অনেক অনেক দিন আগের কথা, রোমান সম্রাটদের রথ, ব্যাবিলনের আশ্চর্য শূন্যে ভেসে থাকা বাগান কিংবা পার্সোপোলিসের বিরাট প্রাসাদ সারিরও আগে প্রাচীন দুনিয়ায় জ্বলজ্বলে রত্ন হিসেবে উপস্থিত ছিল বলখ। গ্রিকদের কাছে নাম ছিল বাকট্রা—সম্পদ আর শিক্ষার ভূমি; পারসিকদের কাছে জারিয়াসপা—স্বর্ণকেশী অশ্বের শহর। আর আরব ইতিহাসবিদরা যখন এ শহরে পা রাখলেন তারা নাম দিলেন উম আল-বিলাদ, ‘সব শহরের জননী’। তারা বিস্মিত হয়েছিলেন এ শহরের সমৃদ্ধি আর প্রাচীনত্ব দেখে।
বলখ শহর গল্পের চেয়ে প্রাচীন। পারস্যের কিংবদন্তি অনুসারে উত্তরে আমু দরিয়ার তীর থেকে ইরানি জাতি এ শহরেই বসত গড়েছিল ২০০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বলা হয় পৌরাণিক রাজা কিওমারস এ শহরের পত্তন করেছিলেন। ফেরদৌসী তার শাহনামায় এ কথা উল্লেখ করেছেন। জরথুস্ত্রের অনুসারীরা বলেন, ‘আহুর মাজদার ১৬টি পবিত্র ভূমির একটি এই বলখ।’
জরথুস্ত্র ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা, আধ্যাত্মিক পুরুষ জরথুস্ত্র এ বলখেই জন্ম নিয়েছিলেন। এ মাটিতে, এ আকাশের নিচে তিনি আহুর মাজদার বাণী প্রচার করেছেন। রাজা বিসতাসপাকে জরথুস্ত্র তার প্রথম অনুসারী করেছিলেন। এরপর জরথুস্ত্র আরো সহজে বলখ শহরে ধর্ম প্রচার শুরু করেন।
এরপর যত সময় গড়িয়েছে, বলখ ততই বিকশিত হয়েছে—বিভিন্ন পণ্যের মতো নানা ধর্মীয়, দার্শনিক মতও এখানে মুক্তভাবে মিথষ্ক্রিয়া করেছে। এ শহরেই জরথুস্ত্র সম্প্রদায়ের পুরোহিত বিতর্ক করেছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে। আবার এখানে একসময় বিকশিত হয়েছে ইসলামী অধ্যাত্মবাদ।
বলখের স্মৃতিতে জমে আছে আলেকজান্ডারের নাম। এখনো শহরের কোনো চায়ের দোকানে বৃদ্ধরা স্মরণ করেন সে মহাবীরকে—তার নাকি খুব পছন্দ হয়েছিল বলখ শহর। ৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বলখ পরিচিত ছিল বাকট্রা নামে। এটা ছিল পারসিয়ান আকামেনিড সাম্রাজ্যের শক্ত ঘাঁটি শহর। তৃতীয় দারিয়ুসকে পরাজিত করে তাকে পুব দিকে ঠেলে দিয়ে আলেকজান্ডার বাকট্রিয়ার দিকে সেনাদলকে পরিচালিত করেন। তাকে প্রতিরোধ করার কোনো ক্ষমতা বলখের ছিল না। এ শহরেই তার সঙ্গে দেখা হয় রোক্সানার, বলখের এক অভিজাতের কন্যা। রোক্সানার সৌন্দর্যে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। সাক্ষাতের পর দ্রুতই তাকে বিয়ে করেন তিনি।
পারস্য সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য আয়োজন নওরোজের জন্মস্থানের একটি এ বলখ শহর। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নওরোজ পালনের ইতিহাস অন্তত তিন হাজার বছরের পুরনো। এ শহর প্রাচীন বাণিজ্য পথ সিল্ক রোডের গাঘেঁষেই অবস্থিত। তাই যুগে যুগে বণিকদের কাফেলার সঙ্গে এসেছে ধর্মীয় সাধু পুরুষরাও। সে সূত্রেই একদিন বলখের মাটিতে পা রাখেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। একসময় বৌদ্ধ মন্দির, স্তূপ নির্মিত হতে থাকে এ শহরে। বলখের সঙ্গে জরথুস্ত্র যেমন জড়িয়ে আছেন, তেমনি এখানে আছে বৌদ্ধ ধর্মেরও ইতিহাস, নিদর্শন। বুদ্ধের দুই প্রাথমিক শিষ্য ত্রাপুষ ও বাহলিকা (বা ভাল্লিকা) ছিলেন এ বলখের বণিক। কথিত আছে, বুদ্ধ বোধিপ্রাপ্তির পর এ দুজন তাকে খাবার সেধেছিলেন আর বুদ্ধ বিনিময়ে তার আটটি চুল তাদের দিয়েছিলেন। তারা বলখে ফিরে বুদ্ধের নির্দেশমতো স্তূপ তৈরি করেন।

বলখের বৌদ্ধ স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ছবি: রামারিয়া ডটকম
পঞ্চদশ শতাব্দীতে চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এ অঞ্চল সফর করেন। বলখ ও সংলগ্ন অঞ্চলে তিনি হীনযান বৌদ্ধ ধর্মকে প্রভাবশালী হিসেবে দেখতে পান। আরেক বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বলখ সফর করেন ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে। তিনিও এ শহরকে হীনযান বৌদ্ধ ধর্মের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে পান। তিনি শহরে ও সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১০০টি ধর্মীয় আশ্রম দেখেছিলেন। আরো দেখেছেন তিন হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু, অনেক স্তূপ ও ধর্মীয় স্থাপনা। হিউয়েন সাং জানান, এ শহরের হুনগোত্রীয় শাসকরা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। এখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষাদানের অনেক কেন্দ্র ছিল। সিল্কের কাপড় আর অলংকারে মোড়ানো অনেক বুদ্ধের মূর্তি ছিল বলখে। এটি ছিল স্থানীয় জরথুস্ত্র ঐতিহ্যের প্রভাব। বলখের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল মধ্য এশিয়ার আরেকটি বৌদ্ধ রাজ্য খোটানের সঙ্গে। হিউয়েন সাং নববিহারের কাছে আরেকটি বৌদ্ধ মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে হীনযান ধ্যান বিপশ্যনা চর্চা হতো।
অষ্টম শতাব্দীতে কোরীয় সন্ন্যাসী ও পরিব্রাজক হাইকিও তার সফরবৃত্তান্তে জানিয়েছেন, আরবদের আগমনের পরও তখন সেখানকার অধিবাসীরা বৌদ্ধ রাজা ও ধর্মকে অনুসরণ করছেন। অবশ্য তখন বৌদ্ধ রাজা বাদাকশানে আশ্রয় নিয়েছেন। এ শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির ছিল নববিহার। এখানে গৌতম বুদ্ধের বিরাটাকার একটি মূর্তি ছিল। বাইরের শাসক কিংবা রাজনৈতিক নেতারা এ শহরে এলে বুদ্ধের এ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাতেন।
কুশান আমলে নির্মিত এ নববিহার শিগগিরই সমগ্র মধ্য এশিয়ায় উচ্চতর বৌদ্ধ অধ্যয়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এটিকে অনেকে তুলনা করেন উত্তর ভারতের নালন্দা মঠের মতো। এখানে বৈভাষিক অভিধর্ম অধ্যয়নের ওপর জোর দেয়া হতো। শুধু সেসব ভিক্ষুদের প্রবেশাধিকার দেয়া হতো, যারা এরই মধ্যে এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এ বিহারে বুদ্ধের একটি দাঁতের নিদর্শন ছিল, তাই এটি চীন থেকে ভারতে রেশম পথ বরাবর বৌদ্ধদের তীর্থযাত্রার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল।
আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুরের পৃষ্ঠপোষকতায় তার কর্মকর্তা খালিদ চিকিৎসা ও ওষুধসংক্রান্ত অনেক সংস্কৃত রচনা আরবিতে অনুবাদ করেন। এ খালিদ ছিলেন বলখের এক বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান ভিক্ষুর পুত্র।
বলখের মাটি জরথুস্ত্রকে জন্ম দিয়েছে। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা করেছেন বুদ্ধের দুই প্রধান শিষ্য। পরে ইসলামের সুফি ধারার অধ্যাত্মবাদ সিক্ত হয়েছে এ শহরের বাতাস। এ শহরের স্মৃতি জীবন্ত হয়ে আছে রুমির কবিতা, ইবনে সিনার জ্ঞান কিংবা শাহনামার পঙক্তিতে। আরো কত কবি, বিজ্ঞানী, দার্শনিক বড় হয়েছেন এ শহরের আলো-বাতাসে; যাদের কথা আমরা জানলেও চিনি না বলখের সে প্রাচীন রাস্তাগুলো।
এসএম রশিদ: লেখক

ত্রাপুষ ও বাহলিকা বুদ্ধের উদ্দেশে নিবেদন জানাচ্ছেন








