১৯৯০ দশকের শেষদিকে উত্তর তেহরানে অবস্থিত আব্বাস কিয়ারোস্তামির বাসায় গিয়েছিলাম। সেবার তিনি বলেছিলেন যে, ইরান ত্যাগ করার আগে আমাকে একটা উপহার দিতে চান। তিনি জানতেন যে, আমি তার আলোকচিত্রের গুণমুগ্ধ। আমাকে তার একটি আলোকচিত্রের প্রিন্ট কপি দিতে চাইলেন। আমাকে বললেন নিজের ইচ্ছেমতো একটা ছবি বেছে নিতে।
আমরা একটা টেবিলে মুখোমুখি বসেছিলাম। তার হাতে ছিল ৭৫টি ছবির বড় সাইজের প্রিন্ট। তিনি আমাকে একটা একটা করে ছবিগুলো দেখাতে লাগলেন। সম্ভবত প্রতিটি ছবি দেখার জন্য তিনি আমাকে ১৫ সেকেন্ড করে সময় দিচ্ছিলেন। ছবিগুলো একের পর এক নতুন ছবির নিচে চলে যাচ্ছিল আর নতুন আরেকটা ছবি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। পুরোটা সময় তিনি আমার ওপর চোখ রাখলেন। যদিও আমি গভীর অভিনিবেশসহকারে ছবিগুলো দেখেছি, কিন্তু সেগুলোর কোনো কোনোটি দেখার পর বিশেষ কি অনুভূতি হয়েছিল, এমনটা মনে করতে পারছি না। সব ছবি দেখা হলে আমি তাকে জানালাম যে, কোন ছবিটা আমার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে। আমার পছন্দের কথা শুনে তার মুখে প্রসন্ন হাসি দেখতে পেলাম। বুঝলাম, তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
কয়েক দিন পর যখন আবার তার বাসায় গেলাম, তিনি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আমি যে ছবিটা পছন্দ করেছিলাম, সেটার নেগেটিভ ল্যাবে নষ্ট হয়ে গেছে, তাই তিনি আর আমাকে সে ছবিটি দিতে পারছেন না। তবে জানালেন, আমার পছন্দের তালিকায় যে ছবিটি দুই নম্বরে ছিল, সেটার প্রিন্ট তিনি আমাকে দিতে পারবেন। হ্যাঁ, তার পর তিনি আমাকে যে ছবিটা দিলেন, সেটা সত্যি সত্যিই আমার পছন্দের তালিকায় দুই নম্বরে ছিল। ছবি দেখার সময় আমার মুখের অভিব্যক্তি ও আবেগের ঝলক দেখেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, এটাই আমার দুই নম্বর পছন্দ। সে ছবিটা বাঁধাই হয়ে এখন আমার লিভিং রুমে শোভা পাচ্ছে।
ঘটনাটি এত পরিষ্কার স্মরণ আছে, কারণ এতে কিয়ারোস্তামির সেসব বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে, যেগুলো আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে— তার অসাধারণ তীক্ষ দৃষ্টি, যার ছাপ তার আলোকচিত্র ও সিনেমায় দেখা যায়; অন্যের প্রতি তার গভীর সংবেদনশীলতা এবং তার বন্ধুত্ব পাওয়া সৌভাগ্যবানদের প্রতি ঔদার্য, রসিকতা।
আমি কিয়ারোস্তামির কাজ প্রথম দেখি ১৯৯২ সালে। সেবার লিংকন সেন্টারে বিপ্লব-পরবর্তী ইরানি সিনেমার প্রথম চলচ্চিত্র উত্সব হচ্ছিল। ফিল্ম কমেন্ট আমাকে সে উত্সবে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় এবং অনুরোধ করে, যেন আমি উত্সবটি নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখে দিই। ইরানের সিনেমা তখন বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উত্সবে জায়গা করে নিচ্ছিল, কিন্তু তখনো আমি ইরানি সিনেমা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। উত্সবে যা দেখছিলাম, তাতে আমি বিস্মিত হয়ে পড়ি। একদল উচ্চমানের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র পরিচালক এবং একের পর এক অসাধারণ সিনেমা দেখতে থাকি। কিন্তু যে নির্মাতা ও সিনেমা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিলেন, তিনি আব্বাস কিয়ারোস্তামি এবং তার সিনেমা ক্লোজ-আপ। গ্রেফতার হওয়া এক গরিব ব্যক্তির গল্প নিয়ে ১৯৯০ সালে কিয়ারোস্তামি এ মেটাসিনেমাটিক মাস্টারপিস নির্মাণ করেছিলেন। ফিল্ম কমেন্টে আমি আমার প্রবন্ধ শুরু করেছিলাম এ যুগান্তকারী চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলোচনা দিয়ে। এর পর আমি অসংখ্যবার সিনেমাটি নিয়ে লিখেছি।
ক্লোজ-আপ ছিল কিয়ারোস্তামির জন্য সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের আগে এক দশক তিনি কাজ করেছেন ইরানের সেন্টার ফর দি ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং অ্যাডাল্টসের চলচ্চিত্র নির্মাণ বিভাগের সঙ্গে। এখানে তিনি কিছু উল্লেখযোগ্য শর্টফিল্ম নির্মাণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানি সিনেমার একটি নতুন ধারার অগ্রদূত, শিশুদের কাহিনী কেন্দ্রে রেখে সিনেমা নির্মাণ। তবে কিয়ারোস্তামি মনে করতেন, এসব সিনেমা শুধু শিশুদের জন্য নয়, তার কথায় ‘এসব সিনেমা শিশুদের সম্পর্কে, তবে এর মানে এই নয় যে, এগুলো শুধু শিশুদের দেখার জন্য।’ এ সময়কালে তিনি তার দুটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘দ্য ট্রাভেলার’ ও ‘দ্য রিপোর্ট’ নির্মাণ করেন। এর পর এল ইরানের ইসলামিক বিপ্লব। ইরানের আরো অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতার মতো তিনিও কিছুদিন বিরতি নিলেন, বিক্ষুব্ধ সময়ের সমাপ্তির অপেক্ষায় থাকলেন। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি সময় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের শাসকরা সিনেমাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন (আয়াতুল্লাহ খোমেনি নৈতিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সিনেমার প্রশংসা করেছেন)। সরকার যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতাকে পুনরায় কাজ শুরু করার জন্য আমন্ত্রণ জানান, কিয়ারোস্তামিও ছিলেন সেই দলে। ইসলামী বিপ্লবের পর নতুন সরকারের আমলে তার প্রথম কাজ ছিল ‘হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউজ?’। এক বালকের নিজের স্কুলের সহপাঠীর বাসা খোঁজার একটু বেশি আবেগি, বিদগ্ধ, কাব্যিক গল্প নিয়ে এ সিনেমা। এ সিনেমার মাধ্যমে বিপ্লবোত্তর ইরানে শিশুকেন্দ্রিক সিনেমার বিরাট সাফল্যযাত্রার সূচনা হয়। ১৯৯৫ সালে ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ ইরানি চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নেয়। কিয়ারোস্তামির চিত্রনাট্য এবং তার একসময়ের সহকারী জাফর পানাহির পরিচালনায় নির্মিত এ সিনেমা কান উত্সবে ক্যামেরা ডি’অর জেতে।
কিন্তু ‘ক্লোজ-আপ’ সিনেমাটি এ কাঠামো ভেঙে দেয়। আবার বলা যায়, একটি নতুন কাঠামো দাঁড় করায়। এ নতুন ধারা কল্পনা ও বাস্তব এবং জীবন ও শিল্পের মধ্যকার ভেদরেখাকে প্রায় তুলে দেয়। আমার মতো সমালোচকরা সিনেমার এমন সংবেদনশীলতা দুনিয়ার আর কোথাও দেখছিলাম না। দুনিয়ার সব বড় বড় উত্সবে পুরস্কার না পেলেও সিনেমাটির সুনাম কিয়ারোস্তামিকে নিয়ে কানের আয়োজকদের আগ্রহী করে তোলে। এর পর অ্যান্ড লাইফ গোজ অন (১৯৯২) ও থ্রো দি অলিভ ট্রিজ (১৯৯৪) কিয়ারোস্তামিকে কান উত্সবের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত করে এবং বিশ্বজুড়ে সমালোচকদের মধ্যে তার সুনাম স্থায়ী রূপ নেয়।
১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি প্রথম যখন আমি ইরান সফর করি তখন দেখি, কিয়ারোস্তামির সাফল্য তার চারপাশে অনেকের মনে এক ধরনের সন্দেহের ছায়া তৈরি করেছে। আমি সেখানে বারবার একটা কথা শুনেছি যে, ইরানের সমালোচক ও সিনেমাবোদ্ধারা কিয়ারোস্তামিকে তাদের সেরা পরিচালক মনে করেন না। ব্যাপারটা হচ্ছে, তাদের সন্দেহ ছিল যে, আরো অনেক মহান চলচ্চিত্রকারের পরিবর্তে কিয়ারোস্তামিকে নিয়ে পশ্চিমারা কেন এত মাতামাতি করছে? এটা কি ধর্মীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত (ইরানিরা চক্রান্ত নিয়ে একটু বেশি উদ্বিগ্ন থাকে)? আমি ব্যাখ্যা করি যে, কান উত্সব হচ্ছে পরিচালক তৈরি করার কারবার এবং তারা এ মুহূর্তে ইরান থেকে একজন পরিচালক নিয়ে কাজ করতে চাইছেন। এটা কোনো শিল্প-সংক্রান্ত বিষয় নয়, যদিও হয়তো তেমনটাই হওয়া উচিত ছিল। কান উত্সব হচ্ছে স্রেফ নাম তৈরি করার জায়গা।
এ সময়ের পর কিয়ারোস্তামি অন্য যেসব কাজ করেছেন, আমি সেগুলোকে আরো বেশি প্রশংসা করেছি। তিনি হয়তো থ্রু দি অলিভ ট্রিজের মতো আরেকটি মানবতাবাদী সিনেমা তৈরি করে চলচ্চিত্র উত্সবের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তাকে আরো বৃদ্ধি করতে পারতেন। কিন্তু ১৯৯৭ সালের প্রথম দিকে যখন তেহরানে তার সঙ্গে দেখা হলো তখন বুঝতে পারলাম, তার আশপাশের পরিবেশ একেবারে বদলে গেছে। মনে হচ্ছিল, তিনি খুব চাপের মধ্যে আছেন। শুনতে পাচ্ছিলাম, সরকার তার কাজের ওপর নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল তার নতুন সিনেমার বিষয় নিয়ে। কাহিনীটি ছিল আত্মহত্যাকেন্দ্রিক আর ইসলামে আত্মহত্যা একটি অনৈতিক কাজ। ছবিটিকে কান উত্সবে পাঠানোর অনুমতি দেয়া নিয়ে বিতর্ক ইরান সরকারের সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল (শোনা যাচ্ছিল কিয়ারোস্তামি সিনেমাটিতে কিছু পরিবর্তনও এনেছিলেন)। এ বিতর্ক একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জারি ছিল। আমি যখন কান উত্সবের উদ্দেশ্যে বিমানে চড়লাম, তখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে, সিনেমাটি সেখানে যাবে কিনা।
এর পর যা ঘটল, সেটা সিনেমার ইতিহাসের এক নাটকীয় ঘটনা: কান উত্সবে পাঠানো হলো কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অভ চেরি’। সিনেমাটি পুরো উত্সব মাত করে প্রথম ইরানি সিনেমা হিসেবে পালমে ডি’অর জিতে নিল। বিশেষত ফরাসিদের কাছে সিনেমাটি অনেক প্রশংসা পেল, কিন্তু সব দেশের সমালোচকরা সিনেমাটিকে পছন্দ করেননি। প্রদর্শনের পর রজার এবার্ট, জোনাথন রোজেনবম ও ডেভ কের মধ্যকার বিতর্ক সিনেমাটির ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
আমি এসব বিতর্কের কোনটিতেই অংশ নিইনি একটা ছোট্ট কারণে: কারণ কী দিয়ে শুরু করব বা সিনেমাটি কেমন, সেটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছিলাম না। কিয়ারোস্তামির কাজ সম্পর্কে আমার ধারণার ক্ষেত্রেও এটা একটা সন্ধিক্ষণ। এর আগে তার সিনেমা নিয়ে লিখে এবং বেশ কয়েক বছর সেগুলোকে পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছিল, তিনি একজন শিল্পী। কিন্তু ‘টেস্ট অভ চেরি’ থেকে পরবর্তী সিনেমাগুলো আমাকে হতাশ করেছে। এর পর দিন, সপ্তাহ, মাস কিংবা বছর পার হয়ে গেছে কিয়ারোস্তামি সম্পর্কে আমার বর্তমান ধারণা তৈরি হতে, তার কাজকে বুঝতে এবং তাকে নিয়ে নিজে সন্তুষ্ট হতে। ক্লোজ-আপ সিনেমাটির অর্থ কয়েক স্তরে বিভক্ত এবং আমি প্রথম দেখাতেই সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। টেস্ট অভ চেরি ও দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস (২০০০) সিনেমাগুলোকেও এখন আমি ক্লোজ-আপের মতো মাস্টারওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করি, কিন্তু প্রথম দেখায় আমি বিভ্রান্ত হয়েছিলাম এবং কিয়ারোস্তামি সম্পর্কে চিন্তা বদল করেছিলাম।
সিনেমা দেখার ১ বা ২ ঘণ্টার মধ্যে যে সমালোচকদের বিচার করে মূল্যায়ন দিতে বলা হয়, তাদের জন্য এ রকম ভুল করা বা বিহ্বলাবস্থা স্বাভাবিক। বড় শিল্পীদের সময়, ধৈর্য, চিন্তা দরকার হয় এবং সবকিছুর পর দরকার হয় সচেতনতা, তাহলে যারা সিনেমা মূল্যায়ন করবেন, তারা কীভাবে সেগুলো বাণিজ্যিক পণ্যের মতো একটার পর একটা দেখে যাবেন? এটা কিয়ারোস্তামির মহত্ত্ব পরিমাপের একটা উপায়। তিনি এমন একজন শিল্পী, যার কাজ কোনো একটি পরিমাপক দিয়ে তাকে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। তিনি নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। দুনিয়া, কর্তৃপক্ষ, সমালোচক, গুণমুগ্ধ এবং এমনকি নিজেও নিজের যে সীমানা তৈরি করেছেন, সেগুলোকেই তিনি নিজে ভেঙে ফেলেছেন।
পশ্চিমে এ ধরনের মনোভাব দেখাতে কিছুটা সাহসী হতে হয়। কিন্তু ইরানে এমনটা করতে সত্যিকার সাহস, অবিশ্বাস্য মনোবল ও দৃঢ়সংকল্প প্রয়োজন হয়। যদিও কিয়ারোস্তামি তার সর্বশেষ দুটি কাজ ইরানের বাইরে করেছেন। তার পরও তিনি নিজের শিল্পভাবনাকে সবসময় ইরানের মাটিতেই প্রোথিত করে রেখেছেন। নিজে কসমোপলিটান মানুষ হলেও তিনি নিজেকে কখনো দেশত্যাগী মনে করেননি। ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক সূক্ষ্ম এক সুতার ওপর ঝুলেছে এবং তিনি যে টিকে গেছেন, এটাই তার বিজয়।
কানে পরিচিত হয়ে ওঠার পর থেকে কিয়ারোস্তামির কাজকে পশ্চিমা আধুনিকতা এবং তার পরবর্তী চিন্তাধারার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝাবুঝি শুরু হয়। কিন্তু আমার সৌভাগ্য হচ্ছে, আমি বেশ কিছুটা সময় ইরানে কাটিয়েছি আর তাই গদার, বার্গম্যান কিংবা তারকোভস্কির সঙ্গে কিয়ারোস্তামির সম্পর্ক না খুঁজে ফিরে তাকিয়েছি ওমর খৈয়াম, রুমি কিংবা হাফিজের মতো পারস্যের শিল্পীদের দিকে। আরো তাকিয়েছি ইরানের আধুনিক যুগের শিল্পী সোহরাব সেফেরি ও ফোরাগ ফরোখজাদের দিকে। অধিকাংশ পশ্চিমার কাছে পারস্যের সাহিত্যভাণ্ডারের বিপুল ঐশ্বর্য এখনো অনাবিষ্কৃত। এ সাহিত্যসম্পদ আবিষ্কার মানে এককথায় জীবন বদলে দেয়া অভিযান। যারাই কিয়ারোস্তামির কাজের গভীরে যেতে চান এবং এর প্রভাব বুঝতে চান, তাদের সবাইকে আমি পারস্য সাহিত্যকে আবিষ্কার করতে বলি।
টেস্ট অভ চেরি কান উত্সবে পুরস্কার জেতার পর আমি কিয়ারোস্তামির পিছু পিছু ইরানে যাই এবং গ্রীষ্মের প্রায় পুরোটা সময় সেখানে অবস্থান করি। অনেকটা সময় আমি কিয়ারোস্তামির সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পাই। তিনি টেপ রেকর্ডারের সামনে বসে আমার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন এবং একদিন আমাকে গাড়িতে করে দূরের এক গ্রামীণ এলাকায় (কোকার) যাওয়ার প্রস্তাব দেন। হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউজ?, অ্যান্ড লাইফ গোজ অন, থ্রু দি অলিভ ট্রিজ— এ ত্রয়ীর শুটিং হয়েছিল সেখানে। পরবর্তীকালে ভূমিকম্পে এ গ্রাম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিয়ারোস্তামির সিনেমা প্রায় সবসময় জীবনের অস্তিত্ব ও মৃত্যুর মধ্যে ছুরির ফলার ভারসাম্যকে দেখায়; তবে সবসময়ই তা জীবনের পক্ষে জয়গান গায়। তার আলোকচিত্রগুলোর দিকে যেমন আমি একদৃষ্টিতে চেয়ে ছিলাম, ঠিক তেমনি তার সিনেমাগুলো পুরো দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেদিন কোকারে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কিয়ারোস্তামিকে আমি যত জীবন্ত, খুশি দেখেছিলাম, তেমনটা আর কাউকে কখনো দেখিনি। কিয়ারোস্তামির এ জীবন কাব্যিক ও দার্শনিক ইচ্ছাপত্র হয়ে রয়ে যাবে তার সিনেমাগুলোয়।
গডফ্রে চেশায়ার: চলচ্চিত্র সমালোচক, সাংবাদিক, সাবেক সভাপতি নিউইয়র্ক ফিল্ম ক্রিটিক সার্কেল ও সদস্য ন্যাশনাল সোসাইটি অফ ফিল্ম ক্রিটিকস, নিয়মিত লেখক নিউইর্য়ক টাইমস, ভ্যারাইটি




