সৈয়দ মুজতবা আলীর পরিচয় নিয়ে এক আলো-আঁধারির খেলা চলে। সিলেটি বা সিলেটি বাঙালি, আবার ভারতীয়, আবার একদিক দিয়ে ভারতীয় হয়েও কোথায় যেন বাংলাদেশী। এই কথায় কোনো ধরনের তর্ক উত্থাপনের ঝোঁক চেপে নেই। অতি অল্প বয়সে সিলেট থেকে শান্তিনিকেতনে যাওয়া আবার পাকিস্তান পর্বে হপ্তাখানেকের মধ্যে ফেরা আবার ভারতেই চলে যাওয়া কিংবা সেখানেও এক সময়ে হেনেস্তার মুখোমুখি হওয়া— এই সবই আমাদের জানা আছে। আজীবন যাযাবর। দেশ-বিদেশে যাঁর প্রথম রচনা, জীবনটাই কাটল প্রায় সেই দেশে আবার দেশে থেকেও বিদেশে। এক আওয়ারা মুসাফিরের চলন। ব্যক্তির এই পরিচয়-অপরিচয়ের কথা না তুললেও চলত, এই মুহূর্তে তা কেন যেন অপ্রয়োজনীয়। কিংবা বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ লেখক হিসেবে মুজতবা আলীর পরিচয় নিয়ে কিছু ধন্দ কিন্তু কোনোভাবেই পাঠক হিসেবে আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না। যেমন— অসাধারণ ভালো ছাত্র আর বহুভাষাবিদ হিসেবে যে মুজতবা আলী আমাদের বিদ্যায়তনিক জগতে পরিচিত, তার সঙ্গে প্রায় একই পঙিক্ততে রম্য কি রসসাহিত্যিক মুজতবা আলীকে এক টানে মেলানো যায় না। কিন্তু তিনি মিলে যান। যেভাবে এমন কাহিনীকার, ছোটগল্প লেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, তাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, কলাম লেখক সর্বোপরি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈঠকি গদ্যের কারিগর। আর ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে অথবা সেই হিসাবকে একেবারেই তোয়াক্কা না করেই কাজের বিবিধ বহুভাষামুখী-ব্যবহারের যে অদৃষ্টপূর্ব নিদর্শন বাংলা ভাষায় সৈয়দ মুজতবা রেখেছেন, তার অনেকাংশই মনে রাখার প্রয়োজনও পড়ে না। কিংবা রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ার সম্পর্কে তার কখনো কখনো অতি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।

কিন্তু এই আলোচনার জায়গায় তো সৈয়দ মুজতবা আলী নয়, তাঁকে নিয়ে কিংবদন্তির অভাব নেই। স্মৃতিশক্তিতে তিনি প্রখ্যাত ইতিহাসবিদকেও প্রায় পিলে চমকে দিতে পারতেন কিংবা শব্দের উত্স ধরে জন-ইতিহাস কথন ইত্যাদি প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে সৈয়দ মুজতবা নিয়ে যাওয়াই যায়। বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে তাই তাঁর পরিচয়ের ‘অপরিচয়’ ইত্যাদি আরো বহুকাল একই রকম থাকবে। সে মান্যতা কোনো প্রকার অনুমানের ওপর নির্ভরশীলও নয়।

অথচ তাঁর ‘পাদটীকা’র মতন ছোটগল্পকে যদি ছোটগল্পের সাহিত্যিক বিচারের স্বাভাবিক মানদণ্ডকে পাশে সরিয়ে রেখে পড়ি, তাহলেও সেখানে বাংলা তথা ভারতীয় ভূখণ্ডের ইতিহাস ও সেই ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার ঔপনিবেশিকতা এবং একই সঙ্গে শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবনারও প্রয়োজন পড়ে না। পাশাপাশি ‘পদটীকা’র পণ্ডিত মশাই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে আজ পর্যন্ত সকল পর্বের এই দেশের শিক্ষক ও এর সঙ্গে শাসক-প্রশাসক শ্রেণীর তুলনামূলক অর্থনৈতিক বোমা পড়াতেও সঙ্গে নিয়ে চলেন।

সৈয়দ মুজতবা আলী এই গল্পের শুরুতেই লিখেছেন: ‘গত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি, ইংরেজ রাজত্বে সেটা প্রায় আমাদেরই চোখের সামনে ঘটল। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে দেশের কর্তাব্যক্তিরা ছেলে-ভাইপোকে টোলে না পাঠিয়ে ইংরেজি স্কুলে পাঠাতে আরম্ভ করলেন। চতুর্দিকে ইংরেজি শিক্ষার জয়-জয়কার পড়ে গেল— সেই ডামাডোলে বিস্তর টোল মরল, আর বিস্তর কাব্যতীর্থ বেদান্তবাগীশ না খেয়ে মারা গেলেন।’

এই দিয়ে পাদটীকা গল্পের শুরু। এখানে ইংরেজি শিক্ষা কি আর একটু মোটাদাগে ভারতবর্ষে ক্লাইভি শাসন আর এর প্রভাবের কথা জানানো যেন খানিকটা ইতিহাসকে দেগে দেয়া, তা যে একটি গল্পেরই অংশ সেই কথা তখন মনে নাও হতে পারে, কিন্তু এই গল্প যখন শেষ তখন এই শুরুর বাক্যগুলো একেবারে দেগে বসে যায় গল্পের গায়ে। কিন্তু এই বাক্যগুলোর সঙ্গে কোনো নাগরিক জীবনে শিক্ষার ইতিহাসের সঙ্গেও কোনো তফাত পাওয়া যায় না। যেমন— রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কমলকুমার, কলকাতা পিছুটানের ইতিহাস’ বইয়ে যখন হঠাত্ পড়ে নেয়া যায়: ‘উনিশ শতকের শেষ পাদে পশ্চিমিকরণের সবচেয়ে জবরদস্ত হাতিয়ার হয়ে ওঠে শিক্ষা, টুলো পণ্ডিত, ভাটপাড়ার স্মৃতিতীর্থ, ন্যায়তীর্থদের দিন শেষ। বিদ্যা, বিদ্বান এই সব পালটে যাচ্ছে। শিক্ষা, শিক্ষিত এসে গেল বদলি শব্দ হিসেবে। পশ্চিমি শিক্ষায় বিদেশের নিজেদের তারা অভ্যস্ত করতে পেরেছে, পশ্চিমের শিক্ষায় রীতি পদ্ধতি রপ্ত করেছে, এবং সে-সব কাজে লাগাতে সক্ষম তারাই শিক্ষিত। বিদ্যার ভারতীয় ঐতিহ্য, রীতি পদ্ধতি নব্য শিক্ষিত জানে না, তারা যে সে সভ্যতার গুণাবলী অর্জন করতে পারল এমন নয়। আসলের এক নকল পাওয়া গেল। অনুরণের কাজটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করাই তার প্রধান চেষ্টা।’ উদ্ধৃতিটা খানিক দীর্ঘই হয়ে গেল। এ তো জানা কথা ভারতীয়দের দক্ষ-সভা করার সাধু সংকল্পে ইংরেজ প্রশাসকরা প্রায় মধ্য উনিশ শতকে টমাস মেকেলের নেতৃত্বে ওই আবহের ‘শুভ’ সূচনা করেন।

মুজতবা আলীর গল্পের বিষয় অবশ্য এত দূর ঘুরে না-দেখলেও চলে। এই গল্প ব্যক্তিগত, ব্যক্তিগত থেকে সামষ্টিক। চাইলে কিশোর-পাঠ গল্প হিসেবেও চালিয়ে দেয়া যায়। (মনে পড়ে, ‘পাদটীকা’র একটি অংশ পণ্ডিত মশাই নামে আমাদের নিম্ন মধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্য ছিল)। সিলেটের সরকারি বিদ্যালয়ে পণ্ডিত সবাইকে নিয়ে এই গল্প। উত্তম পুরুষে বলা। যে কিশোরের জবানে গল্পটা বলা হচ্ছে, তাঁকে সৈয়দ মুজতবা আলী ভাবতেও কোনো দ্বিধা নেই। সেই কিশোর গল্পের শুরুতে ওই টুকুই ভাবীকালের সৈয়দ মুজতবার বর্ণনায় বলে এরপর সরাসরি এক কিশোরের চোখেই গল্পটা জানাচ্ছেন। ইংরেজি বিদ্যার দাপটে কাব্যতীর্থ আর বেদান্তবাগীশ না-খেয়ে মারা যাওয়ার দ্বিতীয় কি তৃতীয় পর্যায়ে তাদের পণ্ডিত মশাই, ‘এবং তার চেয়েও হূদয়বিদারক হলো তাঁদের অবস্থা, যাঁরা কোনো গতিকে সংস্কৃত বা বাংলার শিক্ষক হয়ে হাই স্কুলগুলোতে স্থান পেলেন।’ এই পণ্ডিত মশায়ের ‘বাঙলা ভাষার প্রতি ছিল অবিচল, অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা— ঘৃণা বললেও হয়ত বাড়িয়ে বলা হয় না। বাঙলাতে যেটুকু খাঁটি সংস্কৃত বস্তু আছে তিনি মাত্র সেটুকু পড়াতে রাজী হতেন— অর্থাত্ কৃত্, তদ্ধিত্, সন্ধি এবং সমাস। তাও বাঙলা সমাস না।’ আর এই স্কুলে তিনি আসলে একজন ‘পার্ট টাইম বাংলা ব্যাকরণ শিক্ষক। হেডমাস্টার এক সময়ে তাঁর ছাত্র ছিলেন, এবং তিনি যে তাঁর ছাত্র হিসেবে তেমন ভালো ছিলেন না, এ কথাও কখনো কখনো তাঁর এখনকার ছাত্রদের জানাতে ভুলতেন না। আর এই গল্পের কথক সৈয়দ মুজতবাকে তিনি একটু বেশি স্নেহ করতেন। তার কারণ, ‘বিদ্যাসাগরী বাঙলা লেখা ছিল আমার বাই; ঐ ‘দোলা-লাগা, পাখি-দাগা’ই আমার বর্ণাশ্রম ধর্ম পালনে একমাত্র গো-মাংস ভক্ষণ। পণ্ডিত সবাই যে আমাকে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন তার প্রমাণ তিনি দিতেন আমার উপর নানা প্রকার কটুকাটব্য বর্ষণ করে। ‘অনার্য’ ‘শাখা-মৃগ; ‘দ্রাবিড়-সম্ভূত’ কথাগুলো ব্যবহার না করে তিনি আমাকে সাধারণত সম্বোধন করতেন না। তা ছাড়া এমন সব অশ্লীল কথা বলতেন যে তার সঙ্গে তুলনা দেবার মত জিনিশ তুমি দেশ-বিদেশে কোথাও শুননি।’

এটা পণ্ডিত মশায়ের প্রতি লেখকের এখন পর্যন্ত শ্রদ্ধারই নিদর্শন। তিনি মনে করতেন তার এই ছাত্রটি লেখক হবে। সৈয়দ মুজতবাও এই প্রায় পৃষ্ঠা দুয়েক এই সব কথা জানিয়ে তারপর এক অতীতচারিতার ভিতরে দিয়ে যেন মূল গল্পে এলেন:

বহু বত্সর হয়ে গিয়েছে, সেই ইস্কুলের সামনে সুমা নদী দিয়ে অনেক কাল বয়ে গিয়েছে কিন্তু আজো যখন তার কথা ব্যাকরণ সম্পর্কে মনে পড়ে তখন তার যে ছবিটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটি তার জাগ্রত অবস্থা নয়, সে ছবিতে দেখি, টেবিলের উপর দুপা তোলা, মাথা একদিকে ঝুলে-পড়া, টিকিতে দোলা লাগা কাষ্টাসন শবশয্যায় শায়িত ভারতীয় ঐতিহ্যের শেষ কুমার ভীষ্মদেব কিন্তু ছি:, আবার দোলা লাগা সমাস ব্যবহার করে পণ্ডিত মশায়ের প্রেতাত্মাকে ব্যথিত করি কেন?

এই জায়গা থেকে গল্পের শুরু। আসামের চিফ-কমিশনার এনডি বিটসন বেল আসবেন এই স্কুল পরিদর্শনে। তিনি তার নামটি বাংলায় বলতেন নন্দদুলাল বাজায় ঘণ্টা। তাদের ক্লাসের জ্যেষ্ঠ ছেলে পদ্মলোচন, তার ভগ্নিপতি বেল সায়েবের ট্রুর ক্লার্ক। ফলে, পদ্মলোচনের খবর পাকা। পরিদর্শনের দিকে পণ্ডিত মশাই একটা হলদে রঙের গেঞ্জি গায়ে দিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ পরে কোটি ক্লসের টেবিলের উপর খুলে রাখলেন। কারণ ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো বস্ত্র গায়ে দেয়ার অভ্যাস পণ্ডিত মশায়ের ছিল না, সেটি শাস্ত্রসম্মতও নয়। কথক তাকে নিশ্চিন্ত করলেন, লাট সাহেব ই ক্লাসের দিকে আসলে তাঁকে জানাবেন, তখন তিনি আবার গায়ে পরে নেবেন।

‘লাট সায়েব এলেন। সঙ্গে ডেপুটি কমিশনার, ডাইরেক্টর, ইনসপেক্টর, হেডমাস্টার, শিক্ষক। আর লাট সায়েবের এডিসি ফেডিসি না কি সব বারান্দায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। (নিত্যানন্দ হেড মাস্টারের চাপরাশি।) লাট সায়েব বললেন ‘হ্যালো পানডিট’। তারপর ছাত্রদের হেডমাস্টার ‘বিহঙ্গ’ শব্দের তত্ত্বানুসন্ধান করতে বললেন। এইসব স্বাভাবিক পরিস্থিতি সাধারণ বর্ণনা সারা গল্পে। এরপর মুজতবা ধীরে ধীরে কখনো গম্ভীর হন যেন, আবার কখনো একই কৌতুকপূর্ণ:

লাট সায়েব ততক্ষণ হেডমাষ্টারের সঙ্গে ‘পণ্ডিত’ শব্দের মূল নিয়ে ইংরেজিতে আলোচনা জুড়ে দিয়েছেন। হেডমাষ্টার কি বলেছিলেন জানিনে তবে রবীন্দ্রনাথ নাকি পণ্ডিতদের ধর্মে জড়শীলতার প্রতি বিদ্রূপ করে বলেছেন, যার সবকিছু পণ্ড হয়ে গিয়েছে সেই পণ্ডিত।

ইংরেজ শাসনের ফলে আমাদের পণ্ডিতদের সর্বনাশ, সর্বস্ব পণ্ডের ইতিহাস হয়তো রবীন্দ্রনাথ জানতেন না,  না হলে ব্যঙ্গ করার পূর্বে হয়তো একটু ভেবে দেখতেন।

সে কথা যাক। লাট সায়েব চলে গিয়েছেন, যাবার পূর্বে পণ্ডিত মশায়ের দিকে একখানা মোলায়েম নড্ করাতে তিনি গর্বে চৌচির হয়ে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। আনন্দের আতিশয্যে নূতন গেঞ্জির চুলকানির কথা পর্যন্ত ভুলে গিয়েছেন। আমরা দু’তিনবার স্মরণ করিয়ে দেবার পর গেঞ্জিটা তাঁর শ্রী অঙ্গ থেকে ডিগ্রেডেড হলো।

আসলে, এখন পর্যন্ত যেন আমরা এই গল্পটাকে বুঝে নেয়ার সেই আত্ম আবিষ্কার নিয়ে যাবে যা একজন পাঠকের জন্যে চিরকালীন। সৈয়দ মুজতবা আলীও যেন এবার সংক্ষেপে গল্পের অন্তিমে পৌঁছাতে চান। যখন লাট সায়েবের আগমনের কারণে তিন দিন ছুটির পরে আবার বাংলা ক্লাস বসেছে। আর আজ পণ্ডিত বললেন একেবারে নতুন কথা। বাংলা ক্লাসের ছাত্রদের কাছে অংক জিজ্ঞাসা করলেন। তারও প্রেক্ষাপট জানিয়েছেন লেখক। সেটুকু পড়ে নেওয়া যাবে। আপাতত গল্পের একেবারে শেষের আগেই এই:

পণ্ডিত মশায় বললেন, ‘লোকটার সঙ্গে কথাবার্তা হল। লাট সায়েবের সব খবর জানে, তোর মত কানা নয়, সব জিনিস দেখে, সব কথা মনে রাখে। লাট সায়েবের কুকুরটার একটা ঠ্যাং কি করে ট্রেনের চাকায় কাটা যায় সে-খবরটাও বেশ গুছিয়ে বলল।’