এক
বন্ধুত্ব বলতে নিত্য সঙ্গ দেওয়া, আড্ডা হৈহুল্লোড়ে মেতে থাকা, একসঙ্গে সবজান্তা কোলাহল তৈয়ার করে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা— হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার এই প্রকার সম্বন্ধ ছিল না। কিন্তু বন্ধু দাবি করতে পারি। একটা সহূদয় সম্পর্ক ছিল। ছাত্রাবস্থায় যে সময়টায় ওকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি, তখন হুমায়ূন বেশ মুখচোরা ছিল। ওর লেখালেখির ব্যাপারে আহমদ ছফার উত্সাহ ছিল প্রচুর। আর ছফার স্বভাব অনুযায়ী হুমায়ূনের প্রতি ছিল অফুরন্ত স্নেহ। ছফা, হুমায়ূন আর আমি যে কদিন মোটামুটি ঘনিষ্ঠভাবে আড্ডা দিতে পেরেছি, সেখানে হুমায়ূনের প্রতি ছফার দুটো উপদেশ এখনো কানে বাজে। ষাট দশকের শেষের দিকের কথা বলছি: পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় আমাদের ‘ভালো’ লিখতে হবে। কলকাতার সঙ্গে একটা প্রতিযোগিতা বোধ থেকে ছফার এই সংকল্প। ‘ভালো লেখা’ কী, সেটা কীভাবে লিখতে হয়, সে ব্যাপারে ছফা কিংবা হুমায়ূন কারুরই কোনো ধারণা ছিল বলে মনে পড়ে না। ‘ভালো লেখা’ লিখতে হবে বলত বটে, কিন্তু কাকে ‘ভালো লেখা’ বলা হবে, তার মানদণ্ড কে কীভাবে কী কারণে নির্ণয় করবে সেই প্রশ্নগুলো লেখকের জন্য খুব জরুরি কি? ভালো লিখতে হবে। ব্যস!
এদের দুজনের কেউই জীবিত নেই। ফলে বন্ধুর দায় নিয়ে আমাকে লিখতে হচ্ছে। বিশেষত এখনকার তরুণ লেখকদের প্রতি মনোযোগ রেখে। হুমায়ূন বা ছফা ‘ভালো লেখা’ বলতে কী বোঝে তা নিয়ে আমি যে অল্প সময় দুজনকে একসঙ্গে পেয়েছি, সেখানে তর্ক হয়েছে মনে পড়ে না, তাদের লেখালেখি থেকেও কোনো ধারণা নির্ণয় করা কঠিন। অন্যেরা নির্ণয় করতে পারলে করবেন। অথচ ‘ভালো লেখা’ খুব সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। হুমায়ূন আহমেদ সেটা কোনো সাহিত্য তত্ত্ব দিয়ে আমাদের বোঝায়নি, কিন্তু তার লেখালেখি চর্চার ধরন এবং তার নিজের লেখার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা তা মোটামুটি আন্দাজ করতে পারি। হুমায়ূনকে নিয়ে লিখতে গিয়ে এই কথাটাই মনে হলো। সেই বিষয়েই তাই লিখছি।
সাহিত্যের প্রতি আমি সবসময়ই উন্নাসিক, বই বেচাবিক্রির যুগে ‘পারফর্মিং আর্টস’ থেকে লেখালেখিকে আলাদা করা কঠিন। সে কারণে গল্প-উপন্যাসের প্রতি আমার আগ্রহ সবসময়ই কম ছিল। কার বই ভালো বিক্রি হলো, কে পাঠকনন্দিত হলেন ইত্যাদি, আমার ধারণা, পারফর্মিং আর্টস বা বিনোদনমূলক কলাবিদ্যার মধ্যে পড়ে। সেটা কিন্তু মন্দ নয়। সেটাও শিল্পকলা। তবে সাহিত্যের জিজ্ঞাসা যে প্রশ্ন থেকে শুরু হয় সেটা বিনোদনের বাইরের প্রশ্ন— এই সন্দেহ আমি ছাড়তে পারিনি। ভালো লাগা মন্দ লাগা, ছাড়া সাহিত্যের আর কী আছে, যাকে আমরা সাহিত্য বলতে পারি? সাহিত্যে মানুষের সঙ্গে মানুষের আদান-প্রদান কীভাবে ঘটে? সাহিত্য কীভাবে সম্পর্ক ভাঙে, কীভাবে নতুন সম্পর্ক তৈরি করার শর্ত বানায়, ইত্যাদি। এই সকল কাতর প্রশ্ন যে কোনো ভাবুককেই কাতর করতে বাধ্য।
ভেবে দেখলে বুঝব, এই সকল জিজ্ঞাসা তো সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব, সাহিত্যের ইতিহাস ইত্যাদির মধ্যে পড়ে। তাহলে সেইসব সমাজবিদ্যা ইতিহাসচর্চার বিষয়, সাহিত্যের না। তাহলে বিনোদনের বাইরের জিজ্ঞাসা সবসময় সাহিত্যের জিজ্ঞাসা, এই অনুমানও ঠিক না। কিন্তু আজ এখানে সাহিত্যের সংজ্ঞা দিতে বসিনি। হুমায়ূনকে নিয়ে দুই-একটি কথা বলার ইচ্ছা নিয়ে বসেছি। এটা হুমায়ূনের লেখালেখি কিংবা ছবি বানানো নিয়ে পর্যালোচনামূলক লেখা নয়। সাহিত্য নামক যে জগতের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে আমাদের জেনারেশন বড় হয়েছে সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়া।
দুই
ছফার ‘ভালো লেখা’ নিয়ে শুরু করেছি। ব্যাপারটা যত সাদামাটা মনে হচ্ছে, তত সরল নয়। ‘ভালো লেখা’ লিখতে হবে সংকল্পের পেছনে আহমদ ছফার আকুতিটুকুর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত আছে। ষাট-সত্তর দশকে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে লেখালেখি করতে এসেছি, তখন কলকাতার লেখকদেরই প্রবল দাপট। বাংলাদেশ তাদের বইয়ের বাজার। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের লেখালেখির জগতে বাংলাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন রীতিমতো অনুপস্থিত। এমনকি তাদের ভাষাও। ব্যতিক্রম ছিল না, তা নয়। তবে সেটা নগণ্য। আমাদের দিক থেকে এ ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা কলকাতার লেখকদের আদৌ অপছন্দ করি, কিংবা তাদের লেখা বাংলাদেশে কেউ না পড়ুক তা চাই। মোটেও না। এটা পরিষ্কার ছিল নির্বিচার কলকাতাবিরোধী মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয়া সাম্প্রদায়িকতা। এই সচেতনতাটুকু আমাদের মধ্যে প্রবলই ছিল। আমাদের আগে যাঁরা লেখালেখি করতে এসেছিলেন তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা নেয়া আমাদের জন্য খুব কঠিন ছিল না।
পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা সঙ্গতকারণেই নিজেদের পশ্চিম বাংলার সাহিত্য থেকে স্বতন্ত্র জ্ঞান করতে শুরু করেছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস বিশেষত ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই কিংবা সম্বন্ধ রচনার ধরনে দুই সম্প্রদায়ের ভিন্নতা ছিল। ইংরেজের বিরুদ্ধে দুই সম্প্রদায়ের লড়াই কিংবা সম্বন্ধ তৈরির ইতিহাসের কারণে অনিবার্যভাবেই এই ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ গড়ে উঠবার কথা। তাই হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলবার তাগিদ থেকে সাহিত্যে এক প্রকার রাষ্ট্রীয় জাতিবাদ চর্চার বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়। পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রয়াস সহজেই চোখে পড়ে। যাকে আমরা অনেক সময় পাকিস্তানবাদী সাহিত্য বলে নিন্দা করি।
কিন্তু পাকিস্তানের চেয়ে রাষ্ট্রবাদী চিন্তা পশ্চিম বাংলার সাহিত্যেও সমান প্রকট ছিল। বাংলা সাহিত্য ঐতিহাসিক কারণেই উচ্চ বর্ণের হিন্দুর সাহিত্য। ফলে তার স্বাভাবিক চরিত্রের মধ্যেই হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের ভিত্তি যেমন নিত্য উত্পাদিত ও পুনরুত্পাদিত, একইভাবে হিন্দুত্বের অফুরন্ত উপাদান পশ্চিম বাংলার সাহিত্য নিত্য তার স্বাভাবিক চর্চার মধ্য দিয়ে তৈরি করে। যেটা বিশেষভাবে উল্লেখ করার বিষয় সেটা হলো, এই কাজ হিন্দু সাহিত্যিকরা চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র করে কিংবা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে করেন, তা নয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি যাঁরা দান করেছেন— বঙ্কিম, শরত্চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথসহ আর আর লেখক— তাদের নতুন করে হিন্দুত্ব নির্মাণ করতে হয়নি। আধুনিক বাংলা সাহিত্য হিন্দুর জীবন, জগত্, আশা, কল্পনা, সংকল্প নিয়েই গড়ে উঠেছে। হিন্দুর জগদ্বীক্ষাই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি। আধুনিক বাংলা সাহিত্য হিন্দু সংস্কৃতি ও সভ্যতার ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। ফলে পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিকদের আলাদা করে হিন্দু কিংবা আলাদা করে বাঙালি হতে হয়নি। হিন্দুত্বের চর্চার জন্য তাকে তার হিন্দু জীবন ও জগতের বাইরে গিয়ে আলাদা কোনো কোশেশ কিংবা কোনো শৈল্পিক রক্তপাত ঘটাতে হয়নি। তার স্বাভাবিক চর্চার মধ্যেই হিন্দুর জগত্, হিন্দুর ভাবনা, হিন্দুর কামনা-বাসনা, আশা, সংকল্প ইত্যাদি ফুটে উঠেছে। হিন্দু জাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ বাংলা সাহিত্য থেকে আলাদা কোনো ব্যাপার নয়। এটাই ইতিহাস। এর বিপরীতে, কখনো প্রতিক্রিয়া হিসেবে কখনো গঠনমূলক বাসনায় গড়ে উঠেছে মুসলিম জাতিবাদ। ছফার ভালো লেখার ধারণার মধ্যে বলাবাহুল্য, পশ্চিম বাংলার সাহিত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রস্তাব ছিল না। ভালো লেখা মানে কলকাতার সাহিত্যেও যে লেখা পাঠকপ্রিয়তার গুণে নয়, সাহিত্যের গুণে সমাদৃত হবে, এই অর্থে।
তিন
‘জাতি’ একটি কাল্পনিক নির্মাণ এবং তা তৈরি হওয়ার বৈষয়িক কারণগুলোর মধ্যে ছাপাখানার পুঁজিতন্ত্র নির্ধারক ভূমিকা রাখে, এটা বেনেডিক্ট এন্ডারসনের বরাতে আমরা এখন জানি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সত্তরের দশকে আমরা তা বুঝতাম না, বেনেডিক্টের প্রথম বইটি বেরিয়েছে ১৯৮৩ সালে (অহফবত্ংড়হ, ১৯৮৩)। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি আছে। জাতীয়তাবাদের উত্থানের পেছনে ছাপাখানার ভূমিকা এখন বিতর্কিত নয়, তবে ছাপাখানা ছাড়াও অপরাপর আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কারণও আছে। সেই সকল কারণ এড়িয়ে যাওয়া, অস্বীকার বা গৌণ জ্ঞান করাটা বিতর্কের বটে (ঈযধঃঃবত্লবব, ১৯৯৩)। একটি ভূগোলে মানুষ নানান স্থানীয় ভাষায় কথা বলে, নিজেদের দেশ বলতে নিজের জায়গা ও পরিচিত ভূগোলের সঙ্গে নিজেকে সম্বন্ধযুক্ত দেখে। এর বাইরে অন্য গ্রামে, অন্য জেলায় কিংবা অন্য ভূখণ্ডের সঙ্গে তার যে কোনো যোগ আছে সেটা কল্পনা করা তার পক্ষে কঠিন।
ঢাকায় আমরা এখনো ‘দেশ’ কোথায় প্রশ্ন করলে নিজের জেলার নামই করি; জেলা শহর প্রশ্ন করলে বুঝি প্রশ্নকর্তা আমার গ্রামের হদিস চাইছে; তাই বলি অমুক কি তমুক গ্রাম। কিন্তু কীভাবে নিজেদের ‘বাঙালি জাতি’ হিসেবে আমরা ভাবতে শিখলাম, আর নিজের গ্রাম-সাকিনকে ‘দেশ’ না বলে ‘বাংলাদেশ’কে নিজের দেশ ভাবতে শুরু করলাম সেটা একটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বটে। আর সিলেটি, নোয়াখাইল্যা কিংবা চাটগাঁইয়ের ভাষা বললেও ছাপাখানার ভাষাকে ‘মাতৃভাষা’ বলতে শুরু করলাম তার পেছনে নির্ঘাত্ ছাপাখানার নির্ধারক প্রভাব রয়েছে। এসব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
ছাপাখানা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার তাগিদ ও চাহিদা মেটাতে গিয়ে ‘প্রমিত ভাষা’ তৈরি করেছে। সকলে যেন একই ভাষা বোঝে। ছাপাখানা আবিষ্কারের ফলেই এই ঘটনা ঘটে গিয়েছে তা নয়। এই ঘটনা ঘটার পেছনে আরেকটি শর্ত কাজ করেছে, সেটা হচ্ছে বাজারব্যবস্থার বিকাশ। বাজার মানুষের সঙ্গে মানুষের কথা বিনিময়ের তাগিদ ও প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। সংবাদপত্র যখন ছাপা হওয়া শুরু হলো, তখন তাদের পাঠক তৈরির জন্য এমন ভাষা চর্চা করতে হয়েছে যা স্থানীয় ভাষা না, বরং সকলে কমবেশি বুঝতে পারে এমন ভাষা। এটাই তথাকথিত ‘প্রমিত ভাষা’। স্থানের সঙ্গে সম্বন্ধকে যেমন একসময় আমরা স্বাভাবিক গণ্য করেছি, তেমনি এখন ছাপাখানার ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আমরা ক্রমে ক্রমে স্বাভাবিক কল্পনা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এতই অভ্যস্ত যে কল্পনা করি প্রমিত ভাষাই বুঝি আমার মাতৃভাষা। প্রমিত ভাষা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘মাতৃভাষা’ কিংবা স্থানীয় বা লোকায়ত ভাষাকে গৌণ করে ফেলে।
সাহিত্যের পাশাপাশি যে সাধারণ সংস্কৃতি, জীবনযাপন চর্চা, ভাবনাচিন্তা তৈরি হয় তার মধ্য দিয়ে জাতপাত শ্রেণী নারীপুরুষ ভেদসহ আরো অসংখ্য বিভেদ ও বিভাজন থাকে। তারপরও নিজেদের একই জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির অন্তর্গত কল্পনা করতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। জবরদস্ত কল্পনা ছাড়া এভাবে নিজেদের একই জাতির অন্তর্গত কল্পনা করা সহজ না। ভেদ ও বিভাজনের অতীত নিজেদের একই জাতির কল্পনা করার সামর্থ্য তৈরি একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার। ‘হিন্দু’ কিংবা তার অপর ‘মুসলমান’ এই বিচারপদ্ধতির দিক থেকে কোনো শাশ্বত বা চিরায়ত সত্তা বা পরিচয় নয়। ঐতিহাসিক নির্মাণ। বাঙালি ‘জাতি’ বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে উচ্চ বর্ণের হিন্দুর সম্পর্ক কিংবা উচ্চ বর্ণের হিন্দুর সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক শুধু এই ঐতিহাসিক অর্থে অবিচ্ছেদ্য ও অভিন্ন।
এই বিষয়গুলো আমরা এখন যত সহজে বুঝতে পারি ও বলতে পারি সেটা ষাট কিংবা সত্তরের দশকে বোঝা ও বলা ছিল কঠিন ব্যাপার। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সর্বগ্রাসী প্রভাব তার বড় একটি কারণ। দ্বিতীয়ত, ছাপাখানার ভূমিকা, মুদ্রিত সাহিত্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক ফল, পুঁজি ও বাজার ব্যবস্থার চরিত্র, বিনিময় ও ব্যবসার তাগিদ ও চাহিদা ইত্যাদি ক্ষেত্র আমলে নিয়ে সাহিত্য বোঝার মতো সক্ষমতা আমাদের ষাট, সত্তর কিংবা আশির দশকেও ছিল না। তারপরও ‘ভালো লিখতে হবে’ সংকল্পের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ যতটা ছিল, নিজেদের স্বতন্ত্র দাবি করবার যথেষ্ট যুক্তি আমাদের ছিল না।
তবুও পাকিস্তান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সাহিত্য তৈরির ট্র্যাজেডি টের পেতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। হিন্দু গবেষকদের উস্কানিমূলক ‘ইসলামি সাহিত্য’ নামক সাম্প্রদায়িক ধারণা, এমনকি দীনেশচন্দ্র সেনের মতো সদাশয় মহতের ‘মুসলমান সাহিত্য’ এবং তার প্রভূত প্রশংসা আমাদের আকৃষ্ট করেনি। আমরা বাংলা ভাষায় বাস করি এবং বাংলা সাহিত্যই করতে চেয়েছি। ফলে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক পরিণতি মেনে নিয়েই আমাদের অগ্রসর হতে হয়েছে। বাংলা সাহিত্য উচ্চ বর্ণের হিন্দুর বলে তার বিপরীতে আরেকটি মুসলমানি সাহিত্য চর্চা আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য বলে গণ্য করিনি। বরং বাংলা সাহিত্যকে দুই সম্প্রদায়ের জন্য আরো সর্বজনীন করার কাজটাকেই খুবই দরকারি কাজ বলে মনে হয়েছে।
তাহলে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে ‘ভালো লেখা’র অর্থ নিজেদের স্বতন্ত্র ইতিহাস মনে রেখে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের মধ্যেই স্থান করে নেয়ার সাধনা, যা বাংলা সাহিত্যকে আরো সমৃদ্ধ করবে। আমরা যে সমাজ, সম্প্রদায় ও ইতিহাসের অন্তর্গত তাকে বাংলা সাহিত্যের মধ্যেই আরো দৃশ্যমান করে তোলা। কেবল তখনই বাংলা সাহিত্য তার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারবে, এটা আমরা বিশ্বাস করেছি। সেটা মাথায় রেখেই সাহিত্যচর্চা করেছি। হয়তো ‘ভালো লেখা’ বলতে আমরা কে কী বুঝেছি সেখানে ফারাক রয়েছে। কিন্তু ‘ভালো লিখতে হবে’— এই সংকল্পের মধ্যে একটা ঐতিহাসিক বোধ ও আগামীর আনন্দ কাজ করেছে যা বাংলাভাষী হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, যোগী, ফকির, আস্তিক, নাস্তিক সকলকেই ধারণ করে। কেউই বাদ যায় না। এমন কি ফুটানি মার্কা ইংরেজি বোল দিয়ে আধাখেঁচড়া বাংলা, তাকেও আমরা অপাঙেক্তয় গণ্য করিনি। করি না। আমাদের কোনো ছুঁত্মার্গ ছিল না। এখনো নেই। ভালো লিখতে হবে এটা খুব বড় পরিসরে বিস্তারিত ও বৃহত্ অর্থে আমরা বুঝেছি।
চার
যদি ওপরের কথাগুলো আমরা বুঝে থাকি তাহলে হুমায়ূন ভালো লিখতে হবে কথাটিকে কীভাবে বুঝেছে ও বাস্তবায়ন করেছে তার ঐতিহাসিক তাত্পর্য আমরা বুঝতে পারব। হুমায়ূন ভালো লেখা বলতে বুঝেছে সহজভাবে লেখা। নিজের গল্প গুছিয়ে বলা, পাঠককে আচমকা স্তম্ভিত করা, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়, আমাদের ম্যানারিজম, বিচিত্র সব অভ্যাস ও গাঁজাখুরি চিন্তা বাস্তব ও ইহলৌকিক জীবনেও কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তার চেয়েও এই সকল বিচিত্র উপাদান দিয়ে পাঠককে তার গল্প বলার মধ্যে ধরে রাখা। হুমায়ূন এমন সব বিষয় বেছে নিতে পছন্দ করত। পশ্চিম বাংলার সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টাকে সে স্রেফ ‘মহত্ সাহিত্য’ রচনা মার্কা অবাস্তব চিন্তা দ্বারা দূষিত করেনি। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি, এখানে ছফার সঙ্গে তার পার্থক্য ছিল। সাহিত্যচর্চার বিষয়টা হুমায়ূন একান্তই তার পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হিসেবে বুঝেছে। ভালো লেখার প্রথম মানদণ্ড হচ্ছে পাঠক যা পড়বে এবং পয়সা দিয়ে কিনবে। তথাকথিত উচ্চমার্গের সাহিত্যের ধারেকাছেও হুমায়ূন ছিল না। বিপরীতে পাঠককে পড়াবার জন্য সাহিত্যচর্চা, এটাই ভালো লেখক হওয়ার পথ, বাংলাদেশের সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের এটাই প্রধান অবদান।
ছফার কথা তুলেছি হুমায়ূনের সঙ্গে ছফার পার্থক্য ধরিয়ে দেয়ার জন্য। ছফা লেখার মান নিয়ে চিন্তিত ছিল। হুমায়ূন কেন জনপ্রিয় উপন্যাস লিখে সময় অপচয় করছে, হুমায়ূনের ওপর এটাই ছিল ছফার প্রধান অভিযোগ। ছফার সেই অভিযোগ হুমায়ূন আহমদকে আরো বড় লেখক হিসেবে পাওয়ার আকুতি থেকে। ছফার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আমার কথাবার্তার বড় একটা দিক ছিল হুমায়ূনের জনপ্রিয় লেখার গুরুত্বের পক্ষে দাঁড়ানো।
দাবি করা হয়, হুমায়ূন যদি টেলিভিশনের উত্থানের যুগে জনপ্রিয় নাটক না লিখত তাহলে সে জনপ্রিয় সাহিত্যিক হতে পারত না। হতে পারে তবে সেটা গৌণ তর্ক। বাস্তবতা হলো হুমায়ূন আহমেদের লেখা পাঠক পয়সা দিয়ে কিনে পড়ে, টেলিভিশন দেখতে পয়সা লাগে না। এই ফারাক মনে রাখতে হবে। হুমায়ূনের এই শক্তিটুকু উপেক্ষা করার কোনো যুক্তি নেই। হুমায়ূনের লেখার সাহিত্যিক মূল্য কি, তার লেখা সমাজের চিন্তা-ভাবনা, সংস্কৃতি-রাজনীতিকে ভালো নাকি মন্দভাবে প্রভাবিত করেছে, সেই সকল আগডুম-বাগডুম তর্ক আমার বর্তমান আলোচনার বিষয় না। আমি সেখানে প্রবেশ করতে চাইছি না। প্রভাব তো ফেলেছে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তার ভালোমন্দ বিচার ভিন্ন একটি তর্ক। লেখক হিসেবে হুমায়ূনের সবচেয়ে বড় মহত্ দিক হলো সে সাফ সাফ বলত আমি টাকার জন্য লিখছি। তার কথার মধ্যে চর্বি বা মেদ ছিল না। ফলে যা এক্সোটিক বা বিষয়ের কারণেই চরম উত্তেজনা ও আগ্রহ তৈরি করে, সেই সকল বিষয়ের প্রতি হুমায়ূনের আগ্রহ ছিল বিপুল। তার শেষ সিনেমাতেও দেখলাম সিলেটের হাওর অঞ্চলে এককালে বৈষ্ণব আখড়াতে জন্ম হওয়া ঘেঁটুগান নিয়ে কাহিনী। কিশোর বালকদের মেয়ে সাজিয়ে বিত্তবানেরা নাচাত। একসময় তারা এই বালকদের যৌনসঙ্গী হিসেবে লালায়িত হতো। সেই ভাবেই তাদের নিজের কাছে রাখত। হুমায়ূনের নাটক বা সত্য বলতে কি বাংলাদেশের নাটক বা সিনেমা আমি খুব একটা দেখি না। সময়ের অভাব এক নম্বর। দ্বিতীয়ত, সিনেমার ফ্রেমকে নাটকের মঞ্চ জ্ঞান করে টেলিভিশনের নাটক বা ছবি বানানো, বেশ বিরক্তিকর বটে। নতুন মাধ্যমের ওপর পুরনো মাধ্যমের ভূত দেখা অপচয় মনে হয়। মঞ্চের নাটক আমিও মঞ্চেই দেখতে চাই। তারপরও বলা যায়, হুমায়ূন জনপ্রিয় নাটক কিংবা ছবি বানাতে পারে। ঘেঁটুপুত্র কমলা দারুণ একটি যাত্রার পালা হতে পারত। কিন্তু ক্যামেরা মাধ্যম হিসেবে যাত্রার চেয়ে শক্তিশালী। যাত্রার গল্পকে আমরা লেন্স দিয়ে বলতেই পারি, সেটা দেখতে খারাপ হবে তা না, কিন্তু পুরনো মাধ্যমগুলোকে আমরা লুপ্তপ্রায় করে তুলছি।
এই অঞ্চলে ছেলেদের মেয়ে হয়ে নাচা, কিংবা অভিনয় করা নতুন কিছু না। শ্রীচৈতন্য মেয়ে হতে চেয়েছেন, এর পেছনে নদিয়ার ভাবুকতার রেশ রয়েছে। যাত্রা বা পালা গানে ‘ছুকরি’ শুধু অশ্লীলতার জন্য নয়, ছেলেকে মেয়ে হয়ে সাধনার চর্চা বাংলাদেশের সাধনার ধারার অনেক গভীর ইতিহাসের ব্যাপার। বৈষ্ণব আখড়ায় যে কিশোরদের মেয়ে সাজিয়ে গান গাইবার রীতির কথা হুমায়ূন বলছে সেটা বাংলার অন্তর্গত ভাবের বিষয়। চৈতন্যের অনুসারীদের মধ্যে এটা থাকবারই কথা। ফলে বৈষ্ণবদের আখড়ায় ঘেঁটুগানের উদ্ভবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এ বিষয়ে হুমায়ূনের যথেষ্ট জানাশোনা ছিল, সেটা ছবি দেখে মনে হয়নি। ফলে বিত্তবানরা কীভাবে কিশোর বালকদের যৌনসঙ্গী করার সংস্কৃতি চালু করেছে সেই এক্সোটিক বা উত্তেজক দিকের প্রতি তার মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল। কিন্তু যথারীতি হুমায়ূন তার নিজের গল্পটা ঠিকই বলতে পেরেছে। ছবিটি দর্শক সফল হয়েছে আশা করা যায়।
শেষে একটা সাবধানী কথা বলে শেষ করতে চাই। ভালো লেখা বলতে হুমায়ূন বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসের একটা বিশেষ পর্যায়ে যা বুঝেছে তার উপযোগিতা চিরকালীন নয়। পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারা এবং পাঠককে নিজের গল্প পড়ানো বড় গুণ, কিন্তু সাহিত্যের বিচার শুধু পাঠকপ্রিয়তা দিয়ে ঠিক হয় না। হুমায়ূনের লেখালেখি ও অন্যান্য কাজ নিয়ে ভাবনার আরো অনেক জরুরি বিষয় আছে। হুমায়ূনের জনপ্রিয় লেখালেখি একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষাকে সামনে নিয়ে আসে এবং বিদ্যমান আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে নতুনভাবে দর কষাকষির শর্ত তৈরি করে। হুমায়ূনের এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও সামগ্রিক সমৃদ্ধির বিচারে হুয়ায়ূনের স্থান কোথায় হবে সেটা আমার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তিরা বিচার করে দেখবেন। বাংলাদেশের সাহিত্যের বিপুল পাঠকশ্রেণী তৈরি করা এবং ওর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ভাষা, সংকল্প, ইচ্ছা, বাসনা সকল বাংলাভাষীকে জানাবার শর্ত তৈরি করা বড় কাজ বলেই আমি মনে করি। ইতিহাসের অস্বস্তিকর নির্মাণগুলো ভাঙবার ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বেশ কয়েক কদম এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। যদি আমরা এখন ‘ভালো লেখা’র ধারণা নতুন করে আবার বিচার করার হিম্মত অর্জন করি, যেহেতু বাংলাদেশ তার নিজের পাঠকশ্রেণী মোটামুটি তৈরি করে ফেলতে পেরেছে, তাহলে হুমায়ূন আহমেদকে সকাল-বিকাল সালাম জানিয়ে তরুণরা লিখবেন। হয়তো তাদের লেখা কম পাঠকই পড়বে, কিন্তু এবার উদ্দেশ্য পাঠকপ্রিয়তা নয়, সাহিত্যের ধারণাকে বদলে দেয়া।
নতুন কিছু করা, বাংলাদেশ সম্ভবত যে কাজ করার জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছে।
৮ নভেম্বর ২০১৬। ২৪ কার্তিক ১৪২৩। শ্যামলী।
লেখক: কবি ও দার্শনিক





