গাজা উপত্যকা অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে ১৮০ ফুট উচ্চতায়। আলেকজান্ডারের সময়ে নগর অবস্থিত ছিল পাহাড়ের ওপর। পরে বিভিন্ন সময়ে নানা সংঘাত, সংঘর্ষ ও প্রাকৃতিক কারণে উচ্চতা কমেছে। ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে মাত্র তিন মাইল দূরত্বের এ নগরীর মাটি খুব উর্বর। প্রাচীন আমল থেকেই এখানে জলপাই জন্মাত। উপত্যকার অধিকাংশ মানুষই মুসলমান। ইতিহাসের পরিক্রমায় রয়েছে গ্রিক ও রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান। পরে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান মতাবলম্বীরাও যোগাযোগ বাড়ায়। বিচিত্র জনগোষ্ঠীর মতো বিচিত্র গাজার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে আধিপত্য করেছে মিসরি, মেসিডোনিয়া, বাইজেন্টাইন, মামলুক, উসমানি ও ব্রিটিশ শাসন। গাজার স্থাপত্যে রয়েছে তার নিদর্শন।
দক্ষিণ গাজায় অবস্থিত তেল-উম্ম আমের খ্রিস্টান মঠ অবস্থিত। সেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন সেন্ট হিলারিয়ন দ্য গ্রেট। চতুর্থ শতাব্দীর এ যাজক খ্রিস্টধর্মে সন্ন্যাসবাদের অন্যতম পথ নির্দেশক। জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মরুভূমিতে। হাজার বছর ধরেই এটি খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের আধ্যাত্মিক ঘরানার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ২৫ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত মঠটি এখনো ব্যবহার হয় স্থানীয় বিশ্বাসীদের উপাসনার জায়গা হিসেবে। এ মঠের কথা বাদ দিলে গাজার সবচেয়ে পুরনো ও সক্রিয় ধর্মীয় স্থাপনা সেন্ট পরফিরিয়াস চার্চটি। পরফিরিয়াস ৩৯৫-৪২০ সাল পর্যন্ত গাজার বিশপ ছিলেন। বিস্তৃত স্থাপনার ঠিক উত্তর-পূর্ব পাশে অবস্থিত তার সমাধি, যেখানে চার্চটি নির্মাণ করা হয় ৪২৫ সালে। চার্চের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন হলো ভিন্ন ধরনের অর্ধগম্বুজ, তিনটি প্রবেশপথ ও মার্বেল নির্মিত কলাম। প্রতি বছর হাজারো খ্রিস্টান বিশ্বাসী চার্চে হাজির হয়। এমনকি সংঘাতের সময়ও উপসনা প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। ২০১৪ সালে যুদ্ধের সময় সেখানে দুই হাজার নারী ও শিশু ঘুমিয়েছে। স্থাপনাটি বর্তমানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত।
গাজার দক্ষিণ পাশে খান ইউনিসে অবস্থিত বারকুক দুর্গ নির্মিত হয়েছিল মামলুক আমলে ১৩৮৭ সালে। মামলুক আমলের বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে বারকুক তার পূর্ববর্তী শাসক আস সালিহকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তার সময়েই নির্মিত এ দুর্গ ব্যবহার হতো দামেশক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে। ব্যবসায়ীরা এখানে বিশ্রাম নিতেন সে সময়। যদিও পরে মধ্য এশিয়ার শাসক তৈমুর লঙয়ের অগ্রাভিযান ঠেকানোর প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নেয়া হয় দুর্গে। বর্তমানে এর বড় অংশই ধসে পড়েছে। মামলুক আমলে গাজার আরেকটি স্থাপনা কাসরাল বাশা বা পাশার প্রাসাদ। প্রচলিত আছে, প্রাসাদটি মামলুক সুলতান বাইবার্স নির্মাণ করেন। সুলতান বাইবার্স তখন ক্রুসেডার্স ও মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত। এমন একটি অভিযানের সময় তিনি গাজার এক নারীকে বিয়ে করেন। সন্তান ও স্ত্রীর জন্য তৈরি করেন সুরম্য অট্টালিকা। পরবর্তী সময়ে উসমানি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে স্থাপত্য নিদর্শনে যুক্ত হয়েছে বহু উসমানি উপাদান। ভবনটি সে সময় স্থানীয় শাসকের আবাস ছিল। ব্রিটিশ আমলে ব্যবহার হতো পুলিশ স্টেশন ও আরো পরে রূপান্তর হয় স্কুলে। বর্তমানে এটি জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহযোগিতায় জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। সেখানে শোভা পাচ্ছে মিসরীয়, ফিনিশীয়, পারসিক, হেলেনীয় ও রোমান আমলের নিদর্শন।
গাজার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত আল উমরি মসজিদ। পৃথক খিলান ও প্রশস্ত আঙিনার জন্য এটি পরিচিত। এটা আগে ছিল প্রাচীন মন্দির। তারপর বাইজেন্টাইন আমলে পরিণত হয়েছিল চার্চে। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম বিজয়ের সময় এটি নির্মাণ করা হয়। ক্রুসেডের সময় মসজিদটিকে চার্চে পরিণত করা হলেও মামলুকদের সময়ে আবার ফিরিয়ে আনা হয় পুরনো পরিচয়। ৪ হাজার ১০০ বর্গমিটার জায়গা নিয়ে অবস্থিত মসজিদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গাজাবাসীর জন্য। বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও এখনো টিকে আছে। ইসলামের নবী মুহম্মদ (সা.)-এর জন্ম বনু হাশিম গোত্রে, যে নামটি এসেছে তার প্রপিতামহ হাশিম ইবনে আবদে মানাফ থেকে। হাশিম বাণিজ্যিক সূত্রে গাজায় অবস্থানকালে মৃত্যুবরণ করেন ৪৯৭ সালে। মুসলিম আমলে সেখানে নির্মিত মসজিদ পরিচিত সাইয়েদ হাশিম মসজিদ নামে। এখনো সে স্থাপনাটি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। এমন অজস্র নমুনা নিয়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরের উপত্যকা গাজা যেন কোনো জাদুঘর।
মুহম্মদ আল মুখতাফি




