পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। মিসরে গড়ে উঠছিল পিরামিড, মেসোপটেমিয়ায় গড়ে উঠছিল নগররাষ্ট্র। ঠিক তখনই মেসোপটেমিয়ার পূর্ব দিকে জন্ম নিচ্ছিল আরেক সভ্য ‘এলাম’। তাদের রাজধানী সুসা। এ জনপদেরই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ সাল নাগাদ এসে পৌঁছায় ‘আর্য’ জাতিগোষ্ঠী। তারা নিজেদের বলত airya। তাদের ভাষা থেকে জন্ম নেয় airyānąm। যার অর্থ ‘আর্যদের ভূমি’। আর এখান থেকেই ‘ইরান’ নামের আভিধানিক জন্ম।
এরও এক হাজার বছর পর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এক নামহীন পাহাড়ি উপত্যকা থেকে উঠে এলেন এক যুবক সাইরাস। যিনি হাকামেনিদের পতাকাতলে গড়লেন ইতিহাসের প্রথম মহাসাম্রাজ্য। দখল করেন ব্যাবিলন। ধ্বংস বা প্রতিশোধের পথে না হেঁটে ঘোষণা করেন ধর্ম হবে স্বাধীন, দাস হবে মুক্ত, মানুষ হবে মানুষ। ইতিহাস তাকে স্মরণ রাখল ‘সাইরাস সিলিন্ডার’-এর মাধ্যমে। যাকে অনেকেই বলেন, ‘বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার ঘোষণা। তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে আচেমেনিদ সাম্রাজ্য। গ্রিক লেখকেরা এ সাম্রাজ্যকে ডাকতে শুরু করে পার্সিস নামে, যার উৎস ছিল ‘পার্সা’—একটি দক্ষিণ ইরানি জনগোষ্ঠী। গ্রিক কল্পকাহিনীতে এ নাম আরো রোমান্টিক রূপ ধারণ করে। তারা পারস্য শব্দটিকে জুড়ে দেয় গ্রিক নায়কের নামের সঙ্গে। কাহিনীতে বলা হয় পারসিউস মেডুসাবিনাশী বীর এক পুত্রের জন্ম দেন, নাম ছিল পার্সেস। আর সে পার্সেসই নাকি পরবর্তী সময়ে পারস্য জাতির আদি পিতা। এ উপকথা ইতিহাস না হলেও এতে ফুটে ওঠে প্রাচীন বিশ্বে পারস্যের নাম ও মর্যাদার কল্পিত, রহস্যময় বিস্তার।
এভাবেই একটি অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ইরান আত্মপরিচয়ের পাশাপাশি জন্ম নেয় পারস্যের কিংবদন্তি। যে নামের পেছনে ছিল মিথ ও বাস্তবতা, ইতিহাস ও কল্পনার অনন্য মিশ্রণ। ‘পারস্য’ নামটি আদতে এ ভূখণ্ডের নিজস্ব পরিচয় ছিল না। এটি ছিল বাইরের জগৎ তথা প্রাচীন গ্রিকদের দেয়া একটি এক্সোনিম। অর্থাৎ এমন একটি নাম, যা কোনো জনগোষ্ঠীকে বাইরের কেউ দিয়েছে।
গ্রিকরা যাকে ডাকত পার্সিস নামে, সে সভ্যতাই গড়ে তুলেছিল এমন এক সাংস্কৃতিক বিশ্ব, যেখানে শুধুই সম্রাট নয়, বেঁচে ছিল কল্পনা, বিজ্ঞান, কবিতা আর দর্শন। এ সাম্রাজ্যের বুকে দাঁড়িয়ে ফেরদৌসী রচনা করেন ‘শাহনামা’—যেখানে পারস্যের বীরগাথা শুধু ইতিহাস নয়, হয়ে ওঠে জাতির আত্মপরিচয়ের মহাকাব্য। হাফিজ শিরাজি, যার কবিতায় প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা যেন একাকার। আর রুমি, যিনি কবিতায় আত্মা ও ঈশ্বরের মিলনকে রূপ দিয়েছেন পারস্যের অন্তর্লোকেরই প্রতিচ্ছবি হিসেবে। ছিলেন আল রাজি, ইবনে সিনার মতো কিংবদন্তি চিকিৎসাবিদরা। গণিতে ওমর খৈয়ামের অবদান যেমন ছিল জ্যামিতিতে, তেমনি ছিল রুবাইয়াতে—সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব আর প্রেমের মধুর বিষাদের কবিতায়। আজও ইসফাহানের নীল গম্বুজ, শিরাজের গোলাপবাগান বা পের্সেপোলিসের ধ্বংসস্তূপ—প্রত্যেকটি স্থানে সে ইতিহাসের স্তব ধ্বনিত হয়। এভাবেই পারস্য শুধুই একটি রাজনৈতিক সত্তা ছিল না—এটি ছিল চিন্তার, সৌন্দর্যের ও আত্মার এক পূর্ণাঙ্গ মহাবিশ্ব। কিন্তু সময় বদলায়। একদিন সে ‘পারস্য’ নামটিও ইতিহাসের পাতায় পড়ে থাকে। রাষ্ট্রনামের খাতায় লেখা হয় ‘ইরান’।

খ্রিস্টের জন্মের আগে পারস্য
‘ইরান’ আর ‘পারস্য’ এ দুটি নামের বিভাজন শুধু ভূগোল বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এক গভীর ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। অনেক ঐতিহাসিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এ দুই নামকে সমার্থক ভাবার প্রবণতা আসলে একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি। কারণ ‘জাতীয় পরিচয়’ বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের ধারণা মধ্যপ্রাচ্যে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ের সৃষ্টি। রেজা শাহ যে রকম একটি আধুনিক, গর্বিত, রাষ্ট্রীয় পরিচয় গড়ার চেষ্টা করেছিলেন ‘ইরান’ নামের ভেতর দিয়ে, সেটি অনেক সময় এক ধরনের ইউটোপিয়ান অতীত গৌরবের কল্পনায় গাথা। পনেরো শতকের ত্রিশের দশকে রেজা শাহ আধুনিকীকরণ ও জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপটে বিদেশী দূতাবাসগুলোকে অনুরোধ করেন তার দেশকে ইরান নামে সম্বোধন করতে। তিনি মনে করতেন পারস্য নামটি সামন্ততান্ত্রিক অতীতের স্মারক, আর ইরান একটি আধুনিক, জাতিরাষ্ট্রের পরিচয়। তখন ইউরোপে ‘আর্য’ ধারণাটিও উচ্চ জাতীয়তা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় ছিল, বিশেষ করে জার্মান নাৎসি মতাদর্শে। ‘আর্য’ শব্দটি তখনকার ইউজেনিক্স চর্চা ও আধিপত্যবাদী মনোবিজ্ঞানের প্রভাবে ইউরোপ ও এশিয়ায় নতুন অর্থ ও গুরুত্ব পাচ্ছিল। এ সময় রেজা শাহ ‘Land of the Aryans’ হিসেবে ইরানের বর্ণনা দিয়ে গর্বিত জাতীয়তাবাদ নির্মাণে ব্রতী হন। পরে ১৯৫৯ সালে তার ছেলে মোহাম্মদ রেজা শাহ ঘোষণা দেন যে ‘ইরান’ ও ‘পারস্য’ দুটি নামই সরকারিভাবে গ্রহণযোগ্য। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ‘ইরান’ নামটি রাষ্ট্রীয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এছাড়া ইরানের রাষ্ট্রপরিচয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে ‘ইসলামী শিয়াপন্থি ব্যতিক্রমবাদ’ যুক্ত হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের জন্ম দেয়, যা আজও ইরানের অভ্যন্তরে দোলাচল তৈরি করে রেখেছে। তবে রেজা শাহ ইরান নামকরণ করলেও ভাবমূর্তি নির্মাণে প্রাচীন পারস্যের সম্রাটদের নাম ও ইতিহাস ব্যবহার করেন। তিনি অতীত গৌরবের সঙ্গে বর্তমান রাষ্ট্রকে যুক্ত করার জন্য বারবার ফিরেছেন সাইরাস, দারিউস, জেরক্সিসদের দিকে; যাতে নতুন ইরান একটি সুশাসিত ও মহিমান্বিত উত্তরাধিকারের দাবিদার হতে পারে।
আজকের দিনে ‘ইরান’ নামটি ব্যবহার হয় শুধু যেন রাষ্ট্র, সরকারের পরিচয়ের জন্য। অথচ বিশ্বজুড়ে খাবার, কবিতা, কার্পেট বা চিত্রকলার ক্ষেত্রে কেউ এগুলোকে ইরানি বলে না। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজও বহন করে ‘পারস্য’ নামের গন্ধ। কারণ ইতিহাসের কাছে ‘পারস্য’ মানেই শিল্প, সৌন্দর্য আর মানবিকতার এক চিরন্তন স্মারক।
তবু আজকের মানচিত্রে ‘ইরান’ নামটিই জ্বলজ্বলে সত্য। এটাই তার রাষ্ট্র, তার নাগরিকত্ব, তার ইতিহাসের বর্তমান ঠিকানা। তবু কোথাও একটুখানি ‘পারস্য’ রয়ে যায়—কখনো বয়স্ক দাদার কণ্ঠে ফারসি গজলের সুরে, কখনো রান্নাঘরে গোলাপজল আর জাফরানে ভেজা ‘শিরিন পোলাও’-এর ঘ্রাণে। পারস্য যেন হৃদয়ের এক মৃদু স্পন্দন, যাকে ‘ইরান রাষ্ট্র’ বদলাতে পারে না।
ইরান তার ইতিহাসে অনেকবার ভেঙেছে, আবার জোড়া লেগেছে। নতুন নাম ধারণ করেছে, কিন্তু পারস্যের স্মৃতি তার রক্তে বহমান থেকেছে। এমনকি আধুনিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর ধর্মীয় বিভাজনের মধ্যেও যখন কেউ উচ্চারণ করে ‘পার্সিয়ান কবিতা’, তখন যেন সময় থেমে যায়। ফিরে তাকাতে হয় সে গৌরবময় অতীতে, যে অতীত এখন কেবল সাহিত্যে, শিল্পে, আর স্মৃতিতে।
পাঁচ হাজার বছর আগের সেই ‘আর্যদের ভূমি’ থেকে আজকের ‘ইরান’ একটি দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী। প্রতিটি নাম শুধু শব্দ নয়, তারা ইতিহাসের বুকে বাজানো দুটি ভিন্ন সুর, দুই চিরন্তন আবেগের প্রতিফলন। পারস্যের গৌরব ছিল মানবিকতার, সংস্কৃতির, শিল্পকলা ও সাহিত্যের এক অপার সৌরভ। নাম বদলানো হয়, রাজনীতি বদলায়, কিন্তু ইতিহাসের গভীর স্রোত কখনো থামে না। এ দেশ আজও এক দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিচয়ের মাঝে অটুট—পুরনো ও নতুনের সংঘাতে, গৌরব ও বাস্তবতার মধ্যে। তাই ‘পারস্য’ আর ‘ইরান’ শুধু নাম নয়, একটি চিরস্থায়ী সংলাপ, এক অনুভবের বাষ্প। যেখানে অতীতের স্মৃতি আজকের সংগ্রামের সঙ্গে মিশে যায়।
মাহফুজ রাহমান: সাংবাদিক, বণিক বার্তা








