস
উইম্যান’ বলা
হয়েছে। এক
বিশাল বাগান
এবং ব্র্যান্ডি
ডিস্টিলারির মালিক
হয়েছিলেন তিনি।
তার তিনজন
দাস ও
দুজন দাসী
ছিল। নারীদের
আঞ্চলিক পরিচয়
পাওয়া যায়
না। তবে
দাসরা ভারতের
মালাবার উপকূলের
মানুষ ছিল
বলে জানা
যায়।
অ্যাঙ্গেলার মেয়ে
আনা ডি
কনিংয়ের জীবন
অ্যাঙ্গেলার থেকে
পুরোপুরি ভিন্ন।
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
এক সুইডিশ
অফিসারের সঙ্গে
তার বিয়ে
হয়। ক্যাপ্টেন
ওলফ বার্গ
নামে সে
অফিসারের মৃত্যুর
পর আনার
মৃত্যুর আগ
পর্যন্ত তিনি
প্রচুর সম্পত্তির
মালিক হন।
এর মধ্যে
কেপ টাউনের
কাছে গ্রুট
কনস্ট্যান্টিয়া নামে
একটি ওয়াইনারি
ছিল অন্যতম।
শহরে আনার
একাধিক বাড়ি
মিলে ২৮
জনের মতো
দাস তার
অধীনে ছিল।
গ্রুট কনস্ট্যান্টিয়ায়
আরো ২৭
জনসহ মোট
দাসের সংখ্যা
ছিল ৬২।
এদের মধ্যে
একজন ছিল
বাংলার।
আনাকে বাঙালি
দাস মালিক
বলা যায়
না। তবে
অ্যাঙ্গেলার সমসাময়িক
বাংলার লুইস
অন্যতম। তাকে
‘একটি
রঙিন চরিত্র’
বলে উল্লেখ
করা হয়েছে।
১৬৬৪ সালে
তিনি এ
অঞ্চলে একজন
দাস হিসেবে
আগমন করেন।
১৬৭৩ সাল
নাগাদ লুইস
মুক্তি লাভ
করেন এবং
১৬৭৫ সাল
নাগাদ ব্যাপটাইজড
হন। লুইস
একসময় নিজেই
দাস মালিক
হয়ে যান।
তিনি প্রথম
‘কালো
ব্যক্তি’, যিনি
শ্বেতাঙ্গকে সুপারভাইজার
হিসেবে নিয়োগ
করেন। লুইস
প্রচুর জমিজমার
মালিকানা লাভ
করেন। এর
মধ্যে ল্যানজেরাক
ফার্ম এবং
পরে স্টেলেনবস
হোটেল অন্যতম।
তার বেশ
কয়েকজন স্ত্রী
ও উপপত্নীর
গর্ভে অনেক
সন্তান হয়েছিল
বলে জেএল
হেটিং নিশ্চিত
করেছেন।
বাঙালি দাস
মালিকদের দিকে
তাকালে একটি
কৌতূহলোদ্দীপক চিত্র
পাওয়া যায়।
তা হলো
দাস মালিকদের
মধ্যে ৭২
শতাংশ পুুরুষ,
অর্থাৎ ২৮
শতাংশ নারী।
নারীর সংখ্যা
পুরুষের অনুপাতে
কম মনে
হলেও ২৮
এখানে যথেষ্ট
গুরুত্বপূর্ণ একটি
পরিমাণ। অবশ্য
এদের সম্পর্কে
স্পষ্ট তথ্য
দুর্লভ। তবে
অ্যাঙ্গেলা ও
তার কন্যা
আনা উল্লেখযোগ্য
উদাহরণ হিসেবে
বিবেচিত।
১৭৪১ সাল
নাগাদ রবার্ট
শট নামে
একজন বাঙালি
দাস মালিকের
উল্লেখ পাওয়া
যায়। তিনি
আটজন দাসের
মালিক ছিলেন।
এছাড়া লুইস,
ডেভিডের নাম
পাওয়া যায়।
এদের নামের
মধ্যে বাঙালিয়ানা
বা বাঙালির
পরিচয় খুঁজে
পাওয়া যাবে
না। কেননা
দাস হিসেবে
বিক্রি হওয়ার
আগে বা
অব্যবহিত পরে
তাদের ধর্ম
পরিবর্তন করা
হতো। বেশির
ভাগই দীক্ষিত
হতেন খ্রিস্টধর্মে।
পাশাপাশি বহুদিনের
অভ্যাসে তাদের
জীবনযাপনও বদলে
গিয়েছিল। পরবর্তী
সময়ে তারা
দক্ষিণ আফ্রিকার
মূলধারার সমাজে
আত্তীকৃত হয়ে
যায়।
দাস মালিকদের
অবস্থা বুঝতে
দাসের সংখ্যা
দিয়ে তাদের
বিচার করা
যাবে না।
তাদের অর্থনৈতিক
অবস্থা এবং
জীবনযাপনেও পরিবর্তন
এসেছিল। যেমন
লুইস তার
জমিজমায় কাজ
করা দাসদের
কাজ তদারকের
জন্য শ্বেতাঙ্গ
কর্মচারী নিয়োগ
করেছিলেন। বাংলা
থেকে দাস
হিসেবে যাওয়া
জ্যাকব পরবর্তীতে
মুক্ত হয়ে
নিজের সামাজিক
অবস্থান উন্নত
করেন। তিনি
সন্তানদের শিক্ষার
জন্য শিক্ষক
নিযুক্ত করেছিলেন।
দাস থেকে
দাস মালিকে
পরিণত হওয়া
ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক
অবস্থা বেশ
ভালো হয়েছিল।
কেননা তাদের
বাড়িতে বিভিন্ন
ধরনের তৈজসপত্র
যেমন পোর্সেলিন
প্লেট ও
ডিশ, গোলাকার
দামি টেবিলে
সিলভারের চামচ
ও কাঁটার
ব্যবহার দেখা
যায়। এর
বাইরে স্বর্ণ,
রৌপ্য ও
মুক্তাখচিত অলংকারও
তারা ব্যবহার
করত। সবার
পক্ষে এ
জীবন পাওয়া
সম্ভব হয়নি।
কিন্তু বাংলা
থেকে অপহূত
কিংবা প্রতারণার
শিকার হয়ে
আফ্রিকায় দাসত্ব
করতে আসা
মানুষদের কেউ
কেউ একটা
ভিন্ন জীবন
পেয়েছিল, তাতে
সন্দেহ নেই।
এ ছিল
ভিন্ন বিপরীত
দুই জীবনের
অদ্ভুত গল্প।
মাহমুদুর রহমান: লেখক




