গুলশান-১ ডিসিসি প্রান্তে এসেই মোহাম্মদ মঈদুস শহীদের মনে আর কোনো সন্দেহই থাকে না যে, ড্রাইভার ব্যাটা মহা হারামি, আস্ত একটা গোড়েল, ইচ্ছে করেই ওকে নিয়ে খেলছে, নানান কসরতে মিটারের বিল শুধু বাড়িয়েই চলেছে! নইলে অন্যসব কার-স্কুটারগুলো যখন কার আগে কে সিগন্যাল পার হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে; তখন ওর স্কুটারের ড্রাইভার কেন বাম দিকে মহাখালীর দিকে টার্ন নেয়া রাস্তায় একটা কাভার্ড ভ্যানের পেছনে গায়ে গা ঠেকিয়ে গাঁইগুঁই করতে থাকবে! আরে বাবা! তুমি তো যাবে সোজা— তাই না? তুমি কেন বাম পাশের কাভার্ড ভ্যানের ‘লেনজুড় ধইরা বেয়াক্কেলের মতো বইসা থাকবা?’
কাভার্ড ভ্যানটাও যেমন, চামচিকার মতো একটা জায়গায় গেড়ে আছে তো আছেই— নড়বার কোনো লক্ষণ নেই। গরমে তিষ্টাতে না পেরে শেষে অসহ্য হয়েই সিএনজি স্কুটার থেকে নেমে এল মঈদুস শহীদ। একটু সামনে গিয়ে দেখল, আসলে কাভার্ড ভ্যানেরও দোষ না, ওটার সামনে রাস্তা প্রায় পুরোটা দখলে নিয়ে একটা মিনি ট্রাক দোকানে দোকানে প্লাস্টিকের জারে পানি সরবরাহ করছে। একেই বলে মগের মুল্লুক! যার যা ইচ্ছা করে বেড়াবে! দেখার লোক নেই! মোড়ে তিন-চারজন পুলিশ—সেপাই আর সার্জেন্টের সে কী ব্যস্ততা!
ড্রাইভারদের সঙ্গে তো আর রাগারাগি করা চলে না! সে রিকশার ড্রাইভারই হোক আর লাক্সারি বাসের— ড্রাইভার ইজ ড্রাইভার! তারা বস— ওস্তাদ! মোহাম্মদ মঈদুস শহীদ কণ্ঠে তো বটেই, চেহারাতেও যথেষ্ট মোলায়েম হাসি ফুটিয়ে মিনি ট্রাকের ড্রাইভারকে সকাতরে অনুরোধ জানাল, একটু যেন দয়া করে সাইড দেয় পেছনের কাভার্ড ভ্যানটাকে! বোধহয় মনুষ্য সন্তানটার অন্তরে দয়ামায়া এখনো কিছুটা অবশিষ্ট আছে, উনি বাম পাশে মিনি ট্রাকটাকে সাইড করে বাকি রাস্তাটুকু ছেড়ে দিলেন। অমনি ভুস করে সামনের কাভার্ড ভ্যানটা মহাখালীর দিকে ছুটে ওদের সিএনজি স্কুটারটাকে ডানে ঘোরার চান্স দিল বটে, কিন্তু ততক্ষণে আবারো এই প্রান্তের ট্র্যাফিক সিগন্যালের রেড লাইট জল্লাদের রক্তচক্ষুর মতো জ্বলে উঠেছে। মঈদুস শহীদ আর কী করবেন? সিএনজিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে একটা স্তম্ভিত ভঙ্গি হয়ে রইলেন। স্ত্রী সুরাইয়া এতক্ষণে শুধু স্বামীর হাঁসফাঁস দেখছিলেন, এবার সহানুভূতি ঝরে পড়ে, ‘তোমার অফিস দেরি হয়ে যাচ্ছে না?’
মঈদুস শহীদ ঘড়ি দেখেন। পাক্কা ১৫ মিনিট বসেছিলেন একই জায়গায়, আরো হয়তো ১৫ মিনিট বসে থাকতে হবে! একটা ট্রাফিক সিগন্যালেই আধা ঘণ্টা! ঢাকা শহরের জ্যামে আধা ঘণ্টা বসে থাকাটা হয়তো এখন অভ্যস্ততারই ব্যাপার। তবে স্কুটারের ভেতরের গরমটাকে কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বিড়বিড় করে ওঠেন, ‘ওরে পাষাণ! তোর কি দয়ামায়া নাই’? তারপর সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বললেন, ‘কী আর করবে বলো?’
‘আমাকে বলতে হবে না! আমার এইসবে অভ্যাস আছে। তুমি আগে নিজেকে কন্ট্রোল করতে শেখো!’
‘কীভাবে বলো!’ গলা নামিয়ে আনেন মোহাম্মদ মঈদুস শহীদ, ‘ব্যাটা দেখছো কীভাবে টাইম কিল করছে!’
‘তোমাকে কত বললাম লিফট দেওয়ার দরকার নাই। আমি একাই হেঁটে হেঁটে যেতে পারব। কে শোনে কার কথা! এখন বোঝো!’
বোঝাবুঝির কিছু নেই। সুরাইয়াকে সোনাদানা গয়না দিয়ে সুখ দিতে পারেন না, সামান্য একটু যদি লিফটও দিতে না পারলেন— এর চেয়ে গ্লানিকর আর কী হতে পারে! তাছাড়া কাজটা তো ওর-ই করার কথা! ছেলে ও-লেভেল পরীক্ষা দেবে। ব্রিটিশ কাউন্সিলকে আজকের মধ্যেই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে ২২ হাজার টাকা দিতে হবে। ব্যাপারটা ও নিজেই সারতে পারত। মতিঝিলে কি আর ওই ব্যাংকের কোনো শাখা নেই? কিন্তু সুরাইয়া কিছুতেই ওকে ঝামেলায় ফেলতে রাজি নয়। তুমি ঠিকমতো অফিস করো! আমি তো ফ্রিই থাকি। গুলশানে গিয়ে দিয়ে আসব। সুরাইয়ার এই এক গুণ! ও অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে ছেলের পড়াশোনা এবং সংসারের অন্য দায়িত্বগুলো ও নিজের কাঁধেই নিয়ে নেয়। কিন্তু তাই বলে তো ওর মাথার বোঝা ভারী করাটাও ঠিক না। মঈদুস শহীদও চেষ্টা করে অফিস সামলিয়ে বউকে যতটুকু সাপোর্ট দেয়া যায়, তা দিতে।
আজো দুজন ওদের নিকেতনের বাসা থেকে একসঙ্গেই বেরিয়েছিল। ১০ নম্বর রোড তো বটে, এক নম্বর গেট পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে ওরা না পেল একটা রিকশা না পেল একটা সিএনজি স্কুটার। নিকেতন-গুলশান-বনানী এলাকায় রিকশা বন্ধ করে এটা নাকি মহামান্য মেয়রের নির্দেশে হয়েছে! বিকল্প ব্যবস্থা: কেবল লিমিটেড সংখ্যক বিশেষ রিকশাই চলতে পারবে। তা এতটাই লিমিটেড যে, এক হাজার মানুষের জন্য গড়ে একটা রিকশা পড়ে কিনা সন্দেহ। অগত্যা আর কী করা! হাঁটো। বল্গাহারা রোদের ভেতর হাঁটো। আজ গরমও পড়েছে সেই রকম। এই ভ্যাপসা রোদ-গরমে সুরাইয়া একা একা হেঁটে হেঁটে নিকেতন থেকে গুলশান-১-এ যাবে, সেখান থেকে আরো প্রায় ১০ মিনিট হাঁটতে হবে! কেন যেন ওকে এই যুদ্ধে একা ছাড়তে মন চাইল না। সুরাইয়া অবশ্য বারবারই ওকে নিবৃত্ত করেছে, তুমি অফিসে যাও তো অফিসে যাও। আমি এটা একাই সামলাতে পারব। কে শোনে কার কথা! মঈদুস শহীদের মাথায় ততক্ষণে প্ল্যান দানা বেঁধেছে, একটা সিএনজি স্কুটার পেলে সুরাইয়াকে ব্যাংকে নামিয়ে দিয়ে ওটা নিয়েই ও সোজা অফিসে চলে যাবে।
সিএনজি কি আর মেলে সহজে! নিকেতন-১-এর গেটের কাছে যাওবা একটা মিলল, ভাড়ার কথা শুনে তো দুজনেরই আক্কেল গুড়ুম! গুলশান এক হয়ে মতিঝিল যেতে হবে, যেন এক ডিস্ট্রিক্ট থেকে আরেক ডিস্ট্রিক্ট! ৪০০ টাকা। তাও আবার এমনভাবে চাইল, দিলে দাও নইলে আমি এই ফুটলাম! অনেক দরদামের পর শেষে রফা হলো মিটারেই যাবে, তবে অতিরিক্ত আরো ৪০ টাকা দিতে হবে। কী আর করা! সেটা শিরোধার্য করেই উঠে বসল স্কুটারে। যদিও ভেতরে ভেতরে মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। হবে না? প্রতিদিন যেখানে নিকেতন থেকে হেঁটে নাবিস্কো গিয়ে সেখান থেকে বাসে মতিঝিল যায় মাত্র ২০ কিংবা ৩০ টাকায়, সেখানে আজ দিতে হবে পুরোপুরি ৪০০ টাকা! তা বউ আর সন্তানের জন্য ওটুকু স্যাক্রিফাইস তো করাই যায়! কিন্তু ব্যাটা ঘুঘু ড্রাইভার স্কুটারে চড়ে বসার পর থেকেই শুরু করে দিল খেল-দেখানো। নিকেতনের রোড থেকে তুমি সোজা উঠে যাও শুটিং ক্লাবের সামনে দিয়ে মেইন রোডে। তা না, উনি করলেন কী ভেতরের ভাঙাচোরা সাইড-রাস্তা দিয়ে ঢুকে এক অহৈতকী জ্যামের গ্যাঁড়াকলে স্কুটারকে ঢুকিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসে রইলেন। ১৫-২০ মিনিট বসে থাকতে থাকতে শেষে মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন মোহাম্মদ মঈদুস শহীদ, ‘আপনে মিয়া মেইন রাস্তা দিয়ে গেলেই তো পারতেন?’
লোকটা বাম দিকে ঘাড় ফিরিয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং গলায় বলল কিনা, ‘এই যে বাঙালির স্বভাব! আগে কিছু কইব না। পরে এইদিক দিয়া গেলেন না কেন, ওইদিক দিয়া আসলেন না কেন, আজিরা প্যাচাল শুরু কইরা দিব।’
‘আগে বলতে হবে কেন? মেইন রাস্তা রাইখা কেউ চিপাগলিতে ঢোকে? আপনার সেন্স নাই?’
‘আমরা ড্রাইভার। আপনেগো মতো তো সেন্স লইয়া ঘুরি না। লাইসেন্স নিয়া ঘুরি।’ লোকটা যেন কোনোভাবেই হার মানতে রাজি নয়। চোখা চোখা উত্তর দিতেই হবে। লাগল মঈদুস শহীদের, খেই হারিয়ে চিত্কার করে উঠলেন, ‘যত্তোসব রাবিশ! ছোট...’ বলতে গিয়েও অতি কষ্টে ব্রেক কষেন বটে, কিন্তু অতটুকুতেই যা হবার হয়ে গেল চোখের নিমিষে। ড্রাইভার সোজা দরজা খুলে নেমে এল পেছনে। হুকুমের গলায় বলল, ‘আপনার মতো প্যাসেঞ্জারের দরকার নাই। নামেন। নামেন আমার গাড়ি থেইকা।’
ছোট্ট একটা ঘটনায় যে এতবড় অপমানের মুখোমুখি হতে হবে, কল্পনাই করেনি মঈদুস শহীদ। তাও আবার বউয়ের সামনে। ও হঠাৎ কী করবে! একেবারে চুপসে গেল। সুরাইয়া স্বামীর উদ্দেশে ধমকে উঠল, ‘কথা বলতে যাও কেন এসব মানুষের সাথে। যান তো ভাই, জ্যাম ছুটে গেছে। আপনি আপনার মতো চালান।’
ভাগ্য ভালো, লোকটা আর কথা বাড়ায়নি। সুবোধ বালকের মতো ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসেছিল। কিন্তু তখন থেকেই মোহাম্মদ মঈদুস শহীদের মনে অপমানের কাঁটা খচখচ করে বিঁধছিল। এখন এই গুলশান-১-এ এসে তা আরো তিক্ততায় ভরে উঠেছে। এইভাবে রাস্তায় জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করার কোনো মানে আছে? আবারো পাক্কা ১৫ মিনিট বসিয়ে রাখার পর তবেই সিগন্যাল ছাড়ল।
গুলশান-১ থেকে বাকি পথটা নির্বিঘ্নে পাঁচ-ছয় মিনিটে পৌঁছানো গেল বটে, কিন্তু সুরাইয়াকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে নামিয়ে দেয়ার পর মিটারের দিকে তাকিয়েই মাথার ভেতরটা কেমন চক্কর মেরে ওঠে! সর্বনাশ! ১৮০ টাকা! কীভাবে হলো? শুধু কি টাকা! অফিসের তো আজ বারোটা বাজল! এখনই তো সোয়া এগারোটা বাজে। কখন অফিসে যাবে! চিফ অপারেটিং অফিসার এস দিদারুল ইসলাম মুখের ওপর কিছু বলবে না বটে, কিন্তু ইনক্রিমেন্টে এর প্রভাব না পড়ে যায়ই না। এই যে দেখো, ব্যাটায় শুরু করে দিয়েছে আরেক কেরামতি! গুলশান-২-এর দিকে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। মোহাম্মদ মঈদুস শহীদ গলা যথাসম্ভব মোলায়েম করেই বলল, ‘ভাই! আপনি কি এয়ারপোর্ট যাচ্ছেন নাকি? আমি তো মতিঝিল যাবো!’
লোকটাও যেন মেজাজ সামলাতে সামলাতেই বলছে এমনই এক সুর, ‘ভাই! কেমন কথা বলেন আপনে? কাটা পাইলে তো ঘুরবো! আমিতো জানি আপনি মতিঝিল যাইবেন।’
এও যেন বিল উঠানোর আরেক চক্কর। মাঝে মধ্যে কাটা আছে ঠিকই, বন্ধ করে রেখেছে! এখন বসে বসে মিটারের অংক গুনতে থাকো। বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর অবশেষে কাটা পাওয়া যায়, ড্রাইভার স্কুটারটা ঘুরিয়ে আবার গুলশান-১-এর দিকে যেতে থাকে শান্ত সমাহিত ভঙ্গিতে। পেছনের সিটে বসে মোহাম্মদ মঈদুস শহীদ চেষ্টা করে মিটারের দিক থেকে চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখতে। পারে না। কিছুতেই পারে না। বারবার চোখ ওইদিকেই চলে যায়। এখন উঠেছে ২২০ টাকা। সঙ্গে যোগ হবে আরো ৪০। মতিঝিল যেতে যেতে অংকটা যে ঠিক কত টাকায় গিয়ে ঠেকবে— কে জানে! আবার দেখো যমের মতো জ্যাম! হ্যাঁ, জ্যামকে এখন যমের মতোই লাগছে! আর গুলশানের এই প্রান্তের জ্যাম যে কী ভয়াবহ সেটা ওর ভালোই জানা আছে। পরিত্রাণের উপায়ও কিছুটা জানে। তাই অধীনের বিনীত নিবেদনের ভঙ্গিতে ড্রাইভারকে অনুরোধ করল, ‘ভাই যে জ্যাম দেখতেছি, এক কাজ করেন না— বাঁদিকের একটা গলিতে ঢুকিয়ে দেন। সাইড রাস্তা দিয়ে চলে যাই।’
মনে হলো না লোকটা ওর কথা কানে নিল। যেমন স্থির বসে ছিল তেমনি বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর জ্যাম ছাড়ে। সিএনজি স্কুটার একটু এগোয়। হাতের বাঁয়ে গলিও পড়ে। কিন্তু ড্রাইভারের যেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। গলি পেরিয়ে আবারো জ্যামের মুধু খেতে খেতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে একটা ঔদ্ধত্যের ভঙ্গি নেয়। মোহাম্মদ মঈদুস শহীদের ইচ্ছে হয় লোকটার গালে কষে একটা চড় লাগায়। ইচ্ছেটিকে আর প্রশ্রয় দিতে চায় না সহজে। মার দেয়ার ক্ষমতা যে ওর নেই, সেটা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে? ওজন মাত্র ৫৬ কেজি। ভেতরে ভেতরে অনেক আগেই ক্ষয়ে গেছে স্বাস্থ্য। ডায়াবেটিস খাওয়ার আগেই আজকাল ১১ থাকে। একমাস হলো কিছুতেই নামছে না। সিএনজিওয়ালাকে যদি ও এক ঘুষি দেয়, বেটা ওকে দশ ঘুষি দেবে! ঘুষি খাওয়াটা বড় কথা নয়, বড় কথাটা হলো মানসম্মান বলতে আর কিছু থাকবে না। মঈদুস শহীদ মার দেয়ার বদলে আপোসে আপোসেই ওর সঙ্গে বিষয়গুলো সারার প্ল্যান করে। জ্যাম যখন আবার একটু সচল হয় এবং সিএনজিটা চলতে থাকে, আবার যখন বাঁয়ে একটা গলি পড়ে এবং ও সেদিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হয় যে, সাইড রাস্তাটা মোটামুটি ক্লিয়ারই আছে, চিত্কার দিয়ে ড্রাইভারকে বলতে থাকে, ‘ভাই ভাই, আপনি বাঁয়ে ঘোরান। বাঁয়ে ঘোরান। সাইড রাস্তাটা ক্লিয়ার! ক্লিয়ার আছে ভাই! ড্রাইভার যেন ওর চিত্কার ওর কোনো কথা শুনতেই পাচ্ছে না। বাঁয়ের গলিটা পেরিয়ে আবার আটকে পড়ে জ্যামে, এখন থাকো বসে। মাথায় রক্ত উঠে যায় মঈদুস শহীদের। তবু মেজাজ যথাসম্ভব সামলে চিত্কার দিয়ে উঠলেন, ‘কিরে ভাই? আপনাকে কী বললাম? আপনি তো আমার কথা কানেই নিচ্ছেন না?’ ড্রাইভার এবার বাম দিকে মুখ ঘুরিয়ে শ্লেষের সুরে বলল, ‘আপনি তো মানুষটা একটা ফাউল!’
স্তম্ভিত হয়ে যায় মঈদুস শহীদ, ‘কী বলছেন এসব?’
‘ফাউল না তো কী? যখন সাইড রাস্তা দিয়া যাই তখন কন মেইন রোড দিয়া যাইতে, আর মেইন রোড দিয়া গেলে কন সাইড রাস্তায় যাইতে। এক মুখে চৌদ্দ কথা।’
‘কখন বললাম চৌদ্দ কথা! আমি তো বারবারই বলছি সাইড রাস্তায় ঢোকেন—’
‘নিকেতন থেইকা গুলশানে আইবার সময় সাইড রাস্তায়ই তো আসতেছিলাম, কি কইছেন মনে নাই? অক্ষণে অক্ষণেই ভুইলা যান? এখন আবার সাইড রাস্তার জন্য পাগল হইয়া গেছেন!’
একটা সামান্য সিএনজি ড্রাইভার! তার কথার সাইজ দেখো! ইচ্ছামতো চ্যাটাং চ্যাটাং কথার পর কথা শুনিয়েই যাচ্ছে! মিটারে বিলের পর বিল উঠিয়েই যাচ্ছে! রাগে-দুঃখে-অপমানে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে মঈদুস শহীদের। এই রকম মানবজীবনের চেয়ে মরে যাওয়া উত্তম! কী করবে ও দিশা খুঁজে পায় না। সারাজীবন তো কম দুই নম্বর লোক ফেস করেনি, কিন্তু এমন চশমখোর তেঁদড় লোকের পাল্লায় কখনো পড়েছে বলে মনে পড়ে না। আচ্ছামতো একটা শিক্ষা দেয়া দরকার। কিন্তু সেটা দেবে কীভাবে? একটা বয়সে হয়তো বন্ধুবান্ধবদের ডেকে ধোলাই দেয়া যায়, সেটাও তো এ বয়সে সম্ভব নয়। বড় বেশি ছেলেমানুষি হয়ে যাবে। ব্যক্তিত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না। কী করা যায় তাহলে? পুলিশের শরণাপন্ন হবে? কী বলবে পুলিশকে? ওর বিরুদ্ধে আসলে অভিযোগটিইবা কী? ড্রাইভারের সঙ্গে যেভাবে চুক্তি হয়েছে, সেভাবেই তো হচ্ছে সবকিছু। পুলিশ আর ওর কি করবে! ছিঃ, কী সব অসুস্থ চিন্তা কাজ করছে মাথার ভেতর! কিন্তু একটা কিছু করা দরকার। অন্তর্দাহ কিছুতেই কমে না। এই জন্যই বুঝি মানুষ মানুষকে খুন করে? জেল হবে ফাঁসি হবে জেনেও এক মানুষ আরেক মানুষের পেটে ছুরি বসিয়ে দেয়? কেন বসায়— এখন তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে মঈদুস শহীদ। লোকটাকে শিক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত যেন স্বস্তি নেই ওর। জ্যামে বসে বসে ঘামতে ঘামতে অবশেষে যখন গুলশান-১-এর মোড়ে এসে পৌঁছাত পারল, যখন আর একটা সিগন্যাল পেলেই মোড় পার হওয়া যাবে, তখনই আবার মিটারের দিকে চোখ গেল— ৩৪০ টাকা! মঈদুস শহীদ আর দেরি করল না, যেন নিজেরই অজান্তে, দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ‘একটা ঔষধ নিতে হবে’ বলেই হন হন করে হাঁটা দিল তামান্না ফার্মেসির দিকে, কিন্তু না, সেখানে ঢুকতে গিয়েও তিনি ঢুকলেন না, পায়ের গতি বাড়িয়ে বাঁদিকে সোজা হেঁটে, আবারো বাঁদিকে বাড্ডামুখী রাস্তার দিকে টার্ন নিলেন। এখন আর মেইন রোড দেখা যাচ্ছে না, সিএনজি স্কুটারওয়ালাও দেখতে পাচ্ছে না ওকে। তিনি আরো পায়ের গতি বাড়িয়ে দেন। ফখরুদ্দীনের বিরিয়ানির দোকানটা পার হলেই একটা মার্কেট। অব্যাহত ক্ষিপ্রগতিতে তিনি ঢুকে পড়লেন সেই মার্কেটের ভেতর। মার্কেট পার হয়ে সোজা ওপাশের রাস্তায়। আবার বাঁয়ে কান্নি মেরে উঠে পড়লেন নিজের চেনা-জানা একটা ভবনে। এখানে এই ভবনে ওর ছেলে তিন বছর কোচিং পড়তে এসেছে। সুরাইয়াই নিয়ে আসত ফাইয়াজকে এখানে, ও আসত অফিসের ছুটির দিনগুলোয়।
একতলা দোতলা তিনতলার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে টের পান এখনো কোচিং সেন্টার তেমন জমে ওঠেনি। দুপুরের পর থেকে জমে উঠতে থাকবে। টিচারগুলো প্রায় সবাই বিভিন্ন স্কুলে মাস্টারি করে। ক্লাসট্লাস শেষ করে এখানে এসে বিকালে নামে টাকার কাঁড়ি জমাতে! তিনতলার বারান্দায় পৌঁছে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। বেটা ড্রাইভার যতই ধাঙ্গড় হোক, ওর মাথায় কখনই আসবে না যে, ও এই বাড়ির এই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। চামারগিরির কী প্রতিফল এবার বোঝ্ শালা! বেশি না, ১৫-২০ মিনিট এখানে কাটালেই চলবে— তারপর ধীরেসুস্থে নামা যাবে। এই ফাঁকে ফোন করে অফিসটাকে না হয় ম্যানেজ করা যাক। সিওও আবদুল মুকিত খোন্দকার খুব তোষামোদপ্রিয়, খুব বেশি তেল মারার দরকার হয় না, সামান্য একটু দিলেই হলো— গলে যায়! আসছে ছোট ফ্যামিলি থেকে, মনমানসিকতা খুবই নিচু, ফোন না করলেই মনে করবে যে ওকে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু ফোন না হয় করবে, বলবেটা কী! বলবে যে স্যার আমি একজন সিএনজি স্কুটার ড্রাইভারের পয়সা মারতে গুলশানের একটা জায়গায় লুকিয়ে আছি! হা হা হা, নিজের মনেই হেসে উঠল মঈদুস শহীদ। ধুর! এমন কথা কাউকে বলা যায়, না বলা সম্ভব? এমনকি সুরাইয়াকেও তো কোনোদিন বলতে পারবে না! তাহলে কী বলবে মুকিত সাহেবকে? মঈদুস শহীদ জীবনে কখনো মিথ্যা বলেনি! হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা জাজ্বল্যমান সত্য কথা। মিথ্যে যেমন বলেনি, মানুষের চার আনা পয়সাও মারেনি কোনোদিন। বরঞ্চ পদে পদে ঠকেছে, হাড়ে হাড়ে মার খেয়েছে; আর সেই মানুষটি কিনা সামান্য এক সিএনজি ড্রাইভারের ৪০০ টাকা দিনদুপুরে গাপুস করে দিল? আসলে এটাকে কি গাপুস করা বলা যাবে? যাবে না, না না, যাবে না। ওর একটা কিছু করার খুব দরকার ছিল, আর কিছু করা সম্ভব হয়নি বলেই এটা করেছে। নইলে অপমানের যন্ত্রণা বুক থেকে কিছুতেই নামত না। এখন নেমেছে। বেশ হালকা লাগছে নিজের কাছে। আর যেহেতু হালকা লাগছে তখন আর কোনো গ্লানিবোধকেই প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়, উচিত নয় সিওওর সঙ্গে কথা বলতে দ্বিধায় থাকারও। যা মন থেকে আসবে তাই বলবে, হয়তো এই টাকা গাপুস করার মতো মিথ্যে বললেও মনে হালকা অনুভব করবে। সত্য কথা বলে বলো তোমার চাকরিতে কতটুকু উন্নতি হয়েছে মোহাম্মদ মঈদুস শহীদ? বংশের আভিজাত্য, পরিবারের কৌলিন্য, সামাজিক অবস্থানের খোলনলচে পাল্টে ফেলে অনায়াসে এবং সহজেই গড়গড় করে বলে গেলেন যে, স্যার ছেলের ও-লেভেলের পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে একটু ব্যাংকে এসেছি। ব্যাংকের কাজ সেরে আবার একটু যেতে হবে ওর স্কুলে, গিন্নি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আমাকেই আজ সব করতে হচ্ছে স্যার, হে হে হে! সিওও খুব গদগদ, আরে এসব দায়িত্ব তো করতেই হবে শহীদ সাহেব। ঠিক আছে আস্তে-ধীরে সেরে আসুন। ডোন্ট অরি। আমি এদিকটা সামলাব।
সামলা হালা, হুমুন্দির পুত, ফোন রেখেই একটা গাল দিয়ে উঠল মঈদুস শহীদ! তারপর আবার শিওর হলো, মোবাইলের লাইনটা কেটেছে কিনা। সিওও যদি গালটা শুনে ফেলে তাহলে আবার কেলেঙ্কারি! কোনদিক দিয়ে কী করবে কে জানে? মোবাইল চেক করে আনন্দে নেচে উঠল ও। ইটস ওকে। কল এন্ডই হয়েছিল। আর নাচ পেতেই ও একটা খালি ক্লাসরুমের ভেতরে ঢুকে যায়। ঢুকেই শুরু করে দেয় উন্মত্ত নাচ, হে ডুডুল হাই ডুডুল হে ডুডুল হো... আকিতাকি হোম্বা আকিতাকি হোম্বা... একবার স্কাউটিং জাম্বুরিতে অংশ নিয়েছিল, তখন এ গানটা গাইতে হয়েছে। দুটো হাত ডান দিকে নাচাতে নাচাতে আরেকবার দুটো হাত বাম দিকে নাচাতে নাচাতে হে ডুডুল হাই ডুডুল হে ডুডুল হো, ও মাথাটা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে নিতম্বটাকে যথাসম্ভব যতটুকু পেছনের দিকে নেয়া যায়, নিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আকিতাকি হোম্বা আকিতাকি হোম্বা গাইতে গাইতে... শালা আমি শুধু ড্রাইভারের ৪০০ টাকাই হাপুস করে দেইনি, কী সুন্দর মিথ্যে বলে গেলাম অনায়াসে কত সহজে, আতিতাকি হোম্বা আকিতাকি হোম্বা... হে ডুডুল হাই ডুডুল হে ডুডুল হো! কিন্তু বেরসিক মোবাইলটা বেজে উঠতেই নাচে ক্ষান্ত দিতে হয় মঈদুস শহীদের! শালা ফোন আসার আর সময় পেল না!
সুরাইয়ার কল। সুরাইয়া। মোসাম্মৎ সুরাইয়া খানম। শোনো, আমি না ব্যাংকের কাজ শেষ করলাম। সবকিছু ভালোভাবেই হয়েছে। চিন্তা করো না। এখন বাসায় যাচ্ছি।
আরে না না। চিন্তা করার কী আছে। তুমি বাসায় পৌঁছে একটা ফোন দিয়ো। এ পর্যন্ত কথাবার্তা ঠিকই ছিল। কিন্তু সুরাইয়া আবার প্রশ্ন করেই ঝামেলা বাঁধাল। তুমি কি অফিসে পৌঁছে গেছো? মিথ্যা বলতে গিয়েও পারে না মঈদুস শহীদ। সুরাইয়ার সঙ্গে ও কোনোদিন মিথ্যা কথা বলেনি, এমনকি একবার অফিসের একটা মেয়েকে প্রপোজ করতে গিয়ে যে কী ভীষণভাবে অপমানিত হয়েছিল, সেটা পর্যন্ত বলে বুক হালকা করেছে! কিন্তু এ রকম একটা ছোটলোকমির কথা কী করে বলা যায় সুরাইয়াকে! সেটা কি কখনো সম্ভব? কী মনে করবে ওই সহজ-সরল মেয়েটা! ওকে চুপ থাকতে দেখে ওপাশ থেকে তাড়া, কী হলো! কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি রাস্তায়? যে রকম একটা ড্রাইভারের পাল্লায় পড়েছিলে আজ।
উদ্বেগ আক্রান্ত সুরাইয়াকে স্বস্তি দিতেই ও আবারো গড়গড় করে মিথ্যে বলে যায়, স্বচ্ছন্দে এবং সহজেই, আরে কখন পৌঁছে গেছি অফিসে! আমি এখন সিওও সাহেবের সঙ্গে বসে শিঙাড়া আর চা খাচ্ছি! তুমি কোনো চিন্তা করো না সোনামণি! উম্মাহ! উম্মাহ! শব্দ করে আবেগে ফোনেই চুমু খেয়ে বসে। সুরাইয়া ওপাশ থেকে ধমকে উঠে, ইস! তুমি যে কী! কার সামনে কি বলতে হয় বোঝো না। সিওও সাহেব কী মনে করবে? মঈদুস শহীদ আরো দুঃসাহসী, আমি তো আর উনার বউকে চুমু খাচ্ছি না, তাই না? উনার মনে করার কী আছে! সুরাইয়া কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে মোবাইলটার লাইন কেটে দিতেই আরো বিপুল আনন্দ এসে ভাসিয়ে নেয় মঈদুস শহীদকে। বউয়ের সঙ্গে কী সুন্দর মিথ্যে কথা চালিয়ে গেল। সামান্যও আটকাল না। এ যেন নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। সাফল্যে এবার ওর ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কেউ যদি দেখে ফেলে? ঘড়ি দেখল ও। আরো ১০-১৫ মিনিট থাকা যায় এখানে। তাহলে বাইরে বেরোনোটা আরো নিশ্চিন্ত হবে। ব্যাটা সিএনজিওয়ালা ততক্ষণে নিজেও কোথাও গাপুস হয়ে যাবে। ডিগবাজি যখন খাবে ভালোমতোই খাওয়া যাক না। দরজাটা বন্ধ করে দেয় মঈদুস শহীদ। তারপর যখন ডিগবাজি খেতে যাবে, তখনই এসএম হলের শফিক ভাইয়ের হেটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ ছবিটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলেই দেখত— শফিক ভাই মাথাটা মেঝেতে ঠেকিয়ে পা দুটো আকাশমুখী করে আছে, আছে তো আছেই, পাঁচ মিনিট, ১০ মিনিট, একটুও নড়াচড়া নেই, কী সুন্দর স্থির! এই ফিজিক্যাল এক্সারসাইজটা নাকি মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে দারুণ সহায়ক। আচ্ছা! ডিগবাজির বদলে এই এক্সপেরিয়েন্সটা নিলে কেমন হয়? অনায়াসেই মাথাটা মেঝেতে ঠেকিয়ে পা দুটো আকাশমুখী করতে পারল মঈদুস শহীদ। আশ্চর্য! কী চমত্কার ব্যালেন্স! পা দুটো, হাত দুটো, শরীরের কোনো অংশ একটুও নড়ছে না, স্থির এবং অচঞ্চল।




