নড়েচড়ে হাতের কাছে

খুঁজলে জনমভর মেলে না,

কে কথা কয়রে দেখা দেয় না?

—লালন সাঁই

বলা হয় গুরু নানক একদা বাংলায় এসেছিলেন। তিনি শ্রীচৈতন্যদেবকেও প্রভাবিত করেছিলেন। আজ আর এসব সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। সরাসরি কোনো তথ্য-উপাত্ত সর্বসম্মতভাবে হাজির করাও দুষ্কর। এটিও লোকশ্রুতি যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যস্থিত গুরুদুয়ারা নানকশাহির বর্তমান স্থানে তার এক আধ্যাত্মিক পর্যটনের সময় অর্থাৎ কোনো এক উদাসীতে কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। পরে সতেরো শতকের প্রথমাংশে সংখ্যাগরিষ্ঠ দশ গুরুবাদী শিখের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ সিং এখানে তার স্মরণে একটি কাঠামো স্থাপন করেন। নানক ছিলেন পরিব্রাজক। সেই সূত্রে তিনি নানা অঞ্চল ঘুরে বেড়াতেন এবং তার ধর্মাদর্শ ও দেশনা প্রচার করতেন। ফলে বাংলায় তিনি আসতেই পারেন। গুরুদুয়ারা নানকশাহিতে নবম গুরু তেগ বাহাদুরের এক জোড়া খড়ম সংরক্ষিত আছে। কিন্তু গুরু নানকের কোনো স্মৃতিচিহ্ন আমি কখনো সেখানে দেখিনি। অবশ্য তাতেও প্রমাণ হয় না তিনি ঢাকায় কখনো আসেননি। ঢাকার বাংলাবাজারের শ্রীশ দাস লেনে একটি সঙ্গত টোলা আছে। জানা যায়, শিখ নবম গুরু তেগ বাহাদুর (তেগ মাল) এখানে কিছুকাল কাটিয়েছিলেন। বাংলায় তিনি দুই বছর কাটিয়ে যান। দশম গুরু গোবিন্দ সিং (গোবিন্দ রাই) বাংলায় এসেছেন। আর শিখ ধর্মপ্রচারকরা তো বাংলায় আসছেন বহুকাল ধরেই। বর্তমান বাংলাদেশে এখনো সাতটি গুরুদুয়ারা আছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে গুরুদুয়ারা আছে ২৭১টি। তার পরও শিখ ধর্ম বাংলায় কেন বিস্তৃতি লাভ করল না? এ প্রবন্ধে আমরা এর দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করব।

২.

মধ্যযুগের বাংলায় গড়ে উঠেছিল এক উন্নত সভ্যতা। বাংলা শুধু ধনাঢ্যই ছিল না, ভাববাদ ও দর্শনেও ছিল ঋদ্ধ। বাংলায় মরমিয়া ও সহজিয়া ধারা নানাভাবে বিকশিত হয়েছিল। বাংলার প্রাকৃতিক সুষমা যেমন মানুষকে প্রভাবিত করত, তেমনি তা ভাবুক মনকে উদাস করত, নানাভাবে জগৎকে দেখতে ও তা নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করত। ভক্তিবাদ সম্পর্কিত আমার সব লেখায়ই আমি বলি, বাংলার সহজিয়া ধারা আদতে উত্তর ভারতে রামানন্দ দ্বারা আমদানীকৃত এবং তার দ্বাদশ আদিত্য বা দ্বাদশ সূর্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে ভক্তিবাদ তার প্রভাবে প্রভাবিত, তার প্রবাহে প্রবাহিত ও তার বিশেষ রসে সিঞ্চিত এক ধারা। তবে বাংলার নিজস্ব বেগ তাকে স্বতন্ত্র গতিতে প্রবাহিত করেছে। ভারতবর্ষে ইসলাম এরই মধ্যে সমাসীন। ইসলামের একেশ্বরবাদ এবং সাম্য ও মৈত্রী পুরো উত্তর ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনে গতি সঞ্চার করেছে, যদিও আমার অনুমান, প্রথমদিকে সব স্থানীয় ভাষায় পবিত্র কুরআন অনূদিত হয়নি। ফলে সংমিশ্রিত ইসলামে (Syncretic Islam) লোকজ ও স্থানীয় উপাদান গৃহীত হলেও ইসলামের সাম্য ও মৈত্রী তা থেকে বাদ পড়েনি। ড. গৌরী সেন লিখেছেন,

মুসলমান ধর্মের সংস্পর্শে এসে ভক্তিধর্ম কিছু নতুন প্রেরণা যে লাভ করেছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। প্রথমত নবাগত মুসলমানদের ভেতর জাতিভেদের সংকীর্ণতা ছিল না। (সেন, ড. গৌরী ১৯৮৪: ৭)

অন্যদিকে মিনাক্ষী জৈন লিখেছেন,

ভক্তি আন্দোলনের মূল সাম্য ভাব পুরোটাই ইসলামের সমতা থেকে আহরিত হয়ে নিম্ন বর্ণের দিকে প্রসারিত তা নয়, ভক্তি আন্দোলনে ভক্তি সাধনার আকারে আগেও ছিল।

The bhakti movement has often been presented as a Hindu response to the egalitarian message of Islam and it’s spread among the lower classes. But this seems to be an inadequate assessment, as in the Hindu scheme bhakti (devotion) is an essential constituent of sadhana (religious pursuit). (Jain 2002: 121)

অন্যদিকে শ্রীচৈতন্যদেব রাধাবাদ আশ্রিত যে জাতপাতবিরোধী বৈষ্ণব আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তার কারণে পঞ্চদশ ও তার পরবর্তী কয়েক শতক বাংলা ও ওড়িশা আলোড়িত হয়েছে। চৈতন্য আশ্রিত বাংলায় আহ্বান ছিল—

মুচী হলেও সুচী হয় যদি কৃষ্ণ ভজে॥

ফলে শিখ ধর্ম যে সাম্যের ডাক দিয়েছে পাঞ্জাবের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে, সে সাম্য বাংলার মধ্যে হাজির মূলত ইসলাম ও পরে চৈতন্যের কারণে।

৩.

অন্যদিকে স্মরণ করিয়ে দেয়া জরুরি, শিখ ধর্মের যত পরম্পরা আছে, তাদের সবার আদিগুরু গুরু নানকের দর্শন ও দীক্ষাও ভক্তি আন্দোলনের এক অমোঘ পরিণতি। সেটা বোঝাও দুষ্কর কিছুই নয়। শিখ ধর্মের প্রায় সর্বজনমান্য ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেবজুড়েই আছে এ ভক্তিবাদী গুরুদের অমৃততুল্য বাণী ও তাদের উপদেশ। এ উপদেশ ও বাণীর সঙ্গে রয়েছে শিখগুরুদের অমৃত বচন। সেগুলো আবার গাওয়া হয় সাংগীতিক মেজাজে, রাগসংগীত আকারে। অনেক শিখ রীতিমতো রাগসংগীতের চর্চাও করেন গুরুদুয়ারাগুলোয় মনোজ্ঞ সংগীত পরিবেশনের জন্য। সেগুলোয়ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে উত্তর ভারতীয় দ্বাদশ আদিত্যসহ ভারতের আরো সব নিষ্ঠাবান ভক্তিবাদী গুরুদের, যাদের হিন্দিতে বলা হয় ভগৎ, আর বাংলায় ভক্ত। বহু বর্ণিল ব্যঞ্জনায় এসব রাগসংগীতে তাদের নামও কখনো কখনো সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে গুরু গ্রন্থ সাহেবে; যেমন ভগৎ কবীর, রবী দাস, ত্রিলোচন, জয়দেব, সাধনা, নামদেব ইত্যাদি। এসব গানের মূল বক্তব্য খুবই সরল এবং অপ্রয়োজনীয় দুর্বোধ্যতা ও কপটতাবর্জিত। কিন্তু সেগুলোর অর্থ সুগভীর ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মূলত ভক্তিবাদী গুরুদের ভক্তিসংগীত, কাব্য, দোহা, ভজন ও রাগসংগীতের মূল উপজীব্য হলো হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যসহ মানবজাতির ঐক্য, বাহ্যিক রীতিনীতিসর্বস্ব ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, আল্লাহ বা ভগবানের অস্তিত্ব বৃথাই বাইরে না খুঁজে নিজের ও আল্লাহর সৃষ্টির ভেতরে অনুসন্ধানের তাগিদ, সর্বজীবের প্রতি প্রেম, মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার আকুতি এবং বর্ণাশ্রম বা জাতপাতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। জীবনের অনিত্যতা নানাভাবে জানানোর প্রয়াস রয়েছে এ ভক্তিবাদী সাহিত্যে; ফলে নির্লোভ, বিলাস-ব্যসনহীন সৎ জীবনযাপনের অনবদ্য তাগিদ এখানে দৃষ্ট হয়। মানুষের ভেতরেই মহান আল্লাহ বা পরমেশ্বরের আবাস, এই যে এক চিরায়ত বা লোকায়ত চিন্তা, যা পবিত্র কুরআন আশ্রিত সুফিবাদেরও এক প্রধান অনুষঙ্গ, তারও এক প্রকাশ ভক্তিবাদ। মানবাত্মা পরমাত্মার এক অংশ বা প্রকাশ, যে ধারণা বেদান্ত আশ্রিত, সেটিও ভক্তিবাদী দর্শনে প্রকটিত। এ প্রবণতাগুলোর বেশির ভাগই সহজিয়া ধারার সাহিত্যেরও মূল অনুষঙ্গ, তা বাংলায় হোক বা বাংলার বাইরেই। এর প্রভাব পড়েছে বাংলার হিন্দুদের একাংশের কাছে শ্রীকৃষ্ণাবতার হিসেবে খ্যাত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অর্থাৎ গৌড়াঙ্গ মহাপ্রভুর ওপর এবং তার চার পরিকর তথা নিত্যানন্দ, অদ্বৈতাচার্য, শ্রীবাস ও গদাধরের মধ্যেও; পড়েছে ভক্ত রামপ্রসাদ, লালন সাঁই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুলসহ অসংখ্য ভাবুক মনের ওপর। আসামের বৈষ্ণব গুরু শংকর দেব ও মাধব দেবের মধ্যেও এদের প্রভাব তীব্র। কখনো পয়ার (पयार) ছন্দে লিখিত বৈষ্ণব পদাবলিতেও বৈষ্ণব কবিরা তা প্রকাশ করেছেন অনবদ্যভাবে। ফলে সে অর্থে শিখ ধর্ম বাংলায় নতুন কোনো প্রবাহের জন্ম দিতে পারেনি। দার্শনিক দিক দিয়ে তা সুস্পষ্ট।

যেমন আল্লাহ যে সর্বত্র বিরাজমান, পবিত্র কুরআনে তা বলা হয়েছে—

আমরা তাদের (মানুষের) ঘাড়ের রগের চেয়েও নিকটবর্তী।

(কুরআন, ৫০: ১৬)

ভক্ত কবীর বলছেন:

হে সেবক, আমাকে কোথায় অনুসন্ধান করিতেছ? আমি তোমারই পার্শ্বে রহিয়াছি। আমি কোন মন্দিরে নাই, মসজিদে নাই। কাবা তীর্থে আমি নাই, কৈলাসে আমি নাই, ক্রিয়া কর্ম্মে আমি নাই, যোগে, বৈরাগ্যে আমি নাই। যদি অন্বেষণ করিতে জান তবে তৎক্ষণাৎ আমার দেখা পাইবে—এক নিমিষ খুঁজিলেই পাইবে। কবীর কহেন, হে সাধু, আমি সকল নিঃশ্বাসের নিঃশ্বাসের মধ্যে আছি। (সেন, ক্ষীতিমোহন ২০১০: ২৯-৩০)।

ফলে গুরু অর্জুন দেব যখন নিম্নোক্ত কথা বলেন, সে বার্তা বাংলায় এরই মধ্যে উপস্থিত,

আমার প্রভুর কোনো আকার নাই,

তথাপি তিনি সকলের হৃদয়কে জানেন এবং তিনি

সর্বত্র বিরাজমান।—গুরু অর্জুনদেবজি, ভৈরোরাগ।

(নওশাদ ফেব্রুয়ারি ২০২৩: ১৭৭)

ফলে ঈশ্বর তার সব সৃষ্টিতে বিরাজিত, তাই সাম্য প্রকৃতি ও জগৎবান্ধব, এ বার্তা এরই মধ্যে বাংলায় উপস্থিত ইসলাম, তার সুফিধারা ও চৈতন্য আশ্রিত বৈষ্ণববাদের কারণে। শুরুতে লালনগীতির একটি বাণী দিয়ে শুরু করেছি। লালনের এ ভাব সুফিবাদ আশ্রিত ও নদীয়ার ভাব। ফলে বাংলায় পঞ্চম গুরু অর্জুনদেবজির বার্তা নতুন কিছু বহন করেনি।

৪.

বঙ্গের ভক্তি আন্দোলন মূলত বাংলার বৈষ্ণব আন্দোলন (সান্যাল ২০১৯ বাংলা সংস্করণ, গৌতম ভদ্রের উপক্রমণিকা: xiii)। পরে এর প্রভাব পড়েছে লালন সাঁই, জগদ্বন্ধু সুন্দর এদের ওপরও। বাংলার সহজিয়া ধারা আরো পুরনো। বৌদ্ধ চর্যাপদের কবি এবং নাথপন্থীরা মূলত এ ধারায় পড়েন। বৌদ্ধ চর্যাপদের কবিরা সহজযানের অনুসারী ছিলেন। বৌদ্ধ সহজযান সহজিয়া পথের এক অগ্রনায়ক। এর অনুসারীরা মোক্ষ, নির্বাণ বা মুক্তির জন্য কঠোর তপস্যা, ইন্দ্রিয়ের ক্লেশ স্বীকার ও ইন্দ্রিয় সুখ দমন, কঠোর ব্রহ্মচর্য ইত্যাদিকে পরিত্যাগ করেছিলেন। তারা ছিলেন গৃহী, একজন সৎগুরুর নির্দেশে ও পরামর্শে তারা সুখময় জীবনকেই তাৎপর্যপূর্ণ জ্ঞান করতেন। মূলত সহজযান বৌদ্ধ ধর্ম বজ্রযানেরই এক ধারা। তাই সহজযানী এ পরমগুরুকে বজ্রগুরু নামে ডাকা হতো। এ ধারায় নির্বাণ, মোক্ষ, পার্থিব জীবন, মন সবই পরিশেষে শূন্য (void) মাত্র। পঞ্চ ইন্দ্রিয়জনিত কাম সুখ দ্বারাই বজ্রগুরুর আদেশ ও নির্দেশে নির্বাণ লাভ করতে হয়। পাপ-পুণ্যের ধারণা এ মতে অনুপস্থিত। তবে হিন্দু ও বৈষ্ণব ধর্মে পাপ-পুণ্যের ও জন্মান্তরের ধারণা বিদ্যমান। পঞ্চমকার (মদ, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন) থেকে নিবৃত্তির আহ্বান শাস্ত্রীয় হিন্দু ধর্ম, ব্রাহ্ম আন্দোলন, আর্য সমাজ, রামকৃষ্ণ মিশন এবং মূলধারার বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে আছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জাগতিকতা লালন করে আধ্যাত্মিক চর্চার যে প্রয়োজনীয়তা সে দাবি ইসলাম পূরণ করেছে। আধুনিক হিন্দু সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলো তাদের জায়গা থেকে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সেগুলোর সমাধান করেছে। ব্রাহ্ম আন্দোলন, আর্য সমাজ, রামকৃষ্ণ মিশন ইত্যাদি নর-নারীর সমতা বিধান, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন এবং নারী শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছে। বরং আনন্দ কারাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও অনেক শিখ পুরুষ বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মহিলা বিয়ে করতে চান না। যদিও এক্ষেত্রে বিধানগত জায়গায় কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু বিষয়টি শিখদের কাছে পছন্দনীয় নয়। অন্যদিকে ইসলামে শুরু থেকেই বিধবা বিবাহ আছে, আর ব্রাহ্ম আন্দোলনও এটিকে উৎসাহিত করে।

শিখ ধর্মে যৌতুক বা পণপথা নেই। ব্রাহ্ম ধর্ম, আর্য সমাজ, রামকৃষ্ণ মিশনও এগুলোর বিরুদ্ধে। আনন্দ সংস্কারে জাতপাত প্রথা না থাকার পরেও আজকাল অনেকে জাতপাত দেখে বিয়ে করেন। খ্যাতিমান শিখ ধর্মবিশারদ উইলিয়াম ওয়েন কোল এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন (Cole 2010: 67-69)। গুরু গোবিন্দ সিং নিজেকে রামচন্দ্রের বংশধর দাবি করায় তিনিই এ উপদ্রবের আমদানি করলেন কিনা বলে আমি আমার বইতে প্রশ্ন তুলেছিলাম (নওশাদ ফেব্রুয়ারি ২০২৩: ৩৯)।

লক্ষ করলে আমরা দেখব, শিখ ধর্মে কোনো স্থায়ী পরকালের ধারণা নেই এবং স্থানীয় বৌদ্ধ, জৈন, বৈষ্ণব ধারার প্রতিটিতেই জন্মান্তরের ধারণা বিদ্যমান। এদের সবারই নিষ্ঠা মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানোয়। কারো লক্ষ্য শুদ্ধাচারী মানুষ, কারো লক্ষ্য মানুষ গুরুর কৃপায় নির্বাণপ্রাপ্ত মানুষ। অবশ্য শুদ্ধাচারের বা নির্বাণের সংজ্ঞা ও ধারণা সবার এক নয়; তবে উৎসমুখ যে একই তা বোঝা যায়। কিন্তু এক ধরনের মনুষ্যকেন্দ্রিকতা (anthropocentrism) এ দর্শনগুলোয় কাজ করে। এর বার্তা পরিষ্কার: মৃত্যুর পরে স্বর্গের আশা না করে পৃথিবীতেই সাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে পৃথ্বীলোককেই স্বর্গলোকে রূপান্তর করো। কথাটা আমাকে বলেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধ্যস্থিত গুরুদুয়ারা নানকশাহিতে আমার সঙ্গে চা খেতে খেতে এক পাঞ্জাবি শিখ, নাম হরভজন সিং। কিন্তু বৌদ্ধ সহজিয়া ধারা, লালনপন্থা এবং ব্রাহ্ম ধর্মেও কোনো স্থায়ী পরকাল নেই। ফলে এ অর্থেও নতুন কোনো দার্শনিক প্রবাহ শিখ ধর্ম বাংলায় হাজির করতে পারেনি। ইসলাম তো বটেই, এ আন্দোলনগুলোও পৃথিবীতেই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

৫.

শিখ ধর্ম বিস্তৃত না হওয়ার শেষ কারণটি রাজনৈতিক। ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রশ্নে শিখ মতাদর্শ বা শিখ ধর্ম বেশ কতগুলো ধারায় বিভক্ত হয়েছে। এ বিভাজন কেন হয়েছে তা জানা শিখ ধর্মের বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার জন্য জরুরি। তবে শিখদের বর্তমান বৃহত্তম ধারাটি হচ্ছে খালসা বা নির্ভেজাল ধারা অর্থাৎ খালসাপন্থী, যার প্রবর্তক শিখদের বৃহত্তম অংশের শেষ মানুষ গুরু গোবিন্দ সিং। একটি ধারা রাভিদাসী শিখ, যেটি সন্ত রবী দাসের শিখ ভক্তরা তৈরি করেছে এবং রবী দাসকেও গুরুর আসীনে বসিয়েছে। বাকি কারণগুলো মনে হয় রূঢ়ভাবে বললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গুরুপদে আসীন হওয়ার আসক্তি থেকে প্রভাবশালী কারো মূল ধারা বা কোনো উপধারা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে। আরো বিতর্ক তো আছেই। গুরু নানকের পুত্র বাবা শ্রীচাঁদ সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গুরু হলেন না। তৃতীয় গুরু পর্যন্ত ঠিকই ছিল। অথচ চতুর্থ গুরু রাম দাসের বংশ থেকেই বাকি সব গুরুর আগমন ঘটেছে। উদাসীরা এখনো বাবা শ্রীচাঁদকেই গুরু মানে। নানকপন্থীরা গুরু নানক ছাড়া বাকিদের অত্যাবশ্যক মনে করেন না। তার মানে কি এই যে এ ধারায় গুরু পরম্পরা নানক চাননি। এসব নানা বিতর্কের কারণে তিন কোটি অনুসারীর এ ধর্মে ছোট-বড় ৫০-এর অধিক বিভাজন আছে। বলেছি খালসাপন্থীদের আগমন বেশ পরে, দশম গুরু গোবিন্দ সিংয়ের হাত ধরে। অন্য অনেক ধারা বা বিভাজন এমনকি ধর্ম বিস্তৃত করতে ধর্মান্তর করে কাউকে নিজ ধর্মে আনতেও আগ্রহী নয়। এসব কারণে শিখ আন্দোলন যতটুকু পারত ততটুকুও দানা বাঁধতে পারেনি।

গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র:

দাশগুপ্ত, শশীভূষণ (ডিসেম্বর ২০১৫)। বাঙলা সাহিত্যের পটভূমিরূপে কয়েকটি ধর্মসাধনা। ভারবি। কলকাতা।

নওশাদ, মুহাম্মদ তানিম (ফেব্রুয়ারি ২০২৩)। শিখ ধর্মের উত্থান এবং তার ঐতিহাসিক পথচলা: ভক্তি আন্দোলন থেকে শিখ আন্দোলন এবং তারপর। সংহতি প্রকাশন। ঢাকা।

পোদ্দার, অরবিন্দ (জানুয়ারি, ১৯৯৯)। মানবধর্ম ও বাংলা কাব্যে মধ্যযুগ। পুস্তক বিপণি। কলকাতা।

ভট্টাচার্য, তন্ময় (২০২১)। নবদ্বীপ ও কলকাতায় গুরু নানক, দেখা হয়েছিল চৈতন্যের সঙ্গেও! যে সূত্র থেকে প্রাপ্ত: নবদ্বীপ ও কলকাতায় গুরু নানক, দেখা হয়েছিল চৈতন্যের সঙ্গেও! - Prohor

সান্যাল, হিতেশরঞ্জন (২০১৯)। বাংলার ভক্তি আন্দোলনে পরিবর্তনের ধারা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। নতুন দিল্লি।

সেন, ড. গৌরী (১৯৮৪)। বাংলা ও হিন্দি পদাবলি সাহিত্যে বাৎসল্য রস। সাহিত্যলোক। কলিকাতা।

সেন, ক্ষীতিমোহন, ২০১০, কবীর, আনন্দ সংস্করণ, কলকাতা।

Barua, Suman Kanti (17 June 2021). Retrieved from Sahajayana - Banglapedia

Cole, W. Owen .2010. Sikhism: An Introduction. London: Teach Yourself Publishers.

Islam, Azharul (17 June 2021). Retrieved from Charyapada - Banglapedia

Islam, Azharul; Mohanta, Sambaru Chandra Sahajia (17 June, 2021). Retrieved from Sahajiya - Banglapedia

Jain, Meenakshi (2002). Medieval India: A Textbook for Class XI.

P.121 New Delhi: National Council of Educational Research and Training.

Khalsa, Sukhmandir (April 09, 2019). Sikhism and the Afterlife Retrieved from Sikhism and Its View of the Afterlife

প্রয়োজনীয় লিংক:

I'm divorced, so Sikh men don't want me' 'I'm divorced, so Sikh men don't want me' - BBC News

Sikh Wisdom: Sikhism Discourage Marriage of Widows and Divorced Women

মুহাম্মদ তানিম নওশাদ: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক