সাগরের বুক থেকে নতুন ধরনের নৌকায় চেপে হাজির হলো অপরিচিত এক দল যোদ্ধা। উত্তর সাগর পাড়ি দিয়ে তারা এ দ্বীপে এসে পৌঁছয়। তীরে নেমেই তারা খ্রিস্টীয় মঠে আক্রমণ করে। মঠগুলো সাধারণ ধর্মীয় কাজে ব্যবহার হতো বলে প্রায় অরক্ষিত ছিল। ফলে এ নতুন আক্রমণকারীরা খুব সহজেই মঠের প্রায় সবকিছু লুটে নেয়। লুটতরাজে বাধা দিয়ে অনেকে নিহত ও বন্দি হয়। এ ঘটনা তৎকালীন ইউরোপ ও খ্রিস্টীয় জগতে গভীর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। অপরিচিত সেই যোদ্ধারাই ইতিহাসের পাতায় ‘ভাইকিং’ নামে পরিচিত। সাগরের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবেই যে জাতি বিশিষ্ট হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ মনে করেন লিন্ডিসফার্ন মঠে আক্রমণের মধ্যে দিয়েই ভাইকিংদের সেই বিশিষ্ট যুগের সূচনা। তবে এ ধারণা পুরোপুরি ঠিকও নয়। কারণ এটি তাদের প্রথম আক্রমণ বা সমুদ্রযাত্রা ছিল না। এর আগেও বহু অভিযান তারা পরিচালনা করেছে। তবে এটা সত্য, লিন্ডিসফার্নের মঠ আক্রমণের মধ্য দিয়ে ভাইকিংরা পুরো ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাই সাধারণভাবে লিন্ডিসফার্ন আক্রমণের সময় অর্থাৎ ৭৯৩ সাল থেকে ভাইকিং যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যারা পরবর্তী ৩০০ বছর পর্যন্ত ইউরোপ ও এশিয়ার ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
ভাইকিং কারা
নামটি শুনলেই মাথায় ‘শিংওয়ালা হেলমেট পরিহিত যে বর্বর যোদ্ধা জনগোষ্ঠীর’ চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার সঙ্গে ঐতিহাসিক বাস্তবতার বেশ পার্থক্য রয়েছে। এ চিত্রায়ণ অবশ্য রুপালি পর্দার অবদান। ভাইকিংদের ইতিহাস, সভ্যতা বরং অত্যন্ত তাৎপর্যময়, প্রভাবশালী ও কৌতূহলোদ্দীপক। ভাইকিংরা কোনো একক জাতি ছিল না। বর্তমান স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চল অর্থাৎ নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেনে ভাইকিংদের উৎপত্তি। অষ্টম-একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক স্ক্যান্ডিনেভীয় ভাগ্যান্বেষণের উদ্দেশে স্বদেশ ছেড়ে অন্যত্র অভিযাত্রায় অংশ নিতে শুরু করে। সমুদ্রগামী এ যোদ্ধাদের সাধারণভাবে ভাইকিং বা ‘নর্সম্যান’ (উত্তরের মানুষ) নামে অভিহিত করা হতো।
ভাইকিংরা স্বদেশে জীবিকানির্বাহের জন্য ব্যবসা, ধাতব সামগ্রী নির্মাণ, পশুপালন ও কৃষিকাজ করত। কৃষিকাজের মাঝখানে অবসর সময়ে এক দল সমুদ্র অভিযানে বের হয়ে যেত এবং লুটতরাজ করে ফসল কাটার সময় ফিরে আসত। তবে এমন লুণ্ঠন লাভজনক হয়ে ওঠায় ধীরে ধীরে এ কাজে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ক্রমেই এ কৃষক সম্প্রদায় যোদ্ধা ও জলদস্যুতে পরিণত হয়।
তাদের আক্রমণের নিশানা ছিল বেসামরিক ও অরক্ষিত জনপদ। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালির উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো ছিল ভাইকিং আক্রমণের ‘হটস্পট’। এছাড়া রাশিয়ার অভ্যন্তরভাগ পর্যন্তও তারা আক্রমণ চালিয়েছে। যেসব ভূখণ্ডের সংস্পর্শে তারা এসেছিল, সেখানে তারা শুধু লুণ্ঠন করেনি, বরং বাণিজ্য করেছে, অনুসন্ধান চালিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বসতি স্থাপন ও কৃষিকাজও করেছে।
যে কারণে সমুদ্রে নেমেছিল ভাইকিংরা
অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের জনগণ ঠিক কী কারণে সাগর পাড়ি দিয়ে লুণ্ঠন অভিযানে বের হতে শুরু করে তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একক কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ কেউই প্রমাণ করতে পারেনি। তবে নিজেদের কৃষিজমি ও কামারশালা ছেড়ে কেন প্রথমে আক্রমণ এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল তার পেছনে বেশ কতগুলো কারণ দায়ী থাকতে পারে বলে ধারণা করেন গবেষকরা। এগুলোর মধ্যে আছে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং পর্যাপ্ত উর্বর কৃষিজমির অভাব, ভূমিহীন কনিষ্ঠ পুত্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি, অরক্ষিত ও সম্পদশালী গির্জার সম্পত্তি, ইউরোপীয় খ্রিস্টান ও পৌত্তলিক ভাইকিংদের মধ্যে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা, স্বদেশে গোত্রপ্রধানদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব, নতুন ভূখণ্ডে অভিযান ও দুঃসাহসিক জীবনের হাতছানি।
অধিকাংশ গবেষক বিশ্বাস করেন জনসংখ্যার চাপের তত্ত্ব দিয়ে ভাইকিং যুগের সূচনা ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। ভাইকিংদের লুণ্ঠন ও বাণিজ্যের ফলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অর্থনীতিতে অনেক সম্পদ প্রবেশ করেছিল এবং ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধি হয়তো পরবর্তী সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধিই সম্ভবত ভাইকিং যুগের সূচনার মূল কারণ ছিল না।
ভাইকিং সমাজের প্রথা অনুযায়ী পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী হতো। ফলে দেখা যেত, কনিষ্ঠ পুত্ররা বেশির ভাগ সময় কিছুই পেত না। চাষাবাদের জন্য জমি বরাদ্দ না থাকায় তাদের জীবিকানির্বাহের জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে হতো। এ বিকল্প পথের সন্ধানই ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে স্ক্যান্ডিনেভীয়দের সম্প্রসারণের পেছনে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বলে এ তত্ত্বে মনে করা হয়।
ভাইকিংরা খ্রিস্টধর্মের অনুসারি ছিল না। তাই মঠের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আক্রমণ করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ধর্মীয় বাধা ছিল না। অন্যদিকে গির্জা ও মঠগুলো প্রায়ই অরক্ষিত থাকত। ভাইকিংদের কাছে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল সহজ ও লাভজনক লক্ষ্য। কারণ তৎকালীন গির্জা ও মঠগুলো বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্পদ রাজা কিংবা বণিকদের সম্পদের চেয়েও বেশি ছিল। তাই তারা মঠগুলোয় আক্রমণ করত। লিন্ডিসফার্ন মঠ আক্রমণ বিষয়ে বহুল উদ্ধৃত একটি দলিল হলো ইংরেজ ধর্মযাজক অ্যালকুইনের লেখা একটি চিঠি। সেই সময় তিনি ফ্রাঙ্কিশ রাজদরবারে অবস্থান করছিলেন। নর্থামব্রিয়ার রাজাকে লেখা সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—
‘ব্রিটেনে কোনো পৌত্তলিক জাতির হাতে এমন আতঙ্কের অভিজ্ঞতা আমাদের আগে কখনো হয়নি। সমুদ্রপথে এমন আক্রমণ ঘটতে পারে—এমনটিও কেউ ভাবেনি। দেখো, সেন্ট কুথবার্টের গির্জা ঈশ্বরের যাজকদের রক্তে রঞ্জিত, তার সমস্ত অলংকার লুণ্ঠিত; ব্রিটেনের সবচেয়ে পবিত্র স্থানটি এখন পৌত্তলিকদের শিকারে পরিণত হয়েছে।’

ভাইকিংদের বিদেশযাত্রাকে শুধু দারিদ্র্য বা জমির অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। অষ্টম শতাব্দীর ইউরোপে বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছিল। আগে স্ক্যান্ডিনেভীয়রা ইউরোপীয়দের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য করত। স্ক্যান্ডিনেভীয়রা পশম, অ্যাম্বার, চামড়া ও অন্যান্য পণ্য নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্য করত। কিন্তু খ্রিস্ট ধর্ম ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান বণিকরা পৌত্তলিকদের সঙ্গে বাণিজ্যে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে ভাইকিংরা তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সংকটে পড়ে। সম্ভবত তারা এ সমস্যার বিকল্প সমাধান হিসেবে লুণ্ঠন অভিযানকে বেছে নিয়েছিল। যেহেতু বাণিজ্যের উদ্দেশে ইউরোপীয় বন্দরগুলোয় আনাগোনা ছিল, তাই আক্রমণ করার সহজ রাস্তাও এরই মধ্যে তারা জানত।
ভাইকিংদের মানসিক গড়ন ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসী প্রকৃতির। যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করা কেবল সম্মানজনকই নয়, বরং মৃত যোদ্ধাকে গডফাদার (দেবতাদের প্রধান) ওডিন নিজে ভালহালায় (Valhalla-বীর যোদ্ধাদের স্বর্গ) নিয়ে যাবেন এমন বিশ্বাসও প্রচলিত ছিল তাদের মধ্যে। এ বিশ্বাসও তাদের পরোক্ষভাবে হাতছানি দিয়েছে দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণ করতে। তাছাড়া প্রথম অভিযানের পর এতে বিপুল সম্পদ লাভের সুযোগ সবার কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড অধিকার
ভাইকিংদের বড় ধরনের আক্রমণের প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় ইংল্যান্ডে। ৭৯৩ সালে লিন্ডিসফার্ন আক্রমণ এবং ৭৯৪ সালে জ্যারোর সেন্ট পল মঠের ধ্বংসযজ্ঞের পর কিছুটা বিরতি লক্ষ করা যায়। এরপর ৮৩৫ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে ভাইকিংদের আক্রমণ নিয়ে আর তেমন কিছু শোনা যায়নি। তবে আয়ারল্যান্ডের ভাগ্য অবশ্য অতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। ইংল্যান্ডের প্রায় সমসাময়িক সময়েই আয়ারল্যান্ডে আক্রমণ হয়েছিল এবং কোনো প্রকার বিরতি ছাড়াই তা অব্যাহত থাকে। ভাইকিংরা স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূল দিয়ে যাত্রা শুরু করে ৭৯৫ সালে স্কাই এবং তারপর ডাবলিনের অদূরে ল্যাম্বে দ্বীপ আক্রমণ করে। একই বছরে গ্ল্যামরগানশায়ার বিধ্বস্ত হয় এবং ৭৯৮ সালে আইল অব ম্যান আক্রান্ত হয়। ভাইকিংরা তাদের নৌবহর দিয়ে সমগ্র আয়ারল্যান্ডকে পুরোপুরি ঘিরে ফেলেছিল। তাদের নৌবহর আয়ারল্যান্ডের বন্দরগুলোয় নোঙর করে এবং সেখান থেকে আশপাশের অঞ্চলে আক্রমণ চালাতে থাকে। এ সময় ভাইকিংদের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ‘টারগেস’ বিশাল রাজকীয় নৌবহর নিয়ে আয়ারল্যান্ডে এসে উপস্থিত হন। ৮৪১ সালে আরমাঘের মঠাধ্যক্ষকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তিনি মঠের কর্তৃত্ব নিজ হাতে নিয়ে নেন এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ওপর স্বীয় সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করেন।
ফ্রান্সে ভাইকিংদের বসতি স্থাপন
ভাইকিংদের আক্রমণ শুধু ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আক্রমণের পরিধি বৃদ্ধির প্রবণতাও বাড়তে থাকে। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে এসে তারা বর্তমান ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান শুরু করে। সিন নদী দিয়ে তারা ফ্রান্সের অভ্যন্তরে খুব সহজেই প্রবেশ করে। ৮৪৫ সালে ভাইকিংরা প্রথম প্যারিসে আক্রমণ করে। পরবর্তী সময়ে প্যারিস ও আশপাশ এলাকায় নিয়মিত হামলা চালাতে শুরু করে। ভাইকিংদের হামলা প্রতিহত করার জন্য ফ্রান্সের শাসকরা কখনো তাদের সঙ্গে লড়াই করেছেন, কখনো সমঝোতা চুক্তি করেছেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য, ৯১১ সালে ফ্রান্সের শাসক চার্লস দ্য সিম্পল ভাইকিং নেতা রোলোর সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। যেখানে রোলোকে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের কর্তৃত্ব দেয়া হয় এই শর্তে যে বিনিময়ে রোলো ফ্রান্সকে অন্যান্য আক্রমণকারীর হাত থেকে রক্ষা করবে। ভাইকিংদের বসতি স্থাপন করা এ অঞ্চলই পরবর্তী সময়ে ‘নরম্যান্ডি’ নামে পরিচিতি পায়। এখানে বসবাসকারী ভাইকিংরা স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে।
রাশিয়া ও বাইজেন্টাইন অধিকার
সমুদ্রচারী ভাইকিংসরা নদীপথে রাশিয়া ও বাইজেন্টাইন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। পশ্চিম ইউরোপে ভাইকিংদের হামলার পর তাদের নজর পড়ে পূর্ব ইউরোপের দিক। সুইডেন, ইউক্রেন, রাশিয়া হয়ে ভলগা নদী দিয়ে কৃষ্ণসাগর ও কাস্পিয়ান সাগর ধরে তারা ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমান্তে পৌঁছয়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল ছিল তাদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এখানে এসে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, আবার কেউবা সামরিক সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। বাইজেন্টাইন সম্রাটের বিখ্যাত ‘ভারাঙ্গিয়ান গার্ড’-এ স্ক্যান্ডিনেভীয় এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য উত্তর ইউরোপীয় যোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডে ভাইকিংরা তাদের বসতি স্থাপন করেছিল। এক্ষেত্রে অনেক গবেষকই মনে করেন, কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের বহু আগেই ভাইকিংরা আমেরিকার মাটিতে পা রেখেছিল।
বসতি স্থাপন
সময় যত এগিয়েছে, ভাইকিংদের জীবনও পরিবর্তন হয়েছে। প্রথম দিকে ভাইকিংরা অভিযান পরিচালনা করত কৃষিকাজের অবসর সময়ে। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে জাহাজে করে আসত এবং আক্রমণ করে সম্পদ লুট করে দ্রুত ফিরে যেত। কিন্তু নবম শতাব্দীতে এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। অভিযানের সুফল তাদের জনগণের মধ্যে সবাই অনুধাবন করতে পেরে ধীরে ধীরে লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে এবং অভিযানগুলো বড় ও সংগঠিত হয়ে ওঠে। ফলে তারা কোনো অঞ্চলে আক্রমণ করলে সেখানে লুণ্ঠনের পাশাপাশি জমি দখল ও স্থায়ী বসতি স্থাপনের দিকে অগ্রসর হয়। যেখানে বসতি স্থাপিত হয়, সেখানে শাসক ও শাসন কাঠামো গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দেয় তারা। তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো নরওয়ের ডিউকের ইংল্যান্ড বিজয়। অর্থাৎ একসময় ইংল্যান্ডে যাদের বহিরাগত ও লুটেরা হিসেবে অভিহিত করা হতো, সেই ইংল্যান্ডকেই একদিন নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেয় ভাইকিংরা। আক্রমণকারী থেকে রাজ্য প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ভাইকিংদের এ যাত্রা ইউরোপীয় ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়।
ভাইকিং যুগের অবসান
ইতিহাসে ভাইকিংরা প্রায় ৩০০ বছর দোর্দণ্ডপ্রতাপে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। কিন্তু ঠিক কোন সময়ে এসে ভাইকিংরা সেই প্রভাব হারিয়ে ফেলে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দকে প্রচলিতভাবে ভাইকিং যুগের সমাপ্তির প্রতীকী বছর হিসেবে ধারণা হয়। এ বছর নরওয়ের রাজা হ্যারাল্ড হার্ডরাডা ইংল্যান্ড আক্রমণ করে এবং ইংরেজরাজ ওই যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। একই বছর নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম ইংল্যান্ড জয় করেন। এ আক্রমণ ও বিজয়ের পর থেকে ভাইকিংদের আর উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো অভিযানের কথা শুনতে পাওয়া যায়নি। ততদিন স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলগুলোয় (নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন) শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে উঠেছিল, যা সমাজের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় নতুন মোড় এনে দেয়।
ইতিহাসে ভাইকিংদের মূল্যায়ন
ভাইকিংদের কোনো একক পরিচয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ তিন শতাব্দীজুড়ে তারা বহু জনপদ লুট করেছে, ধ্বংস করেছে, মানুষকে খুন করেছে, বন্দি করেছে। এসবের পাশাপাশি ইতিহাসের তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অবদানও ছিল। তারা সমুদ্র অভিযান ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে নতুন পথ দেখিয়েছে। সমুদ্রে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমে তারা ইউরোপ, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও আরব বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য করেছে। নতুন নতুন অঞ্চলে আক্রমণ ও বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্য তারা বহু নতুন ভূমির সন্ধান পেয়েছে। তাই সাগরে আতঙ্ক ছড়ানো এ জাতি বণিক, বসতি স্থাপনকারী, সাহসী সমুদ্রযোদ্ধা, দক্ষ কারিগর পরিচয়েও ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
ডেইজি আক্তার: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









