চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কপথে বাসে গেলে সময় লাগে ৫ ঘণ্টার মতো। চট্টগ্রামের দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে সে সময় অর্ধেকে নেমে আসবে। সেই সঙ্গে পর্যটনসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসবে বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এ রেলপথ আবার মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত যাবে, যা ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ হিসেবে কাজ করবে। এর মধ্যে দিয়ে তুরস্ক ও সিঙ্গাপুর থেকে যে ট্রান্স-এশিয়ান যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা, তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও কানেক্টিভিটির মাধ্যমে তৈরি হবে বড় সুযোগ। আবার লজিস্টিক হাব হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে রূপান্তরের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে মাতারবাড়ীতে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন। এমন পরিকল্পনার জন্য একটি টেকসই সড়ক অবকাঠামোর পাশাপাশি রেলওয়ে সংযোগকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা। 

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ভবিষ্যতে যুক্ত করা হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে। আর এটি চালু হলে বাণিজ্যিকভাবে হবে আঞ্চলিক হাব বন্দর। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের পর প্যারালাল অর্থনীতির লাইফলাইনও হবে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিভিন্ন বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হিসেবেও মাতারবাড়ীকে ব্যবহার করা যাবে। নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরটিকে ঘিরে এরই মধ্যে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। যেমন নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় রফতানির জন্য জাপান তাদের পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ কারণে গভীর সমুদ্র্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহে সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন চায় দেশটি।

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে ঢাকার আইসিডিতে পণ্য পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করতেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের চকরিয়া অংশ থেকে ২৬ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন মাতারবাড়ীতে পণ্য পরিবহনে রেললাইন যুক্ত হলে পাল্টে যাবে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চিত্রও। রাজস্ব আদায় বাড়বে তখন বহুগুণ।

বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলী হুসাইন বলেন, ‘আমরা সবসময় বলি, যেকোনো প্রকল্পের সঙ্গে কানেক্টিং ডেভেলপ করাটা সবচেয়ে জরুরি। বিশেষ করে রোড ও রেলে সবসময়ই ফোকাস করা উচিত। ট্রেন যদি গতিসম্পন্ন হয় ভাড়া বেশি হলেও মানুষ চলাচল করতে চাইবে। কেননা এটা একটা নিরাপদ বাহন। বিমানে সময় কম লাগলেও অনেক আগে এয়ারপোর্টে যাওয়া, এত নিয়মকানুন আবার ডিলেও আছে। যে দেশে ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি ভালো, যা সরাসরি অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভালো প্রভাব তৈরি করে। কক্সবাজারে আসা রেলপথ ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে সংযোগ হলে ব্যবসায়ীরা এবং ভোক্তা পর্যায়েও নিশ্চয়ই সুফল মিলবে।’

আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি বন্দর ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে সড়কের পাশাপাশি রেলসহ অন্যান্য যোগাযোগও গড়ে তুলতে হয়। বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়াও সাশ্রয় হয় পরিবহন ব্যয়ও। রফতানিতে দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান ফোর এইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাওহার সিরাজ জামিল বলেন, ‘কক্সবাজারের সঙ্গে রেল সংযোগের কারণে পর্যটনে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। আবার মাতারবাড়ীতে যেহেতু গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেখানেও নিশ্চয়ই এ রেল যুক্ত হবে। বন্দরটি ব্যবহার শুরু হলে মূলত রফতানিতে লিড টাইমের ক্ষেত্রে স্বস্তি আসবে। আমরা যদি এক্সপোর্টটা বিবেচনায় নিই, দেখা যাবে ইউরোপে যেতে লাগবে ১৫ দিন, যেখানে এখন লাগে ২০ দিনের মতো। আর যুক্তরাষ্ট্রে যদি ৩৫ দিন সময় লাগে, সেক্ষেত্রেও ২৫ দিনে নেমে আসতে পারে। আবার কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে যেহেতু চীন থেকেই মূলত বেশি আসে। সেখান থেকেও ২০-২২ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য চলে আসবে। আবার ইন্ডিয়া থেকে এখন ১৮ দিন লাগলে সেটি আমরা ১০ দিনের মধ্যে পেয়ে যাব।’

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতটি কক্সবাজারে। দেশের ভেতরে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে এরই মধ্যে রেল সংযোগ হয়ে গেছে। এখন অফ সিজনেও আসবে পর্যটক। আবার দূরপ্রাচ্যর সঙ্গে অর্থাৎ জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো উন্নত অঞ্চলগুলো ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে কানেক্টিভিটি তৈরি হবে। এজন্য বিশেষভাবে শিল্পায়নের দিকে জোর দিতে চান ব্যবসায়ীরা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটা বড় ধরনের শিল্পায়নের সুযোগও তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সড়ক ও রেল পাশাপাশি থাকার কৌশলগত অনেক বিষয় থাকে। যেহেতু মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে আগামীর একটা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রফতানিকে লক্ষ্য করে বিদেশী বিনিয়োগ—এ সবকিছু বিবেচনায় নিলে কক্সবাজার সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক হাব হবে। চট্টগ্রাম শহরের আনোয়ারা থেকে শুরু করে মহেশখালী পর্যন্ত পুরো বেল্টটাতেই একটা বিশাল সম্ভবাবনা তৈরি হয়েছে।’

পদ্মা সেতু যেভাবে দেশের মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাণচঞ্চল করেছে, সেভাবে কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসায় গোটা দেশের শিল্প অর্থনীতিকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এতে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি বদলে দেবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ঘিরে একসময় ছিল চিংড়ির রেণু পোনা উৎপাদনের বড় বাণিজ্য। যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতির কারণে সেটিও ধসের পথে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা ও কক্সবাজারের আটটি উপজেলার প্রধানতম কৃষিজ পণ্য লবণ ও মৎস্য আহরণ। লবণ উৎপাদনের মাঠ কিংবা স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনও ছিল কক্সবাজারের অন্যতম বাণিজ্য। তাছাড়া দেশের বৃহৎ সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনসহ সমুদ্র সৈকতকেন্দ্রিক বাণিজ্যই ছিল এখানকার মানুষের রুটি-রুজির অন্যতম মাধ্যম। সারা দেশের রেলপথের সঙ্গে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম যুক্ত হওয়ায় বিদ্যমান অর্থনেতিক পরিমণ্ডলের উল্লম্ফন ছাড়াও এ অঞ্চলে শিল্প অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে।

আবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও দোহাজারী কৃষির জন্য উর্বর অঞ্চল। এখানকার সবজি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চাহিদা মেটায়। যদিও অপর্যাপ্ত সড়ক অবকাঠামোর কারণে এখানকার কৃষিপণ্য যথাসময়ে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে পারে না। নতুন রেলপথ নির্মাণ হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষিপণ্য এখন সহজেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমলে দেশের শিল্প অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কক্সাবাজারের নতুন এ রেল নেটওয়ার্ক।


মো. নূরুল ইসলাম সুজন

মন্ত্রী, রেলপথ মন্ত্রণালয়

যে দেশ যতটা উন্নত সে দেশের রেলপথও ততটা সমৃদ্ধ। তাই আমাদের দেশকে যদি টেকসই উন্নয়নে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই। উন্নয়নের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ভারসাম্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় পরিকল্পনা নিয়েছেন। শুধু রেলপথ নয়; দেশের নৌপথ, সড়কপথ কিংবা বিমানপথের যোগাযোগ ব্যবস্থাও যাতে ভারসাম্যপূর্ণ হয়, সেসব বিষয়ে তার পরিকল্পনামাফিক নির্দেশনায় দেশব্যাপী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ চলছে। আমাদের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিভিন্নভাবে পিছিয়ে ছিল। সে রেলপথকে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের যে ১০টি অগ্রাধিকার প্রকল্প ছিল তার মধ্যে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, ঢাকার পদ্মা সেতুর রেল লিংক প্রকল্প এবং খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত প্রকল্পগুলো আছে। এসব প্রকল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ রেলের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রেলপথ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেল যুক্ত হলে দেশের অর্থনীতির দৃশ্যপটই পরিবর্তন হয়ে যাবে। এছাড়া আমাদের যাত্রী ও পর্যটন পরিবহন এবং ভবিষ্যতে মালপত্র পরিবহনসহ সব দিক থেকেই এ রেলপথ দেশের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ সংযোগ দেশের জিডিপিতে সার্বিকভাবে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।



ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন

সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম-১

কক্সবাজারে পর্যটন আজ যেমন জনপ্রিয়, স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে কিংবা তারও পর কিন্তু এমনটা ছিল না। এখানকার পর্যটন শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমার বাবা এস রহমান এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরের মোটেল সৈকত পরিচালনায়ও যুক্ত হন। মূলত মোটেল সৈকত পরিচালনা করতে গিয়েই কক্সবাজারের পর্যটনকে ঘিরে পরিকল্পনা হাতে নেন ব্যক্তি উদ্যোগে। উনার সুদূরপ্রসারি চিন্তার ফসল ছিল কক্সবাজারে আধুনিক আবাসিক হোটেল নির্মাণ প্রকল্প, যা বর্তমানে হোটেল সায়মন নামে দেশব্যাপী জনপ্রিয়। বিশ্বের অনেক অনুন্নত দেশ দ্বীপভিত্তিক অর্থনৈতিক হাব তৈরি করে আজ উন্নত দেশের কাতারে। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও অনুধাবন করেছেন, দেশের অর্থনীতিকে লক্ষ্যে পৌঁছতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় কক্সবাজারের মাতারবাড়ীকে ডেভেলপ করে বর্তমানে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা হচ্ছে সেটি উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। আবার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে রেলপথের উন্নয়ন না করে এবং কোনো অঞ্চলকে রেল সংযোগের বাইরে রেখে যে অর্থনৈতিক হাব সম্ভব নয় সেটিও প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করেছেন। শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগই নয়, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে এ পথ ধরে। ফলে পুরো এশিয়ার সঙ্গে আমাদের রেল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াত সহজ করার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে আন্তর্জাতিকভাবেও।



সাইমুম সরওয়ার কমল
সংসদ সদস্য, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু)
আমরা কক্সবাজারবাসী, আমাদের চৌদ্দ পুরুষও কখনো ভাবেনি এখানে রেল হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা এবং দূরদর্শী ভাবনা ও পদক্ষেপে এটা এখন বাস্তব হয়েছে। কক্সবাজার পৌঁছে গেছে সে রেললাইন। এখানকার ২৭ লাখ মানুষই শুধু নয়, সারা দেশের মানুষ সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও নিরাপদ বাহনে এসে পৌঁছবেন কক্সবাজারে। আমরা আশা করছি ২০৩০ সালের মধ্যে এ রেললাইন মিয়ানমার হয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করবে। ট্রান্স এশিয়ার রেলের সঙ্গে মিশে গেলে তখন ১৪০ কোটি মানুষের দেশ চীন থেকেও মানুষ ছুটে আসবে কক্সবাজার হয়ে বাংলাদেশে। আমাদের ১৭ কোটি মানুষের জন্য মিয়ানমার ও চীনের বাজার উন্মুক্ত হয়ে যাবে এ রেললাইনের মাধ্যমে। ২০৩০ সালে আমরা যে ট্রান্স এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছি, এটা অনেকেই কিন্তু এখনো বুঝতে পারছে না। ওদিকে কক্সবাজারেই গভীর সমুদ্রবন্দর অর্থাৎ মাতারবাড়ী পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে, যেখানে মাদার ভেসেল সরাসরি ভিড়তে পারবে। দেশে তখন পণ্যমূল্যও সাশ্রয় হবে। আর এ গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেলপথ যুক্ত হলে পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হবে। ২০৪১ সালে আমরা যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, প্রতি বছর অর্ধ কোটি ব্যবসায়ী, পর্যটক থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর মানুষের এখানে আসা-যাওয়া হবে, তাতে আমাদের জিডিপিতে বলি অথবা রাজস্ব আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এ রেললাইনের মাধ্যমেই আসবে। তাই আবারো বলি কক্সবাজার রেললাইন শুধু কক্সবাজারবাসীর জন্যই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তি স্থাপন।




রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল
চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ
একটা বন্দরের সঙ্গে পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের কানেক্টিভিটির প্রয়োজন। সড়ক, রেল, নৌপথ এবং আকাশপথেও যে বন্দর যত বেশি কানেক্টেড হবে সে বন্দর তত বেশি সমৃদ্ধ হবে। মাতারবাড়ীর সঙ্গে এখন সড়ক সংযোগ নিয়ে কাজ চলছে। আর এখন কক্সবাজারে রেল চলে আসায় আগামীতে এখানে রেল সংযোগও গড়ে তোলা হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। একটা গভীর সমুদ্রবন্দর থাকা মানে অর্থনৈতিকভাবে একটা দেশ সমৃদ্ধিশালী হওয়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিকে একটা গভীর সমুদ্রবন্দর উপহার দিচ্ছেন। এখানে মাদার ভেসেল সরাসরি আসবে। আর একটা জাহাজ যখন বেশি পণ্য বহন করে, তখন পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক কমে যায়। পরিবহন খরচ কমে যাওয়ার অর্থই হলো ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল বয়ে যাওয়া। পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হয়। সাশ্রয় হয় এজন্যই বলছি, আমরা যখন এক্সপোর্ট করি নরম্যালি যে জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসে গভীরতা অনুযায়ী সেখানে আড়াই হাজার থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার টিইইউস (টোয়েন্টি ফুট ইকুয়েভিলেন্ট ইউনিট) পর্যন্ত পাঠানো সম্ভব হয়। মাতারবাড়ী বন্দরে বেশি গভীরতার সুযোগ পাওয়ায় এক জাহাজেই ১০ হাজার টিইইউস পর্যন্ত রফতানি পণ্য আমরা পাঠাতে সক্ষম হব। অর্থাৎ একটা জাহাজে এখনকার ক্যাপসিটি বিবেচনা করলে তিন গুণ পর্যন্ত পণ্য বেশি পাঠাতে পারব। রফতানিকারকের খরচ কমে তখন আরো বেশি প্রতিযোগী সক্ষমতা অর্জন করবে। একইভাবে আমদানির ক্ষেত্রেও অল্প খরচে অনেক বেশি আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা।



ওমর হাজ্জাজ
সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত স্থাপিত রেলপথ দেশের জন্য একটা বড় অর্জন। বিদ্যমান রেললাইনগুলো কিন্তু তৈরি হয়েছে সে ব্রিটিশ আমলে। এখান থেকে পণ্য নিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে তারা রেল সংযোগ করেছিল। এখন আমরা নিজেরা ব্যবহারের জন্য রেলপথ তৈরি করে কক্সবাজার নিয়ে এসেছি। আর কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় এ রেলপথ ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া কক্সবাজার থেকে একটু দূরেই মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরের অবস্থান, যেটা হবে অর্থনীতির গেম চেঞ্জার। আমাদের দেশের দুই পিলার—প্রবাসী আয়, আরেকটা পোশাক খাত। এ দেশের পোশাক শ্রীলংকা বা কলম্বো পোর্টে ট্রান্সশিপমেন্ট হয়ে নিতে হয়। এখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী ভিয়েতনামের সঙ্গেই কম্পেয়ার করি। ভিয়েতনামের যেখানে শিপমেন্টে সময় লাগে ১৫-২০ দিন, সেখানে আমাদের লাগছে ৬০-৭০ দিন। অতিরিক্ত সময়টা লাগছে কেবল ট্রান্সশিপমেন্টের কারণে। আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে এখন রফতানি পণ্য পাঠালে সে সময় দুই সপ্তাহে নেমে যাবে। ব্যবসায়ীরা তখন অনেক বেশি প্রতিযোগী হয়ে উঠবেন। যখনই একটা গভীর সমুদ্রবন্দর হয়, তখন এটাকে ঘিরে একটা বড় পরিসরে শিল্পায়নও হয়। উল্লেখযোগ্য বিদেশী বিনিয়োগ আসে। ফরেন ইনভেস্টররা যখন দেখবে এখানে ডিপ সি পোর্ট আছে, তার পাশেই আছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, হাইওয়ে হচ্ছে, রেল সংযোগ আছে; এটাই তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে অ্যাট্রাক্ট করতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে।




আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা
সভাপতি, কক্সবাজার চেম্বার 
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এ রেলপথের মাধ্যমে কক্সবাজারে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এখানকার স্থানীয় অর্থনীতিতে ট্যুরিজম, লবণ শিল্প আর মৎস্য শিল্প গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের স্থলবন্দর দিয়েও পণ্য আসে। তাছাড়া পর্যটনের ক্ষেত্রে যোগাযোগে একটা প্রতিবন্ধকতা ছিল। রেল সংযোগ তৈরি হওয়ায় এখন বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পর্যটকরা চাইলেই সরাসরি কক্সবাজারে এসে কোনো ধরনের হোটেলে না উঠেও সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করে আবার ফিরে যেতে পারবেন। অন্যদিকে যত বেশি পর্যটক আসবে প্রান্তিক পর্যায় থেকে ততই ইকোনমিক ভাইব্রেশন তৈরি হবে। আবার এর ওপর ভিত্তি করেই কিন্তু এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) সেক্টরে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এখন রেলপথে কার্গো যুক্ত হলে সাশ্রয়ীভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য চলে যাবে। যেমন খাদ্যপণ্য লবণের উদাহরণ যদি দিই, পদ্মার ওপারে লবণের কোনো ক্রাসিং মিল নেই। তাই এখন মনোপলি বিজনেস হচ্ছে। রেলপথের এ যোগাযোগের কারণে নতুন উদ্যোক্তারা কিন্তু এখন নতুন করে ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করবেন। ভোক্তা পর্যায়ে লবণের দামও কমে আসার যৌক্তিক কারণ থাকবে তখন। আবার যদি মৎস্য শিল্পের কথা বলি, এখানে সিজনে যখন মাছের ভালো সরবরাহ হয়, তখন কিন্তু কোল্ড স্টোরেজেরও সক্ষমতা থাকে না। এই ফ্রেশ ফিশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাবে রেলপথে।