সত্যজিত্ রায়ের মৃত্যুর পর বিশ্বখ্যাত জাপানি চিত্রনির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া আশ্বস্ত ছিলেন যে, সত্যজিতের স্থানটি নেয়ার মতো আরো একজন নির্মাতা রয়েছেন— আব্বাস কিয়ারোস্তামি। আকিরা কুরোসাওয়া প্রয়াত হয়েছেন ১৮ বছর আগে ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, আর তাঁর গুণমুগ্ধ আব্বাস কিয়ারোস্তামি মৃত্যুবরণ করলেন ২০১৬ সালের ৪ জুলাই। তাঁর জন্ম ১৯৪০ সালের ২২ জুন ইরানের রাজধানী তেহরানে। পেইন্টিং ও গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। মেধাবী আব্বাসের সামনে বহু সুযোগ ছিল। তিনি বেছে নিয়েছিলেন সিনেমা। তিনি সিনেমাকে যেমন সরল উপভোগ্য করে তুলেছেন তেমন আবার একই হাতে তিনি সিনেমাকে কবিতার মতো নির্মাণ করেছেন। আকিরা কুরোসাওয়ার কথাই ঠিক— তার ছবি তৈরি হয় অন্তর দিয়ে, দেখতেও হবে অন্তর দিয়ে। আব্বাস ইরানের একজন উল্লেখযোগ্য কবিও। তিনি হয়ে উঠেছেন মাস্টার অব সিনেমাটিক পোয়েট্রি। তার ছবি পশ্চিমকে ইরান চিনিয়েছে, প্রাচ্যকেও। আব্বাস বলেছেন, বৈশ্বিক হতে হলে মূল প্রোথিত হতে হবে নিজের সংস্কৃতিতে। তিনি পৃথিবীকে বলেছেন: এটা আমার ওয়ার্কশপ, বাড়ি নয়। শাহের পতনের পর বুদ্ধিজীবীরা যখন ইরান ছেড়ে ইউরোপ-আমেরিকার পথে পাড়ি দেন, আব্বাস এক পা-ও নড়েননি। তিনি ইরানে থেকে এবং ইরানের কাহিনী সেলুলয়েডে এনে নিজে পরিচিত হয়েছেন, ইরানি সিনেমাকে তুলে এনেছেন বিশ্বসভায়। তার বিখ্যাত কোকার ট্রিলজি: ‘হ্যয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউজ?’ (১৯৮৮), ‘অ্যান্ড লাইফ গোজ অন...’ (১৯৯২) ও ‘থ্রু দি অলিভ ট্রিজ’। ‘ক্লোজ আপ’, ‘টেস্ট অভ চেরি’ ও ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ বহুল সমাদৃত সিনেমা। আব্বাস কিয়ারোস্তামি সাধারণভাবে চলচ্চিত্র সম্পর্কে এবং নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে বিভিন্ন সময় খোলামেলা কথা বলেছেন। তার এ ধরনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ, উদ্ধৃতি ও কথোপকথন অনুবাদ করেছেন এম এ মোমেন।

 

প্রশ্ন: সিনেমা কোনো বিশেষ বার্তা দেয়ার জন্য, আপনি এতে বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না।

কিয়ারোস্তামি: একেবারে ঠিক বলেছেন। সিনেমা বার্তা প্রচারের স্থান নয়। একজন শিল্পী তার পছন্দের মাধ্যমে কিছু চিন্তা, কিছু ধারণা ও কিছু অনুভূতির রূপ দেয়ার আশায় কিছু পরিকল্পনা ও সৃষ্টি করে থাকেন। পারস্যের কবি রুমি ও হাফিজের ওপর আমাদের বিশ্বাসের কারণ— তাদের রচনা এমনভাবে সৃষ্ট যে, তা সবসময়ই স্থান-কাল-অবস্থাভেদে যখনই পাঠ করা হোক মনে হবে সতেজ। সমকালীন কবি ফরাফ ফারুকজাদের কবিতার বেলাতেই তা সত্য।

আমরা যখন কোনো বিমূর্ত ছবির সামনে, আমরা যেভাবে চাই, সেভাবেই ব্যাখ্যা করার লাইসেন্স আমাদের থাকে। কিংবা সংগীত— সংগীত এমন একটা মাধ্যম, যা আমরা নাও বুঝতে পারি। কিন্তু আমরা অনুভব করতে পারি, উপভোগ করতে পারি। কিন্তু সিনেমার বেলায় অনেকেই একটি স্পষ্ট ও সমন্বিত বার্তা আশা করতে পারেন, কিন্তু আমার পরামর্শ সিনেমার অভিজ্ঞতাও একটি কবিতা, একটি পেইন্টিং কিংবা একটি গানের মতো হতে পারে।

প্রশ্ন: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেমন করে আপনার নিজস্ব শৈলী, সিনেমার চোখ ও ছন্দের অনুভূতি গড়ে উঠেছে?

কিয়ারোস্তামি: এটা আমার জানা নেই। এটা এমন একটা প্রশ্ন, যার জবাব দিতে বহু চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন; কিন্তু আমাদের তো তেমন সময় নেই। তবে আমার মনে হয় এসবের পেছনে ভয় কাজ করেছে— যখন আপনি শুটিং সেটে ক্যামেরা ও ক্রুদের নিয়ে কাজ করছেন, তখন আপনার প্রযুক্তিজ্ঞান ও ক্ষমতা প্রশ্নের মুখোমুখি, আপনার মনে অদক্ষতার ভয়। এ ধরনের সন্দেহ ও আতঙ্কের মুহূর্তে আপনি নিজেকে চ্যালেঞ্জ করছেন, এভাবেই একজন বেড়ে ওঠে এবং পরিপক্ব হয়।

আপনার সিনেমাটি তৈরি হওয়ার পর আপনি পেছনে বসে দর্শক হিসেবে এটি দেখুন, সিনেমার গল্প বা বিষয়বস্তুর প্রকাশে আপনার সক্ষমতা যাচাই করুন। একটি শিল্পমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করার আগেই সুনির্দিষ্ট কোনো শৈলী কেউ ঠিক করে রাখতে পারে না। আর আমার ছন্দের অনুভূতির কথা যদি বলি দ্রুত লয় ও উত্তেজনাপূর্ণ বাণিজ্যিক সিনেমার ভক্ত আমি কখনই ছিলাম না। আমার নিজের জীবনও দ্রুত ছন্দের নয়। আমি ধীর জীবনের তাল ও লয় আমার চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়।

প্রশ্ন: আপনার সিনেমাটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন পুরো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, না— মানে কোন পর্যায়ে ধ্বনিগত বিষয়গুলো, যেমন গান চূড়ান্ত করেন? এটা কি সম্পাদনা পর্বে না আগে থেকেই ঠিক করা?

কিয়ারোস্তামি: এ বিষয়টি আমি সম্পাদনা পর্বে কখনই ভাবি না; এ সময় ছোটখাটো পরিবর্তন করে থাকি। তবে তার আগেই ধ্বনি চূড়ান্ত করা হয়।

প্রশ্ন: এমনকি সংগীতের বেলায়ও?

কিয়ারোস্তামি: অবশ্যই, সংগীতের বেলাতেও তাই। আমার ছবিতে মিউজিক্যাল সাউন্ডট্র্যাক রাখা হয় না। আমি যদি সংগীত ব্যবহার করি তা একেবারে শেষে, আর সেক্ষেত্রে আমি জানি কোন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। আমি যদি একটি গান বেছে নিই কিংবা একজন সংগীতশিল্পীকে দায়িত্ব দিই পুরো নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই আমার হাতে থাকতে হবে। আমি কখনই আমার ছবি শিল্পীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বলতে পারি না, এবার সুর বসিয়ে দিন। ডাকযোগে বিয়ের হুকুম দেয়ার চেয়েও এটা বেশি বিপজ্জনক। যেখানে সামান্যতম ধ্বনিও সম্পাদনা করা হয়— মাছি মাইক্রোফোনের চারপাশে ভনভন করছে কিংবা পাখির কিচিরমিচির, সেখানে গোটা সিনেমার সাউন্ডট্র্যাকের দায়িত্ব অন্যের হাতে কেমন করে তুলে দেবেন?

প্রশ্ন: আপনার সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় কতটা শিল্পকলা, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক তত্ত্ব সম্পৃক্ত?

কিয়ারোস্তামি: যে তত্ত্বই আমাকে নিবেদন করতে হোক না কেন, সবই আমাকে পেতে হবে ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ানোর আগে। একটি শৈল্পিক প্রকল্প শুরুর আগেই নির্মাতা যা পড়েছেন, যা শিখেছেন, তা নিশ্চয়ই হজমও করেছেন। কেউ যদি সত্যিই কোনো তত্ত্ব, ভাবধারা, কোনো দর্শন বুঝে থাকেন তা হলে এসব তার কাজে খুবই সূক্ষ্মভাবে প্রতিফলিত হবে। সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয়ে দ্রুত ও আবেগময় প্রতিক্রিয়া সিনেমাকে মেয়াদ নির্ধারণ করা সংবাদপত্রে পরিণত করে। যখন সেসব সামাজিক জটিলতা বদলে যায় কিংবা এসবের অবসান ঘটে, সিনেমাটা তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন চিত্রনির্মাতা যদি তার এজেন্ডায় কাঁচা ও অজীর্ণ ভাবধারা নিয়ে একটি কাজ করেন তা হয়ে ওঠে হইচই করা স্লোগান।

আমি বিশ্বাস করি সত্যিকারের শিল্পকে হতে হবে সময়ের বেড়াজালের ঊর্ধ্বে। ইরানের মতো একটি দেশে, যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোর সার্বক্ষণিক পরিবর্তন ঘটছে। শিল্পীকে মনোযোগ দিতে হবে এসব পার্থিব বিষয়ের বাইরে অধিকতর মৌলিক বাস্তবতার ওপর; যেমন মানবতা— এটাই অধিকতর বিশ্বজনীন।

প্রশ্ন: তাহলে একজন শিল্পী অবচেতনে তার সময় থেকে এগিয়ে গিয়ে বসবাস করেন?

কিয়ারোস্তামি: সেটাই হওয়া উচিত। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে ভোর ৪টা পর্যন্ত সংবাদ সংগ্রহ করে পরের দিনের সংবাদপত্রে ছাপা। কিন্তু একজন শিল্পীর বেলায় এ সংবাদ পেতে হবে অনেক মাস, অনেক বছর আগে।

প্রশ্ন: আপনি যখন নিজের পুরনো সিনেমা দেখেন, সেসব ছবি সম্পর্কে কী মনে হয়? আপনার প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘দ্য ট্রাভেলার’-এর কথা ধরা যাক।

কিয়ারোস্তামি: ‘দ্য ট্রাভেলার’ তৈরির বিশ বছর পর জাপানে একটি চলচ্চিত্র উত্সবে সিনেমাটি দেখি। আমার মনে হয়েছে এটি এখনো সতেজ, দর্শক এখনো একে নেবে। তবে আমার সিনেমা কখনই ত্রুটিমুক্ত নয়, সমস্যা সবসময়ই রয়েছে। এটা যে কেবল আমার আগের ছবির বেলায় ঘটছে, তাই নয়। এ ধরনের ত্রুটি এড়ানো যায় না। তার মানে এই নয় যে, আপনি আপনার কাজ সম্পর্কে জানেন না। বিশেষ করে যখন আপনি অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে তাদের নিত্যকার পরিমণ্ডলে কাজ করবেন— সবকিছুর ওপর আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি একই সাক্ষাত্কারে বলেন:

যারা উপন্যাস পড়েন আমি তাদের ঈর্ষা করি, কারণ কল্পনাকে ব্যবহার করার স্বাধীনতা সিনেমার দর্শকের চেয়ে তাদের অনেক বেশি। যখন কেউ উপন্যাস লেখেন তিনি হয়তো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লিখে যান, তার পর কাঙ্ক্ষিত ভাব ও পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করেন। কিন্তু প্রথাগত সিনেমা তা করতে পারে না, কারণ এর বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে দর্শককে জিম্মি করে তাদের ওপর আরোপ করা। অন্যভাবে বলতে গেলে এটা আগে থেকে তৈরি করা একটি প্যাকেজ ডিল আর তাতে থাকছে তৈরি করা বার্তা এবং সমাপ্তি কানাগলিতে। সে কারণে সিনেমা খোলামেলা সাধারণ এবং ঘটনা বিবর্জিত কাহিনী নিতে পারে না। এ ধরনের সিনেমার ছকে দর্শকরা আটকা পড়ে থাকেন। যখন কাহিনীর সমাপ্তিটা খোলা থাকে দর্শক হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন এবং হাতড়ে বেড়ান। তার পর আপনি তাদের বলতে শোনেন ‘ছবিটা প্রায় শেষ পর্যন্ত বুঝেছি, কিন্তু শেষ দৃশ্যে এসে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে।’ সেক্ষেত্রে আমি মনে করি শেষ দৃশ্যটি বাদেই (ধরা যাক বিদ্যুত্ চলে যাওয়ার কারণে দেখা গেল না) সিনেমাটি শেষ হয় তাহলেও তৃপ্তি পাওয়ার কথা। আগের দিনগুলোয় আমি যখন সিনেমা দেখতাম চমত্কার মনকাড়ানিয়া একটি দৃশ্য বা দৃশ্য পরম্পরা দেখার পরই আমি থিয়েটার ত্যাগ করতাম। সেই বিশেষ মুহূর্তগুলোই আমার দিনটা সার্থক করে তুলত, আমি সিনেমার শেষটা দেখার তাগিদ বোধ করতাম না। ভালো হোক কি মন্দ, আমি চরিত্রের ওপর কোনো রায় কিংবা উপসংহার আশা করতাম না।

[২০০০ সালের আগস্টে মন্ট্রিয়ল বিশ্ব চলচ্চিত্র উত্সবে যোগ দিয়েছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তখন কানাডিয়ান চিত্রনির্মাতা শাহিন পারহামি তার যে সাক্ষাত্কার নেন তার নির্বাচিত অংশ অনূদিত হলো।]