সাধারণত বেশকিছু বিষয় বিবেচনা করে অবরোধ দেয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম শত্রু পক্ষের সমুদ্রপথ বন্ধ করে দিলে তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, জনগণ দুর্ভোগে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে অন্য কথা। অবরোধের এ ধারণা প্রায়ই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। অবরোধ অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়। এর পেছনে একাধিক সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করে। প্রাসঙ্গিক কারণগুলো নিচে পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করা হলো।
প্রথমত, অবরোধ সফল করতে হলে প্রতিপক্ষের সমুদ্রপথ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে তা খুব কমই সম্ভব হয়। প্রতিপক্ষের নৌবাহিনী, সাবমেরিন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, কনভয় সিস্টেম ও প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে অবরোধকারী শক্তি প্রায়ই সমুদ্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ এবং মার্কিন নৌবাহিনী জার্মান সাবমেরিনকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করে, ফলে জার্মানি মিত্রবাহিনীর জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। সে সময় অবরোধের মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রু শক্তির অর্থনীতি পঙ্গু করা, যা জার্মানি সম্পূর্ণভাবে অর্জন করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অবরোধ ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর একটি বড় কারণ ‘লিকেজ’ বা ফাঁকফোকর তৈরি হওয়া। চোরাচালান, কালোবাজারি ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে ওঠে। অনেক নিরপেক্ষ দেশ তখন ‘মধ্যস্থ বাণিজ্য কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করে, যার মাধ্যমে অবরুদ্ধ রাষ্ট্র পরোক্ষভাবে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করে। নেপোলিয়নের কন্টিনেন্টাল সিস্টেম এর একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ। তার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটেনকে ইউরোপীয় বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করা। কিন্তু বাস্তবে তিনি ব্রিটেনকে পুরোপুরি ইউরোপীয় বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে ব্রিটিশ পণ্য প্রবেশ অব্যাহত থাকে এবং নেপোলিয়নের অবরোধ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
তৃতীয়ত, অবরোধ কঠোর হলেও বড় শক্তিগুলো তা মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা রাখে। তারা পণ্য মজুদ করে, পুনর্ব্যবহার বাড়ায় এবং প্রয়োজনীয় জিনিসের বিকল্প তৈরি করে। যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যুক্তরাজ্য খাদ্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির কৌশল ছিল আমদানি নির্ভরশীল যুক্তরাজ্য যুদ্ধকালে অনাহারে রেখে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। কিন্তু যুক্তরাজ্য দ্রুত কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে এ সংকট মোকাবেলা করে। একইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি প্রাকৃতিক রাবারের সরবরাহ হারালে কৃত্রিম রাবার উৎপাদন শুরু করে, যা তাদের যুদ্ধযন্ত্র সচল রাখতে সহায়তা করে।
চতুর্থত, শক্তিশালী দেশগুলো শুধু নিজেদের সম্পদের ওপর নির্ভর করে না। তারা আশপাশের অঞ্চল দখল করে সেখানকার সম্পদ ব্যবহার করে। বিশেষ করে রেলপথের বিকাশ এ প্রক্রিয়াকে সহজ করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্পদ আহরণ করে, ফলে মিত্রশক্তির অবরোধের প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
এছাড়া আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধকালীন অবরোধের চাপ মোকাবেলায় অর্থনীতিকে দ্রুত পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণে আনতে তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষ। অর্থনীতিবিদ মানকুর ওলসন তার ‘দি ইকোনমিকস অব দ্য ওয়ারটাইম শর্টেজ’ গ্রন্থে যুক্তরাজ্যের ওপর নেপোলিয়নিক যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবরোধের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন।
তার ব্যাখ্যায় উঠে আসে যুদ্ধের সময় অবরোধের কারণে খাদ্যের ঘাটতি বাড়লেও মানুষের ভোগান্তি সবসময় সে অনুপাতে বাড়ে না। হিসাব অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, আর নেপোলিয়নের সময় সবচেয়ে কম হওয়ার কথা; কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ হয়েছিল নেপোলিয়নিক যুগে, আর দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় তুলনামূলক কম। এর মূল কারণ ছিল ব্যবস্থাপনা।
এ আপাতবিরোধী ফলাফলের ব্যাখ্যা হলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বিবর্তন। আধুনিক রাষ্ট্র যত উন্নত হয়েছে, ততই তারা যুদ্ধকালীন অর্থনীতি সংগঠিত করা, রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা এবং সংকট সামলাতে বেশি কার্যকর হয়েছে। নেপোলিয়নের যুগে ব্রিটেনে এ প্রশাসনিক সক্ষমতা ছিল সীমিত; প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তা উন্নত হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে একই ধরনের খাদ্য ঘাটতি হলেও জনগণের ভোগান্তি সময়ের সঙ্গে কমে এসেছে।

নরওয়েতে আটক জার্মান ইউ-বোট ছবি: ওয়ার অফিস, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার কালেকশন
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আধুনিক রাষ্ট্রের জনগণ ব্যাপক কষ্ট সহ্য করেও সহজে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে না। ইতিহাসে এমন কোনো সুস্পষ্ট উদাহরণ নেই, যেখানে শত্রু পক্ষের অবরোধের সময় সরাসরি জনগণ তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের গণ-আন্দোলনে নেমেছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ঘটে। জনগণের ক্ষোভ আক্রমণকারী শক্তির বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীভূত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের অভিজ্ঞতা এর স্পষ্ট উদাহরণ। দেশটি মার্কিন অবরোধে খাদ্য ও কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়ে, পাশাপাশি ব্যাপক বিমান হামলায় শহরগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়। তবু ভয়াবহ পরিস্থিতি সরকারবিরোধী বিদ্রোহে রূপ নেয়নি; বরং জনগণের প্রতিক্রিয়া মূলত বহিরাগত আক্রমণকারীর বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীভূত ছিল।
তবু জাপানের জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ও ধ্বংসাত্মক আঘাত অবিচলভাবে সহ্য করে গেছে; আত্মসমর্পণের জন্য তারা নিজেদের সরকারের ওপর তেমন কোনো সংগঠিত চাপ সৃষ্টি করেনি। অর্থাৎ, ভয়াবহ কষ্টও সবসময় রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয় না।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শাসকগোষ্ঠী সাধারণত যুদ্ধ থামায় না কেবল এ কারণে যে তাদের জনগণ বিপুল দুর্ভোগে আছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে উল্টো বাস্তবতা কাজ করে। জনগণের কষ্ট যত বাড়ে, যুদ্ধ থেকে সরে আসা নেতাদের জন্য ততই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ যদি তারা পরাজয় স্বীকার করে, তাহলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জনগণের ক্ষোভ তাদের দিকেই ফিরে আসতে পারে। যে নেতৃত্ব দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, পরাজয়ের পর সে নেতৃত্বই প্রতিশোধের লক্ষ্য হতে পারে।
ফলে এক নির্মম প্রণোদনা তৈরি হয়। জনগণের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। তাদের আশা থাকে, কোনোভাবে যদি বিজয় অর্জন করা যায়, তাহলে অন্তত নিজেদের পতন ঠেকানো সম্ভব হবে।
[লেখকের দ্য ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিকস গ্রন্থ থেকে অনুবাদ করেছেন ইকবাল মুনাওয়ার]








