ময়মনসিংহ জিলা স্কুল ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন ভারতের সর্ববৃহৎ জেলা ময়মনসিংহের একটি প্রাচীন সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যালয়টির অবস্থান ময়মনসিংহ নগরীর প্রাণকেন্দ্র নতুন বাজারের কাছে। এ সরকারি বিদ্যালয়ে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বর্তমানে ১ হাজার ৮২০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। মোট ৭ একর ৯৩ শতাংশ জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। স্কুলের ছয়টি ভবনের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৮৭, ১৯৯৮ ও ২০০৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে এটি শ্রেষ্ঠ স্কুলের মর্যাদা লাভ করে। বিদ্যালয়টি ভারতের পাঁচটি সেরা স্কুলের একটি এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি দেশসেরা এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ বোর্ডের সেরা স্কুলের স্বীকৃতি অর্জন করে। পৌনে দুইশ বছরের ঐতিহ্যের স্কুলটি ময়মনসিংহবাসীর গর্বের ধন।
ময়মনসিংহ জিলা স্কুল বাংলাদেশের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। এটি ১৮৫৩ সালের ৩ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল একটি ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবমণ্ডিত বিদ্যাপীঠ। দেড়শ বছরেরও অধিক সময়ের স্মরণীয় ইতিহাস। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ‘নাসিরাবাদ’ নামে ময়মনসিংহ জেলার গোড়াপত্তন ঘটে ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী বেগুনবাড়ীতে। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে বেগুনবাড়ী বিলুপ্ত হওয়ার পর জেলা হেডকোয়ার্টার স্থানান্তরিত হয় বর্তমান নগরীর সেহড়া গ্রামে। ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে এটি শহরের মর্যাদা লাভের পর এখানে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের শিক্ষা সনদ, ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ শিক্ষা কমিশন, ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের অ্যাডাম কমিশন রিপোর্ট এবং ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের লর্ড মেকলের ‘নিম্নগামী পরিস্রবণ নীতি’র সুপারিশ ধরেই ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে তদনীন্তন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক নিরুক্ত কালেক্টর মি. এফ বি ক্যাম্পের ভবন ও কাচারিসংলগ্ন স্থানে পুকুরের উত্তরে একটি লাল একতলা দালানে ‘হার্ডিঞ্জ স্কুল’ নামে একটি ‘মিডল ইংলিশ স্কুল’ স্থাপন করেন। এখানে শুধু উচ্চবিত্তদের সন্তানরা পড়ার সুযোগ পেত। এ বিদ্যালয় ১৮৪৬ থেকে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ স্কুল নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এখানে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রধান শিক্ষকের আসন অলংকৃত করেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর বাবা শ্রী ভগবানচন্দ্র বসু। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রথম মুসলিম প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. আব্দুস সামাদ। ১৮৫৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার মাধ্যমে সরাসরি ইংল্যান্ড থেকে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ শহর ‘পৌরসভা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য এবং ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে হান্টার কমিশনের সুপারিশ অনুসারে শ্রেণীকক্ষ আরো উন্নত করার লক্ষ্যে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে পাকা ভিতওয়ালা বর্তমান ‘ময়মনসিংহ ল্যাবরেটরি স্কুল’ (বেসরকারি ল্যাবরেটরি স্কুল) ভবনে একে স্থানান্তর করা হয়। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে জেলার প্রথম বাঙালি কালেক্টর রমেশ চন্দ্র দত্তের সময়ে জেলা বোর্ড গঠনের ফলে এবং ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের সময় "শিমলা কনফারেন্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপের ফলে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান স্থানে জমি অধিগ্রহণ করে বিদ্যালয় ও ছাত্রাবাস ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ৩০০ আসনবিশিষ্ট জিলা স্কুল এ নতুন ভবনে স্থানান্তর হয়। জিলা স্কুলের মূল ভবন লাল দালানটি প্রথমে এমন ছিল না। বারান্দায় ইটের ভিটার ওপর টিনের চালা ছিল। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে স্যাডলার কমিশন ও ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে সার্জেন্ট জহুরুলের পরিকল্পনা অনুসারে এর মানোন্নয়নে আরো পদক্ষেপ নেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের কারণে বিদ্যালয়টিকে সাময়িকভাবে বিদ্যালয় গেটের উল্টোদিকে অবস্থিত ‘দারুল হাছানা’ ভবনে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশ বিভাগের পর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের আকরম খাঁ শিক্ষা কমিশন এবং ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের আলোকে ময়মনসিংহের প্রথম ডেপুটি কমিশনার এসএমএ কাজমীর সময়ে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলকে"মাল্টিলেটারাল পাইলট স্কুলের মর্যাদা দেয়া হয়। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে মানবিক ও বিজ্ঞান শাখার পাশাপাশি কারিগরি শাখা খোলা হয়। পাইলট স্কিমের আওতায় এ বছর প্রচুর আসবাব প্রস্তুত করা হয়। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ে বাণিজ্য শাখা খোলা হয়। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে নতুন করে সংস্কারকাজ শুরু হয়। মি. ড্রিল নামের একজন আমেরিকান বিজ্ঞান শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ইট বিছানো মেঝে, টিনের চালওয়ালা বারান্দা, প্রতিটি শ্রেণীকক্ষের ভেতর চারটি করে মোটা পিলার, বিদ্যালয়ের উত্তর দিকে টিনের ঘের দেয়া সার্ভিস ল্যাট্রিন অপসারণসহ সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়।
১৯৫৬ ও ৫৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে জিলা স্কুল ছাত্রাবাসের টিনশেড অংশে টি টি কলেজ ময়মনসিংহের শ্রেণী কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জিলা স্কুল ছাত্রাবাসে ইপিআর ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করায় ছাত্রাবাসটি সাময়িকভাবে গুলকীবাড়ি রায়মণি লজে স্থানান্তর করা হয় এবং এটি "আঞ্জুমান মুসলিম হোস্টেল" নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট ইপিআর ছাত্রাবাসটি স্থানান্তর করা হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের এ অঞ্চলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল ময়মনসিংহ জিলা স্কুল। বিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে ও ১৩ শিক্ষার্থী শহীদ হন। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিদ্যালয়ে দুটি অধিবেশনে শিক্ষাদান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকাল ৭টা ৩০ থেকে প্রভাতী অধিবেশন এবং দুপুর ১২টা থেকে দিবা অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। এটি বালক বিদ্যালয় হলেও ১৯৯০ থেকে এখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও শিক্ষকতা করেন। প্রতি বছর এ বিদ্যালয়ে তৃতীয় ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে ছাত্র ভর্তি করা হয়। আবার ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীতে দুটি করে শাখা রয়েছে যথা ‘ক’ শাখা ও ‘খ’ শাখা। এখানে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করা হয়। সাধারণত তৃতীয় ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে ছাত্র ভর্তি করা হয়। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে কোনো কোনো বছর অন্যান্য শ্রেণীতেও ভর্তি করা হয়। ভর্তি পরীক্ষা দিতে কোনো আলাদা যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না এবং যেসব ছাত্র ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে তারাই ভর্তি হতে পারে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় থেকে টিফিন ফি দেয়া হয়। রয়েছে আবাসিক সুবিধা।
বিদ্যালয়ে একটি উঁচুমানের বিজ্ঞানাগার, একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, একটি কম্পিউটার ল্যাবরেটরি, একটি ব্যায়ামাগার ও কর্মশালা রয়েছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিদ্যার প্রায়োগিক পাঠ সাধারণত বিজ্ঞানাগারে পড়ানো হয়। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণীকক্ষ রয়েছে। প্রতি কক্ষেই রয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। এছাড়া নিরাপত্তার পাশাপাশি সম্পূর্ণ "সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশুদ্ধ পানিসহ রয়েছে বড় পুকুর। যাতে প্রতি বছর সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। রয়েছে ইনডোর ও আউটডোর গেমিং ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিনোদনের ব্যবস্থা। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে খেলাধুলা ও অন্যান্য বিষয়ে অসংখ্য সাফল্য অর্জন করেছে। জাতীয় মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পুরস্কার পেয়েছে। এছাড়া আবৃত্তি, গান ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য রয়েছে। গণিত অলিম্পিয়াডের উচ্চপর্যায়েও ছাত্রদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। খেলাধুলায় বিদ্যালয়টি অনেক এগিয়ে। ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, দাবা, হকি, টেবিল টেনিসসহ প্রায় সব খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার মাহমুদল্লাহ রিয়াদসহ বিভিন্ন খেলার অসংখ্য খেলোয়াড় এ স্কুলের ছাত্র। এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জাতীয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ১৮৫৮ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে শিক্ষকতা করার সময়ই গিরীশচন্দ্র সেন প্রথম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। এ কাজের জন্য ব্রাহ্মণরা তাকে ভাই আর মুসলমানরা মওলানা উপাধি দেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সালাম জানান, এ বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। এটি একটি অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের স্থান। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, আনন্দমোহন বসু, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাবেক প্রেসিডেন্ট নূরুল আমীন, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আবদুল মোনেম খান, বাংলাদেশের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আশরাফ সিদ্দিকী এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
মুহাম্মদ আলমগীর কবীর: প্রতিনিধি, বণিক বার্তা










