বিশ্বের প্রথম স্টিম রেল ইঞ্জিন তৈরি হয় ইংল্যান্ডের স্টকটন শহরে। জর্জ স্টিফেনসন ও তার ছেলে রবার্ট স্টিফেনসনের এক যুগান্তকারী প্রচেষ্টায় ১৮২৫ সালে আবিষ্কৃত হয় বিশ্বের প্রথম ট্রেন। সে বছরই স্টকটন থেকে ডার্লিংটন পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মিত হয় এবং ট্রেন চলতে শুরু করে। একপর্যায়ে মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে রেলপথ পৃথিবীতে যুক্ত করে নতুন মাত্রা। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে রেল লাইন স্থাপন শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সংযোজন বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত নবনির্মিত ১০০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ।
এ রেলপথের সৌন্দর্য সাধারণ রুটের চেয়ে কিছুটা আলাদা। চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে সংরক্ষিত ও দুর্গম বনাঞ্চল হয়ে এটি গিয়ে মিশেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। পাহাড় ও পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বছরজুড়ে পর্যটকরা চট্টগ্রামে ছুটে আসেন। এখন চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে নতুন রেলপথ হওয়ায় যাত্রীরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অপরূপ বৃক্ষরাজি থেকে শুরু করে বন্য হাতির পালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায় কক্সবাজারে পৌঁছাবেন। এক রোমাঞ্চকর যাত্রার স্বাদ পাবেন যাত্রীরা। যাত্রাপথে প্রাণ-প্রকৃতি আর পরিবেশের অপূর্ব মেলবন্ধন মুগ্ধ করবে তাদের। স্মৃতিপটে দাগ কাটবে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক আর বিস্তৃত সবুজ অরণ্যের হাতছানি। এতদিন শুধু লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় এমন মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতেন সিলেটগামী যাত্রীরা।
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রুটে সংরক্ষিত বনাঞ্চল চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (১৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার), ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (১০ দশমিক ৩০ কিলোমিটার) এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় পার্কের (দশমিক ৯ কিলোমিটার) প্রায় ২৭ কিলোমিটার বনাঞ্চল। এ জঙ্গলে যাত্রাপথে যাত্রীরা উপভোগ করতে পারবেন গহিন বনের দুর্লভ বৃক্ষরাজির সারি সারি অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে নদী ও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য। হিমশীতল বাতাসের পাশাপাশি দেখা হয়ে যেতে পারে বন্যহাতির পালের সঙ্গে। চোখ আটকে যেতে পারে অজানা-অদেখা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর অপরূপ সৌন্দর্যে।
দৃষ্টিনন্দন এ রুটকে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলতে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে চমৎকার নয়টি স্টেশন। এর মধ্যে কক্সবাজারের ঝিনুক আকৃতির স্টেশনটিকে দেখা হচ্ছে দেশের প্রথম নান্দনিকতায় ভরপুর এক আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে।
ছয়তলাবিশিষ্ট স্টেশনটিতে পর্যটকদের জন্য লিফট, এস্কেলেটর, শপিং মল থেকে শুরু করে স্বল্প খরচে আবাসনের সুবিধাও রাখা হয়েছে। কক্সবাজার ও টেকনাফের প্রতি বরাবরই একটি বাড়তি আকর্ষণ থাকে ভ্রমণপিপাসুদের। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল অর্থনৈতিক দিক থেকেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ক্লান্তিকর সড়কপথের যাত্রার বিকল্প হিসেবে নিয়মিত যাতায়াতকারী এবং দূর-দূরান্তের পর্যটকদের কাছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল রুটটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ রেলপথকে ঘিরে নতুন করে আবারো আলোচনায় চলে আসছে কক্সবাজারের পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা।
রেল ভ্রমণ আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় করে তুলতে এবং চলার পথে যাত্রীরা যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন সেজন্য ট্যুরিস্ট ট্রেনেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ বিশেষ ট্রেনের বগিগুলোতে সাধারণ ট্রেনের চেয়ে অর্ধেকেরও কম আসন থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটন শহরে এমন ট্রেনের ব্যবস্থা আছে। তবে এগুলোর ভাড়া কিছুটা বেশি হবে। যাত্রাপথে গান-বাজনা থেকে শুরু করে খাবারের সুবিধা থাকবে। নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিদিন সকাল ও বিকালে ঢাকা থেকে দুটি ট্রেন এবং সকাল ও রাতে কক্সবাজার থেকে দুটি ট্রেন চলাচল করবে। ৫৪টি কোচের মধ্যে ২০ শতাংশ কোচ স্পেয়ার হিসেবে যাত্রাপথের উভয় প্রান্তে মজুদ রাখা হবে। প্রকল্পের অধীনে থাকবে ছয়টি মিটার গেজ ট্যুরিস্ট কোচ, ২২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কার, সাতটি পাওয়ার কার এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডাইনিং কার ও গার্ড ব্রেক। দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও অনেকে কক্সবাজার ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশে আসেন। নিজ নিজ দেশ থেকে প্রথমে রাজধানী ঢাকায় আসতে হয় তাদের। কিন্তু বিদ্যমান যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সড়কপথে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ভ্রমণ করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। রেলওয়ের প্রস্তাবিত ট্যুরিস্ট কার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রেলের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ৫৫০টির মতো হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। কক্সবাজারে একসঙ্গে প্রায় তিন লাখ পর্যটক অবস্থান করতে পারে। দেশের সর্ববৃহৎ এ পর্যটন বাণিজ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে অন্তত এক লাখ মানুষ। নতুন রেলপথ চালু হওয়ার মাধ্যমে কক্সবাজারের পর্যটক সংখ্যা শুরুতে ১০ শতাংশ, পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে আরো বাড়বে। ফলে অঞ্চলটির পর্যটন শিল্পের আরো বিকাশ ঘটবে।
আগে রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে কক্সবাজার পৌঁছতে সময় লাগত অন্তত ১০ ঘণ্টা। ট্রেন সার্ভিস চালুর মাধ্যমে এ পথের সময় কমে শুরুতে ৮ ঘণ্টায় নেমে আসবে। পর্যায়ক্রমে সেটি আরো কমে ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনবে রেলওয়ে। যাত্রার সময় কমে যাওয়া, তুলনামূলক কম ভাড়ার পাশাপাশি নিরাপদ বাহন ট্রেনের কারণে কক্সবাজার দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নতুন করে আকর্ষণ করবে।
ট্রেন সার্ভিস চালুর ফলে পর্যটকরা কক্সবাজারে ট্রেনে করে সকালে গিয়ে রাতের ট্রেনে ফিরে আসতে পারবেন। কক্সবাজারের গতানুগতিক পর্যটন পরিষেবার বিপরীতে রেল যোগাযোগ নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে এ খাতে। এছাড়া কক্সবাজার জেলায় গড়ে ওঠা সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক, সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, টেকনাফে নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পর্যটন আরো সমৃদ্ধ হবে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রাহাত আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, কক্সবাজারে বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকতের অবস্থান। এ সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্যের টানে প্রতি বছর পর্যটকরা ছোটে কক্সবাজারে। তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে হোটেল-মোটেল গড়ে তোলা হয়েছে। কক্সবাজারের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক ও আকাশপথে যোগাযোগ থাকলেও রেলপথের সংযোগ ছিল না। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফসল হিসেবে কক্সবাজারের সঙ্গে এখন সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। রেল যোগাযোগের মাধ্যমে পর্যটকরা এখন কম খরচে এখানে যাওয়া-আসা করতে পারবেন। ফলে পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়লে আবাসন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। কক্সবাজারে এখন পর্যটন করপোরেশনের শৈবাল, প্রবাল, উপল ও লাবণী এ চারটি মোটেল আছে। এ মোটেলগুলো সংস্কার করে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা আছে। এছাড়া অদূরভবিষ্যতে নতুন করে সরকারিভাবে আবাসস্থল হিসেবে স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হবে। কক্সবাজারকে ঘিরে দেশের পর্যটন খাতের ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।





