পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে পাঞ্জাবে শিখ ধর্মের উদ্ভব ঘটে। এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক। তিনি ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর, মতান্তরে ১৫ এপ্রিল কার্তিকী পূর্ণিমায় পাঞ্জাবের অন্তর্গত রাইভোয়ের তিলমণ্ডী (তালবন্দী) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গুরু নানক ক্ষত্রিয় জাতির ‘বেদী’ সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। তার পিতার নাম কল্যাণ দাস ওরফে মেহতা কালু এবং মাতার নাম ত্রিপতা দেবী। পিতা কালু ছিলেন হিন্দু, পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। শোনা যায়, যৌবনকালে নানক কোরআন ও হিন্দু ধর্মের শাস্ত্র বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
নানক সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তারপর একদিন সন্ন্যাস ত্যাগ করে নানক বাড়ি ফিরলেন। জীবনের বাকি সময় তিনি নিজের নতুন ধর্ম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। নানক প্রচারিত সেই ধর্মই শিখ ধর্ম।
জানা যায়, শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে বাংলা ও এর আশপাশের লোকালয়ে এসেছিলেন। এর মাধ্যমে বাংলায় শিখদের আগমন শুরু হয়। সে সময় গুরু নানক তৎকালীন বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশের অনেক স্থান ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি মিথিলা থেকে কান্তনগর হয়ে ঢাকা পৌঁছেছিলেন। কান্তনগর হচ্ছে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণিয়া জেলা। ইতিহাসবিদদের অনেকে বলেন, এখান থেকে গুরু নানক উত্তরবঙ্গ দিয়ে আসাম চলে যান। আসাম থেকে গুরু নানক সিলেটে আসেন। সিলেটে তার এ আগমনের স্মারক হয়ে আছে একটি গুরুদুয়ারা। সিলেট থেকে নদীপথে তিনি ঢাকায় আসেন।
পাঞ্জাবি গ্লোবাল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত অবিনাশ মহাপাত্রর লেখা ‘দ্য শিখ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ থেকে বিষয়গুলোর একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। তিনি জানাচ্ছেন, গুরু নানক তার সঙ্গী ভাই সাহেব ভাই মর্দানাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন। তারা প্রথমে সুরমা নদীর তীরে অবতরণ করেন। সেখানে এক মাসের মতো অবস্থান করেছিলেন।

বাংলাবাজারের গুরুদুয়ারা
প্রচলিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ সময় সিলেটের জনৈক দেবীপ্রসাদ বোস গিয়েছিলেন গুরু নানকের সঙ্গে দেখা করতে। দেবীপ্রসাদের মনোভাবটি ছিল, গুরু নানক তার চেয়ে নিম্ন ধীশক্তির মানুষ। কিন্তু গুরুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং তিনি নানকপন্থী হন। উল্লেখ্য, অবিনাশ মহাপাত্র ‘নানকপন্থী’ই লিখেছেন, ‘শিখ’ লেখেননি। তবে দেবীপ্রসাদ তার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সিলেটে গুরুর মত প্রচার করেছেন বলে জানান তিনি।
এক মাস পর গুরু নানক সিলেট ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবেন। প্রথমে গুরু নানক শিবপুর গ্রামে নোঙর ফেলেছিলেন, পরবর্তী সময়ে যা রায়েরবাজার ও ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা নামে পরিচিত হয়। শিবপুরে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সংকট ছিল এবং স্থানীয়রা বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতো। গুরু নানক জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূরীকরণার্থে জাফরাবাদ গ্রামে একটি জলাশয় খনন করেন।
১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ঢাকা জেলা গেজেটিয়ারে ঢাকার শিখ সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয়েছে—‘গুরু তেগ বাহাদুর ঢাকা সফর করেছিলেন। রমনার নিকটে সুজাতপুরে একটি শিখ মন্দির আছে। সূত্রাপুরের কাছে সঙ্গতটোলায় অবস্থিত সঙ্গতটি শিখদের প্রধান প্রার্থনাস্থল। ধার্মিক শিখরা এখনো জাফরাবাদে অবস্থিত ধ্বংসাবশেষ দর্শন করেন, এখানে একটি পুকুর আছে। শিখদের বিশ্বাসমতে, এ পুকুরের পানির রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা আছে।’
১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ তীর্থ শিখ অধিকারে ছিল। ১৯৬৮ সালে এ স্থানে ভবন নির্মিত হয়। ঢাকার ‘গুরুদুয়ারা নানকশাহী’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন-সংলগ্ন) যে স্থানে অবস্থিত সে জায়গায় গুরু নানক কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তিনি এখানে শিখ ধর্মের বাণী প্রচার এবং ধর্ম-সংক্রান্ত আলোচনা করতেন। পরে তিনি সেখান থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করেন। তিনি তৎকালীন উর্দু বাজারেও বেশকিছু সময় অতিবাহিত করেছেন।
জানা যায়, গুরু নানক মুর্শিদাবাদ, মালদহ, কান্তনগর, কৃষ্ণনগর, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, গৌরীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। ফলে দেখা যায়, শিখ ধর্মের উদ্ভব এবং ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় সমসাময়িক।

ঢাকার গুরুদুয়ারার নানকশাহিতে সংরক্ষিত গুরু তেগ বাহাদুরের খড়ম ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
পুরনো নথিপত্র ও পুস্তকাদির বরাত দিয়ে অবিনাশ মহাপাত্র জানিয়েছেন, ঢাকায় পাঁচজন সুফির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। এরপর তিনি সোনারগাঁ গমন করেন। সোনারগাঁ তখন ছিল বাংলার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেখান থেকে তিনি ময়মনসিংহের উদ্দেশে গমন করেন। গুরু নানকের এ দীর্ঘ ভ্রমণে বাংলার অনেক মানুষই তার মহিমায় নানকপন্থী হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন অবিনাশ মহাপাত্র।
গুরু নানকের পর তৃতীয় শিখ গুরু অমরদাস ঢাকা এবং তৎকালীন বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে ধর্মপ্রচারকদের পাঠান এবং অনেক স্থানে ধর্মীয় সঙ্গত গড়ে ওঠে। এরপর ষষ্ঠ শিখ গুরু হর গোবিন্দ সিং বাংলায় শিখ ধর্ম প্রচারে বিশেষ আগ্রহ দেখান। এ অঞ্চলে তিনি তার এক প্রিয় শিষ্য আলমাস্তকে পাঠান। বলা হয়, আলমাস্ত এ অঞ্চলে শিখ ধর্মের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
তেগ বাহাদুর ছিলেন নবম শিখ গুরু। তিনি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৬৬৫ বা ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দ) শিখ ধর্ম প্রচার করতে বাংলাদেশে আসেন। এখানে উল্লেখ্য, ঢাকার শিখ ধর্মাবলম্বীদের আমন্ত্রণেই তেগ বাহাদুর এখানে এসেছিলেন। তেগ বাহাদুর পাটনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্বস্ত শিষ্য দেওয়ান মতিদাস, ভাই সতীদাস, ভাই গুরুদিত্তসহ আরো অনেকে। পাটনা থেকে তেগ বাহাদুর মুঙ্গেরে যাত্রাবিরতি করেন, এরপর মুঙ্গের থেকে তিনি ভাগলপুর, সাহিবগঞ্জ প্রভৃতি স্থান হয়ে রাজমহল পৌঁছেন। তারপর রাজমহল থেকে তিনি মালদহ গমন করেন। মালদহ থেকে গোদাগাড়ী হয়ে গোপালপুর, অতঃপর পাবনা, সিরাজগঞ্জ হয়ে তিনি ঢাকায় পৌঁছেন। গুরু তেগ বাহাদুরের আগমনের সংবাদে চট্টগ্রাম, সিলেট ও সন্দ্বীপ থেকে ভক্তরা ঢাকায় তাকে দেখতে আসেন।
তখন ঢাকায় শিখদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ভাই বুলাকি। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন যেন ঢাকায় গুরু তেগ বাহাদুরের কোনো অসুবিধা না হয়। ঢাকায় তেগ বাহাদুরের থাকার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে ওই গৃহটি বাহাদুরের সঙ্গত নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে ওই এলাকা সঙ্গত টোলা নামে পরিচিত। গুরু তেগ বাহাদুর যে স্থানে অবস্থান করতেন, বর্তমানে সেটি পুরান ঢাকার ১৪ নম্বর শ্রীশ দাস লেনে অবস্থিত। এটি সঙ্গতটোলা গুরুদুয়ারা নামে পরিচিতি পেয়েছিল। সঙ্গতটোলায় তেগ বাহাদুরের সময়ে অনেক অবাঙালি মানুষ বসবাস করত।
শোনা যায়, ঢাকায় অবস্থানকালে তেগ বাহাদুরভক্তদের অনুরোধে এবং তাদের আত্মিক জাগরণের জন্য বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, আগরতলা, কুমিল্লা, লাকসাম, দৌলতগঞ্জ, নোয়াখালী, চাঁদপুর গমন করেন। বলা হয়, চট্টগ্রাম অবস্থানকালে তেগ বাহাদুর একটি শিখ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং সন্দ্বীপ ও সিলেটে একটি করে সঙ্গত প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬৬৭ সালের মধ্যভাগে তেগ বাহাদুর আসামের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন, সেখানে এক বছরের অধিককাল অবস্থান করে ত্রিপুরা থেকে চট্টগ্রামে আসেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত গুরুদুয়ারা নানকশাহী বাংলাদেশের শিখ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উপাসনালয়। উপাসনালয়টি কবে নির্মিত হয়েছে তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও ইতিহাসবিদদের ধারণা, ১৬০৬-২৮ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। সে সময় বাংলা ছিল মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যের অধীন। সে সময় ষষ্ঠ শিখ গুরু হর গোবিন্দ সিং পূর্ব বাংলায় শিখ ধর্মপ্রচারের উদ্যোগ নেন। তার প্রচেষ্টায় বর্তমান ‘গুরুদুয়ারা নানকশাহী’ উপাসনালয়টি গড়ে ওঠে। মূলত গুরু গোবিন্দ সিংয়ের সময় একজন শিখ ধর্মপ্রচারক ভাই নাথ এটি নির্মাণ করেন। আবার আরেকটি মত অনুসারে, গুরু হর গোবিন্দ সিংয়ের প্রিয় শিষ্য আলমাস্ত এ গুরুদুয়ারা নানকশাহী নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর ১৮৩৩ সালের দিকে গুরুদুয়ারা আবার সংস্কার করা হয়। ১৯১৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার গুরুদুয়ারা নানকশাহীর দেখাশোনা করেছেন সেবাদার চন্দ্রজ্যোতি। জানা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকে গত শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত এটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপাসনালয় কেন্দ্রটিকে পুনরায় সংস্কার করে নতুন রূপ দেয়া হয়। গুরুদুয়ারাটি পূর্বমুখী করে বর্গাকার ভিত্তির ওপর স্থাপিত। এর কেন্দ্রীয় কক্ষের চারদিকে রয়েছে পাঁচ ফুট প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দার প্রতিটি কোণে রয়েছে একটি করে মোট চারটি কক্ষ। বারান্দার পরে তিনটি করে খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথ রয়েছে।
জানা যায়, ভাই রাম সিং ১৮৯৫ থেকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি সময়ে ঢাকার বাংলাবাজারের ১৪ নম্বর শ্রীশ দাস লেনে অবস্থিত সঙ্গতটোলা গুরুদুয়ারার গ্রান্থি (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (কথিত আছে, শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবিও সঙ্গতটোলায় একটি গুরুদুয়ারা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।) তিনি অবসরে যাওয়ার পর দায়িত্ব নেন তার পুত্র ভাই কিরপাল সিং। এ দুটো ছাড়াও ঢাকার উর্দু বাজারে গুরুদুয়ারা সুতারাশাহী ছিল।
এসএম রশিদ: লেখক





