আজ তাদের উপস্থিতি শুধু দুগ্ধশিল্প, মাংস উৎপাদন বা কৃষিশ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার সঙ্গেই যুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চিড়িয়াখানা, ছোট খামার, শহুরে ফার্ম কিংবা র্যাঞ্চে তাদের দেখা যায়। গ্রামীণ মেলা, ষাঁড়দৌড় বা ষাঁড়ের লড়াইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানেও গরুর উপস্থিতি রয়েছে। আর গরু তো বহু আগে থেকেই গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে মানুষ পালন করে আসছে।
বিশ্বজুড়ে গরু ভালোবাসা পেয়ে আসছে মানুষের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেবতার সম্মানও পায়। কৃষিক্ষেত্রের বাইরেও মানুষের কল্পনা ও সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব বিস্তৃত। জাতীয় প্রতীক, ক্রীড়া দলের মাসকট, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ইন্টারনেট—সবখানেই গরু ও ষাঁড়ের উপস্থিতি দেখা যায়। সাহিত্য, শিল্পকলা ও জাদুঘরেও গরুর স্থান রয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশ্বনেতা ও সেলিব্রিটিদের খামার পর্যন্ত—গবাদিপশু সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শৈশব থেকেই শিশুদের পরিচয় ঘটে গরুর সঙ্গে। গরুবিষয়ক ছড়া, গান ও গল্পের মাধ্যমে তারা গরু চেনে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন গান, গল্প ও ছড়া আছে গরুকে কেন্দ্র করে। চাঁদের ওপর লাফ দেয়া গরুর গল্প আছে। আবার ‘ওল্ড ম্যাকডোনাল্ড হ্যাড আ ফার্ম’ গানে গরুর ডাক শুনে শিশুরা গরু সম্পর্কে ধারণা পায়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা শোনে গ্রিক পুরাণে জিউসের আইওকে বকনায় রূপান্তরের কাহিনী অথবা ষাঁড়ের রূপ ধরে ইউরোপাকে প্রলুব্ধ করার গল্প। ইংরেজি রূপকথায় জ্যাক তার দুগ্ধগাভী বিক্রি করে জাদুবীজ পায়, যা বিশাল লতাগাছে পরিণত হয়। রুশ লোককাহিনী ‘দ্য ডান কাউ’ বা হিমালয়ের কালো গরুর গল্পেও গরুর উপস্থিতি রয়েছে।
টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রেও জনপ্রিয় চরিত্র হিসেবে গরুকে দেখা যায়। ‘দ্য লাফিং কাউ’ পনিরের বিজ্ঞাপনচিত্র ১৯২১ সাল থেকে বিখ্যাত। একইভাবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘রেড বুল’ লোগোতেও ষাঁড় ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন ক্রীড়া দলও ষাঁড়কে তাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে, যেমন এনবিএর শিকাগো বুলস।
বলিউড থেকে হলিউড—সর্বত্রই গরু ও ষাঁড়ের উপস্থিতি রয়েছে। জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে আছে মিনি মাউসের বন্ধু ক্লারাবেল, বড়দিনের চলচ্চিত্র Annabelle’s Wish-এর অ্যানাবেল এবং অ্যানিমেটেড সিরিজ Cow and Chicken। ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র, গরু তাড়ানোর কাহিনী কিংবা র্যাঞ্চভিত্তিক প্রেমের গল্পেও গবাদিপশু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের পতাকাতেও গরু বা ষাঁড়ের প্রতীক দেখা যায়। আন্দোরা, মলদোভা, সুইজারল্যান্ডের উরি অঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস ও ভারমন্ট প্রভৃতি স্থানের পতাকায় এদের ব্যবহার হয়েছে।
চিত্রশিল্পেও গরুকে পাওয়া যায়। প্রাচীন গুহাচিত্র ও সমাধির দেয়াল থেকে আধুনিক শিল্পকর্ম পর্যন্ত শিল্পীরা দীর্ঘকাল ধরে গবাদিপশুর প্রতি মুগ্ধ। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি গর্ভবতী গাভীর জরায়ুর অ্যানাটমি এঁকেছিলেন। জার্মান শিল্পী ফ্রান্ৎস মার্ক তার বিখ্যাত The Yellow Cow (১৯১১) চিত্রকর্মে গরুকে উজ্জ্বল রঙে উপস্থাপন করেন। অ্যান্ডি ওয়ারহল “Cow Series” নামে পপ-আর্ট তৈরি করেন। আধুনিক শিল্পী ড্যামিয়েন হার্স্ট তার বিতর্কিত শিল্পকর্ম Mother and Child Divided-এ গরু ও বাছুরের সংরক্ষিত দেহ ব্যবহার করেন। তার আরেকটি শিল্পকর্মে ফরমালডিহাইডে সংরক্ষিত বাছুরের সঙ্গে সোনার শিং ও খুর ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ২০০৮ সালে বিপুল মূল্যে বিক্রি হয়।

আর্তুরো দ্য মোদিকার ‘চার্জিং বুল’ ছবি: স্টোরি হান্ট
গবাদিপশুর ভাস্কর্যও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইতালীয়-আমেরিকান শিল্পী আর্তুরো দি মোদিকা তৈরি করেন বিখ্যাত Charging Bull, যা ওয়াল স্ট্রিট ও বাণিজ্যের প্রতীক। ১১ ফুট উঁচু ও ১৬ ফুট দীর্ঘ এই ব্রোঞ্জের ষাঁড়টির ওজন ৭ হাজার ১০০ পাউন্ড। ১৯৮৭ সালের ব্ল্যাক মানডে স্টক মার্কেট ক্র্যাশের ঘটনার বিপরীতে তিনি এই ষাঁড় তৈরি করেছিলেন। ১৯৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি ষাঁড়টি একটি ট্রাকে করে এনে ওয়াল স্ট্রিটে ফেলে যান। এরপর থেকেই ষাঁড়টি ওয়াল স্ট্রিট বুল নামেও পরিচিত হয়। Cow Parade নামে আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রকল্পে শিল্পীদের সাজানো গরুর ভাস্কর্য বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়। উজ্জ্বল রঙ ও বৈচিত্র্যময় নকশার কারণে এগুলো শহরের রাস্তা ও পার্কে আকর্ষণ সৃষ্টি করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি তোলার জনপ্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে।
বিশ্বের নানা দেশে গবাদিপশু নিয়ে বিশেষ জাদুঘরও রয়েছে। জার্মানির দুগ্ধ জাদুঘর, জাপানের ক্যাটল মিউজিয়াম, ফিনল্যান্ডের গবাদিপশুর ইতিহাস জাদুঘর এবং টেক্সাসের ক্যাটল রেইজার্স মিউজিয়াম তার উদাহরণ। স্থানীয় ইতিহাসে গবাদিপশুর ভূমিকা জানতে এসব জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।








