ভিক্টর হিউগো ও তাঁহার পুত্র যখন সমুদ্রতীরে নির্বাসিত হন তখন পুত্র পিতাকে বলেছিলেন- এই নির্বাসনের সময়টা আমি শেক্সপীয়ার পড়ে কাটাব। আর পিতা, তুমি?" পিতা উত্তর করেছিলেন-"এই দীর্ঘ বার বৎসর আমার সমুদ্র দেখে কাটবে।"রবীন্দ্রনাথের চরিত্র, তাঁর সাহিত্য, সমুদ্রের মতোই বিরাট, সমুদ্রের মতোই তার অতলস্পর্শী গভীরতা। এর আলোচনাও তেমনি দুরূহ। সবকিছু বলা হয়ে গেলেও মনে হয় কিছুই বলা হলো না।

তাঁর আদর্শের যে দিকটা সহজেই চোখে পড়ে তা হলো-জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে, সভ্যতায় সভ্যতায় সমন্বয়সাধন। তাঁর জীবনে, তাঁর সাহিত্যে সর্বত্রই এ জিনিসটা সুপরিস্ফুট। তাঁর মতো বিরাট প্রতিভার পক্ষে তা খুবই স্বাভাবিক। নইলে সমগ্র জগতকে আপনার করে নিতে পারবেন কেন, জগৎ তাঁকে একবাক্যে স্বীকার করে নেবেই বা কেন?

তাঁকে আমরা শুধু একটা মানুষ হিসেবে দেখব না। তাঁর মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয়েছিল একটা সম্পূর্ণ যুগ-তাঁর জীবন একটা যুগের ইতিহাস। একদিকে হিন্দু সভ্যতা অন্যদিকে মুসলমান সভ্যতা, এই দুটি বিরাট সভ্যতা মিলিত হয়েছিল তাঁর মধ্যে। শুধু তাই নয়, তিনি জন্মেছিলেন একটা যুগসন্ধিক্ষণে। ভারতে মুসলমান শক্তির পতন ও ইংরাজ শক্তির অভ্যুদয়-এ দু’য়ের মাঝখানে তাঁর আবির্ভাব। তাঁর মধ্যে প্রাচ্যের যা কিছু সুন্দর ও গৌরবজনক তা যেমন রূপলাভ করেছিল, তেমনি পাশ্চাত্যের প্রভাব তাঁকে গড়ে তুলতে কম সাহায্য করেনি।

প্রাচ্যের সাধনা ত্যাগসর্বস্ব আর পাশ্চাত্যের সাধনা ভোগসর্বস্ব। এই দু’য়ের সমন্বয়, -পূর্বের আইডিয়ালিজম এবং পশ্চিমের রিয়ালিজম, এই দুটোর মিলন-এই-ই তাঁর জীবনের মূল কথা, তাঁর সাহিত্যের মূল সুর। কি শিক্ষায়, কি সভ্যতায় সর্বত্রই তিনি চেয়েছিলেন প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের মিলন। শিক্ষার ক্ষেত্রে, সভ্যতার ক্ষেত্রে- এ দু’য়ের মিল না হলে কিছুতেই আসতে পারে না সার্থকতা, একথা তিনি জোরের সঙ্গে বলেছেন।

একদিকে তিনি বলেছেন-

দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর,

লও যত লৌহ, লোষ্ট্র, কাষ্ঠ ও প্রস্তর।"

অন্যদিকে বলেছেন-

ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর

এখনি অন্ধ বন্ধ কোরোনা পাখা।

প্রাচীন ভারতের তপোবনের আদর্শ যেমন করেছে তাঁকে আকর্ষণ, তেমনি তাঁর কবি-মানস অজানা নূতন অনির্দেশের পদে পাখা মেলেছে চিরদিন ‘‌নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে’ হয়েছে তাঁর প্রতিভার নিত্য জাগরণ।

প্রাচীনকালে কবিদের কাব্যরচনার উদ্দেশ্য থাকত রসসৃষ্টি। কিন্তু আধুনিক কাব্য শুধু রসসৃষ্টি নয়- সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সমালোচনা। আধুনিক কালের কাব্যে পাঠক খুঁজে পান নিজের প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখের চিত্র-নিজের জীবনের নানাবিধ সমস্যার সমাধান চেষ্টা। বর্তমান জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথও তাই দক্ষ জীবন-সমালোচক। তিনি মানবতার কবি। শুধু কল্পলোকেই তিনি পরিভ্রমণ করেননি, মানুষের জীবনের শতবিধ সমস্যা তাঁর চিত্তকে করেছিল আলোড়িত। ‘‌চিত্রা’র সর্বপ্রথম তিনি ধূলির ধরার পানে স্থির অচঞ্চল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চাইলেন।

এবার ফিরাও মোরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে হে কল্পনে রঙ্গময়ী,

দুলায়ো না সমীরে সমীরে তরঙ্গে তরঙ্গে আর।"

কল্পনা আর সত্য, স্বপ্ন আর বাস্তব জড়াজড়ি করে বাসা বেঁধেছে তাঁর সাহিত্যে। রবীন্দ্র-সাহিত্যের বৈচিত্র্যের তুলনা নেই। জীবনের বিচিত্র রসের প্রকাশ এর বিশেষত্ব। বিভিন্ন প্রকৃতির রসপিপাসু মন এই বিচিত্র সাহিত্যে আনন্দের খোরাক খুঁজে পাবেন। দার্শনিকের কানে এর আধ্যাত্মিকতার সুরটি বাজবে প্রধান হয়ে, কর্মী পাবেন এর মধ্যে খুঁজে কর্মের প্রেরণা, প্রেমিকের কাছে এ অনবদ্য প্রেমের ইতিহাস। এমনকি ছোট শিশুটিও বাদ পড়েনি, বারবার তার মনের মণিকোঠার গোপন কথাটি তিনি টেনে বের করেছেন এবং সঞ্চয় করে রেখেছেন তাঁর সাহিত্যে।

দেশে স্ত্রী-স্বাধীনতার বাণী নূতন করে প্রচারিত হয়েছিল এ যুগে ঠাকুর বাড়ী থেকে। সেই আবহাওয়ায় মানুষ হয়ে রবীন্দ্রনাথ নারীর নিশ্চেষ্টতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন-

তোমরা বসিয়া থাক দ্বার প্রান্ত ভাগে,

শুধু ভালবাস; জান না বাহিরে বিশ্বে গরজে সংসার।

(রাজা ও রাণী)

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার

কেন নাহি দিবে অধিকার

হে বিধাতা?"

এই কথাগুলিতে যে গভীর বেদনা সূচিত হয়েছে তার পরিচয় তাঁর সাহিত্যে বারে বারে আত্মপ্রকাশ করেছে। ‘‌চিত্রাঙ্গদা’য় দেখতে পাওয়া যায় নারীত্বের আদর্শ সম্বন্ধে তাঁর ধারণা; কি সুন্দর ঋজু ও বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে তাঁর মানসকন্যা বলেছে-

দেবী নহি, নহি আমি সামান্য রমণী;

পূজা করি রাখিবে মাথায় সেও আমি নহি।

অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে পিছে সেও আমি নহি।

যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সঙ্কটের পথে

দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও, আমার পাইবে

  • তবে পরিচয়।"

রবীন্দ্রনাথ নেই। তিনি বলেছেন-

কেশে আমার পাক ধরেছে বটে,

তাহার পানে অত নজর কেন?

পাড়ার যত ছেলে এবং বুড়ো

সবার আমি এক বয়সী জেনো।

  • (ক্ষণিকা)

দীর্ঘ এক শতাব্দীর কাছাকাছি কোটি কোটি ছেলে এবং বুড়ো তাঁকে কাছে গেয়েছিল, তাঁর সান্নিধ্য অনুভব করেছিল। ‘Great men live not in years, but in their deeds’ -শুধু বছর গুণেই মহাপুরুষদের বয়সের হিসাব করা চলে না, তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের কাজের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথের অমূল্য জীবনের স্পন্দন আশিটি বছরের মধ্যে জেগে থাকল-আরও জেগে থাকল তাঁর সাহিত্যে। মানুষ হয়তো যুগে যুগে নূতনতর আদর্শের সন্ধান করবে, তা হ’লেও রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করবে না কোনদিন।

[সওগাত, মহিলা সংখ্যা, অগ্রহায়ণ, ১৩৪৮]