চারদিকে শীতের শেষ বিকালের তিরতিরে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। কিন্তু সেই বাতাসে মিশে আছে বসন্তের এক অদ্ভুত মাদকতাময় সুবাস। দোকানের সামনে এখনো ভারী শীতের কাপড়গুলো ঝুলছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হাঁটাচলা আর চোখের চঞ্চলতায় বোঝা যাচ্ছে প্রকৃতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ঘণ্টা বেজেছে। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এল দফের শব্দ আর সেই চিরচেনা তালের ঝংকার। ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল লাল পোশাকের এক জাদুকরী মানুষ। গোটা মুখে তার আলকাতরার মতো কালো রঙ লেপে দেয়া হয়েছে। মাথায় টকটকে রাঙা টুপি, আর চোখে-মুখে হাজার বছরের পুরনো সেই চিরায়ত দুষ্টু হাসি। সে নাচতে নাচতে আর দফ বাজাতে বাজাতে চিৎকার করে বলছে, ‘খবর আছে, খবর! পুরনো বছর গেল, নতুন বছর এল!’ এক বৃদ্ধ দোকানি মুচকি হেসে পাশেরজনকে বললেন, ‘এই তো এল বসন্তের দূত!’ এ লাল পোশাকের মানুষটিই হলেন হাজি ফিরুজ, যার দফের তালে তালে ইরানজুড়ে বেজে ওঠে নওরোজের আগমনী সুর।

হাজি ফিরুজ যখন কোনো বিষণ্ন শিশুর সামনে দাঁড়িয়ে তার ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা লাল ফিতা বের করে দিয়ে বলে, ‘এটা বাঁধো খোকন, দেখবে বসন্ত তোমার কাছেই থাকবে,’ তখন বাজারের গুমোট বাতাস যেন এক নিমেষে হালকা হয়ে যায়। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে সেই অমোঘ সত্য—হাজি ফিরুজ এসেছে, মানে বসন্ত সত্যিই এসে গেছে। হাজি ফিরুজদের কেবল বাজারেই দেখা যায় না। ব্যস্ত সড়কে, পাড়ায়-মহল্লায় ওরা আসে। কখনো একা একা, কখনো দুজনে মিলেমিশে।

এ বসন্তের আবাহনই হলো নওরোজ, যা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং মিথলজি থেকে সত্যের পথে মানবসভ্যতার এক দীর্ঘ পদযাত্রা।

নওরোজ একটি বিশেষণ ও বিশেষ্য, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘নতুন দিন’। এটি আজ শুধু ইরানের জাতীয় উৎসব নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এক আন্তর্জাতিক উৎসব যা আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, বাগদাদসহ ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়।

এর শেকড় খুঁজতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কয়েক সহস্রাব্দ আগে, যখন আর্যরা সাইবেরিয়ার অসহ্য শীত থেকে বাঁচতে দক্ষিণ দিকে তথা ইরানি মালভূমিতে পাড়ি জমিয়েছিল। তাদের জীবনদর্শনে বছর ছিল দুটি প্রধান ঋতুতে বিভক্ত—নওরোজ দিয়ে শুরু হতো উষ্ণতার কাল আর মেহরিগান দিয়ে শুরু হতো শরৎ ও শীতের হিমেল সময়। পরে এ দুই ঋতুকে চার ভাগে ভাগ করা হলেও নওরোজের শ্রেষ্ঠত্ব কখনো ম্লান হয়নি।

আর্যরা প্রথমে তাপ ও শৈত্যের এ দুই ঋতুকে চার ভাগে ভাগ করলেও পরে গ্রীষ্মকে সাত মাস এবং শীতকে পাঁচ মাস হিসেবে ধরত। প্রতিটি ঋতুর শুরুতেই তারা নিজেদের জাতিগত স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে বড় উৎসবের আয়োজন করত। আজ সেই প্রাচীন আর্য ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে নওরোজ জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের কিছু কিছু অংশে বিপুল উৎসাহে পালিত হচ্ছে। সাধারণত গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জি মোতাবেক, ২০ বা ২১ মার্চ শুরু হয় এ নববর্ষ।

নওরোজের শেকড় কত গভীরে তা বোঝা যায় মহাকবি ফেরদৌসীর অমর কাব্য শাহনামা আর ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা পড়লে। ফেরদৌসী নওরোজের বর্ণনা দিয়েছেন এক স্বর্গীয় ভঙ্গিমায়, যেখানে বসন্তের মেঘমালা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ে মাটির বুক থেকে সব দুশ্চিন্তা ধুয়ে দেয়। ফেরদৌসীর ভাষায়, পৃথিবী তখন সবুজের সমারোহে পূর্ণ হয় আর দুঃখীর জীবনে থাকে না কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। প্রাচীন কিংদবন্তি অনুযায়ী, বাদশাহ জমশেদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সালে মহান সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল জয় করার বছর নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা করেন। কুরুশ যখন বাবেল জয় করলেন, তখন তিনি কেবল একজন বিজেতা হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেননি, বরং একজন প্রজাবৎসল শাসক হিসেবে সেখানকার সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়েছিলেন। কুরুশ বিশ্বাস করতেন যে একটি বিশাল সাম্রাজ্য ধরে রাখতে হলে কেবল তলোয়ার যথেষ্ট নয়, বরং সংস্কৃতির সেতুবন্ধ প্রয়োজন। সেই সময় থেকেই নওরোজের দিন বন্দিদের মুক্তি দেয়া এবং কর মওকুফ করার মতো মানবিক প্রথাগুলো চালু হয়। বাবেলের সেই বিশাল উৎসবে পারস্যের সৈন্যরা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মিলেমিশে উৎসব করত। এমন ঘটনা তৎকালীন সময়ের সমর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

a1

নওরোজের ভোজ, শাহ তামাস্পের শাহনামার ফোলিও ছবি: মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট

পারস্য সম্রাট প্রথম দারিউশের শাসনামলে নওরোজের উদযাপন অন্য এক মাত্রায় পৌঁছেছিল। ঐতিহাসিক পার্সিপলিস বা তাখতে জামশেদে এমন জাঁকজমকপূর্ণভাবে উৎসব পালিত হতো। এ উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতেন প্রতিনিধিরা। পারস্য সম্রাটকে তারা নানা উপহারসামগ্রীতে ভরিয়ে দিতেন। পাথরে খোদাই করা শিলালিপিগুলোতে আজও দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা—যাদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয়, গ্রিক, মিসরীয় ও ইথিওপিয়ানরা—সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন সম্রাটের হাতে নওরোজের উপহার তুলে দেয়ার জন্য। এ উপহারগুলো কেবল নিছক উপঢৌকন ছিল না। বরং এর মধ্য দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তির স্মারক ফুটে ওঠে। উপহার হিসেবে এ প্রতিনিধি দলের কেউ কেউ নিয়ে আসতেন মূল্যবান মণি-মাণিক্য, কেউবা আরবীয় ঘোড়া কিংবা বিরল প্রজাতির পশুপাখি।

দারিউশ এ দিনে প্রজাদের জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করতেন। এ ভোজোৎসবে কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে খাওয়ার সুযোগ পেত। দারিউশ নওরোজ উপলক্ষে খ্রিস্টপূর্ব ৪১৬ সালে বিশেষ স্বর্ণমুদ্রার প্রচলনও করেছিলেন। পরবর্তীকালে আশকানি ও সাসানীয় সম্রাটদের যুগেও নওরোজের এ রাজকীয় জৌলুস অব্যাহত ছিল। ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, নওরোজ কেবল একটি মিথ বা পুরাণ নয়, বরং এটি এক অমোঘ গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সত্য। সাসানীয় সম্রাট আর্দেশির এবং পরবর্তীকালে শাহপুররা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করেছিলেন। তারা দেখলেন, নওরোজের দিনটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যালেন্ডারে কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির ঋতুচক্রের সঙ্গে উৎসবের দিনটির এ গরমিল তাদের ভাবিয়ে তুলল। তারা তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে নওরোজকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে হলে আকাশ ও নক্ষত্রের সঠিক অবস্থান বুঝতে হবে। সম্রাটরা তখন দেশের সেরা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ডেকে একটি স্থায়ী দিনপঞ্জি তৈরির নির্দেশ দেন। প্রাচীন ইরানিদের এ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আজ আমাদের অবাক করে দেয়। তারা নওরোজকে স্রেফ একটি উৎসব নয়, বরং প্রকৃতির এক পরম গাণিতিক সত্য হিসেবে বিবেচনা করতেন।

এ গাণিতিক নিখুঁততার চূড়ান্ত রূপ আমরা পাই কয়েক শতাব্দী পরে, যখন কিংবদন্তি বিজ্ঞানী ও কবি ওমর খৈয়ামের হাতে ইরানি দিনপঞ্জিটি পূর্ণতা পায়। সেলজুক সুলতান জালালউদ্দিন মালিক শাহর আমলে ১০৭৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে ওমর খৈয়াম এ আধুনিক ফারসি সৌর দিনপঞ্জিটি তৈরি করেছিলেন। খৈয়ামের তৈরি এ ‘জালালি ক্যালেন্ডার’ বা সৌর দিনপঞ্জি এতটাই সূক্ষ্ম যে তা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়েও বেশি নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারিখ গণনার জন্য এটি আজও বিশ্বের অন্যতম আদর্শ দিনপঞ্জি হিসেবে স্বীকৃত।

প্রাচীন পারস্যের কৃষিভিত্তিক সমাজে নওরোজ কেবল একটি উৎসব ছিল না। ছিল বেঁচে থাকার গাণিতিক হিসাব। আর্যরা যখন প্রথম বসতি স্থাপন করে, তখন তারা লক্ষ করেছিল যে পহেলা ফারভারদিন বা বসন্তের এ দিন থেকেই মাটির তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে, যা বীজ বপনের জন্য উপযুক্ত। গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর রঞ্জবরের মতে, নওরোজের দস্তরখানে যে সাতটি শস্যের চারা রাখা হতো, তা ছিল আদতে একটি ‘ল্যাবরেটরি টেস্ট’।

নওরোজের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশটি হলো এর সঙ্গে মিথলজি বা পৌরাণিক কাহিনীর যোগসূত্র। আর এ প্রসঙ্গের অবতারণা হলেই যার নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয়, তিনি হলেন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতাপস আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-বিরুনি। তার দুই অমর সৃষ্টি আসার আল-বাকিয়া (অর্থ: অতীত জাতির অবশিষ্টাংশ) এবং আল-তাফহিম (অর্থ: জ্যোতির্বিদ্যার প্রাথমিক জ্ঞান) বইতে নওরোজের বিস্তারিত ও বৈজ্ঞানিক বর্ণনা পাওয়া যায়। বিরুনির মতে, নওরোজের এ মহোৎসবের উদ্ভব মূলত প্রাক-ইসলামী রাজা জামশিদের শাসনকালের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

আবু রায়হান বিরুনির বর্ণনায় নওরোজের এ পৌরাণিক সূচনাটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। মিথলজি বা পুরাণের চোখে এটি আসলে ‘আহুরা’ বা মঙ্গলের শক্তির বিজয়গাথা। কাহিনীটি বেশ অলৌকিক। রাজা জমশিদের আদেশে দেবতারা একটি বিশাল সিংহাসন তৈরি করেন। তারা সেই সিংহাসন কাঁধে তুলে জমশিদকে নিয়ে আকাশপথে যাত্রা করেন।

a5

নওরোজের উৎসব ছবি: লেখক

যাত্রাপথটি ছিল পারস্যের বিখ্যাত দামাভান্দ পর্বত থেকে বাবেল শহর পর্যন্ত। এ বাবেল হলো ইতিহাসের সেই প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার রাজধানী ব্যাবিলন, যা তখন দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী নগরী ছিল। আকাশপথে যাওয়ার সময় জমশিদকে দেখে মানুষের মনে বিভ্রম তৈরি হয়। তারা অবাক হয়ে ভাবেন, আকাশে বুঝি আজ দুটো সূর্য উঠেছে! একটি সূর্য স্বয়ং সম্রাট জমশিদ, আর অন্যটি প্রকৃতির আসল সূর্য।

সেই অপার্থিব জ্যোতি আর মহিমার দিনটিই ছিল ফারসি দিনপঞ্জির প্রথম মাস ফারভারদিনের প্রথম দিন। দিনটি ‘আহরামজদ’ নামেও পরিচিত। জমশিদ নিজেই তখন ঘোষণা করেন, এ গৌরবময় দিনটিসহ পরবর্তী পাঁচদিন মহোৎসব পালিত হবে। এভাবেই রাজা জমশিদ ইতিহাসের পাতায় নওরোজের প্রতিষ্ঠাতা এবং সভ্যতার সব সুআচারের স্রষ্টা হিসেবে অমর হয়ে আছেন। আজ সেই পৌরাণিক রাজার সিংহাসন আর নেই, কিন্তু নওরোজের সিংহাসন প্রতিটি ইরানির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেঁথে নিয়েছে।

নওরোজের উৎসব কেবল মনে নয়, পেটেও বটে। বাসনার সেরা বাসা রচনায়। এ সত্য ইরানিরা জানে এবং মানেও। নওরোজের রাতে প্রতিটি ইরানি ঘরে একটি বিশেষ খাবার তৈরি করা বাধ্যতামূলক—তা হলো ‘সবজি পোলো মাহি’ (সবুজ শাক দিয়ে রান্না করা পোলাও মাছ)। মাছ এখানে জীবনের প্রবহমানতার প্রতীক এবং সবুজ শাক হলো সজীবতার চিহ্ন। এছাড়া ‘কুকু সবজি’ নামক এক ধরনের ভেষজ অমলেট তৈরি করা হয়। ডক্টর রঞ্জবর রসিকতা করে বলেন, নওরোজের সময় ইরানের বাজারের মাছের চাহিদাই বলে দেয় উৎসবের গভীরতা কতটুকু। এ রান্নার সুবাস যখন তেহরানের অলিগলি বা শিরাজের প্রাচীন বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রতিবেশীরা একে অন্যের ঘরে খাবার বিনিময় করেন। এ খাবার বিনিময় কেবল পেট ভরানো নয়, বরং এটি হলো সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। নওরোজের বিশেষ মিষ্টি ‘গজ’ বা ‘হালুয়ায়ে সোহান’ মুখে দিয়ে মানুষ তিক্ততা ভুলে নতুন করে বন্ধুত্বের শপথ নেয়। (ইরানের বাজারে সারা বছরই এই দুই পদের মিষ্টি মেলে। ইস্পাহানের ‘গজ’ আর কোমের ‘হালুয়ায়ে সোহান’ সত্যিই অতুলনীয়। ভাবলেই জিভে পানি আসে)

নওরোজের আধ্যাত্মিক ও ঘরোয়া উদযাপনের প্রাণকেন্দ্র হলো ‘হাফত সিন’ বা সাতটি ‘শিন’ অক্ষরের রহস্যময় দস্তরখান। এখানে ‘হাফত’ মানে হলো সাত আর ‘শিন’ হলো ফারসি বর্ণমালার একটি বিশেষ অক্ষর। নওরোজের কয়েকদিন আগে থেকেই প্রতিটি ইরানি পরিবারে এক সাজ সাজ রব পড়ে যায় এ দস্তরখান সাজানোর জন্য। এটি কেবল একটি শৌখিন সজ্জা নয়, বরং এর প্রতিটি উপাদানের পেছনে লুকিয়ে আছে জীবন ও জগতের এক একটি গভীর দর্শন। দস্তরখানের ওপর পরম মমতায় সাজানো থাকে সাবজে বা গম বা ডালের সবুজ চারা। এ চারা মূলত নবজীবন, সজীবতা ও প্রকৃতির অফুরন্ত প্রাণশক্তির প্রতীক। ঘরের কোণে এ সবুজ চারা রাখার মানে হলো বসন্তের আগমনকে নিজের অন্তরে বরণ করে নেয়া। এরপর আসে সামানু, বা গমের চারা দিয়ে তৈরি এক বিশেষ পুষ্টিকর মিষ্টি হালুয়া। এটি মূলত প্রাচুর্য, শক্তি এবং মহান আল্লাহর অশেষ আশীর্বাদের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। সামানু তৈরি করাও এক বিশেষ রন্ধন শিল্প। পরিবারের নারীরা দলবেঁধে আনন্দমুখর পরিবেশে সামানু তৈরি করে থাকেন। তিন নম্বর উপাদানটি হলো সিব বা লাল আপেল। জগতের অনিন্দ্য সৌন্দর্য এবং সুস্বাস্থ্যের ধারকের প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সিব। চার নম্বরে থাকে সেনজেদ নামের এক বিশেষ সুগন্ধি ফল। এ ফল ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণের বার্তা বহন করে। পাঁচ নম্বর হলো সোমাক নামের এক ধরনের বিশেষ মসলা। উদীয়মান সূর্যের রঙের সঙ্গে এ মসলার তুলনা করা হয়। এ মসলা মূলত নতুন দিনের শুরু এবং মানুষের জীবনে ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতীক। ছয় নম্বরে থাকে সির বা রসুন। শরীর ও মনের সুস্থতা এবং রোগমুক্ত জীবনের চিহ্ন হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে রসুন। সবশেষে আসে সের্কে বা সিরকা। সিরকাকে দীর্ঘায়ু, গভীর প্রজ্ঞা ও পরম ধৈর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

a4

মশাল হাতে বারবাদ ছবি: নাসের ডি খলিল কালেকশন

ইসলামের আবির্ভাবে নওরোজের এ চিরায়ত ঐতিহ্যে কোনো ছেদ পড়েনি। বরং তা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ডক্টর মাহমুদ রঞ্জবর অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে ইসলাম নওরোজকে মুছে দেয়নি, বরং একে আধ্যাত্মিক মহিমায় নতুন করে রাঙিয়ে দিয়েছে। পারস্যের মরমি কবি এবং সুফি সাধকরা নওরোজকে মানুষের আত্মার ‘নবজন্ম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মহাকবি জালালুদ্দিন রুমি বা শামস তাবরেজির লেখায় নওরোজ হলো সেই মুহূর্ত, যখন শীতের নির্জীবতা কাটিয়ে প্রকৃতি সবুজে ভরে ওঠে। একইভাবে মানুষের হৃদয়ও তওবা ও প্রেমের স্পর্শে পুনরায় জীবিত হয়। রুমি তার মাসনাবিতে বসন্তের মেঘ ও বৃষ্টির উপমা দিয়ে মানুষের চোখে রোনাজারির মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছেন।

পারস্যের শাস্ত্রীয় সংগীতে নওরোজের একটি বিশাল প্রভাব রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই নওরোজের আগমনে ‘নওরোজ-ই খারা’, ‘নওরোজ-ই সাবাহ’ এবং ‘নওরোজ-ই দারা’ নামক বিশেষ রাগ বা সুর বাজানো হতো। এ সুরগুলো মূলত বিরহ কাটিয়ে মিলনের বার্তা বহন করত। সুফি খানকাহগুলোতে যখন দফের তালে তালে এ রাগগুলো গাওয়া হতো, তখন উপস্থিত সাধকদের মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভাবান্তর বা ‘ওয়াজদ’ তৈরি হতো। তারা বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা নওরোজের সকালে আল্লাহর জিকিরে মেতে ওঠে। রুমি তার ‘দিওয়ান-ই শামস’-এ নওরোজকে দেখেছেন মহাজাগতিক নাচের অংশ হিসেবে। এ সুরের মূর্ছনা কেবল কানে নয়, হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিত প্রকৃতির পুনর্জন্মের বার্তা। আজও ইরানের ঐতিহ্যবাহী মিউজিয়ামগুলোতে সেই প্রাচীন নওরোজের সুর সংরক্ষণ করা আছে। এ সুর মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে নওরোজ কেবল দৃশ্যত নয়, শ্রবণগতভাবেও এক মহাসংগীত।

নওরোজ আসার অন্তত এক মাস আগে থেকেই ইরানজুড়ে শুরু হয় ‘খনে তেক্কনি’ বা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ। ধনী থেকে দরিদ্র—সবাই নিজের ঘরবাড়ি এবং আসবাবপত্র ধুয়েমুছে ঝকঝকে করে তোলেন। নওরোজের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাতায়াত। ইরানের এ সংস্কৃতিতে একটি অলিখিত নিয়ম হলো, প্রথমে ছোটরা বড়দের বাড়িতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন এবং এরপর বড়রা ছোটদের বাড়িতে ফিরতি সফরে যাবেন। এ সাক্ষাতের সময় বড়রা ছোটদের হাতে ‘ঈদি’ বা কড়কড়ে নতুন নোট উপহার দেন। এ উপহার শিশুদের মনে এক অপার্থিব আনন্দের সঞ্চার করে। যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, নওরোজের সময় তাদের কবর জিয়ারত করা এবং সেখানে মোমবাতি জ্বালানো বা ফুল দেয়া এ সংস্কৃতির এক মানবিক দিক। অনেক সময় পরিবারগুলো কবরস্থানেই নওরোজের দস্তরখান সাজিয়ে মৃত প্রিয়জনদের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে নতুন বছর ভাগ করে নেয়।

নওরোজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় তেরোতম দিনে, যাকে বলা হয় ‘সিজদাহ বেদার’ বা প্রকৃতি দিবস। এ দিনটি ইরানের জাতীয় জীবনের এক অনন্য উৎসব। এদিন নেহাত শয্যাশায়ী না হলে ইরানের কোনো মানুষই ঘরে বসে থাকে না; তারা তাঁবু খাটিয়ে, চাদর বিছিয়ে ঝরনা, পাহাড় বা পার্কের মনোরম পরিবেশে সারা দিন খোশগল্পে মেতে ওঠে।

প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, বছরের তেরোতম দিনটি অশুভ হতে পারে, তাই ঘর থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিলে সেই অশুভ ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সিজদাহ বেদারের দিন পরিবারের মেয়েরা ঘাসের ডগা গিঁট দেন, যাতে আগামী বছর তাদের জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে।

তবে আধুনিক যুগে এসে নওরোজের কিছু প্রাচীন আচারে বিচ্যুতি বা বিকৃতি দেখা দিয়েছে, এ নিয়ে ডক্টর রঞ্জবর বেশ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ‘চাহারশানবে সুরি’ বা ফারসি নতুন বছরের আগে, পুরনো বছরের শেষ বুধবারের আগুনের উৎসব বর্তমানে বিপজ্জনক বাজি ফোটানো আর বিশৃঙ্খলায় রূপ নিয়েছে। তবে এখনো নওরোজ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ বা নিছক ছুটির দিন নয়। এটি একটি জীবন্ত ও গতিশীল দর্শন, যা আমাদের শেখায় যে শীতের নিষ্ঠুরতার পরই বসন্তের অনিবার্য আগমন ঘটে।

সৈয়দ মূসা রেজা: সাংবাদিক ও লেখক