আমোস ওজ অনুবাদ : আলম খোরশেদ

[লেখক পরিচিতি: এ মুহূর্তে ইসরায়েলের জীবিত লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত লেখক আমোস ওজ, যিনি মূলত একজন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণকারী আমোস পেশাজীবনে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের শিক্ষক। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০-এর অধিক, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: Elsewhere, Perhaps (1966), To Know a Woman (1989), Don’t Call It Night (1994), Rhyming Life and Death (2007), Between Friends (2012) ইত্যাদি। দেশে ও বিদেশে তিনি অসংখ্য সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার আত্মজীবনী The Tale of Love and Darkness সম্প্রতি একই নামে চলচ্চিত্রে রূপায়ণ হয়েছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অগ্রণী আমোস ওজ আরব-ইসরায়েলের চলমান সংকটের সমাধান হিসেবে দ্বিরাষ্ট্রতত্ত্বকে সমর্থন করেন অত্যন্ত জোরালোভাবে। অনূদিত গল্পটি তার বিটুইন ফ্রেন্ডস গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।]

খুব ভোরে, সূর্যোদয়ের আগে, ঝোপের ভেতর থেকে কবুতরের কূজন তার জানালা গলে ভেতরে ভেসে আসতে শুরু করে। তাদের একটানা ও একই লয়ের গলা ফোলানো আওয়াজটুকু তাকে প্রশমিত করে। পাইন গাছগুলোর ওপর দিয়ে মৃদু হাওয়া বয়ে যায় আর একটা কাক পাহাড়ের ঢালে বসে ডেকে ওঠে।

দূরে একটা কুকুর ঘেউ করে, আরেকটি তার উত্তর দেয়। এসব শব্দ অ্যালার্ম বাজার আগেই ওসনাতকে জাগিয়ে দেয়। সে শয্যা ছেড়ে নেমে আসে, অ্যালার্ম বন্ধ করে, স্নান সারে এবং কাজের পোশাক পরে নেয়। সাড়ে ৫টায় সে কিবুেসর লন্ড্রির কাজে বেরিয়ে পড়ে। পথে সে বোয়াজ ও আরিয়েলার ফ্ল্যাট অতিক্রম করে, যেটি তখনো অন্ধকার ও অর্গলবদ্ধ। তারা নিশ্চয়ই ঘুমাচ্ছে। সে ভাবে, আর এই ভাবনাটুকু তার মধ্যে কোনো ঈর্ষা কিংবা বেদনার জন্ম দেয় না। কেবল এক অস্পষ্ট অবিশ্বাস, যেনবা যা কিছু ঘটেছে, তা আসলে তার বেলায় নয়, অন্য কারোর ক্ষেত্রে ঘটেছে। আর তাও দুই মাস নয়, অনেক বছর আগে। লন্ড্রিতে সে বিদ্যুত্বাতি জ্বালিয়ে দেয়। কেননা দিনের আলো তখনো বেশ ক্ষীণ। তারপর সে অপেক্ষমাণ স্তূপের ওপর নুয়ে পড়ে সাদা থেকে রঙিন আর সুতি থেকে সিনথেটিক কাপড় আলাদা করতে থাকে। ময়লা কাপড় থেকে বেরোনো শরীরের নোনতা ঘ্রাণ সাবানগুঁড়োর গন্ধের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। ওসনাত এখানে একাই কাজ করে বলে রেডিওটা সে সারাক্ষণই খোলা রাখে নিঃসঙ্গতা কাটানর জন্য। যদিও যন্ত্রের গুঞ্জন সংগীত ও কথা দুটোকেই অস্পষ্ট করে দেয়। সাড়ে ৭টায় সে প্রথম কিস্তির কাজ শেষ করে, মেশিন খালি করে আবার কাপড় ভরে, তারপর নাশতা করতে খাওয়ার ঘরের দিকে যায়। সে বরাবরই খুব ধীরে হাঁটে, যেনবা সে তার গন্তব্য বিষয়ে নিশ্চিত নয় অথবা তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। এখানে আমাদের এই কিবুেস ওসনাতকে একজন অত্যন্ত মিতবাক নারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গ্রীষ্মের শুরুতে বোয়াজ ওসনাতকে জানায়, আরিয়েলা বালাশের সঙ্গে আট মাস ধরে তার সম্পর্ক চলছে এবং সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা তিনজন এ মিথ্যার জীবন যাপন করে যেতে পারে না। সে তাই ওসনাতকে ছেড়ে যেতে এবং তার জিনিসপত্র আরিয়েলার বাড়িতে সরিয়ে ফেলতে মনস্থির করেছে। ‘তুমি তো আর ছোট মেয়েটি নও আর’— সে বলে। ‘তুমি জানো ওসনাত, এসব আজকাল দুনিয়াজুড়ে প্রতিদিনই ঘটছে, এমনকি আমাদের এই কিবুেসও। ভাগ্য ভালো, আমাদের কোনো ছেলেপিলে নেই। তাহলে ব্যাপারটা আরো শক্ত হতো আমাদের জন্য।’ সে তার সাইকেলটা নিয়ে যাবে তার সঙ্গে আর রেডিওটা রেখে যাবে ওসনাতের জন্য। সে চায় তাদের বিচ্ছেদটাও এতদিনের যৌথজীবনের মতোই যেন বন্ধুতাপূর্ণ হয়। ওসনাত তার ওপর ক্ষুব্ধ হলে সেটা সে পুরোপুরিই বুঝবে। যদিও তার সেটা হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই: ‘আরিয়েলার সঙ্গে আমার এ সম্পর্কটা তোমাকে আঘাত দেয়ার জন্য নয়। এগুলো স্রেফ ঘটে যায়, এই আর কি।’ তবে যা-ই হোক, সে এর জন্য দুঃখিত। সে তার জিনিসপত্র এখনই সরিয়ে ফেলবে এবং তাকে শুধু রেডিওটা নয়, বাকি সবকিছুই, অ্যালবামগুলো, নকশা আঁকা বালিশগুলো, আর বিয়েতে উপহার পাওয়া কফিসেটটাও দিয়ে যাবে।

ওসনাত বলে, ‘হ্যাঁ।’

‘হ্যাঁ, মানে কী?’

‘যাও’, সে বলে, ‘স্রেফ বিদায় হও।’

আরিয়েলা বারাশ লম্বা, তন্বী, সরু গ্রীব, কোঁকড়ানো চুল আর হাস্যোজ্জ্বল চোখের এক বিবাহবিচ্ছিন্না নারী, যার একটা চোখ কিঞ্চিৎ ট্যারা। সে কাজ করত মুরগির খামারে আবার কিবুেসর সাংস্কৃতিক কমিটিরও প্রধান, যার দায়িত্ব ছিল ছুটি, উৎসবাদি ও বিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। পাশাপাশি শুক্রবার রাতের জন্য বক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো এবং বুধবার রাতে ডাইনিং হলে দেখানোর জন্য ছবির ফরমাশ করাও ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব। তার একটা বুড়োটে বিড়াল ও ছোট্ট কুকুর, প্রায় ছানা ছিল, যারা তার অ্যাপার্টমেন্টে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করত। কুকুরটা বিড়ালকে ভয় পেত, তাই বিনয়ের সঙ্গেই তাকে জায়গা ছেড়ে দিত। বুড়ো বিড়ালটি কুকুরছানাটিকে উপেক্ষা করত এবং তার পাশ দিয়ে এমনভাবে হেঁটে যেত, যেন তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আরিয়েলার ঘরে সারাটা দিনই প্রায় তারা ঘুমিয়ে কাটাত, বিড়ালটি সোফায় আর কুকুরটি কার্পেটে, পরস্পরের প্রতি উদাসীন।

আরিয়েলা বছরখানেকের জন্য এফরাইম নামে জনৈক সেনা অফিসারের সঙ্গে বিবাহিত ছিল, যে পরে এক তরুণী নারী সেনার জন্য তাকে ছেড়ে যায়। বোয়াজের সঙ্গে তার সম্পর্কের সূত্রপাত হয় যখন একদিন তেল মাখানো, ঘামে জবজবে ইউনিফর্ম পরে সে তার অ্যাপার্টমেন্টে আসে। সে তাকে একটি জল চুইয়ে পড়া ট্যাপ ঠিক করে দিতে ডেকেছিল। ধাতব বাকলস্সমেত একটা চামড়ার বেল্ট পরনে ছিল তার। পানির কলটির ওপর নুয়ে থাকা অবস্থায় আরিয়েলা তার রোদে পোড়া পিঠে কয়েকবার মৃদুভাবে হাত বোলালে একসময় সে রেঞ্চ ও স্ক্রু ডাইভার হাতে নিয়েই তার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। এর পর থেকে সে প্রায়ই কখনো আধা ঘণ্টার জন্য এ বেলায়, অন্য বেলায় কখনো ঘণ্টাখানেকের জন্য তার ফ্ল্যাটে চুপিসারে ঢুঁ মারত। তবে তাদের এ লুকোচুরি খেলাটুকু ইয়েখাত কিবুেসর অনেকেরই চোখে পড়েছিল, যে আবিষ্কারটিকে তারা স্রেফ নিজেদের কাছেই রেখে দেয়নি। আমাদের কিবুেসর লোকজন বলাবলি করছিল: ‘কী অদ্ভুত জুটি; বোয়াজের মুখে কোনো টুঁ শব্দ নেই, আর আরিয়েলা তো তার বকবকানি থামায়ই না।’ কমেডিয়ান রনি শিন্ডলিন বলে, ‘মধুই খাচ্ছে ভাল্লুককে।’ ওসনাতকে কেউ এ বিষয়ে কিছু বলে না। তবে তার বন্ধুরা তাকে আদরে ভাসিয়ে দেয় এবং সুযোগ পেলেই মনে করিয়ে দেয় যে, সে একা নয়, তার যদি কোনো কিছুর দরকার পড়ে, ছোটখাটো যেকোনো কিছু তবে যেন... ইত্যাকার সব কথা।

বোয়াজ তারপর সাইকেলের ঝুড়িতে তার কাপড়চোপড় ভরে নিয়ে আরিয়েলা বাড়ির দিকে রওনা হয়। বিকালে তার গ্যারেজের কাজ শেষ করে সে বাড়ি ফিরে কাজের পোশাক ছেড়ে স্নানের জন্য বাথরুমে ঢোকে। দরজার মুখ থেকে সে সবসময় তার কাছে জানতে চায়, ‘তা, আজ কিছু ঘটেছে?’ আরিয়েলাও বিস্ময়ের সঙ্গে উত্তর করে, ‘কী আর ঘটবে? কিছুই ঘটেনি। স্নান শেষ করো, আমরা একসঙ্গে কফি খাব।’

ডাইনিং হলে ঢোকার মুখে রাখা ডাকবাক্সগুলোর একেবারে বাম প্রান্তে রাখা তার বাক্সটিতে আরিয়েলা, ওসনাতের গোটা গোটা অক্ষরে অচঞ্চল হাতে লেখা একটি ভাঁজ করা চিঠি পায়:

বোয়াজ তার ব্লাড প্রেসারের অষুধ খেতে সবসময় ভুলে যায়। এ অষুধটি তাকে খেতে হয় সকালে আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে, সঙ্গে কোলেস্টেরলের বড়ির অর্ধেকটাও খাওয়া দরকার তার সকালবেলায়। সালাদে তার বেশি লবণ ও গোলমরিচ ঢালা ঠিক নয়, কম চর্বিওয়ালা পনির খাওয়া উচিত তার এবং স্টেক খাওয়া একদম বারণ। মাছ ও মুর্গি খাওয়া চলবে, তবে একগাদা মসলা দিয়ে নয়। বেশি বেশি মিষ্টি গেলাটাও তার জন্য ঠিক নয়। ওসনাত পুনশ্চঃ কালো কফিটাও তার কমই খাওয়া উচিত।

আরিয়েলা বারাশ তার কাটা কাটা, তীক্ষ ও কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষরে ওসনাতের চিঠির জবাব লিখে তার বাক্সে রেখে দেয়:

ধন্যবাদ। আমাকে লেখাটা তোমার সত্যিকারের বদান্যতা। বোয়াজের বুকজ্বালাও রয়েছে, কিন্তু সে বলে, এটা কিছু নয়। তুমি যা যা লিখেছ, আমি তার সবই করতে চেষ্টা করব, কিন্তু সে সহজ পাত্র নয় এবং সে তার স্বাস্থ্য নিয়ে মোটেও ভাবিত নয়। সে আরো অনেক জিনিস নিয়েই তেমন ভাবিত নয়। তুমি জানো। আরিয়েলা বি.

ওসনাত লেখে:

তুমি তাকে ভাজা, নোনতা ও মসলাদার খাওয়া খেতে না দিলেই তার আর বুকজ্বালা হবে না। ওসনাত

আরিয়েলা বেশ কদিন পর জবাব দেয়:

আমি প্রায়ই নিজেকে শুধাই, এ আমরা কী করেছি? সে তার অনুভূতি চেপে রাখে আর আমারটা ক্রমাগত পাল্টায়। সে আমার কুকুরকে সহ্য করে, কিন্তু বিড়ালটাকে একেবারেই নয়। গ্যারেজ থেকে যখন বিকালবেলা বাড়ি ফেরে সে, আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আজ কী হয়েছে? তারপর স্নান করে, একটু কালো কফি খেয়ে আমার আরামকেদারাটায় বসে খবরের কাগজ পড়ে। আমি তাকে কফির বদলে চা দেয়ার চেষ্টা করলে সে রেগে গিয়ে বলে, আমার তার মা সাজার চেষ্টা করা উচিত নয়। তারপর সে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ে, তার হাত থেকে কাগজগুলো পড়ে যায় মেঝেতে, ৭টায় সে জেগে ওঠে রেডিওতে খবর শুনবে বলে। খবর শোনার সময় কুকুরটার পিঠ চাপড়ায় সে, বিড়বিড় করে দু-একটা আদরের ধ্বনিও করে। কিন্তু বিড়ালটা আদর কাড়ার জন্য তার কোলে উঠে বসলেই সে ওটাকে এমনভাবে ছুড়ে ফেলে যে, আমি শিউরে উঠি। আমি তাকে আটকে যাওয়া ড্রয়ারটা ঠিক করার কথা বললে সে শুধু ওটাই ঠিক করে না, ক্যাঁচক্যাঁচ করা ওয়ার্ডরোবের দরজা দুটোও খুলে ঠিকঠাক করে আবার জুড়ে দেয় এবং হাসিমুখে জানতে চায়, মেঝে কিংবা ছাদটাও মেরামত করতে হবে কিনা। আমি আমাকে জিজ্ঞাসা করি, তার কোন জিনিসটা আমাকে আকর্ষণ করেছিল বা এখনো মাঝে মধ্যে করে, কিন্তু পরিষ্কার কোনো উত্তর খুঁজে পাই না। স্নানের পরও তার নখের ভেতর মেশিনের কালি লেগে থাকে আর তার হাত দুটোকে রুক্ষ ও আঁচড় কণ্টকিত দেখায়। আর শেভ করার পরও তার গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি রয়ে যায়। হয়তোবা তার ওই সারাক্ষণ ঘুমে ঢলে পড়ার অভ্যাসটুকু— এমনকি সে যখন জেগে থাকে, তখনো মনে হয় ঘুমাচ্ছে— আমাকে প্রলুব্ধ করে তাকে জাগিয়ে তুলতে। তবে আমি তাকে খুব অল্প সময়ের জন্য জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হই। তুমি জানো কীভাবে এবং সেটাও সবসময় ঘটে না। একটা দিনও যায় না, যখন আমি তোমার কথা ভাবি না। ওসনাত, আমি নিজেকে ঘেন্না করি আর ভাবি, আমি তোমার সঙ্গে যা করেছি, তার কি কোনো ক্ষমা হতে পারে। মাঝে মধ্যে আমি নিজেকে বলি, হয়তো ওসনাত এটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না। হয়তো সে তাকে ভালোই বাসেনি? এটা জানা কঠিন। তুমি নিশ্চয়ই ভেবেছ, এটা আমি ইচ্ছা করে করেছি। কিন্তু আমাদের অনেক সময় উপায় থাকে না। নারী আর পুরুষের মধ্যকার এ সম্পর্কের ব্যাপারটাকে আমার হঠাৎ করেই খুব অদ্ভুত ও খানিকটা হাস্যকরও মনে হচ্ছে। তোমারও কি তা-ই মনে হয়? তোমার বাচ্চা থাকলে তুমি ও আমি দুজনই আরো অনেক বেশি কষ্ট পেতাম। আর ও কী বলে? ও আসলে কী ভাবে? কে বলবে? তুমি কী সুন্দর বলতে পারো, ওর কী খাওয়া উচিত বা উচিত নয়। কিন্তু তুমি কি জানো ও ঠিক কী অনুভব করে? অথবা আদৌ তার কোনো অনুভূতি রয়েছে কিনা? আমি একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার কোনো অনুশোচনা হয় কিনা, তখন সে বলেছিল, ‘তুমি নিজের চোখেই দেখছ, আমি তোমার সঙ্গেই রয়েছি, তার সঙ্গে নয়।’ তুমি জেনো ওসনাত, প্রতি রাতে সে ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি বিছানায় জেগে থেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে আমাদের শোয়ার ঘরে এসে পড়া চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবি, তোমার জায়গায় আমি হলে কী হতো। আমি তোমার স্থৈর্যের প্রতি আকৃষ্ট হই। আমি যদি তার খানিকটাও শুষে নিতে পারতাম আমার মধ্যে।

মাঝে মধ্যে আমি জেগে উঠে পোশাক পরে দরজা পর্যন্ত হেঁটে যাই মাঝরাতে এই ভেবে যে, আমি তোমার কাছে গিয়ে সব ব্যাখ্যা করে বলব, কিন্তু কী ব্যাখ্যা দিতে পারি আমি তোমাকে? আমি রোয়াকে মিনিট দশেকের মতো দাঁড়াই, স্বচ্ছ আকাশের দিকে তাকাই, সপ্তর্ষিমণ্ডলকে চিহ্নিত করি, তারপর আবার পোশাক ছেড়ে জেগে থাকব বলে বিছানায় ফিরে যাই। সে আরামসে নাক ডাকে আর আমার হঠাৎ ইচ্ছা করে সম্পূর্ণ নতুন কোনো জায়গায় চলে যেতে। এমনকি তোমার ঘরে, তোমার কাছে চলে যেতে। তবে বোঝার চেষ্টা করো যে, এটা কেবল রাতের বেলাতেই হয়, যখন আমি ঘুমাতে না পেরে সজাগ শুয়ে থাকি, বুঝতে পারি না কী এবং কেন ঘটল, তখন আমি তোমার প্রতি এক তীব্র নৈকট্য অনুভব করি। তখন যেমন ধরো তোমার সঙ্গে লন্ড্রিতে কাজ করতে ইচ্ছে করে আমার। শুধু আমরা দুজন। আমি তোমার ছোট্ট চিরকুট দুটো সবসময় আমার পকেটে বহন করি, আর বের করে বারবার পড়ি। আমি চাই যে, তুমি জানো তোমার লেখা প্রতিটি শব্দকে আমি কী রকম মূল্য দিই, তার চেয়েও বেশি, তুমি যেসব লেখোনি, আমি তাতেও কতটা মুগ্ধ। কিবুেসর লোকজন আমাদের নিয়ে কথা বলে। তারা বোয়াজের ব্যাপারেও বিস্মিত। তারা বলে, আমি নাকি সটান হেঁটে গিয়ে একটু নুয়ে পড়ে তাকে তোমার কাছ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে এসেছি। আর সে, কাজের শেষে কোন ঘরে ফিরবে কি কোন বিছানায় ঘুমাবে, তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাই নেই। রনি শিন্ডলিন একদিন অফিসের কাছে আমার দিকে চোখ টিপে একগাল হেসে বলে, তা মোনালিসা, স্থির জল গভীরে বয়, বুঝলে? আমি তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে ঘেন্নায় পালিয়ে যাই। পরে বাড়িতে আমি কাঁদি। প্রায়ই রাতের বেলায় আমি কাঁদি, সে ঘুমিয়ে পড়লে, তার কারণে নয় অথবা শুধু তার কারণেই নয়, বরং তোমার আর আমার জন্য। যেনবা আমাদের দুজনের ক্ষেত্রে এমন বাজে ও কুিসত কিছু ঘটেছে, যেটা আর ঠিক করা যাবে না। মাঝে মধ্যে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি: কী বোয়াজ? আর সে বলে, কিছু না। আমি তার সেই শূন্যতার প্রতি আকৃষ্ট হই— যেনবা তার কিছু নেই, কোনো এক শূন্যতার মরুভূমি থেকে সোজা উঠে এসেছে। তারপর, তা আমি এসব তোমাকে বলছি কেন? শত হলেও এসব শুনতে নিশ্চয়ই তোমার কষ্ট হয়। আর আমি তোমার যন্ত্রণায় আর কিছু যোগ করতে চাই না। ঠিক তার উল্টো: আমি তোমার নৈঃসঙ্গ্যের ভাগ নিতে চাই, যেমনটি একদা তার নিঃসঙ্গতাকে ছুঁতে চেয়েছিলাম। এখন রাত প্রায় একটা বাজে, সে ঘুমাচ্ছে, প্রায় নবজাতকের ভঙ্গিতে কুঁকড়ে, কুকুরটা তার পায়ের কাছে, বিড়ালটা কাছেই একটা টেবিলের ওপরে, তার হলুদ চোখ মরালগ্রীব ল্যাম্পের আলোয় লিখে চলা আমার হাতের নড়াচড়াকে অনুসরণ করে। আমি জানি, এ অর্থহীন, আমার লেখা বন্ধ করা উচিত, তুমি হয়তো এ চিঠি কখনই পড়বে না, যা এরই মধ্যে চার পৃষ্ঠায় গড়িয়েছে। তুমি সম্ভবত এটাকে ছিঁড়ে ফেলে দেবে। তুমি হয়তো ভাববে, আমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে, যা সত্যি সত্যি হয়েছে। আমরা কি দেখা করে কথা বলব? না, বোয়াজের পথ্য কিংবা ওষুধপত্র বিষয়ে নয়। (আমি সত্যি চেষ্টা করি, সে যেন এগুলো ভুলে না যায়। আমি চেষ্টা করি, কিন্তু সবসময় সফল হই না। তুমি তো তার একগুঁয়েমির কথা জানো, যেটাকে আসলে ঘৃণা বলে মনে হলেও তা আসলে উদাসীনতা।) আমরা সম্পূর্ণ নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি। ধরো, বছরের ঋতুগুলো বিষয়ে কিংবা তারাভরা গ্রীষ্মের আকাশ নিয়ে: তারারাজি আর ছায়াপথের ব্যাপারে আমি খুব আগ্রহী। মনে হয় তুমিও, না? তুমি কী ভাবছ, সে বিষয়ে আমি তোমার কাছ থেকে একটা চিঠির অপেক্ষা করছি, ওসনাত। দুটি শব্দ হলেও চলবে। আমি অপেক্ষা করছি। আরিয়েলা বি.

এ চিঠিটির, যা ডাকবাক্সে পড়ে ছিল, উত্তর না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। সে দুবার পড়ে চিঠিটি, ভাঁজ করে এবং ড্রয়ারে পুরে রাখে। সে এখন একেবারে নিশ্চল দাঁড়ানো, জানালা দিয়ে বাইরে দেখে। বেড়ার ধারে তিনটি বিড়ালছানা: একটি তার থাবা কামড়াতে ব্যস্ত, আরেকটি উবু হয়ে আছে, সম্ভবত ঘুমাচ্ছে, কিন্তু তার কান দুটি সন্দেহজনকভাবে খাড়া, যেনবা কোনো পাতলা ধ্বনিকে ধরতে উদ্যত, তৃতীয়টি খুবই বাচ্চা, তার নিজেরই লেজকে ধাওয়া করতে গিয়ে বারবার পড়ে যাচ্ছে এবং পিঠের ওপর গড়িয়ে পড়ছে আলতোভাবে। কাপের চা ঠাণ্ডা করে দেয়ার মতো মৃদু বাতাস বইছে। ওসনাত জানালা থেকে সরে গিয়ে সোফায় সোজা হয়ে বসে। তার হাতজোড়া হাঁটুতে রাখা, চোখ বন্ধ। একটু পরই সন্ধ্যা হবে। সে তখন রেডিওতে হালকা সংগীত শুনবে এবং বই পড়বে কোনো। তারপর সে কাপড় ছাড়বে, কাজ শেষের পোশাকগুলো ভাঁজ করে রাখবে পরিপাটি করে, আগামীকালের কাজের পোশাক বের করে গুছিয়ে রাখবে, স্নান করে বিছানায় যাবে এবং ঘুমিয়ে পড়বে। তার রাতগুলো স্বপ্নহীন এখন এবং সে অ্যালার্ম বাজার আগেই জেগে ওঠে। কবুতররা জাগিয়ে দেয় তাকে।

 

হিব্রু থেকে ইংরেজি অনুবাদ: সন্ড্রা সিলভারস্টোন