গাজার জনবিন্যাস সেই প্রাচীনকাল থেকেই কসমোপলিটান গোছের। এ শহরে আরবদের বসবাস শুরু থেকেই। আলেকজান্ডারের অবরোধের সময় শহর বাঁচাতে যারা লড়েছিল তাদের একটা অংশ ছিল আরব যোদ্ধা। পেত্রা কিংবা আরব উপদ্বীপের বণিকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল এই গাজা। মক্কার দুই প্রভাবশালী গোত্রের নেতারাও এ শহরের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে যুক্ত ছিলেন, যারা পরবর্তীকালে ইসলামের গৌরবযাত্রার অংশীদার।
ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রপিতামহ গাজা শহরে সমাধিস্থ হয়েছিলেন। তার নাম হাশিম ইবন আবদে মানাফ। তিনি ছিলেন মক্কার অভিজাত কুরায়েশ বংশের নেতা। তার জন্ম আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টাব্দে। বছরে তিনি দুবার ক্যারাভান নিয়ে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন যেতেন। এমন এক সফরে ২৫ বছর বয়সে তিনি গাজায় মারা যান। তার এক পুত্রের নাম ছিল আবদুল মুত্তালিব। তিনি মদিনায় বসবাস করতেন। তার ছিল ছয় কন্যা ও ছয় পুত্র। এই ছয় পুত্রের একজন আবদুল্লাহ যিনি বিয়ে করেন বিবি আমিনাকে। তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেন ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। নবীর প্রপিতামহের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ইসলামী টেক্সটে নগরীটি গাজ্জাতু হাশিম বা হাশিমের গাজা নামে পরিচিত।
হাশিমের পর মক্কার আরো একজন বণিকের নাম গাজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে—তিনি উমর ইবন খাত্তাব। এ দক্ষ, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ মানুষটি ব্যবসায় সাফল্য পেয়েছিলেন। গাজায় তিনি যে ক্যারাভান পাঠিয়েছিলেন তাতে তার ভাগ্য ফিরে যায়। পরবর্তী সময়ে তিনিই ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে বিখ্যাত হয়েছেন।
বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্য যখন তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিয়ে ব্যস্ত তখন আরব উপদ্বীপে নতুন শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর প্রথম খলিফা আবু বকর আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের পতাকার বিজয়ের জন্য অগ্রসর হলেন। এ রকম একটি অভিযান ছিল গাজায়। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে গাজা শহরের কয়েক কিলোমিটার দূরে বাইজেন্টাইনরা মুসলিমদের হাতে পরাজয় বরণ করে। এ বছরই নতুন খলিফা হন উমর ইবন খাত্তাব। তিনি গাজা শহরকে ভালোই চিনতেন। তিনি চারদিকে ইসলামের শাসন বিস্তৃত করার প্রত্যয়ী হন। মুসলিম সেনাদল প্রথমে গাজার উত্তরাংশে থাকা খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকায় হামলা করে। ৬৩৬ সালের আগস্টে ইয়ারমুক নদীর কাছে ইতিহাস নির্ধারণী এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে মুসলিমরা জয়ী হয়। ৬৩৭ সালের জুলাইয়ে আকস্মিক আক্রমণে গাজা দখল করে মুসলিম সেনাদল। মিসরের দিকে অভিযান প্রেরণের জন্য গাজাকে ব্যবহার করা হয় ঘাঁটি হিসেবে। জিউসের এক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়েছিল চার্চ অব সেন্ট ইউডোক্সিয়া, এবার চার্চকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। এর পাশেই চার্চ অব সেন্ট পরফিরি খ্রিস্টানদের প্রার্থনার জন্য উন্মুক্ত ছিল। খ্রিস্ট ধর্মের বিস্তৃতির ক্ষেত্রে গাজার প্যাগানরা বেশি রক্ষণাত্মক ছিলেন। কিন্তু এরাই বেশ আগ্রহ নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তবে শহরের প্রান্তে থাকা জনগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহণে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। এ প্রান্তগুলো মুসলিম সেনাবাহিনীর গাজা দখলের ২০০ বছর পরেও খ্রিস্টান অধ্যুষিত ছিল।
গাজা তখন ফিলিস্তিনের একটি সামরিক শহর। উমাইয়া আমলে (৬৬১-৭৫০) এ শহর শাসন করা হতো রামালা থেকে। আব্বাসীয় আমলে খিলাফতের কেন্দ্র ইরাকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হলো। ফলে ইসলামী শাসনের কেন্দ্র থেকে গাজার দূরত্ব বেড়ে গেল। কিন্তু তাতে গাজার গুরুত্ব কমে যায়নি, বরং ইসলামী সাম্রাজ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে গাজার খ্যাতি ছিল। সুন্নিদের চার মাজহাবের একটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাম শাফেয়ী গাজায় জন্ম নেন ৭৬৭ সালে। অবশ্য শিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি অন্যত্র গমন করেছিলেন। গাজার জেইতুনের গোরস্তানে আছে ইমাম শাফেয়ীর কন্যা ও এক সহকারীর কবর।
অন্যদিকে মাইয়ুমাস বন্দরকে ঘিরে গাজায় সব ধরনের বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। সেকালের ভ্রামণিক ও লেখকদের বিবরণে পাওয়া যায় এ সময় গাজা ছিল একটি সমৃদ্ধ শহর; ফলের বাগান ও খামার দিয়ে পূর্ণ ছিল এর ভূমি। গাজা উপত্যকা, যা দক্ষিণ দিকে ভূমধ্যসাগরে উন্মুক্ত ছিল, ছিল সবুজে পূর্ণ।
এ পর্বে প্রায় ১৫০ বছর মুসলিম শাসন তার আধিপত্য ধরে রেখেছিল। সময়টা বেশ স্থিতিশীল ছিল গাজা নগরীর জন্য। ৮৯৯-৯০৫ আব্বাসীয় শাসক ও মিসরের বিরোধী পক্ষের দ্বন্দ্বে গাজার আকাশে আঁধার ঘনিয়ে আসে। বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা গাজাকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে মিসরের বিদ্রোহীদের দমনে সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। গাজা তখন ইসলামী দুনিয়ার অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক শহর। হামাদানি নামের একজন পারসিক দিনলিপিকার উল্লেখ করেছেন যে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে ধাক্কাধাক্কি চলছিল। সিরিয়ার এক লেখক গাজা ও আসকালানকে এ অঞ্চলের দুই বধুরূপে প্রশংসা করেছেন। অবশেষে ৯৬৯ সালে মিসর দখল করে পশ্চিম দিক থেকে আসা ইসমাইলি শিয়া ফাতিমি বংশ। এরপর তারা গাজার নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয়। সুন্নি অধ্যুষিত গাজায় অবশ্য তারা শিয়া মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার কোনো চেষ্টা করেনি।
দশম শতাব্দীর শেষভাগে এসে দিনলিপিকার আল-মুকাদ্দিসি গাজাকে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড় শহরগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেছেন। তার সমসাময়িক ইবন হায়কাল গাজাকে ‘চমৎকার ও সমৃদ্ধ’ শহর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১০৯৫ সালে শুরু হয় ক্রুসেড। চার বছর পর ক্রুসেডারদের হাতে জেরুজালেমের পতন হয়। গাজার অধিবাসীরা পালাতে শুরু করেন। ক্রুসেডাররা গাজা দখল করে প্রায় বিনা বাধায়। উমরের মসজিদ আবার চার্চে পরিণত হয়। আসকালান থেকে মুসলিম বাহিনী গাজার দিকে বারবার হামলা চালালে রাজা তৃতীয় বাল্ডউইন নাইট টেম্পলারদের নির্দেশ দেন গাজায় শক্ত সামরিক অবস্থান গড়ে উপকূলকে শান্তিপূর্ণ রাখতে। ১১৫৩ সালে আসকালানের পতন হলে সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গাজার গুরুত্ব কমে আসে। কিন্তু বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গাজার গুরুত্ব তখনো অটুট ছিল। আরব ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসি বলেছেন, ‘গাজা একটি মাঝারি আকারের শহর যার বাজার খুবই বিখ্যাত।’
এসব এলাকা আবার মুসলিম অধিকারে আসে কুর্দি সেনাপতি জগদ্বিখ্যাত সালাদিনের হাত ধরে। ১১৯১ সালের পর গাজা সালাদিনের অধিকারে আসে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর পর ১২২৯ সালে সালাদিনের এক বংশধরের সঙ্গে সিসিলির রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিখের চুক্তি অনুসারে গাজা আবার খ্রিস্টানদের অধিকারে চলে যায়। ১২৪৪ সালে তুর্কি ও মিসরীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা গাজা ছেড়ে পিছু হটে। ১২৫০ মালে আইয়ুবীয় সালতানাতকে উৎখাত করে মামলুকরা গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এদিকে হাজির হয় নতুন বাহিনী। ১২৬০ সালে গাজা দখল করে মোঙ্গল হালাকু খান। সে বছরই মামলুকরা এ এলাকা থেকে মোঙ্গলদের তাড়িয়ে দেয়।
ক্রুসেডার ও মোঙ্গলদের হাতে বেশ অনেক বছর ধরে দখল-পুনর্দখলে গাজার ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য সংযোগগুলো নষ্ট হয়ে যায়। বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে এর ব্যবহারও তখন প্রায় শেষ। ১২৬০ থেকে মামলুকরা গাজাকে নতুন করে গড়ে তোলায় মনোযোগ দেয়। এ পর্বকে অনেকে গাজার স্বর্ণযুগ হিসেবে অভিহিত করেন। মামলুক শাসক বাইবার্স নতুন নতুন ভবন নির্মাণ শুরু করেন। খলিফা উমরের নামে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণ করান। এ মসজিদের পাশেই নির্মিত হয় পাশার প্রাসাদ, যা ছিল গভর্নরের দপ্তর।
১৩৪৮ সালে প্লেগের আক্রমণ এ অঞ্চলকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে। গাজায় মারা যায় প্রায় ২২ হাজার মানুষ। ইবনে বতুতা এ সময় গাজা সফর করেছিলেন। তিনি দেখেছেন শহরের মানুষ পালিয়েছে। আর যারা আছে তারা প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। মামলুক শাসকদের আন্তরিকতায় গাজা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। বাণিজ্য সচল করতে গাজা ও রাফার মধ্যে একটি সুরক্ষিত ক্যারাভানসরাই নির্মাণ করা হয়।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে উত্থান ঘটল নতুন শক্তির—অটোমান শাসন। তারা গাজা দখল করে বেশ নিষ্ঠুরতা চালিয়েছিল স্থানীয়দের ওপর। ১৫৭০ সালে রাদওয়ান পাশা উত্তরাধিকার সূত্রে গাজার গভর্নরের দায়িত্ব পান এবং এরপর তাদের পরিবারের হাতে গাজার শাসন অব্যাহত থাকে। তবে তারা ইস্তানবুলের অটোমানদের প্রভাবাধীন ছিলেন।
৬৩৭ সালে গাজা মুসলিম শাসনাধীন আসার পর মামলুকদের সময় ছিল এর স্বর্ণযুগ। এরপর অটোমানদের অধীনে গাজার গুরুত্ব কমে আসে।
এস এম রশিদ: লেখক





