প্রিয়তমা তোমাকে অভিবাদন, যেখানে কবি শহীদ কাদরী বলেছেন— ভয় নেই/ আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী/ গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে/ মার্চপাস্ট করে চলে যাবে/ এবং স্যালুট করবে/ কেবল তোমাকে প্রিয়তমা। এ কবিতাটি আমার অন্যতম প্রিয় কবিতা। আমার সঙ্গে শহীদ কাদরীর প্রথম পরিচয় বাংলাবাজারের একটা প্রেসে। তখন কী কারণে আমি সেই প্রেসে যাই, মনে করতে পারছি না। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া থেকে ঢাকায় আসার পর ঢাকার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় ছিল না। তো একদিন সন্ধ্যার দিকে লুত্ফর রহমান আমাকে বললেন, তোমাকে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের অনুষ্ঠানে কবিতা পড়ার আহ্বান করা হয়েছে। আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আমন্ত্রণটি জানিয়েছিলেন বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর। আমি নির্দিষ্ট দিনে আমার সবচেয়ে ধোপ-দুরস্ত একটি খদ্দরের পাঞ্জাবি-পাজামা এবং সেই রাবারের স্যান্ডেল পরে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের অনুষ্ঠানে হাজির হলাম। সঙ্গে লুত্ফর রহমানও আছেন। সেখানে যাওয়ামাত্র আমাকে বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। একসময় দুজন সঙ্গীসহ আসরে প্রবেশ করলেন কবি শামসুর রাহমান। তার এক পাশে খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা একজন স্বাস্থ্যবান যুবক। নাম শহীদ কাদরী। আসরের শেষ দিকে এসে চা পর্ব শুরু হলো। আমি শামসুর রাহমানের সামনে গিয়ে তার সঙ্গে যেচে পরিচিত হলাম। তার পাশে যে দুজন বসে ছিলেন, তারা এক রকম অবজ্ঞাভরে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। এদের একজন শহীদ কাদরী, অন্যজন ফজল শাহাবুদ্দীন। শামসুর রাহমান বাড়ির দিকে রওনা দেয়ামাত্রই আমাকে শহীদ কাদরী কনুই আকর্ষণ করে টানল, আরে ইয়ার চলো আমাদের সঙ্গে। শামসুর রাহমান তো বাড়ি গেলেন, আমাদের সঙ্গে চলো, বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে বসি। তোমাদের সঙ্গে একটু খোশগল্প করি। আমি এদের অনুসরণ করে বাংলাবাজারের পথ ধরলাম। তখনো আমার জানা ছিল না যে, বিউটি বোর্ডিংয়ের রাস্তার পাশেই কাদরীর আস্তানা। এখানে এসে ফজল ও শহীদ কাদরীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমি একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বুঝলাম, পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের আদর্শগত টার্গেট মার্ক্সবাদের সঙ্গে এদের মৌলিক বৈপরীত্য আছে। এখানে আমি শহীদ কাদরীর বিদ্যাবত্তা, তাদের ঢাকায় রিফিউজি হয়ে আসার কথা জানতে পারি। জানতে পারি যে, কাদরীর মরহুম আব্বাজান কলকাতার একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকের সম্পাদক ছিলেন। যে পত্রিকাটি আদর্শগত দিক থেকে মুসলিম স্বার্থের অনুকূল। এর মধ্যে আমি কাজের খোঁজে এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করতে লাগলাম এবং কাফেলায় নিত্য যাওয়া-আসাও করছি। বিকালে চলে যাই বিউটি রেস্টুরেন্টে, শহীদ কাদরীকে পাওয়ার আশায়। শহীদ আমাকে দেখেই বেশ খুশি হয়ে ওঠে এবং ইউরোপীয় কবিতার জ্ঞানগম্ভীর ভাব ছেড়ে আমাকে সাহিত্য সম্পর্কে পাকামি করার কায়দা-কানুন শেখাতে থাকলেন। আমি তার কথায় একেবারেই ভড়কে যাইনি। তবে গ্রাম্য সতর্কতার কারণেই আমি কাদরীকে বিশ্বাস করতাম না। ওর মধ্যে এক ধরনের অপমান করার, বিদ্রূপ করার, অবশেষে ক্ষতি করার একটা টেনডেন্সি দেখতে পাই। অবশ্য এটা যে শুধু আমার সঙ্গেই শহীদ করেছে তা নয়, সে করেছে নিজের জীবনের সঙ্গেও। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে তার প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল, সেটা হলো ক্রমাগত পড়ে যাওয়ার অক্লান্ত স্বভাব। ভালো খাওয়া ও ভালো পোশাক কাদরী পছন্দ করত। কিন্তু যে বিষয়ে চর্চা ছিল তার প্রতিষ্ঠার কারণ, সে ব্যাপারে আমার মনে হতো, কাদরীর এক ধরনের উন্নাসিকতা ছিল।
শহীদই আমাকে তাদের বিউটি বোর্ডিংকেন্দ্রিক আড্ডায় আসার সুযোগ করে দেয়। আমি গ্রাম থেকে এসে এখনকার যে মতিঝিল, তার আশপাশ এলাকায় থাকতাম। পরে অবশ্য কাদরীর কারণেই আমি বিউটি বোর্ডিংয়ে স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করি। শহীদ কাদরী ও আমি প্রায়ই একসঙ্গে রাতের পর রাত আড্ডা দিয়ে ঘুরে কাটিয়েছি। আমাদের মাঝে কাব্য ঈর্ষা ছিল, কিন্তু আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। তখনকার সময়ে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ হলে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি কাজ করত, মনে হতো আমিও কবি। আমার প্রকাশিত কবিতাসহ যেদিন আমার হাতে ‘কবিতা’ পত্রিকাটি এল, সেদিন বলে বুঝাতে পারব না, কী আনন্দঘন মুহূর্ত ছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেদিন শহীদ কাদরীর মা মারা যান। আগেই যেহেতু বললাম: কাব্য ঈর্ষাটা প্রবল ছিল, তাই এ কারণে হয়তো শহীদের সেদিন একটু খারাপও লেগেছিল। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও আমাদের ভালো কবিতা লেখার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল।
তখন বিউটি রেস্তোরাঁটা ছিল আমার কাছে নেশার আকর্ষণের মতো। গিয়েই সেখানে শহীদকে পেয়ে গেলাম। এবং বললাম কাফেলার জন্য একটা কবিতা দিতে।
কী ব্যাপার!
মনে হচ্ছে কাফেলা পত্রিকাটি আমাকেই দেখতে হবে।
ও! বহুত আচ্ছা। ওয়াসেকপুরী ভাগোরাই?
আজই চাকরি ছেড়ে গেলেন!
কনগ্র্যাচুলেট আল মাহমুদ! তাহলে দাবার চালে কিস্তিমাত?
আমিও তার সঙ্গে হাসলাম, যদিও বিষণ্ন হাসি।
অতি উত্সাহে শহীদ কাদরী চেঁচিয়ে ওঠল। এই প্রহ্লাদ বাবু। এই বেকার কবি পাশা উল্টে দিয়েছে। কাফেলায় ঢুকে পড়েছে। দু’কাপ চা লাগান। এই গাঁইয়া কবিকে একটু খাতির করি। পাশের টেবিল থেকে একটি ফর্সা তরুণ হো হো করে হেসে উঠল। আমি এখানে শহীদদের সঙ্গে চা-টা খেয়ে বললাম, কাদরী সাহেব, সন্ধ্যার দিকে একটু মিল্লাতে যেতে হবে। মনে হয় সেখানেও কিছু হয়ে যাবে।
তাই নাকি? এ তো দেখি রাজরাজড়ার মতো কথাবার্তা।
আমি হাসলাম।
চলো দোস্ত, তোমাকে রাইসা বাজার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। মনে হয় পকেটে মাল আছে। আমাকে তাহলে একটা সিগারেটের প্যাকেট কিনে দিও। আমি কাদরী সাহেবকে নিয়ে নবাবপুরের দিকে হাঁটা দিলাম।
একদিন শহীদ কাদরী এসে আমাকে বোঝাল যে, এসব কবিতা-টবিতা আসলে ছেলেখেলা। ওসব ছেড়ে আমাদের মতো কবিদের নাকি দর্শনচর্চা করা উচিত। আমি শহীদের কথায় খুব হাসছি দেখে কাদরী একটু ফাঁপড়ে পড়লেন। আমি তাকে একেবারেই পাত্তা না দিয়ে একটি সিগারেট অফার করে পাশ কাটিয়ে ফজলের অফিসে চলে গেলাম। পরদিন আমি বললাম, কাদরী সাহেব, কাল তোমার দর্শনচর্চার বিষয়টি ঠিকমতো হজম করতে পারিনি। আজ বলো, আমি হূদয়ঙ্গম করতে চেষ্টা করব। আমার কথায় কাদরী সিগারেটে একটা মস্ত টান মেরে ধোঁয়া উগরে দিয়ে হো হো করে হাসতে লাগল— আরে গাঁইয়া আল মাহমুদ, তুমি ফিলোসফি বুঝতে চাও! ওটা হলো এক অখাদ্য ব্যাপার। তার চেয়ে নতুন সাহিত্যে তোমার কবিতাটি দারুণ সুন্দর। শেষ লাইনগুলোয় তুমি যেখানে লিখেছ, ‘আমি জলপান শব্দের শিকারি’ তা খুবই তাত্পর্যপূর্ণ।
আমি, শামসুর রাহমান ও কাদরী প্রহ্লাদ বাবুর দোকানে চা খেতাম আর আড্ডা দিতাম। এক কাপ চায়ের বদলে অনেকক্ষণ বসে আড্ডা দিতাম। অবশ্য লোকটা এ কারণে আমাদের প্রতি কিছুটা বিরক্তও ছিল। একদিন কী কারণে হিন্দু-মুসলমানের মারামারি শুরু হয়। সেদিন আমরাই বাবুর দোকানটা বাঁচিয়েছিলাম। তার পর আমরা হলাম ওখানকার নিয়মিত আড্ডাবাজ। তবে যেহেতু আমি চাকরি করতাম তখন একটা পত্রিকায়, তাই আমি সন্ধ্যাবেলা ছাড়া আসতে পারতাম না। শহীদ ছিল নিরেট সহজ-সরল মানুষ। যতই মন খারাপ থাকুক না কেন, একটা কবিতা লিখতে পারলে ওর মন ভালো হয়ে যেত। ও খুব অন্তর্মুখী একজন মানুষ ছিল। কষ্ট পেলে তা নিজের মাঝে আড়াল করে রাখত। আর কারো সঙ্গে কোনো বিষয়ে তর্কে জড়াত না। কেউ যদি ওর মতামত গ্রহণ না করত, ও সেখানে চাপ সৃষ্টি করত না। এটুকু ভদ্রতা শহীদের ছিল নিঃসন্দেহে।
বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে ছিল ওর অগাধ জ্ঞান। বিশ্বসাহিত্যের মুগ্ধ পাঠক ও ত্রিশের কবি বুদ্ধদেব বসুকে যোগ্য সম্পাদক ও জীবনানন্দ দাশকে প্রিয় কবি মনে করার পরও ত্রিশের রূপকপ্রধান কবিতা তাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। কবিতায় রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিসিজম ও নজরুলের সরাসরি উচ্চারণের প্রতি তার এক ধরনের দুর্বলতা ছিল। আর এ দুর্বলতা আমারও আছে। ফলে আমি ও শহীদ কাদরী মিলে মূলত ত্রিশের কাব্যবলয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার যে প্রচেষ্টা তার পক্ষে অবস্থান নিই। ত্রিশের দশকের কবিদের বলয়ের বাইরে গিয়ে নতুন সংগ্রামে শামিল হওয়ার যে প্রেরণা, তা কাজে লাগানো সম্ভব ছিল না, যদি না কাদরী পাশে থাকত। ওই সময় কিন্তু আমার বন্ধু রাহমান জীবনান্দে আচ্ছন্ন। তার ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ কাব্যগ্রন্থটিতে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। তাই বাংলা কবিতা কিছুটা হলেও ঋণী আমার বন্ধু শহীদ কাদরীর কাছে।
অনেকে আমার সোনালী কাবিনের উত্সর্গপত্রে কাব্যহিংসা অমর হোক, এ নিয়ে অনেক কথা বলে। কিন্তু এত কিছুর পরও আমার কাদরী, শামসুর রাহমান ও ফজল শাহাবুদ্দিনের বন্ধুত্ব চিরকাল ছিল।
শহীদ কাদরীর মাধ্যমে আমি বিশ্বসাহিত্যেও নানা খ্যাতিমান লেখকের নাম শুনেছি। আর তাদের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হয়েছি। এমন পাঠপাগল বন্ধু আমার আর ছিল না। সে যখন নিউইয়র্ক থেকে ফোন করত, বলত, ‘আমি শহীদ।’ আর হা হা হা করে হাসত। তার সেই গাঢ় স্বর আমার এখনো মনে আছে। আর শুনব না! তার বই উত্তরাধিকার (১৯৬৭), প্রিয়তমা তোমাকে অভিবাদন (১৯৭৪), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯) শহীদ কাদরীর কয়েকটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যে অবশ্যই আমার প্রিয় প্রিয়তমা তোমাকে অভিবাদন। কাদরী তো নাগরিক কবি, সবাই বলে। আসলে কলকাতা থেকে আসার পর গ্রামজীবনের কোনো অভিজ্ঞতা ওর ছিল না। কলকাতা শহর থেকে ও শুধু ঢাকা শহরে আবাস পরিবর্তন করল। কিন্তু ওর কবিতার বোধ ছিল অত্যন্ত প্রখর।
মানুষ যে ধরনের জীবন আকাঙ্ক্ষা করে, আল্লাহ তাকে সে ধরনের জীবনাচরণই দেন সম্ভবত। কাদরী সারা জীবন বিদেশেই কাটিয়ে দিল। অবশ্য এটাও আমি ভাবি, এখানে থেকেইবা কী হতো? তার তো কোনো দেশ, দশ ও দায়িত্ববোধ ছিল না। এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে গুলিস্তান রেস্তোরাঁয় বসত, আর রাত ১০টায় আড্ডা ভেঙে উঠে যেত। একটি রেস্তোরাঁয় দীর্ঘদিন কাটাতে না পারলে অন্য রেস্তোরাঁয় চলে যেত। বিউটি বোর্ডিং থেকে রেকস রেস্টুরেন্টে, সে জায়গাটা পুরনো হয়ে গেলে কিংবা অবিশ্রাম আড্ডায় বাধা সৃষ্টি হলে অন্যত্র চলে যেতে অসুবিধা কী। এক অদ্ভুত ধরনের শহুরে চরিত্র তৈরি করে নিয়েছিল কবি শহীদ কাদরী।
একবার আমি চট্টগ্রাম আসার আগে শহীদ কাদরী আমাকে রায়সাহেব বাজারের চশমার দোকান থেকে ধরে নিয়ে গুলিস্তান রওনা দিল। সে সোজা এসে তখনকার গুলিস্তান এলাকার সবচেয়ে ভালো কাবাব প্রস্তুতকারক রেকস রেস্তোরাঁয় এসে ঢুকল। ওই জায়গায় ছিল কাদরী সাহেবের আড্ডার আসর। এ আসরে বসলে রাত ১২টার আগে ওঠা যেত না। তো সেদিন এখানে ঢুকে কিছুক্ষণ গালগল্প করার পর গল্পকার ও কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক এসে প্রবেশ করলেন। হাসান প্রগতিশীল লেখক হিসেবে তখন বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কী একটা বিষয় নিয়ে যেন কাদরী সাহেবের সঙ্গে বেধে গেলে, হাসান মার্ক্সবাদী আদর্শের ওপর তার আস্থার কথা সুন্দরভাবে ব্যক্ত করলেন। কাদরীর তখন প্রকৃতপক্ষে কোনো আদর্শ ছিল না। ছিল ইউরোপীয় সাহিত্যের কিছু জ্ঞান ও কিছু দার্শনিক পড়াশোনা। কাদরী সাহেব হাসান আজিজুল হককে নানা রেফারেন্স উল্লেখ করে জব্দ করতে চাইল। কিন্তু হাসান ছিলেন অনড়। নিজের আদর্শগত রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর অত্যন্ত অবিচল। যেকোনো কারণে হোক, আমিও তখন হাসান আজিজুল হককে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিলাম। আমি জানতাম যে, কাদরী সাহেবের কোনো আদর্শ নেই। সে কেবল পাশ্চাত্য সাহিত্যের দোহাই দিয়ে এ দেশের কম ইংরেজি জানা লেখকদের মাথা ঘুরিয়ে দিতে চাইত। তবে এ দেশে বসে জগেক জানা আর নিউইয়র্কে বসে জানা, এ দুই জানার মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না।
আমি ঢাকায় এসে যখন সমকালের দপ্তরে গিয়ে আমার কতগুলো কবিতা সমকাল সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের হাতে তুলে দিলাম, তার আগে ওই সনেট সাতটি নিয়ে আমি সকালে শহীদ কাদরীর বাসায় গিয়েছিলাম। সে তখনো চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আমি তার মুখের কাপড় সরিয়ে বললাম, কয়েকটি সনেট লিখেছি। শোনো।
কাদরী চোখ খুলে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ‘সোনালী কাবিন’-এর প্রথম সাতটি সনেট শুনে উঠে বসে পড়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিল, ভালো হয়েছে। আমি চট্টগ্রাম ফিরে আসার কিছুকালের মধ্যে কাদরী এসে আমার মেহমান হলো। বলল, কয়েক দিন থাকব। এ কথায় আমি মুহূর্তে আন্দাজ করে নিয়েছিলাম যে, ঢাকায় কোনো অঘটন ঘটেছে। হতে পারে এটা কাদরীর পারিবারিক কিংবা শামসুর রাহমানের সঙ্গে কোনো বিষয়ে শহীদ কাদরীর বৈপরীত্য প্রকট রূপ ধারণ করেছে। এ সময় কাদরী চুপচাপ থাকত। শুধু খাওয়ার সময় খানিকটা উত্সাহ দেখেছি। মাছ-মুরগি সবই সাবাড় করেছে। কিন্তু খাওয়ার পর বাসায় এসে চুপচাপ শুয়ে পড়ত। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার ভেতরের কথা বের করতে পারিনি। এর মধ্যে সুচরিত চৌধুরী এসে যোগ দিলেন। কাদরী সাহেবকে কিছু পান-টান করার আহ্বান জানালে সে দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করতে লাগল। কিন্তু সন্ধ্যার আসরে সুচরিত বাবুর প্ররোচনায় বেশ খানিকটা মদপান করে ফেলল। প্রথমে তো খাব না, খাব না। পরে পিঁপেসুদ্ধ গলায় ঢেলে দিয়ে ভেতরের বিষ উগড়ে দিলেন। শামসুর রাহমানকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করছিল।
আমি চট্টগ্রাম যাওয়ার কয়েক বছর আগে দৈনিক পাকিস্তান বলে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার যিনি প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি আমাকেও নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি দেখলাম, সেখানে শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন সম্পাদকীয় বিভাগে উচ্চপদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন কবি আহসান হাবীব। প্রুফ রিডার ছাড়া আমার পক্ষে ওখানে আর কোনো কাজ জোটানো সম্ভবপর ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি সেখানে যাব না। আমার সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল, সেটা শহীদ কাদরী আমাকে প্রায়ই বলত।
২৬ মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মধ্যরাতে বিপুল বিক্রমে ঢাকা নগরীর ঘুমন্ত অধিবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাঞ্জাবি হানাদারদের বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞে গুলি ও কামানের শব্দে মানুষের কানের পর্দা বিদীর্ণ হতে লাগল। আমি সেদিন ইত্তেফাক অফিস থেকে ৯টার মধ্যে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমার আসার অল্পক্ষণ পরই সম্ভবত ইত্তেফাক অফিসে আক্রমণ চালানো হয় এবং অফিসটিকে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এতে কয়েকজন শহীদও হয়েছেন। কয়েক দিন এদিক-সেদিক লুকিয়ে থেকে আমি সপরিবারে গ্রামের দিকে পালাতে লাগলাম। আমি ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে ইত্তেফাকের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য টিকাটুলী গিয়েছিলাম। মতিঝিলের যেখানে শেষ, সেখানে একটি ওষুধের দোকানে জরুরি ওষুধ কিনে বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমাকে দেখে সে উচ্চশব্দে হেসে উঠেছিল। সে হাসির অর্থ আমার কাছে তখনো যেমন দুর্বোধ্য ছিল, আজো দুর্বোধ্য।
শিল্পী হামিদুল ইসলামের অসাধারণ প্রচ্ছদে ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ বইটি বাজারে বের হলে কিছুদিনের মধ্যেই এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়। আমি কলকাতায় গেলে কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘পরিচয়’-এর সম্পাদক অমিতাভ দাশগুপ্তের হাতে বইটি দিই। তিনি আমার তরুণ বয়সের বন্ধু ও সুহূদ ছিলেন। বইটি পেয়ে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন এবং পরে আমাকে জানিয়েছিলেন, বইটির ওপর তার কিছু লেখার ইচ্ছা আছে। তার ধারণা, বইটি একটু আধুনিক কবিতার ঐতিহ্যবাহী সংকলন। অথচ এ বইটি মৌলবাদী হিসেবে আমার সুখ্যাতিকে আরো প্রতিষ্ঠিত করল। আমার বন্ধু শহীদ কাদরী আমার কবিতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করলেও ওই বইটির নাম সম্পর্কে দারুণ আপত্তি জানিয়েছিল।
১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন শহীদ কাদরী নাগরিক জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায়। ও আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছে। ওর কবিতায় অনুভূতির গভীরতা, চিন্তার সূক্ষ্মতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট। মাতৃভাষা বাংলা না হয়েও কবি শহীদ কাদরী বাংলা ভাষা শিখলেন এবং বাংলা ভাষার একজন কবি হয়ে গেলেন। এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে। বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা, প্রহ্লাদ বাবুর দোকানে চা, শহীদ কাদরীর সঙ্গের স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো আমাকে নাড়া দেয়। জীবনে বেশি বছর বেঁচে থাকলে কাছের মানুষগুলোর মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়। আমার বন্ধু রাহমান বিগত হয়েছেন, বিগত হয়েছেন ফজল আর এবার বিগত হলো কাদরী। কখন যেন আবার আমার ডাক আসে। এ বৃদ্ধ বয়সে কাছের বন্ধুদের মৃত্যুর খবরের মতো হূদয়বিদারক কোনো সংবাদ থাকতে পারে না। (৩০-০৮-২০১৬)
লেখক: কবি




