ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার নানা অঞ্চলে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টরা নিযুক্ত ছিলেন। তারা কেবল পেশাগত দায়িত্বই পালন করেননি, সেই সঙ্গে বাংলার নানা বিষয় নিয়ে লিখে গেছেন। কেউ লিখেছেন স্মৃতিচারণে। কেউ লিখেছেন একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে। পরবর্তী সময়ে বাংলা, বাংলার প্রকৃতি, জীবজন্তু ও মানুষ চেনার ক্ষেত্রে এ লেখাগুলোই সূত্র হয়ে উঠেছে। সাহেবদের লেখায় এসেছে ময়মনসিংহও। এর মধ্যে কোনোটি সাহেবদের কর্মসূত্রে আসা সামান্য বিবরণ আবার কখনো তাদের স্মৃতি থেকে লেখা বিশেষ কোনো ঘটনা। লেখাটি সাহেবদের সে স্মৃতি ও আলাপ থেকে ময়মনসিংহকে দেখার চেষ্টা করা হবে। এক্ষেত্রে সূত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে সিভিল সার্ভেন্ট ফ্র্যাংক বি সিমসনের ‘লেটারস অন স্পোর্ট ইন ইস্টার্ন বেঙ্গল’ ও মুনতাসীর মামুনের ‘কোই হ্যায়: পূর্ববঙ্গে ব্রিটিশ সিভিলিয়ান’।
সিমসন তার শিকার ও অন্যান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রচুর চিঠি লিখেছেন। তার এসব চিঠিতে রয়ে গেছে বাংলার বিভিন্ন বিষয়। তার একাধিক চিঠিতে এসেছে ময়মনসিংহের কথা। একটি চিঠির শুরুতেই তিনি লিখেছেন, ‘মৌমাছি ও মধুর জন্য ময়মনসিংহ বিখ্যাত। আমার বাড়ির বারান্দায় মৌমাছি চাক তৈরি করে। একসময় বিষয়টা বেশ সমস্যা তৈরি করেছিল। আমি পেশাদার মৌয়ালদের ডেকে মৌচাক কাটার ব্যবস্থা করি এবং এরপর তারা রসুনসহ আরো কিছু গন্ধদ্রব্য থামে মেখে দিলে আমি এই সমস্যা থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।’
এখন ময়মনসিংহে কোনো বাঘ দেখা যায় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে, তবে সিমসন যখন ছিলেন তখন বাঘ দেখা যেত। তিনি লিখেছেন, ‘এখানে গাবসারা নামে একটা জায়গা আছে, যেখানে বাঘেরা দুই বছরের জন্য বাস করত। এটা ছিল ব্রহ্মপুত্র থেকে ময়মনসিংহের দিকে। বগুড়া থেকে বহু শিকার পার্টি সেখানে গিয়েছে। কিন্তু তারা বাঘ শিকারে সফল হয়নি। প্রচুর মৌমাছি ও জঙ্গলের কারণে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে আমরা যারা ময়মনসিংহের শিকারী ছিলাম, বগুড়া থেকে আসা শিকারীরা সফল হলে তা হতো আমাদের জন্য অপমানজনক বিষয়। এজন্য আমি গাবসারায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম এবং বিষয়টি নিয়ে বদরউদ্দিনকে রিপোর্ট করতেও বললাম।’
সিমসন লিখছেন, এ যাত্রা সম্পর্কে বদরউদ্দিনের রিপোর্ট খুব একটা ভালো ছিল না। তার লেখা থেকে মোটামুটি বোঝা যায় গাবসারা ছিল একটি চর। সেখানে প্রচুর গাছগাছড়া জন্মে রীতিমতো জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থা হয়েছিল। এছাড়া সেখানে ছিল চোরাবালি, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘ফাঁসু’ বলা হতো। অঞ্চলটিতে প্রচুর পরিমাণে ‘ফাঁসু’ ছিল, যার জন্য সতর্ক হয়ে শিকারে যেতে হতো। আর মৌমাছির অত্যাচার তো ছিলই।
সিমসন লিখেছেন, ‘এরপর আমাদের মনোযোগ দেয়ার মতো বিষয় ছিল মৌমাছি। এরা জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের ঘর তৈরি করেছিল। এটাই ছিল চরের সবচেয়ে সেরা জঙ্গল। সাধারণভাবে এমন জায়গায়ই বাঘেরা থাকতে পছন্দ করে।’
এ জঙ্গলে শিকার করার জন্য সিমসন বিটিং পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বড়দিনের আগের সন্ধ্যায় আমি বিটিং দিয়ে শিকার অভিযান শুরু করি। আমরা আমাদের শিকার থেকে মোটামুটি একটা দূরত্বে অবস্থান করছিলাম এবং একটা সময় আমরা তাকে উত্ত্যক্ত করতে সক্ষম হই।’
গাবসারার বাঘ শিকারে ময়মনসিংহের উল্লেখ খুব একটা করেননি সিমসন। তবে আরেকটি চিঠিতে দেখা যায় তিনি ব্রহ্মপুত্রের চরে বাঘ শিকার করতে গিয়েছেন। তা নিয়ে লিখেছেন, ‘১৮৬৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আমরা তিনজন আমার ময়মনসিংহের বাড়িতে দেখা করলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্রহ্মপুত্রের তীরে—ময়মনসিংহ ও আসামের মধ্যবর্তী তীর—বাঘ শিকার। আমার ডায়েরিতে সবসময় তারিখ লেখা থাকলেও এই বিষয়টি নিয়ে তেমন কিছু লেখা নেই।’
অনেক দিন ধরে তাদের অভিযান চলছিল। ১৩ তারিখের পরবর্তী সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘পরবর্তী দুইদিনে কোনো বাঘের দেখা মিলল না। এই সময়ে এসে আমরা হতাশ হয়ে গেলাম। আমাদের মনে হলো ময়মনসিংহে কোনো শিকারের দেখা পাব না।’
২৫ তারিখ পর্যন্ত তারা বাঘ শিকার করতে পারেননি। তারা নানা জায়গায় শুয়োর শিকার করেছেন। এরপর তারা ময়মনসিংহের চর-জঙ্গলে বাঘ শিকারে যান।
ইংরেজ সিভিলিয়ানদের লেখায় বিশ শতকের ময়মনসিংহের অবস্থা উঠে এসেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্রও এতে মেলে। মুনতাসির মামুনের বইয়ে পাই, ‘বিশ শতকের যে ক’টি উদ্ধৃতি দিলাম তখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে কিন্তু পূর্ববঙ্গের অবস্থা তথৈবচ। উনিশ শতকে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ ছিল। এখানে সংকলিত গ্রাহামের স্মৃতিকথায় দেখা যায়, ময়মনসিংহে কাজে যোগদানের জন্য ঢাকা থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে একা রওনা হয়েছিলেন। কয়েকদিন পর পৌঁছেছিলেন ময়মনসিংহ। স্টেশনে পৌঁছার পর নিজের বন্দোবস্তেই নিজেকে থিতু হতে হতো।’ (কোই হ্যায়? পৃ: ৫৩)
তবে সেখানে কী পরিমাণ ইংরেজ ছিলেন? খুব বেশি না। মামুন লেখেন, ‘ইংরেজরা এসেছে, এ দেশের পুরনো শাসন ব্যবস্থা গুটিয়ে নিজেদের শাসন ব্যবস্থা চালু করেছে, অনেকে থেকে গেছে, অনেকে দীর্ঘদিন কাটিয়ে চলে গেছে। এবং পণ্য রফতানি বা পুঁজির অভিবাসন ঘটেছে। শেষোক্তটির পরিমাণ কম হলেও, নিজের দেশের পণ্য ও কৃৎ কৌশল আমদানি করেছে। ভারতবর্ষ/বাংলার লোকসংখ্যার তুলনায় ইংরেজ/ইউরোপীয় অভিবাসীদের সংখ্যা তেমন কিছুই ছিল না। এমনও দেখা গেছে, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ময়মনসিংহে ইংরেজদের সংখ্যা সর্বসাকল্যে হয়ত ১০ জনও ছিল না।’ (কোই হ্যায়? পৃ: ৬২)
কিন্তু যারাই ছিলেন তারাই সে অঞ্চল নিয়ে কিছু না কিছু লিখে গেছেন। মুনতাসীর মামুনও তার লেখায় সিমসনের কথা এনেছেন। ববার্ট লিন্ডসের আত্মজীবনীর প্রসঙ্গে এসেছে হেনরি রবারদিউর আত্মস্মৃতির কথা। মামুন লিখেছেন, হেনরি রবারদিউর আত্মস্মৃতির একটি অধ্যায় ‘অ্যামিউজমেন্ট ইন দ্য কান্ট্রি’র ভাবানুবাদ করেছি ‘রবারদিউর ময়মনসিংহ: দুশো বছর আগে’, শিরোনামে।
রবারদিউ লিখেছেন—
‘This premised I shall only describe Mymunsing to you, and think you will thence be able to form a tolerably correct idea of country living in India.’
তার ভাষায়—বছরের দুই-তৃতীয়াংশ আমরা বাস করি এক ধরনের শূন্যতার ভেতর। এ শূন্যতার কথা আগেও উল্লেখ করেছি।
রবারদিউর বিবরণটি আমাদের নতুন গড়ে ওঠা নগর, মানুষজন, পরিবেশ বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০ বছর আগের ময়মনসিংহের এত সুন্দর বিবরণ আমরা আর কোথাও পাই না। (কোই হ্যায়? পৃ: ৯৮)
ময়মনসিংহের সমাজ নিয়েও লিখেছেন রবারদিউ। এ নিয়ে মুনতাসীর মামুনের বইয়ে পাই—
ময়মনসিংহের সমাজটা কেমন ছিল? সমাজ বলতে অবশ্য তিনি বুঝিয়েছেন ইংরেজ বা ইউরোপীয় সমাজ। কোম্পানির সব পদে লোক থাকলে সমাজে সভ্যের সংখ্যা দাঁড়াত ছয়জনে। এঁরা হলেন জজ এবং ম্যাজিস্ট্রেট, রেজিস্ট্রার, রেজিস্ট্রারের সহকারী, কলেক্টর, কালেক্টরের সহকারী ও সার্জন। রবারদিউ যখন ময়মনসিংহে অর্থাৎ বিবরণ লেখার সময়, তখন ইংরেজ ছিলেন চারজন। কালেক্টরের সহকারী ও সার্জন ছিলেন অনুপস্থিত। বাড়তি একজন ছিলেন, একজন মহিলা, জজের শ্যালিকা। সার্কিট জজ বছরে দুবার আসেন। এছাড়া আর কোনো ইউরোপীয় নেই। কাছের স্টেশন ঢাকা, তাও ১০০ মাইল দূরে। জেলাটি ইংল্যান্ডের একটি কাউন্টির মতো বড় এবং লোকসংখ্যাও কম নয়। ... বাংলার ভাটি অঞ্চল ময়মনসিংহ, চমৎকার নদী বয়ে গেছে এলাকা দিয়ে। আবহাওয়া শুষ্ক এবং স্বাস্থ্যকর।
(কোই হ্যায়? পৃ: ১৯৮-৯৯)
এদিকে ময়মনসিংহের ঝড়বাদলের বর্ণনা দিয়েছেন আরেক সিভিলিয়ান টেইলর। তিনি লিখেছেন, ‘ময়মনসিংহের ঝড়বাদলের তুলনা হয় না। এখানে বজ্রপাতের তুলনায় অন্যান্য অঞ্চলের বজ্রপাত কবুতরের বকবকম। আর হাওয়া। রাজা লিয়ারও এর চেয়ে জোরে তা বওয়াতে পারতেন কিনা সন্দেহ। ময়মনসিংহের ঝড়-বৃষ্টি দেখার পর অন্যান্য অঞ্চলের ঝড়-বৃষ্টি মনে হবে যেন ভায়োলেট গুচ্ছের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দখিনা বাতাস।’
(কোই হ্যায়? পৃ: ২৫৭)
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক










