আমাদের দেশেও বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়, চীনে বড় করে আয়োজিত হয় চৈনিক নববর্ষের উৎসব। তবে নতুন বছর নিয়ে অন্যতম ঋদ্ধ ও ঐতিহাসিক আয়োজন হয় পারস্যে, বর্তমান ইরানে। তাদের নববর্ষ তথা নওরোজ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই পারস্যের সাহিত্যেও নওরোজ প্রসঙ্গ এসেছে বারবার।

নওরোজ পারস্য সংস্কৃতির কয়েক হাজার বছরের পুরনো অংশ। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো এত প্রাচীন হওয়ার পরও এর গায়ে পুরনোর কোনো ছাপ পড়েনি। জৌলুসের কোনো কমতি হয়নি। অনুষ্ঠানটিকে আজও আনন্দের অবসর মনে করার পাশাপাশি দেখা হয় পুনরুজ্জীবনের বার্তাবাহক হিসেবে। আর সাহিত্য যেহেতু সমাজের দর্পণ, সেখানেও অনুষ্ঠানটি এসেছে ঘুরেফিরে।

পারস্যের অন্যতম বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম মহাকবি ফেরদৌসী রচিত শাহনামা। পারস্যের নানা ঘটনা, কথা-উপকথা এসেছে এ মহাকাব্যে। পাশাপাশি আছে নওরোজের কথাও। শাহনামার সিয়ভাস গল্পে এসেছে এ প্রসঙ্গ। সর্বকালের মানুষের জন্য নওরোজ বা নতুন দিন কামনা করেছেন কবি। তিনি লিখেছেন—

প্রতি বছর তোমার ভাগ্যের হোক জয়

তোমার সারাটা জীবন হোক শুভ নওরোজ।

দুটো লাইন পড়েই বোঝা যাচ্ছে এখানে নওরোজকে সুখ ও আনন্দের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। কবি মানুষের সারাজীবন ও বছরের প্রতিটি দিনের জন্য শুভ কামনা জানিয়েছেন।

শিরাজের কবি শেখ সাদীও নওরোজকে এ দৃষ্টিতেই দেখেছেন। তার কবিতার চরণে এসেছে নওরোজের কথা। একে তিনি দেখেছেন নতুনের বার্তা হিসেবে। সাদী লিখেছেন—

ভোরের স্নিগ্ধ সমীরণ নিয়ে এলো নওরোজের সুঘ্রাণ

আমার প্রিয়জনের জন্য তা নিয়ে আসুক সৌভাগ্যের বার্তা

আশীর্বাদে পূর্ণ হোক তোমার এ বছর ও প্রতিটি বছর,

সমৃদ্ধ হোক তোমার আজকের এ দিন ও প্রতিটি দিন।

এ চার লাইন পড়ে বোঝা যাচ্ছে শেখ সাদীও বিশ্ব মানবতাকে নওরোজের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। মানুষের প্রতিটি দিন নওরোজের মতো সুখ ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক এ কামনা করেছেন। আসলে এ কবিতায় নওরোজ সম্বন্ধে সাদীর দৃষ্টিভঙ্গি কবি ফেরদৌসীর দৃষ্টিভঙ্গির অনুরূপ এবং এ দিনটি একটি শুভদিন হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।

পারস্য সাহিত্যের আলাপ হবে আর সেখানে জালাল উদ্দিন রুমীর কথা আসবে না তা তো হয় না। এ মহান কবিও নওরোজকে রেখেছেন তার কবিতায়। তবে স্বাভাবিকভাবেই সেই লেখায় আছে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ‘দিওয়ান-এ-শামস’-এ নওরোজ সম্পর্কে লিখেছেন। নওরোজকে রুমী দেখেছেন সৃষ্টিকর্তার বাণী ও এমনকি খোদার অস্তিত্বের নিদর্শন হিসেবে। তিনি তার কবিতার ছন্দমিল করেছেন মাতাল, প্রেম, তারুণ্য এবং আমাদের বন্ধু— এ অভিধাগুলো দিয়ে। মনে রাখা প্রয়োজন নওরোজ বসন্তেরও সূচনা। তাই রুমী নওরোজ ও বসন্তের সূচনাকে মেষরাশির সঙ্গে তুলনা করেছেন। কবিতায় তিনি বসন্ত ও প্রকৃতির নতুন প্রাণের সঞ্চারকে আল্লাহ প্রদত্ত বলে মনে করেন। রুমী লেখেন—

টিউলিপ আর তুলসী পাতাগুলো আজ পেল পানপেয়ালার আকৃতি

আমার রব ব্যতীত এমন অনন্য শোভার কারিগর আর কে হতে পারে?

অর্থাৎ শুরুতেই তিনি স্রষ্টার গুণ গাওয়ার পাশাপাশি তাকেই নওরোজের মালিক বলে জানালেন। পারস্যের কবিরা ফুল পছন্দ করতেন। রুমীর মধ্যে তা দেখা যায়, তাই তিনি ফুলের কথা বলেছেন। এর পরের দুই চরণেও বিষয়টি দেখা যায়। তিনি লিখেছেন—

লিলি ফুল বলল কানে গুল্মলতাটিরে

রবের ছায়া থেকে যেন না যাই কভু সরে।

পারস্যের কবিরা তাদের একাধিক কবিতায় নওরোজকে নিয়ে এসেছেন। শেখ সাদী তার গজলের প্রথম স্তবকে নওরোজ সম্পর্কে একই মারফাতি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। তিনি নওরোজকে এ বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার উপহার (সৃষ্টি) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন—

পুবাকাশের সূর্যোদয় আর দখিনা বাতাসে নওরোজের ভেসে আসা ঘ্রাণ

প্রকৃতির এ অপরূপ রূপে, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে আমার প্রাণ

ফারসি সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র হাফিজ শিরাজী তার এক মনোমুগ্ধকর গজলে বলেন—

বন্ধুর গলি থেকে নওরোজের মৃদু বাতাস ভেসে আসে;

এ বাতাসকে গ্রহণ করলে তা হৃদয়কে আলোকিত করে।

মরুভূমিতে ঝেড়ে ফেলো হৃদয়ে জমে থাকা ধূলিকণা,

আর ফুলবাগানের বুলবুলির কাছ থেকে শিখে নাও সুরেলা গান।

এ কবিতায় হাফিজ মানুষকে আহ্বান জানান বসন্তের মতো নিজেকেও নবায়ন করতে—দুঃখ, ক্লান্তি ও মলিনতা দূর করে হৃদয় ও আত্মাকে আলোর দিকে উন্মুক্ত করতে।

ফারসি কাব্যে নওরোজ শুধু বসন্তের আগমন নয়, বরং এটি কঠিন সময় পেরিয়ে আশার আলো ফিরে আসার প্রতীক। শীত এখানে কষ্ট ও ক্লান্তির রূপক, যার অবসানে আসে আনন্দ ও প্রাণচাঞ্চল্য। এ ভাবনাকে কবি শেখ সাদী অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন—

বিদায় নিচ্ছে বিষণ্নতার দিন,

পাপিয়াকে বলি—দুঃখ করো না;

নওরোজের দিন, টিউলিপ ও তুলসীর ঋতু

আবারো ফিরে আসবে।

পারস্যের সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রভাব ফেলেছে ভারতেও। সেই সূত্রে ভারতের কবিদের লেখায়ও এসেছে নওরোজ প্রসঙ্গ। আমির খুসরো লিখেছেন—

তোমার নাম ছাড়া আর কারো নাম আমি ডাকিনি,

তোমাকে ছাড়া আর কারো সাথে থাকিনি।

নওরোজের এ শুভক্ষণে সব করেছি সাফ,

শুধু তোমাকে ছাড়া আর কাউকেই রাখিনি।

তিনি নওরোজকে অন্তর পরিশুদ্ধির এক উপলক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, বসন্ত যেমন প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়, তেমনি মানুষেরও উচিত নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা এবং সব ভ্রান্তি ও অশুদ্ধতা দূর করা।

এসব কবিতার আলোচনায় স্পষ্ট হয়, নওরোজ কেবল একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তনের নাম নয়; এর গভীরে রয়েছে আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও। এটি মানুষের জন্য আত্মশুদ্ধি, নবজাগরণ এবং স্রষ্টার নিদর্শন উপলব্ধির এক বিশেষ সময়।

নওরোজ প্রসঙ্গ এসেছে এ বাংলার কবিদের কবিতায়ও। নওরোজ শিরোনামে কবিতা লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। এ কবিতা দিয়েই শেষ করা যাক।

রূপের সওদা কে করিবি তোরা আয় রে আয়,

নওরোজের এই মেলায়!

ডামাডোল আজি চাঁদের হাট,

লিট হ’ল রূপ হ’ল লোপাট!

খুলে ফেলে লাজ শরম-ঠাট!

রূপসীরা সব রূপ বিলায়

বিনি কিম্মতে হাসি-ইঙ্গিতে হেলাফেলায়!

নওরোজের এই মেলায়!

ফয়সাল আহমেদ: অনুবাদক