ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্র জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একেবারে নিকটে এর অবস্থান। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক স্থাপনা। নাম আলেকজান্ডার ক্যাসল বা লোহার কুঠির। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী নিজের বাগানবাড়ি ও বিদেশী অতিথিদের থাকার জন্য ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিরা এখানে এসেছিলেন। তারা এখানে বিশ্রাম নিয়েছেন, কেউ কেউ থেকেছেন।

১৪৬ বছর আগে নির্মিত আলেকজান্ডার ক্যাসল নির্মাণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লোহার ব্যবহার থাকায় স্থানীয়ভাবে এটিকে বলা হয় লোহার কুঠি। ১৮৭৯ সালে এটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত ভবন এবং ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধীন রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য স্থানীয় মানুষ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আসেন। লোহা ও কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা প্রাসাদটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভবনটি যে ঝুঁকিপূর্ণ তার একটি সাইনবোর্ড দেয়া আছে।

১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলার শতবর্ষ উৎসব পালনে ১৮৭৯ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসল নির্মাণ হয়। তৎকালীন ইংরেজ কালেক্টর আলেকজান্ডারের নামে এটি নির্মাণ করা হয়। সে সময় এর নির্মাণ ব্যয় ছিল ৪৫ হাজার টাকা। প্রাসাদটি নানা রকম আসবাবে সুসজ্জিত করা হয়। দ্বিতল এ প্রাসাদের নিচতলা বর্তমানে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধীনে রয়েছে।

প্রাসাদটি তখন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর বাগানবাড়ি হিসেবে ব্যবহার হতো। পাশাপাশি বিদেশী অতিথিরা ময়মনসিংহে এলে এখানে থাকতেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পরেও এখানে বিভিন্ন সময় অতিথিরা থেকেছেন। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহে এলে চার রাত এ লোহার কুঠিতে ছিলেন। একই বছর আসেন মহাত্মা গান্ধী। এছাড়া লর্ড কার্জন, চিত্তরঞ্জন দাস, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা, মৌলভি ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এ লোহার কুঠিতে থেকেছেন।

ময়মনসিংহের প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ও লেখক স্বপন ধর এ কুঠি সম্পর্কে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে সেগুন কাঠ আনিয়ে চীনা কারিগরদের দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। ভারত থেকে অভ্র এনে প্রাসাদটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়।’

তথ্যটি বিশেষ, কেননা এটি অনেকের অজানা। এটি ময়মনসিংহের অন্যতম একটি ঐহিত্য ও প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন।

তবে ১৪৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী ভবনটি যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। প্রাসাদটি ঘিরে কোনো সীমানাপ্রাচীর না থাকায় এটি অরক্ষিত অবস্থায় আছে। দিনরাত উঠতি বয়সীরা এখানে বসে আড্ডা দেয়। এমনকি রাতের আঁধারে প্রাসাদটির বারান্দায় বসে বখাটেদের মাদক সেবন করার ঘটনাও ঘটে।