মানুষ যে
পরিবেশে বসবাস
করে সে
পরিবেশের সঙ্গেই
মিশে যায়।
তবে গ্রহণ
করার প্রক্রিয়াটা
কখনো বেশ
দীর্ঘ। এক্ষেত্রে
ধর্ম, বর্ণ,
জাত, শ্রেণী
প্রভৃতি বিষয়
প্রভাব রাখে।
তবু সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে
আত্তীকরণ ঘটেই
যায়। তবে
দক্ষিণ আফ্রিকার
সমাজে বাংলার
দাসদের মিশে
যাওয়ার বিষয়টি
বিস্ময়কর। বাংলা
থেকে নিয়ে
যাওয়া দাসেরা
দক্ষিণ আফ্রিকার
সমাজে এতটাই
মিশে গিয়েছে
যে তাদের
আলাদা করা
কঠিন। বর্তমানে
সেখানে পাঁচটি
নৃতাত্ত্বিক বিভাগ
দেখা যায়।
এগুলো হলো
(১) ইংরেজি
ও আফ্রিকানভাষী
শ্বেতাঙ্গ, (২)
আফ্রো-ইউরোপিয়ান
গ্রুপ, যাদের
প্রধান ভাষা
আফ্রিকান, (৩)
খোয়সানদের উত্তরাধিকারী,
যারা আফ্রিকান
ভাষাভাষী, (৪)
কেপ মালয়ী,
আফ্রিকানভাষী মুসলিম
ও (৫)
কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান,
যারা প্রধানত
খোসা ভাষাভাষী।
এর মধ্যে
সেই সপ্তদশ
শতাব্দীর বাংলা
থেকে আসা
দাসদের উত্তর
প্রজন্ম আলাদা
করা যায়
না।
বর্তমানে কেপ
টাউনে নেদারল্যান্ডস,
ব্রিটেন, জার্মানি
ও স্ক্যান্ডিনেভীয়
নানা দেশের
মানুষ বসবাস
করে। কয়েকশ
বছর ধরেই
বিভিন্ন অঞ্চলের
মানুষের উপস্থিতির
কারণে এখানে
মানুষের আত্তীকরণ
সহজ হয়েছে।
বাংলা থেকে
আসা দাসদের
অনেকেই খ্রিস্টধর্মে
দীক্ষিত হয়।
এ কারণে
কেপ টাউনের
শ্বেতাঙ্গ সমাজে
মেশা তাদের
জন্য সহজ
হয়েছিল। তবে
রবার্ট শেল
মনে করেন
কয়েকজন নারী
হঠাৎ করে
বর্ণ অতিক্রম
করে মিশে
যাওয়াকে বর্ণ
বিভেদ ছাড়িয়ে
যাওয়ার উদাহরণ
মনে করা
ঠিক হবে
না। তবে
নারীদের মাধ্যমে
তাদের পরবর্তী
প্রজন্মের আত্তীকরণ
সহজ হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে
আন্তোনিয়ো মালান
বলেন, ‘যেসব
নারী বিধবা
হয়ে তাদের
পারিবারিক সম্পত্তির
অধিকার পেয়েছিল
তারা সে
সম্পত্তি নিজের
সন্তানদের মধ্যে
বণ্টন করে
দিতে সক্ষম
হন এবং
যেসব নারী
ইউরোপীয় পুরুষদের
সঙ্গে বিবাহবন্ধনে
আবদ্ধ হয়েছিল
তাদের নাতি-নাতনিদের
সুন্দর ভবিষ্যৎ
দেখার সুযোগ
ছিল।’
আত্তীকরণের বিষয়টি সময় ও ঘটনাভেদে ভিন্নভাবে কাজ করেছে। যেসব নারী গৃহকর্ম ও ধাত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিল, তাদের জন্য আত্তীকরণ সহজ হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকে বিবাহের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ সমাজে গৃহীত হতো। স্থানীয় নারীদের পাশাপাশি এশিয়ান ও ইউরেশিয়ান নারীদের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে এখানে মিশ্র ধরনের উত্তরাধিকারী তৈরি হয়েছে।
আত্তীকরণের আরেকটি
প্রধান কারণ
দাস মুক্তি।
সৌভাগ্যবান বহু
দাস ও
দাসী তাদের
মালিকদের কাছ
থেকে মুক্তি
পেয়েছিল। খুব
কমসংখ্যক হলেও
মুষ্টিমেয় দাস
নিজের চেষ্টায়
মুক্তি লাভ
করে। এর
বাইরে অনেকে
বিশ্বস্ত কাজ
ও ডাচ
রিফর্মড চার্চের
সহায়তায় মুক্তি
লাভ সহজ
হয়েছিল। এরা
স্বাধীনভাবে নিজেদের
উপস্থাপন করতে
পারত এবং
সমাজের সঙ্গে
তাদের মেশা
সহজ হয়ে
যায়। যদিও
এ পদ্ধতিতে
নিজেদের এগিয়ে
নেয়া দাসের
(পুরুষ) সংখ্যা
ছিল খুবই
কম।
কেপ টাউনের
খ্রিস্টীয় সমাজ
এ আত্তীকরণে
বিশেষভাবে প্রভাব
রেখেছে। অবশ্য
অন্যান্য গোত্রের
মানুষের সঙ্গেও
আত্তীকরণ ঘটেছে।
যেমন মালয়ীদের
দ্বারা গঠিত
মুসলিম সম্প্রদায়
এ অঞ্চলে
আরেকটি প্রধান
গ্রুপ হয়ে
উঠেছিল। বর্ণ
অনুসারে এদের
আলাদা পরিচয়
তৈরি হয়েছিল।
বাংলা থেকে
আগত দাসদের
একটি বড়
অংশ এ
মালয়ী মুসলিম
সম্প্রদায়ের সঙ্গে
যুক্ত হয়ে
যায়। অবশ্য
এর বাইরেও
খ্রিস্টানদেরও একটি
কৃষ্ণাঙ্গ গ্রুপ
ছিল। সব
মিলিয়ে বাঙালিরা
এ ধরনের
নানা গ্রুপে
অধিভুক্ত হয়ে
নিজেদের স্বতন্ত্র
পরিচয় হারিয়ে
ফেলে। তবে
সময়ের সঙ্গে
সঙ্গে আত্তীকরণের
প্রক্রিয়া কঠিন
হয়ে ওঠে।
এ সময়
শ্বেতাঙ্গদের বর্ণ
বিদ্বেষ মাত্রা
ছাড়াতে শুরু
করে।
আত্তীকরণের দিকে
আরেকটি পদক্ষেপ
ছিল দাস
মুক্তি। মুক্তির
পাশাপাশি তাদের
অর্থনৈতিক ও
সামাজিক পুনর্বাসনে
মনোযোগ দেয়া
হয়। এক্ষেত্রে
আদ্রিয়ান ভ্যান
রিডের প্রস্তাব
একটি মাইলফলক।
এর মূল
কথা ৩০
বছর কাজ
করার পর
বহিরাগত দাস
ও দাসীদের
মুক্তি দিতে
হবে। তবে
এ মুক্তি
এক ধরনের
দান, তাদের
অধিকার হিসেবে
বিবেচিত হবে
না। ছয়টির
মতো শর্তযুক্ত
এ মুক্তির
ক্ষেত্রে মাত্র
দশমিক ০০০৪
শতাংশ দাসই
মুক্ত হতে
পেরেছিল বলে
উল্লেখ করা
হয়।
শ্বেতাঙ্গ ও
অশ্বেতাঙ্গদের মধ্যে
বিবাহ সম্পর্কে
হেটিং একটি
খসড়া হিসাব
দাখিল করেছেন।
তার মতে,
লিজবেথ ভ্যান
বেঙ্গলের অসংখ্য
উত্তরাধিকারী বর্তমানে
দক্ষিণ আফ্রিকায়
রয়েছে, কিন্তু
তাদের আলাদা
করে শনাক্ত
করা সম্ভব
না। বিবাহ
ও অন্যান্য
মাধ্যমে আত্তীকৃত
হওয়া নিয়ে
নানা ঘটনা
ও গল্প
প্রচলিত। একটি
ঘটনা হলো
ক্যাথরিনা নামে
এক নারী
খুনের দায়ে
অভিযুক্ত হন।
তাকে কেপ
টাউনে ১৬৫৭
সালে নির্বাসনে
দেয়া হলে
সেখানে ক্রিস্টোফেল
নিজম্যান নামে
এক সৈন্যের
সঙ্গে প্রেমের
সম্পর্কে জড়ায়।
তাদের সন্তান
১৬৬৯ সালে
ব্যাপটাইজ করা
হয়। কৌতূহলোদ্দীপক
বিষয় হলো
একজন গডপ্যারেন্ট
ছিলেন অ্যাঙ্গেলা,
যিনি এককালে
বাংলা থেকে
আসা দাস।
বাংলা থেকে
আগত দাসদের
উত্তর প্রজন্ম
যে দক্ষিণ
আফ্রিকায় ছড়িয়ে
আছে তা
দেশটির ভূতপূর্ব
প্রেসিডেন্ট ফ্রেডরিক
উইলিয়ামও স্বীকার
করেছেন। প্রফেসর
রবার্ট শেলের
উক্তি এখানে
উল্লেখ্য। তিনি
বলেন, ‘সত্যি
হলো আমরা
সবাই কোনো
না কোনোভাবে
দাসদের উত্তরাধিকারী।’
দক্ষিণ আফ্রিকার
থেরেস বেনাদে
দাবি করেছেন,
তিনি অ্যাঙ্গেলার
৩০তম উত্তরাধিকারী।
তার পূর্বপুরুষ
নিয়ে তিনি
গৌরব অনুভব
করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায়
অধিবাসীদের অতীত
ও পূর্বপুরুষ
তথা শেকড়
সন্ধানের কিছু
চেষ্টা করা
হয়েছে। এসব
গবেষণা থেকে
দেখা গিয়েছে
তারা ইউরোপীয়
ও অ-ইউরোপীয়দের
মধ্যে ঘটা
পরিণয়ের উত্তরসূরি।
আন্তোনিয়ো মালান
তার গবেষণায়
দেখিয়েছেন হেনরিয়েটা
ক্লাসয উইটবোল
মূলত বাংলার
ক্লাসয গেরিটযের
উত্তরসূরি। হেনরিয়েটা
পরে হ্যামবুর্গের
জোহান ক্লস
মোলারকে বিয়ে
করেছিলেন। ফলে
তার পরবর্তী
প্রজন্ম দক্ষিণ
আফ্রিকার মানুষের
সঙ্গে মিশে
যায়। একইভাবে
দক্ষিণ আফ্রিকার
বিভিন্ন মানুষের
সঙ্গে বিভিন্ন
ধারায় মিশে
গিয়েছে বহু
বাঙালি রক্ত।
আলী আমজাদ: লেখক




