চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র চকবাজার। শহরের অভ্যন্তরে কর্ণফুলী নদীর পাশেই শিখ ধর্মের প্রচার ও প্রার্থনা কেন্দ্র গড়ে ওঠে কয়েকশ বছর আগে। শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবের পূর্ব ভারত ভ্রমণের সময় চট্টগ্রাম সফর এবং সেই স্মৃতিতে গড়ে ওঠা চকবাজারের গুরুদুয়ারা। পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলে পাঞ্জাব থেকে আসা দক্ষ রেল কারিগর ও রেল প্রকৌশলীদের হাত ধরে পাহাড়তলীর পার্বত্য (পাহাড়বেষ্টিত) অঞ্চলেও একটি গুরুদুয়ারা স্থাপিত হয় ১৯৩৫ সালে।
সত্যসন্ধানী গুরু নানক ভ্রমণ করেছিলেন পৃথিবীর অনেক দেশ। ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভাই বালাজি, আর ইসলাম ধর্মাবলম্বী ভাই মর্দানা। পূর্বভ্রমণ (উদাসী) ও বাংলায় গুরু নানক তার বাণী প্রচারের জন্য একাধিক ‘উদাসী’ বা দীর্ঘযাত্রা করেছিলেন। নানকের প্রথম দিকের উদাসী ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে-বঙ্গ, আসাম, আজকের বাংলাদেশের নানা স্থানে তিনি ভ্রমণ করেছেন। জীবনে প্রায় ৩০ বছর গুরু নানক ব্যয় করেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তরে। হেঁটে ভ্রমণ করেছেন পূর্বে বাংলা, আসাম, বার্মা, পশ্চিমে পারস্য, আরব, মক্কা, মদিনা, বাগদাদ, তুরস্ক ও গ্রিসে। জন্মভূমি পাঞ্জাবে ফিরে প্রচার করলেন মানবপ্রেমের দর্শন। নিরাকার একেশ্বরবাদী দর্শনে সবাইকে দীক্ষা দিয়ে আবদ্ধ করেন মৈত্রীর বন্ধনে। পাঞ্জাবি নামানুযায়ী ‘শিখ’ নামে পরিচিত হতে থাকেন অনুসারীরা।
গুরু নানক সম্পর্কে ভাই বালাজি রচিত ‘জনমসাখী’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় সত্যের সন্ধানে গুরু নানক পাহাড়-পর্বত, মরুভূমিসহ নানা প্রান্তর পাড়ি দিয়েছেন। কখনো হাজার হাজার মাইল হেঁটে ভ্রমণ করেছেন। এসেছিলেন বাংলায়। মিথিলা থেকে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, কৃষ্ণনগর, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা হয়ে এসেছিলেন চট্টগ্রামেও। সাথিদের মধ্যে ছিলেন মুসলিম কিংবা হিন্দু ধর্মের অনুসারীরাও। ১৫০৭ খ্রিস্টাদে চট্টগ্রামে আসার পর ভাই মর্দানা খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। গুরু নানক তখন ভাই মর্দানাকে ঝান্ডাজির (ঝান্ডিয়া) সঙ্গে দেখা করতে বলেন। ঝান্ডা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি (পাঞ্জাবি ভাষায় তারখান)। মর্দানা ঝান্ডাজিকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যান ইন্দ্র সেনকে। ইন্দ্র সেন ছিলেন ঝান্ডার পরিচিত। ইন্দ্র সেন এ অঞ্চলের তৎকালীন রাজা সুধর সেনের ভাগনে। ঝান্ডা বিস্মিত হন ভাই মর্দানা কেন তার খোঁজ নিচ্ছেন। মর্দানা জানালেন একজন সাধক পুরুষ ঝান্ডার খোঁজ করছেন। এ তিনজন একসঙ্গে মিলিত হলে তারা রাজা সুধর সেনের কাছে যান। জানান, এক আধ্যাত্মিক গুরু এসেছেন তার রাজ্যে। ভাই মর্দানা সবাইকে শুরু নানকের কাছে নিয়ে যান। সাক্ষাতে ঝান্ডা পূর্ব জন্মের কর্ম ও কর্মফলের ফিরিস্তি দিলে ঝান্ডা গুরু নানকের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে পড়েন। নানককে যেকোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু নানক শুধু ঝান্ডার একান্ত নিজস্ব যা কিছু আছে সেটিই নিতে চান। নানক বলেন অর্থকড়ি, ভূমি কিংবা নিজ দেহও নিজের নয়, সবকিছু নশ্বর। শেষ পর্যন্ত মন ও পরমাত্মাকে গুরু নানকের কাছে সমর্পণ করেন তারখান/কাঠমিস্ত্রি ঝান্ডা।
রাজা সুধর সেন গুরু নানকের আগমন উপলক্ষে এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেখানে সারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসেন সাধু-সন্ন্যাসীরা। গুরু নানকের সংস্পর্শে সবাই প্রীত হন। রাজা গুরু নানককে থেকে যেতে বললে তিনি উত্তর দেন, কোনো স্থান তার জন্য চিরস্থায়ী নয়। চকবাজারের ১ নম্বর জয়নগর রোডে এ মন্দির স্থাপন করে ঝান্ডাজিকে মান্জি (স্থানীয় ধর্মোপদেশ কেন্দ্র) ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করেন। চট্টগ্রামে শুরু হয় শিখ ধর্মাবলম্বীদের টেম্পল ‘গুরুদুয়ারা’।
ভাই মোহন সিংহ, এক দরিদ্র ক্ষত্রিয়, যিনি বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁর (১৭৪০-৫৬) আমলে দেওয়ান (রাজস্বমন্ত্রী) হয়েছিলেন। তিনি গুরুদুয়ারাকে কিছু জমি দান করেন। এটি বহু মহন্তের অধীনে টিকে ছিল। শেষ মহন্ত কালীদাসের মৃত্যুর পর তার ছেলে নাবালক হওয়ার কারণে গুরুদুয়ারার দায়িত্ব নিতে পারেনি। দীর্ঘকাল এটি উদাসী ধারার মোহন্তদের তত্ত্বাবধানে চললেও ১৯১৭ সালে আত্মা সিংহ ও অর্জন সিংহ (ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে) এবং আরো অনেকে আপিল করলে, চট্টগ্রামের জেলা জজ আনন্দ সেনকে গুরুদুয়ারার দায়িত্ব দেন। জেলা জজ ১১ সদস্যের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেন। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন সতীশ চন্দ্র হাজারী ও সম্পাদক ছিলেন কে চন্দ্র দাশ বর্মণ। কমিটি বহু বছর ধরে গুরুদুয়ারার সম্পত্তি পরিচালনা করে আসছিল। ১৯৭২ সালে ভারতের এক শিখ প্রতিনিধি দল ক্যাপ্টেন ভাগ সিংহের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সফর করেন। তখন গুরুদুয়ারার সভাপতি ছিলেন সতীশ চন্দ্র দে এবং সম্পাদক ছিলেন এস কে দাশ বর্মণ।
শিখ ধর্মাবলম্বী ছাড়াও হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও গুরুদুয়ারার নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেন। শিখ সম্প্রদায়ের চারটি বড় উৎসব চকবাজারের গুরুদুয়ারায় উদযাপন করা হয়। তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও গুরু নানকের জন্মদিন পালন করা হয় জাঁকজমকভাবে। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ শিখ ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয় ‘খালসা সাজনা দিবস’। আবার প্রতি বছর ১৩ নভেম্বর পালন হয় গুরু নানকের জন্মদিন। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে ভক্তকুল সমবেত হন। এ দুটি বৃহৎ উৎসবে গুরুদুয়ারা আলোকিত করা হয়। এক মাস আগেই গুরু গ্রন্থ সাহেব পাঠ শুরু হয়। ‘সহজপাঠ‘ নামের এ পাঠ শেষ হয় অনুষ্ঠানের দিন। গুরুদুয়ারার প্রার্থনার কক্ষকে বলা হয় ‘দরবার সাহেব’। দরবার সাহেবে ভজন, কীর্তন, মানুষের আত্মশুদ্ধি বাণী ও ধর্মীয় ইতিহাস আলোচনা করা হয়। পাঠের শেষে ভোগ ‘কাড়া প্রসাদ’ বিতরণের পর ‘গুরুর ভোগ’ লঙ্গর শুরু হয়। সব ধর্ম, বর্ণের মানুষ এ লঙ্গরে অংশ নিতে পারেন, নেন। লঙ্গরের খাবারের তালিকায় থাকে বড় আকারের রুটি, ভাত, ডাল। এছাড়া প্রতি বছর ২২ ডিসেম্বর অনেকটা অনাড়ম্বরভাবে পালন হয় শিখ ধর্মের নয়জন ধর্মগুরুর জন্মদিন উৎসব।
চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র চকবাজার এলাকার ঐতিহাসিক ওয়ালি বেগ খাঁ মসজিদের পশ্চিম পাশে ১ নম্বর জয়নগর গলির শুরুতেই রয়েছে গুরুদুয়ারা। ৫০০ বছরের পুরনো এ গুরুদুয়ারা প্রায় ৫০ ফুট দীর্ঘ ও প্রস্থে ৩৫ ফুট। চকবাজার গুরুদুয়ারার সামনের দালান, দোচালা আঙিনা আর ভেতরের সভামণ্ডপ সব মিলিয়ে এক ধরনের ঐতিহাসিক-ঔপনিবেশিক স্থাপত্য-ঐতিহ্যের ছাপ বহন করে। স্থানীয় শিখ সম্প্রদায় ও অতিথিদের সমবেত হওয়ার কেন্দ্র হয়ে আছে। চকবাজার গুরুদুয়ারায় একটিমাত্র শিখ পরিবার সেবায়েত হিসেবে থাকলেও নানা কাজে চট্টগ্রাম কিংবা বাংলাদেশে অবস্থানরত শিখ সম্প্রদায় গুরুদুয়ারার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান কিংবা সাপ্তাহিক প্রার্থনায় অংশ নেয়।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত শিখ গুরুদুয়ারা ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
গুরুদুয়ারায় হলুদ রঙের পতাকা টাঙানো থাকে। একে বলা হয় ‘নিশান সাহেব’। নিশানের দুদিকে তলোয়ারের ছবি আঁকা থাকে, যা খান্ডা নামে পরিচিত। এ নিশানকে শিখদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক মিশ্রণের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। গুরুদুয়ারার মূল কক্ষের বেদির ওপরে রাখা আছে শিখদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থ সাহেব’। এটি একটি প্রাচীন ও হস্তলিখিত ধর্মগ্রন্থ, যাকে ঘিরে শিখদের পূজা-অর্চনা করা হয়। যারা এ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন এবং এ ধর্মাচারকে পাঞ্জাবি ভাষায় ‘আরদাশ’ বলা হয়। প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সাপ্তাহিক জমায়েত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয় গুরুদুয়ারায়। শিখদের উপাসনা পদ্ধতি মূলত সংগীতসংশ্লিষ্ট। প্রার্থনার সময় ভক্তিগীতি, ধর্মগ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। নারী-পুরুষ সবাই ভেদাভেদহীনভাবে প্রার্থনায় অংশ নিতে পারে। তবলা, ডুগডুগি, খাকসা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। প্রতি প্রার্থনার শেষে চট্টগ্রামে অস্থায়ীভাবে থাকা শিখ ধর্মের অনুসারীদের সহযোগিতায় ‘লঙ্গর’ বা ভোগের প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
পাহাড়তলী গুরুদুয়ারা মূলত ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়ে কারখানাকে ঘিরে আসা পাঞ্জাবি শিখ সম্প্রদায়ের হাতে তৈরি। উত্তর-পশ্চিম ভারত (বিশেষত পাঞ্জাব) থেকে বহু কর্মী ও কারিগর আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের চাকরিতে যোগদানের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে আসেন। ওই সময়ে পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানা থেকে চকবাজারে আসার পথ পাহাড়ি কণ্টকময় ও সময়সাপেক্ষ ছিল। এ কারণে শিখ ধর্মাবলম্বী রেলওয়ে কর্মী ও কর্মকর্তাদের ধর্মীয় প্রয়োজন মেটাতে পাহাড়তলীতে রেলওয়ে কর্মীদের উদ্যোগে একটি গুরুদুয়ারা নির্মাণ হয়। বিশ্ব গুরুদুয়ারা নথিতে এটিকে রেল কর্মচারীদের জন্য নির্মিত গুরুদুয়ারা হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে। তবে পাহাড়তলীর এ গুরুদুয়ারা কর্মসূত্রে চট্টগ্রামে আসা পাঞ্জাবি-শিখ ও স্থানীয় শিখ পরিবারগুলোর জন্য ছিল এক অনন্য আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল। গুরু-কীর্তন, কীর্তন-সেবা, শবদ-আখণ্ডপাঠের মাধ্যমে রেল শহর চট্টগ্রামের এক স্নিগ্ধ ধর্মীয় টেম্পল হিসেবে আখ্যা পেয়েছিল পাহাড়তলীতে গড়ে ওঠা রেলপাতের মাধ্যমে তৈরি পাহাড়তলী গুরুদুয়ারা।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম তথা গোটা বাংলাদেশ থেকেই শিখ ধর্মাবলম্বীরা চলে যেতে থাকে। একসময় শিখ ধর্মাবলম্বীরা কার্যত শূন্যের কাছাকাছি চলে এলেও মুষ্টিমেয় স্থানীয় কয়েকজন সেবায়েত, পাঞ্জাব থেকে আসা শিখ চকবাজার গুরুদুয়ারার দায়িত্ব পালন করেন। আবার পাহাড়তলী গুরুদুয়ারার দায়িত্ব বা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন এমকে রায়। চকবাজারের দায়িত্বে রয়েছেন পাঞ্জাবের বাসিন্দা শিখ ধর্মাবলম্বী সিং বীর সিং।
বতর্মান বাংলাদেশে চট্টগ্রামের চকবাজার ও পাহাড়তলী শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, স্মৃতি স্থাপনা থেকে শুরু করে পরম্পরায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নানা ভাষা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানমূলক অতীতের সাক্ষ্য দেয়। গুরু নানক স্মরণ-অনুষ্ঠান, গুরুপুরব, আখণ্ডপাঠ বা লঙ্গরের আয়োজন স্থানীয় অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্যও উন্মুক্ত হয়, যা নানা ধর্মের একই কাতারে যূথবদ্ধ হওয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চট্টগ্রামের শিখ ঐতিহ্য তাই একদিকে গুরু নানকের ভারত উপমহাদেশজুড়ে প্রেম, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রচারের যাত্রার স্মৃতি। অন্যদিকে বন্দর ও রেলের শহর চট্টগ্রামের সামাজিক ইতিহাসে চকবাজারের প্রাচীন কূপ কিংবা পাহাড়তলীর গুরুদুয়ারা প্রাচীন আখ্যান, স্থাপত্য, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চর্চার অনন্য কেন্দ্র হয়ে এখনো টিকে আছে মানুষে মানুষে পারস্পরিক বিশ্বাস, আতিথ্য আর সহাবস্থানের অনন্য নজির হিসেবে।
সুজিত সাহা: চট্টগ্রাম ব্যুরো, বণিক বার্তা





