সজলনয়না দেবীর জন্ম সূত্রাপুরে, ১৮৭৫ সালে। কলতাবাজার ও বাংলাবাজারের স্মৃতিসমৃদ্ধ মনোদা দেবীর জন্ম ১৮৭৮ সালে, বিক্রমপুরে। ১৯২২-এ জন্মগ্রহণ করেন বাসন্তী গুহঠাকুরতা। এই তিনজন বিশিষ্ট নারীর স্মৃতিতে কেমন ছিল তাদের স্মৃতির ঢাকা, তারই খণ্ড খণ্ড অংশের কোলাজ ‘নারীর স্মৃতি, স্মৃতির ঢাকা’।
সূত্রাপুরের সজলনয়না দেবীর সুখের শহর
সূত্রাপুরে নানাবাড়িতে ১২৮২ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৮৭৫) সজলনয়না দেবীর জন্ম। নানা হারাণচন্দ্র সরকার। পিতা খ্যাতিমান সাংবাদিক মহিলাল ঘোষ, তিনি অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
সজলনয়নার স্মৃতিতে উঠে এসেছে ১৮৮০ থেকে ১৮৮৫— এই সময়ের ঢাকা। তখন রাস্তায় ফুটপাত ছিল না, গ্যাসের আলো ছিল না, বাড়িতে টিউবওয়েল ছিল না, ছিল না পাতকুয়া। সোনার ভরি ১৬ টাকা, রুপা ১ টাকা। পাত ক্ষীর, সানি ক্ষীর আর ছাপার মাখন ফেরিওয়ালারা ডেকে ডেকে বিক্রি করত।
সজলনয়নার নানা হারাণবাবু ঢাকা ফৌজদারি আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন। ঢাকা শহরের বিত্তশালী লোকদের সঙ্গে তার জানাশোনা, এমনকি ঢাকার নবাব গণি মিয়ার (নবাব আবদুল গণি) বাড়িতেও মাঝে মাঝে যেতেন বলে তার নাতনি উল্লেখ করেছেন। ঢাকার ধনাঢ্য তিন ভাই— সনাতন, রূপ ও রঘু সেরেস্তাদার সাহেবকে মান্য করতেন। ধনীলোকের মেয়েদের সাজসজ্জা সজলনয়নার স্মৃতিতে উঠে এসেছে:
‘ঢাকার মেয়েদের আবার তেমনি সাজবাহারে ধুম ছিল, কি রাশিকৃত গহনা যে পরত, তা বলে শেষ করতে পারি না। সব আমার মনে নেই...মাথায় ফুল- চিরুনি, কানে কানবালা, চৌদানী, মাকড়ি, গলায় হাঁসুলী (আরো চার-পাঁচ ধরনের অলঙ্কার গলায়। কিন্তু তিনি নাম মনে করতে পারছেন না।), উপর হাতে তাবিজ, যশম, অনন্ত, বাজু। নিচের হাতে পিন খাড়ু, চুড়ি, যবদানা, মটরদানা, নারিকেল ফুল, পুঁইছে, বালা ইত্যাদি। কোমরে গোট, চন্দ্রহার। পায়ে গুঞ্জরী-পঞ্চম, পাঁছর, বাঁকমল, চরণপদ্ম। গায়ের কোনো জায়গায় ফাঁক থাকত না।’
সজলনয়না রূপবাবুর ছেলে রাধাবল্লভের বিয়েতে গিয়েছিলেন। রাধাবল্লভের স্ত্রীর নামটা পুরুষালি ধরনের— নরেশ। সজলনয়নার মাসিমার বান্ধবী। দিনের বেলা রূপবাবুর বাড়ি যাওয়ার রাস্তার দুধারে বাজি পুঁতে দেয়া হলো, রাতে যোগ হলো বাজনা, আলোর বাহার, সাজানো হাতি, ঘোড়া, শোলার পাহাড়, সঙ আরো কত কী। এসবের সঙ্গে চতুর্দোলায় চড়ে বর এল। সজলনয়নার স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধৃতি:
ঢাকার বিয়ের আর একটা বিশেষত্ব— বাড়িতে যখন বিয়ে হবে মেয়েরা সমস্ত দিন চিত্কার করে গান গাইবে। আবার তাদের ভাষা এমন যে আমি কিছুই বুঝতে পারতাম না। শুনতেও বিশেষ ভালো লাগত না। তবে রূপবাবুরটা অনেকটা মার্জিত রুচিসম্পন্ন হয়েছিল। তাদের কথা পরিষ্কার আর গহনার ভিতর যেগুলো নিতান্ত সেকেলে সেগুলো বাদ পড়েছিল।
ঢাকার মেয়ে ও তাদের অভিভাবকরা মেয়েদের ব্যাপারে খুব আব্রু সচেতন ছিলেন: ‘যারা খুব বড়লোক তাদের বাড়িতে হাতি থাকত, হাতির উপর হাওদা দিয়ে সকলে চড়ত। সাধারণ লোকে ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করেই যাওয়া-আসা করত। মেয়েরা যখন কোথাও যাবে বাড়ির ভেতর থেকে গাড়ি পর্যন্ত, দুদিকে দুখানা কাপড় কিংবা চাদর দিয়ে আড়াল করে রাখত, যাতে বাইরের লোক না দেখে ফেলে। গরিব মুসলমানের মেয়েরা বোরকা পরে রাস্তায় বেরুত। ব্রাহ্ম সমাজের ভিতরেও মেয়েরা চিকের আড়ালে থাকত।’
তিনি দেখেছেন, হিন্দু বিধবারা অত্যন্ত শুচিবাইগ্রস্ত। ভাঁড়ার কিংবা ঠাকুরঘরে চুনকাম করতে হলে নিজেরাই করতেন, মুসলমান রাজমিস্ত্রি ঢুকতে দিতেন না।
সজলনয়না দেবী ছোটবেলায় কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছেন অনেকবার। সেরেস্তাদার বাবুর তিনটি বাড়ি ছিল সূত্রাপুরে, প্রথমে ভাড়া দেন, পরে একেবারে বিক্রি করে ফেলেন। তখন ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
ঢাকায় বিশাল হরিলুটের কথা, কীর্তনের পর এমনকি ধনীদেরও ধুলায় গড়াগড়ির কথা, খাবারের বৈচিত্র্য ও পর্যাপ্ততার কথা তার খুব মনে পড়ে।
“ঢাকার মোরব্বা অত্যন্ত বিখ্যাত ছিল। শ্রীহট্ট থেকে মোরব্বা আমদানি করা হতো। কমলালেবু, নারেঙ্গালেবু, আমলকী, হরীতকী, শতমূল— এইসব মোরব্বা ছিল আমাদের অত্যন্ত প্রিয়। ঢাকায় এতদিন ছিলাম কিন্তু গরীব ভিখারী একদিনও দেখিনি। সমস্ত শহরের বেশির ভাগ লোকই সামান্য ক্রিয়াকর্মে আড়ম্বরটা খুব পছন্দ করত। বিবাহ ব্যাপারের তো কথাই নেই। বিবাহের উত্সব দশ দিন পর্যন্ত হবে আর গাড়ি বোঝাই লোক (এক গাড়িতে দশ-বারজন পর্যন্ত) কেবলই নিমন্ত্রিত খেতে যাবে। কুটুম্বর নাম হলো ইস্ট। বিয়ের সময় নিজে ‘ফুল কোটা’ নিয়ে বরকে বরণ করবে (‘ফুল কোটা’ এক রকম ক্রিয়া, ফুল নিয়ে বরের সম্মুখে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করা; তা দেখতে বেশ সুন্দর)। তারপর তত্ত্ব পাঠানো। আজকার মতো থালায় করে সন্দেশ পাঠানো নয়, সমস্ত জিনিস বাঁকে করে আন্দাজ ত্রিশজন লোক নিয়ে যাবে। সঙ্গে বাজনা বাজতে বাজতে যাবে, সে এক বিরাট দৃশ্য। তত্ত্বর নাম হাড়ু।” সে আমলের ষষ্ঠীপূজাকে বলা হতো পুয়ানি। পর্যাপ্ত খানাপিনার সঙ্গে বাইজি নাচ, সাহেব-বিবি নাচ এবং ইংরেজি বাজনা অবিরাম বাজত।
বাংলাবাজারের মনোদা দেবীর ঢাকা শহর
মনোদা দেবীর জন্ম বিক্রমপুর পরগনার সোনারং গ্রামে, ১৮৭৮ সালে। বাবা ডাক্তার কৈলাশচন্দ্র সেন মনোদার শৈশবে প্রয়াত হলে দাদু রায়বাহাদুর আনন্দচন্দ্র সেন তাকে লালন করেন এবং বরিশালে তার কর্মক্ষেত্রে নাতনিকে সঙ্গে রাখেন। আনন্দচন্দ্র ডাকসাইটে ম্যাজিস্ট্রেট।
ঢাকার ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট হেয়ার সাহেব ছয় মাসের ছুটিতে বিলেত যাচ্ছেন। আনন্দচন্দ্রকে তার স্থলাভিষিক্ত হতে হবে। বরিশাল থেকে নৌপথে ঢাকায়, ডাকাতরা যখন মাঝপথে জানতে পারল ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব যাচ্ছেন, ডাকাতির বদলে কীভাবে বিচারকের সেবা করবে তার খোঁজখবর নিতে শুরু করল। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে নৌকা বুড়িগঙ্গায়।
‘যথাসময়ে আমাদের বহু জনপূর্ণ গ্রীণবোটখানা ঢাকার বুড়িগঙ্গার ঘাটে নোঙর গাড়িল। হৈ-চৈ করিয়া ছেলের দল তীরে নামিয়া পড়িল। ঠাকুর, চাকর, চাপরাশির দল ঘোড়ার গাড়ির সন্ধানে ছুটিয়া চলিল, মালবাহী গাড়িও কয়েকটা আসিয়া দাঁড়াইয়া গেল। আমরা হৈ-চৈ করিয়া ঘোড়ার গাড়িতে উঠিয়া বসিলাম, পশ্চাতে রহিয়া গেল বরিশালের আনন্দময় জীবনের মধুর স্মৃতিটুকু। যথাসময়ে ম্যাজিস্ট্রেট হেয়ার সাহেবের কুঠিতে কলতাবাজারে আমরা সকলেই পৌঁছাইয়া গেলাম। সাহেবদের বাড়ি ঝকঝকে তকতকে ম্যাটিং করা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন; অনেকগুলি কোঠা, সাজসজ্জাও বেশ মনোহর ছিল... ফল ও ফুলের গাছগুলি অতি সুন্দরভাবে সজ্জিত ছিল, তন্মধ্যে অধিকতর লোভনীয় ছিল নারিকেল কুলের গাছটি।’
দেয়ালঘেরা বিশাল বাড়ি। সিংহ-দরজায় দশাসই দারোয়ান। এ বাড়ির পাট চুকিয়ে একসময় মনোদা পিতামহের পরিবারের সঙ্গে ঠাঁই পেলেন বাংলাবাজারে। তার জন্য স্কুলও ঠিক করা হলো। ইডেন স্কুলের ঘোড়ার গাড়ি বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ায়— ঘর থেকে মাত্র কয়েক পা।
‘(ইডেন স্কুলে) আমাদের বাংলার শিক্ষয়িত্রী শ্রীযুক্তা মনোরমা মজুমদার (ভবিষ্যত্ জীবনে ডাঃ নীলরতন সরকারের শ্বশ্রূমাতা ও তটিনী গুপ্তার মাতামহী) খুব শান্ত প্রকৃতি ও স্নেহশীলা ছিলেন, তিনি আমাদের খুব স্নেহ করিতেন। তাঁহার এক মেয়ে উর্মিলা আমার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়িত, ক্রমে সে আমার পরম বন্ধু হইয়া গেল। গেন্ডারিয়ার নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের এক মেয়ে চারুও আমার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল (ভবিষ্যত্ জীবনে চারুর সুবিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে বিবাহ হইয়াছিল)।...
স্কুলে পড়াশোনা ভালোই চালাইয়া যাইতেছিলাম, ক্লাসে প্রত্যেক বিষয়েই প্রথম বা দ্বিতীয় থাকিতাম এবং বত্সরান্তে প্রথম প্রাইজ লইয়া বাড়ি ফিরিতাম। উর্মিলা ও আমি একটু সহজ-সরল অর্থাত্ যাকে বলে হাবাগোবা। চারু ছিল খুব শার্প মেয়ে কিন্তু পড়াশোনায়, খেলাধুলায় ও গায়ের জোরে আমি ছিলাম ক্লাসের প্রথম ছাত্রী। ইডেনের গাড়ি সূত্রাপুরে লোহার পুলের এ পারে দাঁড়াইত, ঝি নামিয়া যাইয়া গেন্ডারিয়ার বাড়ি হইতে চারুকে নিয়া আসিত। তখনকার গেন্ডারিয়ার সঙ্গে বর্তমান গেন্ডারিয়ার তুলনা করা অসম্ভব। তখন গেন্ডারি বনে ভরা গ্রামখানা ভয়াবহ বলিলেও কোনো অত্যুক্তি হয় না।... আমি কিন্তু শত নিষেধ সত্ত্বেও ঝির সঙ্গ ধরিয়া চারুর বাড়িতে উপস্থিত। চারুকে লইয়া গাড়িতে ফিরিতাম। ইক্ষুপাতার তীক্ষ ধারে অনেক সময় হাত-পা ছড়িয়া যাইত এবং রক্ত বাহির হইত, কিন্তু আমার তবু যাওয়ার উত্সাহ কমিত না।’
স্যার কে জি গুপ্তের পিতা শ্রীযুক্ত কালী নারায়ণ রায় গৃহশিক্ষক হিসেবে মনোদা ও অন্য শিশুদের সাগ্রহে পড়াতে আসতেন। কালী নারায়ণ বাবু আসলে বড় জমিদার ছিলেন। কিন্তু অতি সরল, নিরাভরণ জীবনযাপন করতেন। তারই দৌহিত্র অতুলপ্রসাদ সেন ঢাকাতেই পড়াশোনা করতেন। মনোদা দেবী পূর্ববঙ্গের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টারিয়ান আশালতা সেনের মা। তার জীবনের কয়েকটি বছর ১৮৮৫ থেকে ১৮৮৮ (বয়স তখন ৭ থেকে ১০ বছরের মধ্যে) তুলে এনেছেন ‘সেকালের গৃহবধূর ডায়েরি’তে। ঠিক ডায়েরির মতো করে লেখা হয়নি, শেষ পর্যন্ত এটি হয়ে উঠেছে জীবন ও পুরুষশাসিত সমাজের একটি দলিল।
‘আমাদের বাংলাবাজারের বাসার সম্মুখে একটু অপরিসর জমি ছিল, সেই চত্বরটুকুতে বিকাল বেলা একটি আনন্দের মজলিস বসিয়া যাইত। ইজিচেয়ার ও চেয়ারে ঐ স্থানটুকু সাজাইয়া রাখা হইত প্রত্যহ। দাদামহাশয় অফিস হইতে ফেরার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া ঐ চত্বরখানাতে আসিয়া বসিতেন এবং ক্রমে ক্রমে ২/১ জন করিয়া লোকজনের আবির্ভাব হইতে থাকিত। তন্মধ্যে দেখিতাম আমাদের সামনের রাস্তার উপরে বড় গেইটের একটি বাড়ি হইতে বাহির হইয়া আসিতেন সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন ঘোষ এবং প্রসন্নকুমার বিদ্যারত্ন। ইহারা প্রায় প্রতিদিনই উপস্থিত থাকিতেন। কোনো কোনোদিন রামসুন্দর বসাক (বাল্যশিক্ষা রচয়িতা) আসিতেন, কোনো কোনোদিন ঢাকার সুগায়ক চন্দ্রনাথ রায় (আমার মার কাকা) এবং ঢাকার সুপ্রসিদ্ধ ভগবান সেতারীর আবির্ভাবও হইত।’
সেতারের টুংটাং বালিকা মনোদার উপভোগ করার কথা নয় কিন্তু চন্দ্রনাথ রায়ের গানে তিনি মুগ্ধ হতেন।
মনোদা দেবীর বয়স ১০ হতে না হতেই তার ইডেন স্কুলের পাঠ সমাপ্ত হলো। দাদু তার হাত দিয়ে স্কুলে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল, যাতে অনুরোধ করেছেন স্কুলের রেজিস্টার থেকে যেন মেয়েটির নাম কর্তন করা হয়। মনোদা যেদিন স্কুলের ঘোড়াগাড়িতে স্কুল শেষবারের মতো ছেড়ে আসেন, তাকে ঘিরেছিলেন অশ্রুসিক্ত শিক্ষয়িত্রী এবং সতীর্থরা। দশ বছর চার মাস বয়সে মনোদার বিয়ে হয়ে গেল (১৮৮৮ সালে বিক্রমপুর পরগনার বিদগ্রামের বগলামোহন দাশগুপ্তের সাথে তার বিয়ে হয়। বগলামোহন মেধাবী ছাত্র, প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে বিএ ও বিএল ডিগ্রি লাভ করে আইন ব্যবসায় সাফল্য লাভ করেন)। স্বামীর মৃত্যু হয় ১৯৩০-এ। তারপর মনোদার কাটে ৩৪ বছরের বৈধব্য জীবন। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় ছেলের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।
মনোদা দেবীর বিয়ের পরদিন যারা বউ দেখতে এলেন, তাদের মন্তব্য:
‘আগের বড় ভূঁইয়াদের বৌদের মত অত সাপ (ফর্সা) না।’ কেহ বলিল, ‘গড়ন-পিটন মোটাসোটা আছে, বেশ বড়সড় সেয়ানা বৌ,’ কেহ বলিল, ‘১৪-১৫ বয়স হইবে। আংরেজি পড়া বৌ বড় ক্যান হইব না।’
মন্তব্যগুলো যতটা না মনোদা দেবীকে, তার চেয়ে বেশি পীড়া দিয়েছে তার সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে আসা ধাইপিসিকে।
ধাইপিসি ‘গজর গজর’ করতে করতে বলে, ‘মাইয়াডারে আমার ওকড়াইয়া ওকড়াইয়া শেষ করিয়া দিল, ১০ বছরের মাইয়া, ওরা কয় ১৪-১৫, কী আশ্চর্য কথা! এটা কেমন গ্রাম?’
ফতুল্লার বাসন্তী গুহঠাকুরতার আনন্দের শহর, বেদনার শহর
স্বল্পালোচিত কিন্তু নগর ও নাগরিক জীবন গড়ে ওঠার অত্যন্ত বিশ্বস্ত একটি দলিল বাসন্তী গুহঠাকুরতার ‘কালের ভেলায়’।
উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও ঢাকার পাকা রাস্তার দৈর্ঘ্য ২২ মাইলের একাংশ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোড, একাংশ ঢাকা-টঙ্গী। নারায়ণগঞ্জ ঢাকারই অংশ, জেলার আওতায় মহকুমা। বিক্রমপুর পরগনার বাসন্তীর পরিবার পদ্মার ভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আশ্রয় নেন। ফতুল্লায় তাঁর স্বজনদের জমির ওপর দিয়ে চলে গেছে সমান্তরাল রেললাইন, মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে টেলিগ্রামের খুঁটি, দুই স্টেশন মাস্টারের কথা চালাচালির জন্য টেলিগ্রামের তার। যখন ফতুল্লার বুকের ওপর দিয়ে ট্রেন যায়, ছেলেবুড়ো সব সাগ্রহে লাইনের কাছাকাছি ছুটে আসে। কিন্তু ট্রেন থামে না। গাঁয়ের মুরব্বিরা আবেদন করলেন, স্টেশন চাই, রেলওয়ে জবাব দিল ফতুল্লাতে আয়ের কোনো পথ নেই। তার পরও চাপের মুখে এক মাস পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন থামার আদেশ জারি হলো, যদি টিকিট বিক্রি সন্তোষজনক হয়, তখন বিবেচনা করা হবে। এটাকে সবাই চ্যলেঞ্জ হিসেবে নিলেন। বাসন্তীর বাবা পাড়ার ছেলেদের ধরে ধরে ১ টাকা করে দিতেন, যা ট্রেনে ঢাকা থেকে ঘুরে আয়। স্টেশনটি যে গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রমাণের জন্য অন্যরাও অকারণে টিকিট কিনে ঢাকা থেকে ঘুরে এসেছিল। এভাবেই একসময় স্থায়ী ফতুল্লা স্টেশন হলো।
দুরন্ত শৈশবে রেললাইনে কান পেতে যারা ট্রেনের আগমনী সংবাদ পেতে চেয়েছেন, বাসন্তী তাদের একজন। ১৯৩১-এর আশ্বিনের মাঝামাঝি সময়ের একটি ঘটনা: ‘‘সন্ধ্যার পর সাড়ে ৬টার ট্রেনটা বোধ হয় গেন্ডারিয়া থেকে ফতুল্লা আসছে। পাগলার কাছে আসতেই একটা আলোর জ্যোতি ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমার ঠাকুমা ভয় পেয়ে বাড়ির ভেতরে এসে বলছেন, ‘দ্যাখ দ্যাখ মাটিতে কী রকম আলো ছড়িয়ে গেল। একবার তো আকাশে ধূমকেতুর আলো দেখেছিলাম কয়েক দিন ধরে। মাটিতে তো দেখিনি।’ বলতে বলতে পাড়ার ছোট-বড় ও পাড়ায় চন্দবাড়ির বোসেদের রায়তবাড়ির সবাই রেললাইনের ধারে এসে দাঁড়িয়ে গেল। আলো ক্রমেই ছড়িয়ে লাইনের দুধারের মাঠে পড়ল। তখন বোঝা গেল এটা ট্রেনের নতুন বাতি-সার্চ লাইট— যেমন স্টীমারে থাকে আর বর্ষার স্টীমার ঘুরলে আমাদের বাড়ির দোতলার বারান্দা আলোকিত হয়। এই আলোটা স্টেশনে এলে দিনের মতো আলো হয়ে গেল। তখন কোয়ার্টার থেকে স্টেশন মাস্টার বললেন, ‘এটা সার্চ লাইট, রাতে যাতে কেউ কাটা না পড়ে কোনো রকম দুর্ঘটনা না ঘটে।’’
অলৌকিক এই আলোর টানে ট্রেনের শব্দ কানে এলেই তিনি স্টেশনে ছুটতেন, আর ছিল রহস্যময় ছায়া। ট্রেন থামলে ছায়া থেমে যায়, ট্রেন চললে ছায়া চলে। ট্রেনের গতি বাড়লে ছায়াগুলোও দৌড়ে চলে, আলো-ছায়ার এই সিনেমা বালিকাকে মুগ্ধ করত।
জন্মাষ্টমীর ছুটিতে বাসন্তী চলে আসেন গেন্ডারিয়া। দুদিন ধরে মিছিল।
‘আমরা পুরানো জিপিও পাটুয়াটুলী বাংলাবাজারের মোড়ের কাছে লাল দালানের ওপর থেকে মিছিল দেখতাম। একবার মাত্র নবাবপুরের রথখোলার মোড়ের একটা মনিহারী দোকানে বসে মিছিল দেখছি। ...ঐ লাল উঁচু দালানের লম্বা ছাদে দাঁড়ালে দুদিকে অনেক দূর দেখা যেত। দুটি দল মিছিল বের করত— একটি হলো ইসলামপুরের দল, আরেকটি নবাবপুরের দল। দুই দলে প্রতিযোগিতা ছিল, রেষারেষিও ছিল। একদল বলত ইসলামপুর গরিব, নবাবপুর ধনী, অনেক বড় মিছিল বের করে। তারা বলত, ইসলামপুইরা বাপে পুতে-নবাবপুইরারা হাতেগোতে। ইসলামপুর বাপে-পুতে খরচে মিছিল করে। নবাবপুরের ধনীরা, ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিয়ে মিছিলের খরচ চালায়।’
১৯০২ সালে এই মিছিল দেখে রমেশচন্দ্র মজুমদার মোহিত হয়েছিলেন। বাসন্তীদের বাড়িতে চা পানের রেওয়াজ ১৯৩০ সাল থেকে। তার বড় বৌদি একবার বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এসে চা খেতে আরম্ভ করলেন। নিজে খেতেন, অন্যদের ডেকে খাওয়াতেন। যারা বেড়াতে আসতেন সময়ে অসময়ে, সবাইকে চা দিতেন, তার কারণেই ওই এলাকায় চা প্রিয় পানীয় হয়ে উঠল। ১৯৩৩ সালে বাসন্তী যখন সপ্তম শ্রেণীতে, স্কুলে টিফিন ব্যবস্থা চালু হলো, প্রথম দুই বছর টিফিনের জন্য মাসে ১২ আনা আদায় করা হতো। টিফিন একটা লুচি ও হালুয়া, কোনো দিন ডালপুরী, কোনো দিন একটা মিষ্টি কিছু, কোনো দিন শিঙ্গাড়া।
‘অষ্টম শ্রেণীতে উঠেই আমরা পেলাম নতুন প্রধান শিক্ষিকা— নাম তাঁর মিস ভায়োলেট রয়। বেশ ভারিক্কি ধরনের চেহারা। চালচলনেও তাই— মেয়েরা বলত গজেন্দ্রগামিনী। বেশ বড় বড় চোখ, মিষ্টি চেহারা, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। কিন্তু তার চোখের দিকে চেয়ে কথা বলা যায় না। তিনি কিন্তু আমাদের ক্লাসে কোনো বিষয় পড়াতেন না। নবম শ্রেণীতে অংক করাতেন।’
‘কালের ভেলায়’ স্মৃতিগ্রন্থের একেবারে শেষাংশে বাসন্তী ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে এন্ট্রান্স পাস করেছেন। মেয়েকে নিয়ে বাবার উত্সাহের শেষ নেই। তিনি ইডেন কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করলেন।
‘প্রিন্সিপাল মিস আলফানসো রাজি হলেন। কিন্তু সমস্যা হলো আমার যাওয়া-আসা নিয়ে। ফতুল্লা থেকে ট্রেনে গেন্ডারিয়া-দোলাইগঞ্জ। সেখানে আমি অপেক্ষা করবো— স্কুলের ঘোড়ার গাড়িতে সদরঘাটে ইডেন কলেজে যাবো।’
তত দিনে শুরু হলো শিক্ষাজীবনের আরো একটি পর্ব। ‘আমি এখন আর কিশোরী নই। পরিবর্তনের আগমন বার্তা পেতে থাকলাম দিনে দিনে। সে আর এক জীবন, অভিজ্ঞতায় ভিন্নতর।’
সবচেয়ে বেদনার ছবিটি তাঁকে আঁকতে হয়েছে ‘একাত্তরের স্মৃতিতে’। নীলক্ষেতে বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় থাকতেন অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, তার স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতা এবং তাদের কন্যা দোলা। ২৫ মার্চ-রাতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জ্যোতির্ময়কে হিড়হিড় করে টেনে পেছনের বাগান দিয়ে নিয়ে গেল। বাসন্তী যখন বের হলেন, দেখলেন তাদের ভবনের পাশে ঘাসের ওপর চিত হয়ে পড়ে আছেন গুলিবিদ্ধ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। তখনো তার প্রাণ আছে।




