ভাগ্যের পরিহাসে
যেসব বাঙালি
দাস দক্ষিণ
আফ্রিকায় গিয়ে
পৌঁছেছিল তারা
ক্ষোভ ছাড়াই
পরিস্থিতি মেনে
নিয়েছিল এমনটা
ভাবার কোনো
কারণ নেই।
ফলে প্রতিরোধ
তো ছিলই।
এমনকি যারা
অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর
ছিল তারাও
সেখান থেকেই
ধীরে ধীরে
সাধারণ প্রতিরোধ
গড়ে তোলে।
তবে দাসদের
প্রতিবাদের ভাষা
ছিল ভিন্ন।
বিদ্রোহ প্রকাশ
করতে এসব
দাস অনুপস্থিতি,
কর্তব্যে অবহেলার
পাশাপাশি আরো
বেশকিছু পদক্ষেপ
নেয়। সেখানে
সমন্বিতভাবে বিক্ষোভ,
আত্মহত্যার চেষ্টা,
প্রভুত্বের অবমাননা
এবং বিদ্রোহের
মতো ঘটনা
ঘটতেও দেখা
যায়।
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
(ভিওসি) শাসনের
সময়ে এমন
কোনো বিদ্রোহের
ইতিহাস দেখা
যায়নি যেখানে
তাদের শাসনক্ষমতা
থেকে নামানোর
চেষ্টা করা
হয়েছে। পরে
যখন ১৮০৮
সালের দিকে
ব্রিটিশরা শাসনক্ষমতা
হাতে তুলে
নেয় তখন
একটি বিদ্রোহ
দেখা দেয়।
সে সময়েই
এ দাসপ্রথা
উত্খাত করার
দাবি ওঠে।
ধীরে ধীরে
ইতিহাস বিভিন্ন
রকমের বিদ্রোহের
উদাহরণও সামনে
নিয়ে আসে।
বিদ্রোহী দাসদের
মধ্যে দেরিতে
সেবা প্রদানের
ঘটনা সবচেয়ে
অহরহ ঘটত।
হয়তো কখনো
কখনো সেসব
দেরির ঘটনা
যৌক্তিক কারণেই
ঘটত। কিন্তু
ইতিহাস তখনকার
সময়ে বেশকিছু
ঘটনার বয়ান
দেয় যেখানে
দাসেরা কাজ
শেষ করে
দেরিতে বাড়িতে
ফেরায় প্রভুদের
কাছ থেকে
সাজা ভোগ
করতে বাধ্য
হয়। এসব
প্রভুর মনে
ভয় ছিল
তারা হয়
পালিয়ে গেছে
বা পালানোর
চেষ্টা করেছে।
ঠিক এমনই
একটা ঘটনা
ঘটতে দেখা
গিয়েছিল বাংলার
ফরটুইজনের ক্ষেত্রেও।
প্রভুর আচরণের
প্রতিবাদে শুধু
সে বলেছিল,
খামারে ফেরত
আসতে তাকে
বেশ খানিকটা
পথ হাঁটতে
হয়েছে। কিন্তু
এমন জবাবে
মোটেও খুশি
হননি ফরটুইজনের
প্রভু, তিনি
তাকে মাটিতে
ফেলে দেন।
রেগে গিয়ে
ফরটুইজনও একটি
ছুরি বের
করে তাকে
আঘাত করার
চেষ্টা করেন।
যদিও অন্যরা
তাকে আটকে
ফেলেন।
সে সময়ের
দাসদের মধ্যে
বিদ্রোহের আরেকটি
ভাষা ছিল
কাজ ছেড়ে
যাওয়া। বছরের
পর বছর
ধরে সেই
প্রক্রিয়া আরো
বেশি শক্তিশালী
হয়ে ওঠে।
ক্ষুব্ধ দাসেরা
সে সময়ে
কাজ ছেড়ে
দিত এবং
তারা প্রভুর
বাড়ি বা
ফার্ম থেকে
অনেক দূরে
চলে যেত।
ওই গ্রামীণ
এলাকায় খামার
বা বাড়ি
থেকে দাসদের
পালিয়ে যাওয়া
খুব একটা
কঠিন ছিল
না। প্রভুদের
পরিবার ছোট
হওয়ায়, চারপাশের
পরিবেশ পাহাড়
ও বনে
ঘেরা হওয়ায়
তারা লুকানোর
জন্য বেশ
ভালো জায়গাও
পেত। আঠারো
শতকের ওই
সময়ে দুর্গ
থেকে বেশি
একটা দূরে
ছিল না
দক্ষিণ আফ্রিকার
টেবল ভ্যালি।
সেটাই ছিল
পলাতকদের লুকানোর
জন্য সবচেয়ে
ভালো জায়গা।
পরবর্তী সময়ে
অন্তরীপের অবস্থান
বদলে যাওয়ায়
এবং দাসদের
সংখ্যা ক্রমাগত
বৃদ্ধি পাওয়ায়
ফলস বের
সবচেয়ে দক্ষিণের
অংশ দাসদের
পালিয়ে যাওয়ার
একটি পছন্দসই
জায়গা হিসেবে
উদ্ভূত হয়।
সে সময়ে
পালিয়ে যাওয়ার
প্রক্রিয়ার অংশ
হিসেবে কেউ
কেউ ভিওসিতে
নাবিক হিসেবে
সংযুক্ত হয়।
তাদের আশা
ছিল যে
তাদের পূর্ব
দিকে পাঠানো
হবে এবং
তারা সেখানে
মুক্তভাবে বসবাস
করতে পারবে।
তবে পথটি
কতজন সফলভাবে
ব্যবহার করেছিল
তা নিশ্চিত
হওয়া যায়নি।
ইতিহাসে দুজন
দাসের রেকর্ড
পাওয়া যায়,
যারা পথটি
ব্যবহার করতে
গিয়ে অসফল
হয়েছিল। তাদের
জাহাজ যখন
কেপ টাউন
পার হচ্ছিল
তখন তারা
ধরা পড়ে
যায়, ফলে
আবার নির্মমতার
মুখে পতন।
তবে এসব
পলাতক দাস,
যারা কোনো
একটি সম্প্রদায়ে
বসবাস করত
এবং ছোট
ছোট দলে
ঘোরাফেরা করত
তাদের শ্বেতাঙ্গ
কৃষক ও
প্রভুদের প্রতি
বড় হুমকি
বলেই মনে
করা হতো।
আর তাদের
এভাবে শঙ্কার
কারণ ভাবার
বিষয়টি অন্যান্য
দাসের ওপর
বেশ বড়
আকারে প্রভাব
ফেলে। ফলে
তারা পলাতকদের
সঙ্গে যোগ
দিতে বা
অন্ততপক্ষে শ্বেতাঙ্গ
কৃষকদের বিরুদ্ধে
বিধান বা
তথ্য দিয়ে
তাদের সাহায্য
করতে চেষ্টা
করত।
সাধারণভাবে পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে যদি সেটা কোনোভাবে সহিংসতার দিকে না যেত তাহলে শুধু প্রভুই দাসদের সাজা দিতেন। যদিও সেই সাজা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হতো নৃশংস। তবে বারবার পালিয়ে যাওয়া এবং প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়লে সেটাকে অপরাধ কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে তাকে ল্যান্ডরস্টের (স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট) কাছে নিয়ে যাওয়া হতো, পরে অভিযোগ যেত কেপ টাউনের কোর্ট অব জাস্টিসে। রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যাবে, সেসব পলাতক দাসের কেউ কেউ ছিল বাঙালি।
সে সময়
আত্মহত্যাকেও বিশেষ
ধরনের পলায়ন
হিসেবে বিবেচনা
করা হতো।
বলা হতো,
এর মধ্য
দিয়ে এমন
জায়গায় যাওয়া
হয় যেখান
থেকে ফেরা
যায় না।
কেপ শাসিত
রোমান-ডাচ
আইন অনুসারে
দাসের আত্মহত্যাকে
বলা হতো
প্রতিরোধের নতুন
ধরন এবং
সম্পদের বিরুদ্ধে
একটি অপরাধ।
দাসদের প্রভুদের
একটি সম্পদ
হিসেবেই বিবেচনা
করা হতো।
মৃত্যুর কারণ
যে-ই
হোক তাতে
যেহেতু প্রভুর
ক্ষতি হতো
তাই সেটাকে
অপরাধ হিসেবেই
বিবেচনা করা
হতো। আর
যে এমনটা
করত তাকে
শাস্তির আওতায়
আনা হতো।
তবে যেহেতু
আত্মহত্যা চেষ্টায়
সফল হলে
ব্যক্তিকে আর
কোনো শাস্তির
দেয়ার উপায়
ছিল না
তাই তাদের
মরদেহ শহরের
প্রধান রাস্তা
দিয়ে টেনে
নিয়ে যাওয়া
হতো এবং
ফাঁসির মঞ্চে
প্রদর্শন করা
হতো।
এসব দেখে
হতাশাচ্ছন্ন দাসেরা
প্রভুদের প্রতি
তাদের ক্ষোভ
প্রকাশ করত
খামারে আগুন
দিয়ে। কেপের
খামারগুলোর খড়
দিয়ে ছাওয়া
ছাদই ছিল
তাদের লক্ষ্য।
১৭১৭ সালের
দিকে তেমনই
একটি ঘটনা
ঘটান বাংলার
দাস আরন।
তিনি ওয়াইন
তৈরিকারী যে
প্রতিষ্ঠানে কাজ
করতেন সেই
ভবনে আগুন
ধরিয়ে দেন।
অবশ্য সেজন্য
কড়া মূল্য
দিতে হয়
তাকে। একটি
পোলে ঝুলিয়ে
অর্ধশ্বাসরুদ্ধ করে
পুড়িয়ে মারা
হয় তাকে।
কিন্তু যেহেতু
প্রথম থেকেই
ছত্রভঙ্গ ছিল
তাই পুরো
সিস্টেমের বিরুদ্ধে
সমন্বিতভাবে কোনো
প্রতিরোধ গড়ে
তুলতে পারেনি
বাঙালি দাসরা।
তবে তারা
অন্যান্য স্বতন্ত্র
প্রতিবাদের ক্ষেত্রে
মিলেমিশে কাজ
করেছে বলে
প্রমাণ মিলেছে।
আর এসবই
ছিল বাঙালি
দাসদের প্রতিবাদের
ভাষা।
ওই সময়ের
প্রেক্ষাপটে পরিত্যাগের
তুলনায় আরো
বেশি তাত্পর্যপূর্ণ
প্রতিবাদের ধরন
ছিল নিজের
মানসিক স্বায়ত্তশাসনের
দৃঢ় দাবি।
ইউগেন জেনোভেসের
মতো কিছু
ইতিহাসবিদ অবশ্য
মনে করতেন,
প্রতিবাদের এ
ধরন পরিত্যাগের
তুলনায় বেশি
বৈপ্লবিক। ঊনবিংশ
শতাব্দীর শুরু
ও শেষের
দিকে এ
ধরনের প্রতিবাদ
আরো বেশি
সুস্পষ্ট হয়ে
উঠেছিল।
এ ধরনের
প্রতিবাদের ব্যাখ্যা
মেলে ১৭৯৩
সালের মাদাগাস্কার
থেকে আসা
সিজারের ঘটনায়।
সেখানে অভিযুক্ত
সিজারও বারবার
দৃঢ়ভাবে বলছিল,
আমার অবশ্যই
কথা বলার
অধিকার আছে।
এমন বক্তব্যের
পরও যখন
ঔদ্ধত্যের জন্য
চাবুক দিয়ে
তাকে আঘাত
করা হয়
তখন সে
ছুরি দিয়ে
সেটা কেটে
ফেলে। ফলটাও
তাকে ভুগতে
হয় দীর্ঘ
সময়। ২৫
বছর শিকলে
বাঁধা অবস্থায়
কঠোর পরিশ্রমের
সাজা ভোগ
করতে হয়
সিজারকে।
ভিওসি কর্তৃপক্ষ
দাসদের দিক
থেকে সব
ধরনের হুমকি
এড়াতে দ্বিমুখী
নীতি প্রবর্তন
করে। তারা
কিছু কঠোর
পদক্ষেপ নেয়
দাসদের প্রতিরোধ
দমন করার
জন্য। পরে
সেটাকে তারা
মালিকদের ওপর
দাসদের নির্ভরতা
বাড়ানোর সঙ্গে
যুক্ত করে।
দাস বিষয়ে
সবচেয়ে প্রসারিত
লেখায় লেখক
রবার্ট সেল
আরেক লেখক
রবার্ট রসের
উদ্ধৃতি দিয়ে
বলেন, বিষয়টা
এমন হয়েছিল
যে উৎপাদনের
মেশিন চালু
রাখতে তাতে
দাসদের পিঠ
থেকে বেত্রাঘাতে
বের হওয়া
রক্ত দিয়ে
তেল দিতে
হবে।
এভাবে ছোট
ছোট প্রতিবাদ
সে সময়ে
অনেক গড়ে
উঠেছিল। কিন্তু
যেমনটা আধুনিক
বিশ্বে ঘটতে
দেখা যায়
সাধারণভাবে তেমন
কোনো বিপ্লবের
মুখোমুখি হয়নি
কেপ। ইতিহাসবিদরা
বিভিন্নভাবে এ
ঘটনার হিসাব
রাখার চেষ্টা
করেছেন। এটা
সত্যি যে
দাসদের সংখ্যা
সবসময় প্রভুদের
সংখ্যার তুলনায়
বেশি ছিল।
কিন্তু দাস-প্রভুর
অনুপাত কখনই
দাসদের পক্ষে
যায়নি।
সূত্র:
ফ্রম
বেঙ্গল টু
দ্য কেপ,
বেঙ্গলি স্লেভস
ইন সাউথ
আফ্রিকা,
অংশু দত্ত
শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক





