পারস্য এ দুনিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাম্রাজ্য। সাইরাস সত্যিকার সম্রাটের প্রথম মুখ। আজকের ইরানকে কেন্দ্র করে এ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ইউরোপ থেকে মিসর, একসময় ভারত পর্যন্ত। পারস্যই ইতিহাসের প্রথম পরাশক্তি। সাইরাস থেকে নাদের শাহ—ইতিহাসে অগণন বীর শাসক, যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে এ সভ্যতা। পুরনো ইতিহাস সবার সামনে হাজির নাও থাকতে পারে কিন্তু অষ্টাদশ শতকের নাদের শাহ কি ইতিহাসে যথেষ্ট জায়গা পেয়েছেন? তার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয় পাননি। পারস্যের ইতিহাস-রাজনীতির পণ্ডিত মাইকেল অক্সওর্থি মনে করেন, বিশেষত পশ্চিমাদের কাছে নাদের শাহ একেবারেই অপরিচিত। কিন্তু মধ্যযুগের বর্ণময় ইতিহাসের শেষভাগের উল্লেখযোগ্য চরিত্র পারস্যের এ সামরিক নেতা। তার সামরিক সাফল্যের কারণে ইতিহাসবিদরা তাকে পারস্যের নেপোলিয়ন, দ্বিতীয় আলেকজান্ডার বলে অভিহিত করেন। অভিজাত নয়, তিনি উঠে এসেছিলেন একেবারে সমাজের সাধারণ স্তর থেকে। তারপর পারস্যের নেতা হিসেবে তার দেশকে মুক্ত করেছেন অটোমান তুর্কি, আফগান ও রুশদের আগ্রাসন থেকে। অটোমানদের ভূমিতে প্রবেশ করে তাদের পরাজিত করেছেন। আফগানদেরও তাদের ঘরে ঢুকে পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছেন। জগৎখ্যাত ভারতের মোগল সাম্রাজ্যের গৌরব দিল্লিকে প্রায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন, চূর্ণ করেছেন তৈমুর বংশের গৌরব। ১৭৪০-এর দশকে নাদের শাহর সেনাবাহিনী ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সেনা দল।

মাইকেল অক্সওর্থি তার পারস্য সভ্যতার ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘ইরানের ইতিহাস সহিংসতা আর নাটকীয়তায় পূর্ণ। পারস্য সভ্যতার ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যাবে আক্রমণ, বিজয়ী সেনানায়ক, যুদ্ধ এবং বিপ্লব গল্প। যেহেতু বেশির ভাগ দেশের তুলনায় ইরানের ইতিহাস দীর্ঘ, আয়তনেও বিস্তৃত তাই এর মাটিতে, অধিবাসীদের রক্তে ট্র্যাজেডি কিংবা কমেডি অন্যদের চেয়ে বেশি। কিন্তু ইরানের ইতিহাসে এর চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে। ধর্ম, প্রভাব, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন এবং দার্শনিক ধারণা ইরানের মনকে সময়ে সময়ে বদলে দিয়েছে, আবার ইরান প্রভাবক হিসেবে পরিবর্তন এনেছে তার সীমান্তের বাইরের দুনিয়ায়। আজ ইরান আবার মনোযোগের কেন্দ্রে, নতুন পরিস্থিতি প্রশ্ন উঠছে—ইরান কি আক্রমণাত্মক শক্তি, না নিজেই আক্রমণের ভুক্তভোগী? ইরান কি সম্প্রসারণ নীতিতে বিশ্বাসী নাকি ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণাত্মক? ইরানের মতবাদ কি নীরবে থাকার নাকি অস্থিরতার?’ মাইকেলের গ্রন্থটি প্রকাশ হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু এ তথ্যটি সরিয়ে রেখে এ উদ্ধৃতি পাঠ করলে মনে হবে চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের পটভূমিতে গতকালই কেউ লিখেছেন। প্রাচীন সভ্যতার এ জাতির জীবনে প্রকৃতপক্ষে এমন মুহূর্ত এর আগেও বহুবার এসেছে। তাই ওপরের কথাগুলো প্রাসঙ্গিকতা হারায় না। প্রশ্নগুলোর জবাব মাইকেল ইতিহাসে পাতায় খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো সভ্যতার অন্যতম। শুরু থেকেই এ সভ্যতা চিন্তাশীল, সক্রিয় ও জটিল। এ সভ্যতার অনেক দিক পৃথিবীর প্রায় সব মানুষকেই কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করেছে। কিন্তু যথারীতি দীর্ঘকালের হাজারো গল্পের সব আর আমাদের চোখের সামনে নেই।

ইরান দ্বন্দ্ব, ব্যতিক্রম আর ভিন্নমতে পূর্ণ ছিল সবসময়। বাইরের মানুষের ধারণা এখানে হয়তো বেশির ভাগই মরুভূমি, উত্তপ্ত, কিন্তু এখানে আছে উঁচু উঁচু শীতল পর্বত। আছে উর্বর কৃষিভূমি আর সবুজ বনাঞ্চল। ইরানের জলবায়ু বৈচিত্র্য ভরা, এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ সমৃদ্ধ আর আছে রঙিন নকশার বাহার। ইরাক ও আফগানিস্তান, রাশিয়া এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যে, ইরানিরা আরবিভাষী মধ্যপ্রাচ্যের মাঝখানে একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলে। এ ভাষার পছন্দ ও সংরক্ষণ তাদের স্বতন্ত্র মনের ইশারা দেয়। ইরানকে সাধারণত একটি সমগোত্রীয় জাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় যাদের জাতীয় সংস্কৃতি বেশ শক্তিশালী। কিন্তু বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতি—আজেরি, কুর্দি, গিলাকি, বেলুচি এবং তুর্কমেনিরা এখানকার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানি পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের পড়াশোনায় অভূতপূর্ব মনোযোগ দিয়েছে। তারা বিভিন্ন কাজে যোগ দিয়েছেন। দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ৬০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী নারী।

ইরান যেন এক চলমান বৈপরীত্যের দেশ—একদিকে রয়েছে বিশ্বের অনন্য সুন্দর ইসলামী স্থাপত্য, গালিচাবোনা আর হাজার বছরের সংস্কৃতি; অন্যদিকে রাজধানী তেহরানের কংক্রিটে-ঢাকা মুখ, যানজটের বিষণ্নতা।

Untitled-1

পারস্যের ঐতিহ্যে কবিতা কেবল সাহিত্যের শৈলী নয়, যেন জীবনের এক ভাষা। ইরানিরা কবিতার পঙক্তি মুখস্থ করে, রাস্তায়, চায়ের দোকানে, প্রার্থনায়—প্রতিদিনের কথোপকথনে উচ্চারণ করে হাফিজ, রুমি বা ফেরদৌসীর চরণ। এ কবিতার ভাষা শুধু প্রেম, গোলাপ, মদ আর সৌন্দর্যের নয়, এটি আত্মা ও ঈশ্বর, জীবন ও মৃত্যুর সীমান্তে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত আরাধনা।

এ দেশে মহররমের শোকাবহ স্মৃতিতে রাস্তায় নামে ক্রন্দনরত মানুষের স্রোত—ইমাম হোসাইনের মৃত্যু যেন এখনো হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। ঘরে ঘরে যেন কারবালা। এ দেশ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে কঠোর, বিচক্ষণ ও বিধিবদ্ধ শিয়া মুসলিম পণ্ডিতদের আবাসস্থল।

ইরান এবং পারস্য—একই দেশের দুটি নাম, কিন্তু পশ্চিমের কাছে দুই নামের সৃষ্ট প্রতিচ্ছবি একেবারেই আলাদা। ‘পারস্য’ শব্দটি প্রাচীনকাল থেকে রোমান্টিক ও সৌন্দর্যের প্রতীক—গোলাপ, বুলবুলি, বেহেশতের মতো বাগান, রঙিন গালিচা ও সুরেলা সংগীত। অন্যদিকে পশ্চিমা মিডিয়ায় ‘ইরান’ নামটি হাজির হয় ধর্মীয় নীতিতে কঠোর, পশ্চিমবিরোধী মিছিল, কালো চাদরে ঢাকা নারীর ছবিতে।

ইরানের দক্ষিণে একটি প্রদেশ আছে যার নাম ফারস। এর রাজধানী শিরাজ। এখানে আছে প্রাচীন পারস্যের অবিশ্বাস্য সব স্থাপত্য। পার্সেপোলিস ও পাসারগাদের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট এখানেই অবস্থিত। প্রাচীনকালে এ প্রদেশটি পরিচিত ছিল পার্স নামে—এর নামকরণ হয়েছিল সেখানকার বসবাসকারী জনগোষ্ঠী ‘পার্সিয়ান’দের নামে। যখন এ জনগোষ্ঠী একটি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, তখন গ্রিকরা তাদের সাম্রাজ্যকে ‘পার্সিয়ান সাম্রাজ্য’ নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীকালে, গ্রিক, রোমান ও অন্য ইউরোপীয়রা ওই অঞ্চলের পরবর্তী বিভিন্ন রাজবংশীয় শাসনকেও ‘পার্সিয়ান’ নামে অভিহিত করে, যা আজকের ইরানের ভূখণ্ড। যেমন ইসলামী বিজয়ের আগে সাসানীয় সাম্রাজ্য (সাসানীয় পার্সিয়া), ষোলো ও সতেরো শতকে সাফাভিদ সাম্রাজ্য (সাফাভিদ পার্সিয়া) এবং উনিশ শতকে কাজার সাম্রাজ্য (কাজার পার্সিয়া)।

কিন্তু এসব কালপর্বেও এ সাম্রাজ্যগুলোর জনগণ নিজেদের ‘ইরানি’ নামে পরিচয় দিত এবং তাদের দেশ বলত ‘ইরান’। ‘ইরান’ শব্দটির উৎপত্তি প্রাচীন যুগেই, যার অর্থ ‘‌মহিমান্বিত’ বা ‘‌উত্তম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এ নাম ‘আর্য’ ধারণাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। পরবর্তী সময় এ আর্য ধারণা নিয়ে ইতিহাস চর্চা ও এর অপব্যবহারের অনেক ঘটনা ঘটেছে।

১৯৩৫ সালে রেজা শাহ, তার পূর্বসূরি কাজার শাসনের অবক্ষয়ের বদনাম থেকে নিজেকে দূরে রাখতে, বিদেশে তাদের দূতাবাসকে নির্দেশ দেন ভবিষ্যতে সরকারি যোগাযোগে দেশের নাম ‘ইরান’ ব্যবহার করতে। তবে অনেক ইরানি ‘পারস্য’ নামটিকেই পছন্দ করেন। এ নাম তাদের প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও আনন্দময় স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে। ইংরেজিভাষী দুনিয়ার কাছে ঐতিহাসিকভাবে পারস্য নামটিই ছিল মূল পরিচয়। ১৯৩৫ সালের আগে সবাই পারস্যই ব্যবহার করতেন। পরে ইরান নামের ব্যবহার বাড়তে থাকে।

পারস্য কিংবা ইরান—যে নামেই ডাকা হোক, এ জাতি, সভ্যতা কিংবা রাষ্ট্রের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের ভাষা, স্থাপত্য, পরম্পরা, সংস্কৃতি, চিন্তায় সমৃদ্ধ। তাদের ইতিহাস বিজয়ের, বিপর্যয়ের কখনো শোকের কখনো উদযাপনের। হাজার বছরের ধারাবাহিকতা তাদের টিকে থাকার ইচ্ছা, পরিস্থিতি মোকাবেলার সাহস আর সৃষ্টিশীলতার জীবন্ত সাক্ষ্য।

এস এম রশিদ: লেখক