[সূচনাবিন্দু]
বব ডিলান
[গত সংখ্যার পর]
আমি যখন পৌঁছাই পুরো দস্তুর শীতকাল ছিল সেটা। ঠাণ্ডাটা ছিল নিষ্ঠুর, শহরের প্রতিটি নাড়িনক্ষত্র তুষারে ঠাসা, কিন্তু আমি রওনা দিয়েছি পৃথিবীর এক ছোট কোণ বরফে আক্রান্ত নর্থ কান্ট্রি থেকে, যেখানে অন্ধকার জমাটবাঁধা জঙ্গল আর তুষারে ঢাকা পথঘাট আমাকে ঠেকাতে পারেনি। সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারতাম আমি। টাকা বা ভালোবাসার খোঁজ করছিলাম না। সচেতনতার চড়া একটা বোধ ছিল আমার, নিজের পথ বেছে নিয়েছিলাম, অবাস্তব আবার স্বপ্নচারীও বটে। আমার মন ছিল ফাঁদের মতোই শক্তিশালী, তার জন্যে কোনো নিশ্চয়তার গ্যারান্টির দরকার ছিল না। এই অন্ধকার হিম শহরের একটা মানুষকেও চিনতাম না, কিন্তু সেটা বদলে যাবে, শিগগিরই।
ক্যাফে হোয়া? ছিল গ্রিনউইচ গ্রামের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে ম্যাকড্যুগাল স্ট্রিটের একটা ক্লাব। জায়গাটা মাটির নিচের একটা গুহা, মদহীন, স্বল্পালোকিত, নিচু ছাদ, চেয়ার-টেবিলঅলা একটা প্রশস্ত ডাইনিং হলের মতো— দুপুরে খোলে, ভোর ৪টায় বন্ধ হয়। কে যেন ওখানে গিয়ে ফ্রেডি নিল নামে এক গায়কের খোঁজ করতে বলেছিল আমাকে। হোয়া?-র দিনের পালার শো সেই চালাত।
জায়গাটা খুঁজে বের করলাম। নিচের বেসমেন্টে আছে ফ্রেডি, জানানো হলো আমাকে। ওখানে কোট আর টুপি রাখা হয়। ওখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হলো আমার। নিল ছিল ওই কামরার এমসি এবং সমস্ত বিনোদকদের মায়েস্ত্রো ইন চার্জ। এর চেয়ে ভালো আর হতে পারে না। আমি কী করি জানতে চাইল সে। বললাম আমি গান গাই, গিটার আর হারমোনিকা বাজাই। আমাকে একটা কিছু বাজাতে বলল সে। মিনিটখানেক বাদে বলল, তার পালার সময় তার সঙ্গে হারমোনিকা বাজাতে পারি। সে ছিল পুলকের মুহূর্ত। অন্তত ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার মতো একটা জায়গা তো ছিল ওটা। বেশ ভালো।
আনুমানিক ২০ মিনিটের মতো বাজাল ফ্রেড, তারপর পালার বাকি সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিল, তারপর যখন মনে চেয়েছে, যখনই জায়গাটায় ঠাসাঠাসি ভিড় ছিল, ফিরে এসে বাজিয়েছে। অভিনয়গুলো ছিল খাপছাড়া, বিব্রতকর এবং টেড ম্যাকের জনপ্রিয় টিভি শো ‘অ্যামেচার আওয়ার’ থেকে ধার করা বলে মনে হয়েছে। শ্রোতারা বেশির ভাগই ছিল কলেজের ছাত্র টাইপের, শহরতলির লোকজন, লাঞ্চ-টাইম সেক্রেটারি, নাবিক আর ট্যুরিস্ট। সবাই ১০ থেকে ১৫ মিনিট অংশ নিত। ফেড অবশ্য যতক্ষণ অনুপ্রেরণা টিকে থাকত ততক্ষণই বাজাত। ফ্রেডির আন্তরিকতা ছিল, রক্ষণশীল কায়দায় পোশাক পরত, গম্ভীর এবং ভাবুক, হেঁয়ালিমাখা দৃষ্টি চোখে, পিচের মতো গায়ের রঙ, কোঁকড়ানো চুলের গোছা, ক্রুদ্ধ ও শক্তিশালী ফ্যাঁসফেঁসে কণ্ঠস্বর, যা ব্লু সুরে টোকা দিয়ে মাইক থাকুক বা না থাকুক ছাদের কড়িবরগার দিকে পাঠিয়ে দিত। ওখানকার অধিপতি ছিল সে, এমনকি নিজের হারেমও ছিল, তার ভক্তের দল। ওকে স্পর্শ করার জো ছিল না। সবকিছু তাকে ঘিরে আবর্তিত হতো। হিট গান ‘এভরিবডিজ টকিং’ লিখেছিল ফ্রেডি। আমি কখনই নিজের কোনো সেট বাজাইনি। স্রেফ নিলকে তার সব গানে সঙ্গ দিয়েছি আর ওখানেই নিউইয়র্কে নিয়মিত বাজানো শুরু করেছিলাম। ’
কাফে হোয়া?-র দিনের শো ছিল নানা রকম কাজের এক জাঁকাল নকশা, যে কেউ যেকোনো কিছু করতে পারত— কমেডিয়ান, ভেন্ট্রিলোকুইস্ট, স্টিল ড্রাম গ্রুপ, কবি, মহিলা অনুকরণকারী, ব্রডওয়ের গান গাইয়ে একটা জুটি, টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করে আনা জাদুকর, পাগড়ি মাথায় এক লোক দর্শকদের সম্মোহিত করত, যার পুরো অভিনয়ই ছিল মুখের ভঙ্গি এমন কেউ— স্রেফ শো বিজনেসে পা রাখতে চায় এমন যে কেউ। দুনিয়া সম্পর্কে তোমার মনোভাব পাল্টে দেয়ার মতো কিছু নয়। কোনোকিছুর বিনিময়েই ফ্রেডের সঙ্গে থাকতে চাইতাম না আমি।
৮টার দিকে পুরো দিনের তামাশা থেমে যেত। তারপর শুরু হতো পেশাদারি অনুষ্ঠান। রিচার্ড প্রিয়র, উডি অ্যালেন, জোয়ান রিভার্স, লেনি ব্রুসের মতো কমেডিয়ান আর দ্য জার্নিম্যানের মতো বাণিজ্যিক লোকসংগীত দলগুলোর পালা শুরু হতো। দিনের বেলায় যারা থাকত সবাই পাততাড়ি গোটাত। বিকেলে যারা বাজাত তাদের ভেতর একজন ছিল তীক্ষ স্বর টাইনি-টিম। উকুলেলে বাজাত সে আর মেয়েদের মতো গাইত— ২০-এর দশকের পুরনো সব প্রমিত গান। কয়েকবার তার সঙ্গে কথা বলেছি, এখানে কাজ করার মতো আর কী কী জায়গা আছে জানতে চেয়েছি। সে আমাকে বলেছে, অনেক সময় টাইমস স্কয়ারে হিউবার্টস ফ্লি সার্কাস মিউজিয়াম নামে একটা জায়গায় বাজায় সে। পরে জায়গাটা খুঁজে বের করব আমি।
ফ্রেড সবসময়ই একটা না একটা কিছু বাজাতে ইচ্ছুক এমন সব পরজীবীর চাপের মুখে থাকত। সবচেয়ে মারাত্মক চরিত্র ছিল বিলি দ্য বুচার নামে এক লোক। দেখে মনে হতো যেন দুঃস্বপ্নের গলি থেকে বেরিয়ে এসেছে। মাত্র একটা গানই বাজাত সে— ‘হাই হিল স্নিকারস’ নেশার মতো ওটায় আসক্ত ছিল। সাধারণত দিনের বেলায় একটা সময় তাকে বাজাতে দিত ফ্রেড, বেশির ভাগ সময় যখন জায়গাটা ফাঁকা থাকত। বিলি সবসময়ই ‘এটা তোমাদের সবার জন্যে, মেয়েরা’ ভূমিকা দিয়ে গান শুরু করত। তার তুলনায় বেশ ছোট একটা ওভার কোট গায়ে দিত বুচার, বুকের ওপর আঁটো হয়ে বোতাম সেঁটে থাকত। উত্তেজিত হয়ে থাকত সে, অতীতের কোনো একটা সময় বেলেভ্যুতে স্ট্রেইটজ্যাকেট পরানো হয়েছিল ওকে, জেলের সেলে তক্তপোষও পুড়িয়েছে। সবকিছুই ঘটেছে বিলির জীবনে। সবার সঙ্গে তার ঝামেলা ছিল, তবে গানটা সে ভালোই গাইত।
আরেক জনপ্রিয় লোক পুরুতের পোশাক আর ছোট ছোট ঘণ্টাঅলা রেডটপড বুট পরত। বাইবেলের বিভিন্ন কাহিনী নিজের মতো করে বয়ান করত। মুনডগও গান গাইত ওখানে। অন্ধ কবি ছিল মুনডগ, বেশির ভাগ সময় রাস্তায় থাকত। মাথায় একটা ভাইকিং হেলমেট আর পায়ে উঁচু ফারের বুটসহ একটা কম্বল থাকত তার গায়ে। একক সংলাপ আওড়াত মুনডগ, বাঁশের বাঁশি আর হুইসল বাজাত। বেশির ভাগ সময় ফর্টিসেকেন্ড স্ট্রিটেই পারফরম করত সে।
ওখানে আমার প্রিয় গায়িকা ছিল কারেন ডাল্টন। দীর্ঘাঙ্গিনী শ্বেতাঙ্গ ব্লুজ গায়িকা ও গিটার বাদক ছিল সে, ভয়ার্ত, ছিপছিপে আর গম্ভীর। আগেও আসলে ওর সঙ্গে পরিচয় ছিল আমার, আগের গ্রীষ্মে ডেনভারের এক মাউন্টেন পাস শহরের একটা ফোক ক্লাবে দেখা হয়েছিল ওর সঙ্গে। কারেনের কণ্ঠ ছিল বিলি হলিডের মতো আর গিটার বাজাত একেবারে জিমি রিডের মতো। বার দুই ওর সঙ্গে গানও গেয়েছিলাম।
ফ্রেড বরাবরই বেশির ভাগ পারফর্মারই জায়গা করে দেয়ার চেষ্টা করত, যতদূর সম্ভব কৌশলী ছিল সে। অনেক সময় কামরাটা ব্যাখ্যাতীতভাবে খাঁ-খাঁ করত, অনেক সময় আধাখালি আর তারপরই নিমেষে কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই বাইরে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো লোকজনসহ ঠাসাঠাসি অবস্থা দাঁড়াত। ফ্রেডই ছিল এখনকার আসল লোক, মূল আকর্ষণ আর নেমপ্লেটে তার নাম ছিল, তো অনেকেই হয়তো তাকেই দেখতে আসত। জানি না। একটা বিশাল ড্রেডনট গিটার বাজাত সে, বাজানোয় যথেষ্ট পেশাদারি ভাব ছিল, তীক্ষভেদী তাড়াকারী ছন্দ— একক ব্যান্ড, গানের গলা রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক। চেইন গ্যাং সং-এর জ্বালাময়ী সংকর ভাষ্য গেয়ে দর্শকদের উন্মত্ত করে তুলত। নানা কথা শুনেছি তাকে নিয়ে, ভবঘুরে নাবিক ছিল সে, ফ্লোরিডায় একটা স্কিফ রাখা আছে, আন্ডারগ্রাউন্ড পুলিশ ছিল সে, পতিতা-বান্ধবী আর ছায়াময় অতীত। ন্যাশভিল অবধি এসে নিজের লেখা গানগুলো ফেলে নিউইয়র্কের পথ ধরেছে। এখানে গাঢাকা দিয়ে একটা কিছু ঘটে তার পকেট টাকা-পয়সায় ভরে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। যাই হোক, সেটা বিরাট কোনো ইতিহাস ছিল না। তার কোনো আকাঙ্ক্ষা আছে বলে মনে হয়নি। আমাদের ভেতর খুব মিল ছিল। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মোটেই কথা হতো না। অনেকটাই আমার মতো ছিল সে, ভদ্র, তবে অতিবন্ধুভাব নেই। দিনের শেষে পকেট খরচা দিয়েছে, বলেছে, ‘ধরো, যাতে ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে পারো।’
অবশ্য তার সঙ্গে কাজ করার সেরা অংশ দিকটা পুরোপুরি পেটের কারবার— আমার পক্ষে খাওয়া সম্ভব রাজ্যের ফ্রেঞ্চফ্রাই আর হ্যামবার্গার। দিনের কোনো একটা সময়ে টাইনি টিম আর আমি হেঁশেলে গিয়ে ঘুরঘুর করতাম। বাবুর্চি নরবার্ট সাধারণত চটচটে বার্গার নিয়ে অপেক্ষা করত। নয়তো পোর্ক আর বিনের খালি ক্যান কিংবা কড়াইতে করে স্প্যাঘেটি দিত আমাদের। হালকা চালে চলত নরবার্ট। টমেটোর দাগপড়া অ্যাপ্রন পরত সে, মাংসল কঠিন চেহারা, থলথলে গাল, মুখে থাবার চিহ্নের মতো দাগ— নিজেকে কোনো নারীর পুরুষ ভাবত— ইতালির ভেরোনায় গিয়ে রোমিও-জুলিয়েটের সমাধি দেখবে বলে টাকা জমাচ্ছিল। কোনো পাহাড়ের পাশে খুঁড়ে বানানো গুহার মতো ছিল রান্নাঘরটা।
একদিন বিকেলে দুধের সোরাই থেকে একটা গ্লাসে কোক ঢালছিলাম, রেডিও স্পিকারের পর্দা থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুনলাম। নতুন গান ‘ট্রাভেলিন ম্যান’ গাইছিল রিকি নেলসন। মসৃণ একটা ভাব ছিল রিকির, দ্রুত ছন্দে যেভাবে গুনগুন করত, তার কণ্ঠের ওঠানামা। বাকি টিন-আইডলদের চেয়ে ভিন্ন ছিল সে, দারুণ একজন গিটারিস্ট ছিল তার, যে কিনা হঙ্কিটঙ্ক হিরো আর বার্ন ড্যান্স বেহালাবাদকের মাঝামাঝি একটা কায়দায় বাজাত। আগের দিনের জ্বলন্ত জাহাজ চালানোর ভাব করে গান গাওয়া গায়কদের মতো দারুণ উদ্ভাবক ছিল না নেলসন। গুরুতর ভঙ্গিতে গাইত না সে, যথেষ্ট বদল করত, এবং ওকে কখনই শামান বলে ভুল করবে না তুমি। তার সহনশীলতার শেষটুকু যাচাই করা হয়েছে বলে মনে হয়নি, তবে তাতে কিছু এসে যায়নি। যেন ঝড়ের ভেতর আছে, শান্ত আর অবিচল কণ্ঠে গান গাইত সে, লোকজন তার পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। তার কণ্ঠস্বর ছিল অনেকটা রহস্যময়, বিশেষ একটা ভাবে নিয়ে যেত তোমাকে।
রিকির বিরাট ভক্ত ছিলাম আমি, এখনো ওকে পছন্দ করি, কিন্তু ওই ধরনের গান বিদায়ের পথে ছিল। কোনো অর্থ বোঝানোর সুযোগই ছিল না। ভবিষ্যতে এই জিনিসের কোনো ভবিষ্যত্ ছিল না। পুরোটাই ছিল ভুল। ভুল যা ছিল না সেটা হলো গোস্ট অব বিলি লিয়ন্স, রুটিং দ্য মাউন্টেন ডাউন, স্ট্যান্ডিং অ্যারাউন্ড ইন ইস্ট কায়রো, ব্ল্যাক বেটি ব্যাম বি ল্যাম। ওটা কোনো ভুল ছিল না। ওই জিনিসই ঘটছিল। ওই জিনিসই তুমি সবসময় যাকে মেনে নিয়েছ তাকে প্রশ্ন করতে পারত, ভগ্নহূদয়ে ভরে তুলতে পারত ল্যান্ডস্কেপ, আত্মার শক্তি ছিল। যথারীতি রিকি মরা গান গাইত। সম্ভবত কেবল ওর জন্যে লেখা গান। অবশ্য, সবসময় তার সঙ্গে আত্মীয়তা বোধ করতাম আমি। মোটামুটি সমবয়সী ছিলাম আমরা। সম্ভবত একই জিনিস পছন্দ করতাম, একই প্রজন্মেও ছিলাম, যদিও আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতায় বহু অমিল ছিল, সে একটা ফ্যামিলি টিভি শো-তে পশ্চিমে বেড়ে উঠেছিল। মনে হতো বুঝি ওয়াল্ডেন পন্ডে জন্ম আর বেড়ে ওঠা ওর, যেখানে সবকিছু ছিল চমত্কার। আর আমি এসেছিলাম অন্ধকার দানবীয় জগত্ থেকে, একই জঙ্গল, কেবল সবকিছুর দিকে ভিন্নদৃষ্টিতে তাকানো। রিকির প্রতিভা আমার পক্ষে বোধগম্য ছিল। আমাদের অনেক মিল আছে বলে মনে হয়েছিল। কয়েক বছরের ভেতর আমার কয়েকটা গান রেকর্ড করবে সে, এমনভাব করবে যেন ওগুলো তারই, যেন নিজেই লিখেছে সে। শেষতক নিজেও একটা গান লিখেছিল সে, আমার নাম উল্লেখ করেছিল তাতে। দশ বছরের ভেতর রিকি ওর গানের ধারা হিসেবে ধরে নেয়া বিষয় বদলানোর কারণে মঞ্চে দুয়ো ধ্বনির মুখে পড়বে। দেখা গেছে আমাদের ভেতর বেশ মিল ছিল।
কাফে হোয়া?-র হেঁশেলে দাঁড়িয়ে ওই মসৃণ, একঘেয়ে কথা শোনার সময় সেটা জানার কোনো উপায় ছিল না। ব্যাপার হলো রিকি এখনো রেকর্ড বানাচ্ছে আর আমিও তাই করতে চেয়েছিলাম। ফোকসওয়েজ রেকর্ডের হয়ে রেকর্ডিং করার কল্পনা করেছি। ওই মার্কাটাই পেতে চেয়েছিলাম। ওই মার্কাই বিরাট সব রেকর্ড থামিয়ে দিয়েছিল।
রিকির গান থামলে আমার বাকি ফ্রেঞ্চফ্রাইগুলো টাইনি টিমকে দিয়ে ফ্রেড কী করছে দেখব বলে বাইরের কামরায় চলে এলাম। ফ্রেডকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কোনো রেকর্ড বের করেছে কিনা ও, সে বলেছিল, ‘ওটা আমার খেল না।’ অন্ধকারকে সংগীতসুলভ জোরাল অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাত সে, তবে সেটা ওর মতোই নিপুণ ও জোরালো ছিল, পারফর্মার হিসেবে একটা কিছুর ঘাটতি ছিল ওর। সেটা কি বুঝে উঠতে পারিনি। ডেভ ভ্যান রঙ্ককে দেখার পরই বুঝেছিলাম।
গ্যাসলাইট নামে এক রহস্যময় ক্লাবে কাজ করত ভ্যান রঙ্ক— রাস্তায় জোরালো উপস্থিতি, অন্য কোনোটির চেয়ে ঢের বেশি সম্মান ছিল ওটার। সামনে বিরাট জাঁকাল ব্যানার ছিল, সাপ্তাহিক মজুরি মেটাত। এক সার সিঁড়ি বেয়ে নামলে কেটল অব ফিশ নামে একটা বারের পাশের গ্যাসলাইট মদমুক্ত ছিল, তবে তুমি কাগজে মুড়ে বোতল নিয়ে আসতে পারতে। দিনে বন্ধ থাকত ওটা, সন্ধ্যার দিকে আনুমানিক ছয়জন পারফর্মারকে নিয়ে খুলত, সারা রাত পালা করে কাজ চালাত তারা। একটা রুদ্ধচক্র, অচেনা কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। কোনো অডিশনের ব্যাপার ছিল না। ওটা ছিল আমার বাজাতে চাওয়ার মতো একটা ক্লাব, দরকার ছিল।
ভ্যান রঙ্ক বাজাত ওখানে। মিডওয়েস্টে থাকতে রেকর্ডে ভ্যান রঙ্ককে শুনছি, মনে হয়েছিল বিরাট কিছু, তার কিছু রেকর্ডিং হুবহু নকল করেছি। আবেগময় আর হুল ফোটানো ছিল সে, ভাড়াটে সৈনিকের মতো গাইত, মনে হতো যেন সে-ই পয়সা মিটিয়েছে। গর্জন আর ফিসফিস করতে পারত ভ্যান রঙ্ক, ব্লুজকে ব্যালাড আবার ব্যালাডকে ব্লুজে পরিণত করতে পারত। ওর কায়দা আমার ভালো লাগত। ওই ছিল শহরের আসল জিনিস। গ্রিনউইচ গ্রামে ভ্যান রঙ্ক ছিল রাস্তার রাজা, সর্বেসর্বা ছিল সে।
এক হিমেল শীতের দিনে টম্পসন আর থার্ড-এর কাছে হালকা তুষারের ঝাপ্টার ভেতর দুর্বল সূর্য যখন ধোঁয়াশা থেকে উঁকি মারছিল, জমাট নীরবতায় আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখেছিলাম তাকে। যেন হাওয়া আমার দিকে ভাসিয়ে নিয়ে আসছিল তাকে। কথা বলতে চেয়েছিলাম ওর সঙ্গে, কিন্তু একটা কিছু বাদ সেধেছে। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখেছি ওকে, তার চোখের ঝিলিক দেখেছি। পলাতক মুহূর্ত ছিল সেটা, আমি হারিয়ে যেতে দিয়েছি। যদিও ওর জন্যে বাজাতে চেয়েছিলাম। আসলে যে কারো জন্যেই বাজাতে চেয়েছি। কোনোদিন স্রেফ একলা ঘরে বসে বাজাতে পারতাম না। সারাক্ষণ মানুষের জন্যে বাজানোর দরকার ছিল আমার। তুমি বলতে পারো আমি মানুষের সামনেই অনুশীলন করেছি আর আমার গোটা জীবন যা চর্চা করেছি, সেটাই পরিণত হচ্ছিল। গ্যাসলাইটের দিকে সর্বক্ষণ নজর ছিল আমার। না রেখে পারতাম কীভাবে? ওটার তুলনায় রাস্তার বাকি সব জায়গা ছিল নামহীন, জঘন্য নিচু মানের বাস্কেট হাউজ বা ছোট্ট কফি হাউজ যেখানে পারফর্মাররা টুপি পেতে টাকা জোগাড় করে। কিন্তু যত বেশি সম্ভব বাজানো শুরু করেছিলাম আমি। আমার উপায় ছিল না। সংকীর্ণ রাস্তাটা ভরে ছিল ওসবে। ওগুলো ছিল ছোট, চড়া আর হট্টগোলময়; রাতে রাস্তায় ভিড় জমানো পর্যটকদের আপ্যায়ন করত। যেকোনো কিছুই উপযুক্ত ছিল সেজন্যে— ডাবল ডোর পার্লার রুম, স্টোরফ্রন্ট, দোতলা ওয়াক-আপস, রাস্তার সমতলের নিচের বেসমেন্ট, দেয়ালের সমস্ত ফাঁকফোকর।
থার্ড স্ট্রিটে অস্বাভাবিক মদ আর বিয়ারের দোকানটা আসলে আরন বারের লিভারি স্ট্যাবল ছিল, এখন ওটার নাম কাফে বিজায়ার। পৃষ্ঠপোষকদের বেশির ভাগই ছিল শ্রমিক, যারা বসে হাসাহাসি, মুখখিস্তি করতে করতে মাংস খেতে খেতে অশ্লীল আলাপ জমাত। পেছন দিকে ছোট একটা মঞ্চ ছিল, ওখানে বার দুই বাজিয়েছি আমি। সম্ভবত সব জায়গাতেই একবার না একবার বাজিয়েছি। ওগুলোর বেশির ভাগই দিনের শুরু না হওয়া পর্যন্ত খোলা থাকত, কেরোসিন ল্যাম্প আর কাঠের গুঁড়ো মেঝেতে, কোনো কোনোটা কাঠের বেঞ্চঅলা, দরজার মুখে তাগড়া কোনো লোক— কাভার চার্জেও বালাই ছিল না, যত বেশি পারা যায় কফি বিক্রি করতে চাইত মালিকরা। পারফর্মাররা হয় বসে থাকত বা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকত, রাস্তা থেকে চোখে পড়ত তাদের, কিংবা দরজার দিকে মুখ করে কামরার উল্টোদিকে অবস্থান নিত, গলা চড়িয়ে গান গাইত। মাইক্রোফোনটোন ছিল না।
প্রতিভাশিকারিরা এসব ডেরায় আসত না। অন্ধকার আর বিষণ্ন ছিল ওসব, পরিবেশ গোলযোগময়। পারফর্মাররা গান গাইত আর টুপি চালান করত বা পর্যটকরা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখার সময় গান গাইত, আশায় থাকত যে ওদের কেউ হয়তো ব্রেডবাস্কেট বা গিটার কেসে পয়সা ফেলবে। ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি সবগুলো জায়গায় গাইতে পারলে সপ্তাহান্তে হয়তো বা ২০ ডলারের মতো আয় করতে পারতে তুমি। উইকনাইটের ব্যাপারে বলা কঠিন ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়ার কারণে অনেক সময় খুব বেশি কিছু না। টিকে থাকার জন্যে তোমাকে দুচারটা কৌশল জানতে হতো।
বহুবার মুখোমুখি হয়েছি এমন একজন গায়ক রিচি হাভেনসের সঙ্গে সব সময়ই সুন্দরী একটা মেয়ে থাকত, টুপি চালান করত সে; আমি লক্ষ করেছি বরাবরই ভালো করত সে। অনেক সময় দুটো টুপি চালান করত মেয়েটা। তোমার কাছে কোনো ধরনের কায়দা না থাকলে এক ধরনের অদৃশ্য উপস্থিতি পেতে তুমি, সেটা ভালো কথা ছিল না। বার দুই কাফে হোয়া?-র পরিচিত সুনয়না এক ওয়েট্রেসের সঙ্গে দল বেঁধেছিলাম আমি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতাম আমরা, আমি বাজাতাম আর ও টাকা সংগ্রহ করত। হাস্যকর ছোট একটা বনেট পরত সে, কালো ঘন মাশকারা, লোলেসড ব্লাউজ— কেপের মতো কোটের ভেতর কোমর থেকে উপরের দিকে প্রায় নগ্ন লাগত ওকে। পরে ওর সঙ্গে টাকা ভাগাভাগি করতাম আমি, কিন্তু সারাক্ষণ কাজটা বড্ড ঝামেলার ছিল। তবু একা কাজ করার চেয়ে ও সঙ্গে থাকলে বেশি রুজি করতাম আমি।
এই দিনগুলোতে যে জিনিসটা সত্যি আমাকে আলাদা করেছিল, সেটা ছিল আমার ভাণ্ডার। বাকি কফিহাউজ প্লেয়ারদের চেয়ে অনেক বেশি দুর্দান্ত ছিল সেটা, আমার ধরনটা ছিল অবিরাম চড়া স্ট্রামিংয়ের সঙ্গে নির্জলা লোকসংগীত। হয় লোকজন আমার কাছ থেকে দূরে চলে যেত, নয়তো আসলে ব্যাপার কি জানতে কাছাকাছি আসত। মাঝামাঝি কিছু ছিল না। ওসব জায়গায় অনেক ভালো গায়ক আর বাদক ছিল, কিন্তু আমি যা করছিলাম ধরনের দিক থেকে তার কাছাকাছি কিছু ছিল না। লোকসংগীত ছিল আমার জগেক জানার রাস্তা, ছবি ছিল সেগুলো আর ছবির দাম ছিল আমার বলার মতো অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে দামি। জিনিসটার সারবস্তু জানা ছিল আমার। অনায়াসেই টুকরোগুলো জুড়ে দিতে পারতাম। ‘কলম্বাস স্টকেড,’ ‘প্যাশচারস অব প্লেন্টি,’ ‘ব্রাদার ইন কোরিয়া,’ আর ‘ইফ আ লুজ, লেট মি লুজ’-এর মতো জিনিস বানানো কোনো ব্যাপার ছিল না, একের পর এক, ঠিক যেন দীর্ঘ কোনো গান ছিল তা। অন্য পারফর্মারদের বেশির ভাগই নিজেদের সামনে এগিয়ে নিতে চাইত, কিন্তু আমি ওসবের পরোয়া করিনি। আমার বেলায় গানকে এগিয়ে দেয়াই ছিল আসল ব্যাপার।
বিকেলে কাফে হোয়া?-তে যাওয়া বাদ দিয়েছিলাম। আর কখনো ওখানে পা রাখিনি। ফ্রেডি নিলের সঙ্গেও যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিলাম। ওখানে না গিয়ে আমেরিকান লোকগানের দুর্গ ফোকলোর সেন্টারে ঘুরঘুর করতে শুরু করেছিলাম। ওটাও ম্যাকদুগ্যাল স্ট্রিটের ব্লিকার আর থার্ড স্ট্রিটের মাঝখানে ছিল। ছোট স্টোরটা ছিল এক সারি সিঁড়ির মাথায়; অনন্য এক ধরনের মাহাত্ম্য ছিল ওটার। প্রাচীন গির্জার মতো, জুতোর বাক্স আকারের ইনস্টিটিউটের মতো। ফোকলোর সেন্টার লোকগানের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত কিছু বিক্রি করত আর সেগুলো সম্পর্কে প্রতিবেদন দিত। একটা চওড়া প্লেট-গ্লাস উইন্ডো ছিল ওটার যেখানে রেকর্ড আর বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শিত হতো।
একদিন বিকেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ঢুকে পড়লাম ওখানে। ঘুরতে ঘুরতে মালিক ইিস ইয়াংয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ইয়াং ছিল পুরনো কেতার লোকসংগীত অনুরাগী, খুবই পরিহাসপ্রবণ, চোখে ভারি হর্নরিমড চশমা, ভারি ব্রুকলিন টানে কথা বলত, জীর্ণ উলের স্লাক্স, সরু বেল্ট আর ওয়ার্ক বুট পরত, বেখেয়াল কায়দায় বাঁকা হয়ে থাকত টাইটা। বুলডেজারের মতো ছিল ওর কণ্ঠস্বর, সবসময় ছোট কামরার তুলনায় অনেক চড়া শোনাত। ইিস বরাবরই কোনোকিছু বা কারো ব্যাপারে বিরক্ত ছিল। বাস্তবে একজন রোমান্টিক। তার কাছে লোকসংগীত সোনার ঢিবির মতো ঝিলিক মারত। আমার বেলায়ও তাই ছিল। বলার মতো যত লোক-কর্মকাণ্ড আছে, তার সবকিছুরই একটা মিলনবিন্দু ছিল জায়গাটা, ওখানে যেকোনো মুহূর্তে কট্টর লোকসংগীত শিল্পীদের চোখে পড়ত তোমার। কেউ কেউ ওখান থেকে চিঠি জোগাড় করত।
অনেক সময় ইয়াং সন্দেহাতীত খাঁটি লোকসংগীত ও ব্লুজ শিল্পীদের নিয়ে ফোক কনসার্টের আয়োজন করত। টাউন হল বা কোনো ইউনিভার্সিটিতে বাজানোর জন্যে শহরের বাইরে থেকে নিয়ে আসত তাদের। কখনো কখনো ক্লারেন্স অ্যাশলি, গাস কানন, ম্যান্স লিপসকম্ব, টম পালে, এরিক ডার্লিংকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছি ওখানে। প্রচুর মরমি লোকসংগীতের রেকর্ডও ছিল ওখানে। যেসব রেকর্ড আমি শুনতে চেয়েছি। সবধরনের বিলুপ্ত গানের ফোলিও— নাবিকদের গান, গৃহযুদ্ধের গান, কাউবয় গান, বিলাপের গান, গির্জার গান, জিম ক্রোবিরোধী গান, ইউনিয়ন সংগীত— লোককাহিনীর প্রাচীন সব গ্রন্থ, জীর্ণ জার্নাল, নারী অধিকার থেকে শুরু করে মাদকের বিপদ অবধি সব বিষয়ে প্রপাগান্ডা প্যামফ্ল্যাট, মোল ফ্ল্যান্ডারসের ইংরেজ লেখক ড্যানিয়েল ডি ফোর লেখাও ছিল একটা। বিক্রির জন্যে রাখা গোটাকতক বাদ্যযন্ত্র: ডালসিমার, পাঁচ তারের ব্যাঞ্জো, কাজুজি, পেনিহুইসল, অ্যাকুইস্টিক গিটার, ম্যান্ডোলিন। লোকসংগীত কী জিনিস জানার ইচ্ছা থাকলে এখানেই অস্পষ্ট ঝিলিকের চেয়ে বেশি কিছু জানতে পারতে তুমি।
একটা পেটমোটা কাঠের লাকড়ি চুলো, দোমড়ানো ছবি আর জীর্ণ চেয়ারঅলা ব্যাকরুম ছিল ইিসর— ওটার দেয়ালে বুড়ো দেশপ্রেমিক আর বীরেরা, ক্রসস্টিচড ডিজাইনঅলা পটারি, কালো রঙ লাগানো মোমবাতি...কুটিরশিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত নানান জিনিস। আমেরিকান রেকর্ড আর একটা ফনোগ্রাফে বোঝাই ছিল ছোট কামরাটা। আমাকে ওখানে থেকে সেসব শোনার সুযোগ দিত ইিস। যত বেশি সম্ভব শুনেছি আমি, এমনকি তার সেকেলে লোকসংগীতের পাণ্ডুলিপিতেও নজর বুলিয়েছি। উন্মত্ত জটিল আধুনিক দুনিয়া ছিল এমন কিছু যার দিকে তেমন একটা আগ্রহ ছিল না আমার। এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা, কোনো ওজন ছিল না। তাতে আমি মোহগ্রস্ত হইনি। আমার কাছে যা স্বচ্ছন্দ, প্রাসঙ্গিক আর হালনাগাদ বিষয় ছিল, সেগুলো হলো টাইটানিক সিংকিং, দ্য গ্যালভেস্টন ফ্ল্যাড ইত্যাদি। এসবই ছিল হালনাগাদ, উন্মুক্ত অনুষ্ঠিত হতো। এই খবরই আমি শুনতাম, অনুসরণ করতাম আর খোঁজ নিতাম।
খোঁজখবর করার ব্যাপারে ইিসও একটা ডায়েরি রাখত। ওর ডেস্কে খোলা ফেলে রাখা এক ধরনের লেজার ছিল সেটা। আমাকে নিজের সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল ও, যেমন আমি কোথায় বড় হয়েছি, লোকসংগীতে কীভাবে আমার আগ্রহ দেখা দিয়েছিল, কোথায় একে আবিষ্কার করেছি— এসব। তারপর ডায়েরিতে আমার সম্পর্কে লিখে রেখেছে। কেন ধারণা করতে পারিনি। ওর প্রশ্নগুলো বিব্রতকর ছিল, কিন্তু আমার প্রতি দরাজ ছিল বলে পছন্দ করেছিলাম ওকে; আমি বিবেচক আর উত্তর জোগাতে তৈরি থাকার চেষ্টা করেছি। বাইরের লোকদের সঙ্গে কথা বলার সময় খুবই সতর্ক থাকতাম আমি, তবে ইিস ঠিক ছিল, ওকে সহজ ভাষায় জবাব দিয়েছি।
আমার পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করেছে ও। ওকে নানির কথা বলেছি, আমাদের সঙ্গে থাকত সে। মহত্ত্ব আর ভালোত্বে ভরপুর ছিল সে, একবার আমাকে বলেছিল সুখ কোনোকিছুর দিকে যাওয়ার পথ নয়, বরং রাস্তাই হলো সুখ। আমাকে দয়ালু হওয়ারও উপদেশ দিয়েছিল, কারণ তোমার সঙ্গে যাদেরই দেখা হবে কঠিন যুদ্ধে জড়িয়ে আছে তারা।
ইিসর লড়াই কি নিয়ে ছিল কল্পনা করতে পারিনি। অন্তঃস্থ্থ, বহিঃস্থ, কে জানে? ইয়াং ছিল সামাজিক অবিচার, ক্ষুধা আর গৃহহীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন একজন মানুষ, সেটা তোমাকে বলতে তার কোনো দ্বিধা ছিল না। তার নায়করা ছিল আব্রাহাম লিঙ্কন আর ফ্রেডেরিক ডাগলাস। চূড়ান্ত মাছের কাহিনী মবি ডিক ছিল ওর প্রিয় কাহিনী। বিল কালেক্টর আর জমিদারদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইয়াং। লোকে সবসময়ই টাকার জন্যে পিছু ধাওয়া করে আসছিল, কিন্তু তাতে ওকে এতটুকু বিচলিত বলে মনে হয়নি। প্রবল স্থিতিস্থাপকতা ছিল ওর, এমনকি সিটি হলের সঙ্গে লড়াই করে ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কে লোকসংগীত বাজানোর অনুমতি বের করেছিল। সবাই তার পক্ষে ছিল।
আমার জন্যে রেকর্ড বের করেছিল ও। একটা কান্ট্রি জেন্টলসেন রেকর্ড দিয়ে বলেছিল ‘গার্ল বাহাইন্ড দ্য বার’ শোনা উচিত আমার। আমাকে চার্লি পুলের ‘হোয়াইট হাউস ব্লুজ’ বাজিয়ে শুনিয়েছে, বলেছে আমার জন্যে এটাই নিখুঁত হবে, তারপর জানিয়েছে এটাই দ্য রাম্বারসের করা আসল ভাষ্য। বিগ বিলি ব্রুনজি গান ‘সামবডিজ গট টু গো’ বাজিয়ে শুনিয়েছে আমাকে, ওটাই আমার লাইনের ছিল। ইিসর ওখানে লেগে থাকতে ভালো লাগত আমার। সারাক্ষণই আগুন কড়কড় করে জ্বলত।
এক শীতের দিনে এক দশাসই লোক রাস্তা থেকে ভেতরে এসে হাজির হলো। দেখে মনে হলো যেন রাশিয়ান দূতাবাস থেকে এসেছে, কোটের হাতা থেকে তুষার ঝেড়ে ফেলল, গ্লাভস খুলে কাউন্টারে রাখল, ইটের দেয়ালে ঝোলানো গিবসন গিটারটা দেখতে চাইল। সেটা ছিল ডেভ ভ্যান রঙ্ক। রুক্ষ ছিল তার কণ্ঠস্বর, খড়খড়ে চুলের একটা ঢিবি, বেপরোয়া হাবভাব, আত্মবিশ্বাসী শিকারি। আমার মনের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। ওই মানুষটা আর আমার মাঝখানে কিছুই ছিল না। ইিস গিটারটা নামিয়ে তাকে দিল। তারে টোকা দিয়ে এক ধরনের জ্যাজ টাইপের ওয়াল্টজ বাজাল, তারপর গিটারটা আবার কাউন্টারে নামিয়ে রাখল। সে গিটারটা রাখামাত্রই সামনে এগিয়ে গিয়ে ওটার ওপর হাত রাখলাম, একই সময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম গ্যাসলাইটে কাজ পেতে হলে কি করতে হয়, কার সঙ্গে পরিচয় থাকতে হবে? এমন নয় যে ওর সঙ্গে খাতির জমানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি স্রেফ জানতে চেয়েছি।
ভ্যান রঙ্ক কৌতূহলী চোখে তাকিয়েছে আমার দিকে, তীক্ষ আর গম্ভীর ছিল সে, জানতে চাইল জ্যানিটরের কাজ করেছি কিনা আমি।
ওকে বললাম না, করি না, চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারে সে, তবে ওকে কি একটা কিছু বাজিয়ে শোনাতে পারি? সে বলল, ‘নিশ্চয়ই।’
‘নোবডি নোজ ইউ হোয়েন ইউর ডাউন অ্যান্ড আউট’ বাজিয়ে শোনালাম ওকে। যা শুনেছে পছন্দ হলো ডেভের, আমি কে, কতদিন ধরে শহরে আছি জানতে চাইল। তারপর বলল সন্ধ্যা ৮টা বা ৯টার দিকে গিয়ে তার ওখানে গোটা দুই গান বাজাতে পারি আমি। ওভাবেই ডেভ ভ্যান রঙ্কের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার।
ফোকলোর সেন্টার থেকে বেরিয়ে ফের হিমশীতল পরিবেশে ফিরে এলাম। সন্ধ্যার দিকে ব্লিকার স্ট্রিটের মিলস ট্যাভার্নে ছিলাম আমি, ওখানে বাস্কেট হাউস গায়করা ভিড় জমাত, গল্পগুজব করে দৃশ্য তৈরি করত। আমার ফ্ল্যামেনকো গিটার-বাজানো বন্ধু হুয়ান মোরেনো একটা নতুন কফি হাউসের কথা বলেছিল আমাকে; থার্ড স্ট্রিটে মাত্র খুলেছে ওটা, নাম আউত্রে, কিন্তু মন দিয়ে শুনছিলাম না। হুয়ানের ঠোঁটজোড়া নড়ছিল, কিন্তু নড়ছিল কোনো শব্দ ছাড়াই। আউত্রেতে কখনই বাজাইনি আমি, দরকার হয়নি। অচিরেই গ্যাসলাইটে বাজানোর জন্যে নেওয়া হবে আমাকে, আর কোনোদিন বাস্কেট হাউসগুলোকে দেখতে হবে না। মিলস ট্যাভার্নের বাইরে থার্মোমিটার শূন্যের আনুমানিক ১০ ডিগ্রি অবধি উঠে এসেছিল। বাতাসে জমাট বেঁধে গেছে আমার নিঃশ্বাস, কিন্তু ঠাণ্ডার কোনো বোধ ছিল না আমার। অনন্য আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমন নয় তো আমি প্রতারিত হয়েছি? মনে হয় না। প্রতারিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কল্পনাশক্তি আমার ছিল বলে মনে হয়নি। কোনো মিথ্যে আশাও ছিল না। বহু দূর থেকে এসেছি আমি, শুরু করেছিলাম অনেক নিচ থেকে। কিন্তু ভাগ্য নিজেকে তুলে ধরতে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন আর কেউ না, সোজা আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল তা।
(বব ডিলানের স্মৃতিচারণ ক্রনিকলস প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ের ভাষান্তরের শেষাংশ)
ভাষান্তর: শওকত হোসেন




