নবম শতাব্দীর শেষ থেকে ১৬১৬ সালের আগ পর্যন্ত কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ ছিল আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। মোগল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ি রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং ক্যাম্প স্থাপনের আদেশ দেন। মোগলদের পর ত্রিপুরা ও আরাকান এবং তারও পর পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে কক্সবাজারে পর্যটন এত জনপ্রিয় ছিল না। এখানকার পর্যটন শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখেন হোটেল সায়মনের প্রতিষ্ঠাতা এস রহমান। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বাবা এস রহমান ১৯৪৪ সালে কলকাতায় গিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। দেশ ভাগের পর তিনি চট্টগ্রামে এসে প্রতিষ্ঠা করেন ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স নামের একটি ঠিকাদারি ফার্ম। তৎকালীন চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসায়ীদের সিংহভাগই ভোগ্যপণ্য আমদানি বাণিজ্যে যুক্ত থাকলেও এস রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে তিনি অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরের মোটেল সৈকত পরিচালনায় যুক্ত হন। মূলত মোটেল সৈকত পরিচালনা করতে গিয়েই কক্সবাজারের পর্যটনকে ঘিরে হাতে নেন বৃহৎ পরিকল্পনা।

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত এলাকায় ১২ হাজার টাকায় এক একর জমি কিনে ১৯৬২ সালে পর্যটকদের জন্য আবাসিক হোটেল নির্মাণে উদ্যোগী হন। এস রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল ছিল কক্সবাজারে আধুনিক আবাসিক হোটেল নির্মাণ প্রকল্প, যা বর্তমানে হোটেল সায়মন নামে দেশব্যাপী জনপ্রিয়। ওই সময়ে অনেকে তার এ বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে সন্দিহান থাকলেও কালের পরিক্রমায় কক্সবাজার এখন বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী।

লাহোর থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে ১৯৬৪ সালে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কক্সবাজারে সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেল সায়মনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। এছাড়া পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক ও সহজ যোগাযোগ স্থাপনে চালু করেন বিলাসবহুল বাস সার্ভিস। কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প প্রসারে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পারিবারিক দূরদৃষ্টিকে এখনো স্মরণ করেন পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা। 

ষাটের দশকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর সড়কপথ ছিল খুবই নাজুক। অথচ ওই সময়ই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২০টি বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ বাস আমদানি করেন এস রহমান। ‘সিলভার এরো ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি’ স্থাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর মধ্যে চালু করেন অত্যাধুনিক বাস সার্ভিস। ওই সময় বাস সার্ভিসটিতে আপ্যায়ন ও সেবা প্রদানে ছিল হোস্টেজ এবং বাসের পেছনে ছিল টয়লেট সুবিধা, যা দেশের সড়ক যোগাযোগ খাতের প্রথম দিকের সবচেয়ে আধুনিক বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করা হয়। সিলভার এরো ট্রান্সপোর্টের বাস সার্ভিস তৎকালীন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বিমান ভাড়া ১২ টাকা থাকলেও মানুষ সিলভার এরো ট্রান্সপোর্টের বাসে যেত ১০ টাকা দিয়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে হোটেল সায়মনকে সংস্কার ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে তারকা মানের হোটেল ‘দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং’ করেছে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পরিবার। বর্তমানে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া কক্সবাজারে হোটেল ও পর্যটন খাতে আরো বেশকিছু বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।


(ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ফেলে আসা দিনগুলি’ থেকে সংকলিত)