ভালোবাসা এমন এক অমর অগ্নিশিখা, যা মৃত্যুর শীতল ছোঁয়াতেও নিভে যায় না—বরং আরো দীপ্তি পায়। এ এমন সংগীত, যার সুর মৃত্যুর নিস্তব্ধতাকেও ছেদ করে বেজে যায় চিরকাল। জীবন নয়, মৃত্যুই তাকে চিরস্থায়ী করে রাখে হৃদয়ের গহিনে। মৃত্যুতে দেহ বিলীন হলেও প্রেম মুছে যায় না, সে যাত্রার শেষ নেই, কেবল রূপান্তর ঘটে, স্মৃতিতে, ব্যথায়, কবিতায়।
বলছি রাবিয়া বলখির কথা। যাকে ইসলামের স্বর্ণযুগের বিখ্যাত কবিদের একজন হিসেবে ধরা হয়। ইতিহাস তাকে ফার্সি ভাষায় প্রথম নারী কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কবি রাবিয়ার পিতা বলখের দরবারে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সেই রাজদরবারেই তিনি তার ভাইয়ের তুর্কি দাস বক্তাশের প্রেমে পড়েন। বক্তাশকে উদ্দেশ্য করে লিখতেন কবিতা । কিন্তু তাদের এ প্রেম ভাইয়ের অনুমোদন পায়নি। রাবিয়াকে এক স্নানগৃহে (হাম্মাম) এবং বক্তাশকে একটি কূপে নিক্ষেপ করা হয়।
হাম্মামে রাবিয়া তার নিজের কবজি কেটে ফেলেন এবং রক্ত দিয়ে প্রেমের শেষ কবিতাগুলো প্রাচীরে লিখতে লিখতেই মৃত্যুবরণ করেন। বিখ্যাত কত আধুনিক কবির জীবনের ট্র্যাজেডি আমার জানি, আর রাবিয়া হাজার বছর আগেই প্রেম আর কবিতার সব ট্রাজেডিকে নিজের জীবন দিয়ে লিখে আমাদের জন্য রেখে গেছেন।

মধ্য এশিয়ায় রাবিয়া বলখির ভাস্কর্য ছবি: আজাম মিডিয়া কালেকটিভ
ধারণা করা হয়, তার দৃষ্টিতে বক্তাশ ছিলেন সে মাধ্যম, যার মাধ্যমে রাবিয়া ঈশ্বরের সান্নিধ্যে পৌঁছতে পেরেছিলেন। এখানে স্মরণ করা যায় রুশ সাহিত্যিক দস্তয়েভস্কিকে, যার ভাষায়, যেখানে প্রেম আছে সেখানেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকে।
রাবিয়ার জন্মস্থান বলখ, যা বর্তমান উত্তর আফগানিস্তানের একটি অংশ। রাবিয়া আফগান কল্পলোকের অন্যতম শ্রদ্ধেয় নারী চরিত্র। তাকে কখনো উপস্থাপন করা হয় এক নারীবাদী প্রতীক হিসেবে, যিনি ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্ভীক সত্য বলেছিলেন; কখনো তাকে দেখা হয় পবিত্র প্রেমের শহীদ হিসেবে; আবার কখনো পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সম্মানের বলি হিসেবে।
আজও আফগানরা তাদের কন্যাসন্তানের নাম রাখেন রাবিয়ার নামে, এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—বিদ্যালয় থেকে শুরু করে হাসপাতাল—তার নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়। তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক। থিয়েটার মঞ্চস্থ ও চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তার জীবনকাহিনী আফগান জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঐতিহাসিক মহাকাব্যধর্মী চলচ্চিত্র হলো রাবিয়া বলখি (১৯৭৪)।
মৃত্যুর এক হাজার বছরের বেশি সময় পর রাবিয়া আজও আফগান সংস্কৃতির কল্পনালোক ও কাব্য চেতনায় শক্তিশালীভাবে হাজির। তার গল্প ও কবিতার ছায়া পাওয়া যায় ফার্সি সাহিত্যের প্রভাবশালী পুরুষ কবি ও জীবনীগ্রন্থকারদের বর্ণনায়, যা তাজকিরা নামে পরিচিত।
রাবিয়ার জীবন ও কবিতার দীর্ঘতম বর্ণনা পাওয়া যায় সুফি কবি ও সাধক জীবনীকার ফরিদউদ্দীন আত্তারের (১১৪৫-১২২১ খ্রি.) কাব্যগ্রন্থ ইলাহি নামায় (অর্থাৎ ‘দিব্য গ্রন্থ’), যেখানে তার প্রেম, আত্মত্যাগ এবং ঈশ্বরমুখী হৃদয়ের এক চিত্রময় বিবরণ তিনি তুলে ধরেছেন।
রাবিয়ার জীবনের দীর্ঘতম এ বিবরণে সুফি কবি ফরিদউদ্দীন আত্তার তাকে এক ধ্রুপদি সাধিকারূপে উপস্থাপন করেছেন, যা রাবিয়ার পরবর্তী যুগের অনেক সুফি কবিদের মধ্যেও দেখা যায়। বক্তাশের প্রতি রাবিয়ার প্রেম—এখানে এক পবিত্র ও ঐশ্বরিক প্রেম হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। বক্তাশকে দেখে রাবিয়া প্রেমের কবিতা লেখা শুরু করেন এবং তার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের প্রতি গভীর ভালোবাসার অনুভব জন্ম নেয়।
কবি আত্তার দাবি করেন, ফার্সি সুফি কবি আবু সাঈদ আবুল খায়ের (৯৬৭-১০৪৯ খ্রি.) তাকে বলেছিলেন, রাবিয়া এক সুফি সাধিকা হয়ে উঠেছিলেন এবং তার সব কবিতাই ঈশ্বরের উদ্দেশে নিবেদিত ছিল। এ প্রেম ও আত্মত্যাগের গল্পটি অনেকটা বাসরার সুফি সাধিকা রাবিয়া আল-আদাবিয়ার (৭১৪-৮০১ খ্রি.) জীবনের সঙ্গেও তুলনীয়, যিনি ইসলামী ইতিহাসে অন্যতম শ্রদ্ধেয় নারী সাধিকা হিসেবে পরিচিত, ঈশ্বর ভক্তিতে যার ছিল অবিচল আনুগত্য।
পনেরো শতকের ফার্সি সুফি লেখক ও কবি নূরউদ্দীন আবদুর রহমান জামি (১৪১৪-৯২ খ্রি.) তার সাধু কাহিনীভিত্তিক গ্রন্থ নাফাহাতুল উনসে (অর্থাৎ আন্তরিকতার বাতাস) রাবিয়ার নাম উল্লেখ করেন আরো ৩৩ জন নারী সাধিকার সঙ্গে। তিনি তাকে উপস্থাপন করেন দুখতার-এ-কা’ব রহমতুল্লাহি আলাইহা নামে (অর্থাৎ কা’বের কন্যা, আল্লাহ তার প্রতি দয়া বর্ষণ করুন)।

একাংশে জামিও উল্লেখ করেন, কা’বের কন্যা এক দাসের প্রেমে পড়েছিলেন, কিন্তু সে প্রেম দাসের উদ্দেশে ছিল না। আত্তারের ধারাবাহিকতায় তিনি লেখেন, যখন বক্তাশ রাবিয়ার সান্নিধ্যে আসেন, তখন সে রাবিয়ার জামার হাতায় হাত রাখে। তাতে রাবিয়া বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘তুমি কি এখনো বুঝলে না—এ প্রেম ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে? আমি কি তোমাকে কখনো এমন কোনো সুযোগ দিয়েছি, যাতে তুমি আমাকে ভোগ করতে পারো?’ এ বাক্যই স্মরণ করিয়ে দেয় পার্থিব প্রেম অনেকাংশে আকর্ষণ দিয়ে শুরু হলেও প্রকৃত সুফি সাধক সে আকর্ষণকে পরিণত করেন আত্মোৎসর্গে। আবার নতুন করে ভাবনার জগতে নাড়া দিয়ে যায় এই ভেবে যে প্রেম কীভাবে শুদ্ধ আধ্যাত্মিকতার রূপে রূপান্তর হয় এবং কীভাবে সে প্রেম পার্থিব আকর্ষণ বা শরীরী কামনার ঊর্ধ্বে উঠে যায়।
রাবিয়ার জীবন ও কবিতা সম্পর্কে যেসব পাঠ্যবর্ণনা রয়েছে, তার অধিকাংশই সুফি পরম্পরার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে তার অলৌকিকত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যখন কোনো কবির কবিতা মৌখিকভাবে সংরক্ষণের ধারা ভেঙে যায় বা তার দিওয়ান (কাব্যসংকলন) হারিয়ে যায়, তখন তাজকিরা বা জীবনীগ্রন্থগুলোই হয়ে ওঠে সে ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্ন ও কবিতার চরণগুলোর একমাত্র আশ্রয়স্থল।
রাবিয়া ফার্সি ও আরবি—দুই ভাষায়ই কবিতা লিখতেন। তার কবিতা ফার্সি কবিতার পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাক-ইসলামী যুগের রাজা ও ধর্মের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে এবং তিনি এমনসব উপমা ও রূপক ব্যবহার করেছেন, যা পরবর্তী ফার্সি কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে।
এ কারণেই রাবিয়া ফার্সি সাহিত্য-ঐতিহ্য নির্মাণে একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। জালাল উদ দিন মুহাম্মদ বলখির (রুমি নামে সমধিক পরিচিত) জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে জন্ম নেয়া রাবিয়া, ফার্সি সাহিত্য ধারার ভিত্তি নির্মাণে বড় অবদান রেখেছেন।
আফগানরা রাবিয়ার গল্প ও কবিতা বারবার স্মরণ করেছে—বিভিন্ন উপায়ে, নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। রাবিয়াকে তার বর্ণনাকারীরা স্মরণে রেখেছেন এবং অমর করে তুলছেন। এক অর্থে আফগানিস্তানে রাবিয়ার জনপ্রিয়তা ইরানে ফেরদৌসীর জনপ্রিয়তার মতো।
অন্যদিকে রাবিয়ার বক্তাশের সঙ্গে প্রেমকাহিনীটি ফার্সি সাহিত্যের বিখ্যাত ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনীর সঙ্গে যেমন লাইলি-মজনু বা খসরু-শিরিনের মতো মিল রয়েছে, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সহজেই বলা যায় ও সংরক্ষিত হতে পারে। তবু আফগানদের কল্পনায় রাবিয়ার ভালোবাসা ও জীবনের এ একমাত্র রূপ নয়, এটি কেবল একটি সংস্করণ মাত্র। কেননা সত্যিকারের প্রেম কখনই ফুরায় না, তা কেবল রূপান্তর হয় স্মৃতিতে, ব্যথায়, কবিতায়।
জুলি বিল্লো, তার নৃবিজ্ঞান গ্রন্থ Kabul Carnival: Gender Politics in Postwar Afghanistan-এ উল্লেখ করেছেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ছাত্রীরা রাবিয়াকে খুবই শ্রদ্ধা করে। তারা রাবিয়ার সে সাহসিকতার প্রশংসা করে, যা তিনি তার আদর্শের রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছিলেন এবং মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন। বিল্লোর মতে, আত্মত্যাগ আফগান নারীদের আবেগ প্রকাশের একটি বিস্তৃত রূপ এবং এটি তাদের সাংস্কৃতিক রেওয়াজের অংশ। কাবুল ও পাঞ্জশিরের শুধু মেয়েদের স্কুলগুলো পরিদর্শন করলে দেখা যায়, সেখানকার দেয়ালে আর করিডোরে রাবিয়ার ছবি টানানো রয়েছে। তার কীর্তি তরুণ নারীদের অনুপ্রাণিত করে সমাজে বিদ্যমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং তা অতিক্রম করতে। সে কারণে রাবিয়ার জীবনে ও কবিতায় তার স্বর্গীয় বা পার্থিব ভালোবাসা, বক্তাশকে পাওয়ার জন্য তার প্রতিবাদ এবং সাহসিকতা আফগান সাংস্কৃতিক কল্পনায় হাজার বছর পরেও কেন্দ্রীয় স্থান ধরে রেখেছে।
যদিও রাবিয়ার গল্প নানা রূপে বলা হয়, আফগানিস্তানে যে সাধারণ সংস্করণটি প্রচলিত সেটি নিম্নরূপ:
এক হাজার মসজিদের পবিত্র বলখ শহরে জন্ম নেয় আমিরের কন্যা রাবিয়া। তাকে গোলাপজলে স্নান করানো হয়, রেশমে সজ্জিত করা হয় এবং স্বর্ণের গাড়িতে বহন করা হয়। তার জন্মদিন বলখবাসীর কাছে একটি শুভ উৎসবের দিন, তারা প্রার্থনা ও কবিতা পাঠ করে আনন্দ করে।
রাবিয়া প্রাসাদে বেড়ে ওঠে, যেখানে তাকে শিল্প, সাহিত্য, শিকার ও তীরন্দাজি শেখানো হয়, যতদিন না অভিজ্ঞতা তাকে প্রজ্ঞাবান করে তোলে। দেখতে সে ছিল মনোমুগ্ধকর, তার সৌন্দর্য ও কথন দিয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করত। সে যেমন চলাফেরা করত, তেমনি কথা বলত এমন মার্জিত ভঙ্গিতে যে সে বহু প্রশংসক সৃষ্টি করত। রাবিয়া যখন তার কবিতা আবৃত্তি করত, তখন তা তার সময়ের কবি ও বুদ্ধিজীবীদের বিস্মিত করত। সে শুধু তার মা-বাবার হৃদয়ই নয়, বরং বলখবাসীর হৃদয়ও জয় করেছিল; তারা তাকে ‘জাইন আল-আরব’ (আরবদের সুন্দরী), ‘ইকবাল’ (শুভলক্ষণ) এবং ‘তেলা-য়ে কাব’ (কা’বের সোনা) নামে ডাকত।
রাবিয়ার মা মারা গেলে তার কোমল হৃদয় ভেঙে পড়ে। প্রাসাদের নারীরা তাকে উপাসনার স্থানে নিয়ে যান, যেখানে বলখের মহান পণ্ডিত ও প্রজ্ঞাময় পুরুষদের উপদেশ ও কৃত্রিম বাণী তার আত্মাকে শান্তি দেয়।
এদিকে তার ভাই হারিস রাবিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা, কথাবার্তা সম্পর্কে বাবার এবং বলখবাসীর কাছে যে প্রশংসা শুনত তাতে তার প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল। যখন তাদের বাবা মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তিনি উভয়কে ডেকে পাঠান। হারিসকে বলেন যে সে তার উত্তরাধিকারী হবে এবং তাকে সৎ ও উদার হতে উপদেশ দেন, সৃষ্টির সবকিছুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে বলেন এবং রাবিয়ার যত্ন নেয়ার কথাও বলেন। সে সময় হারিস বাবাকে কথা দেয় যে বোনকে তিনি দেখে রাখবেন, কিন্তু তিনি যখন রাজা হন তখন তিনিই হয়ে ওঠেন রাবিয়ার মৃত্যুর কারণ।
কথিত আছে, একদিন রাবিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এ সময় তার চোখে পড়ে এক সুদর্শন যুবক তার ভাই হারিসকে মদ পরিবেশন করছেন। সে যুবকের নাম বক্তাশ। হারিসের তুর্কি দাস ছিলেন তিনি, যিনি আবার কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বেও ছিলেন, তিনিই রাবিয়ার হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
আর এখান থেকেই রাবিয়ার ‘প্রেমকাহিনী’ ও কবিতার শুরু, যা শেষ হয় ট্রাজেডিতে।
রাবিয়া তার বিশ্বস্ত অনুচর রানার মাধ্যমে বক্তাশের কাছে প্রেমপত্র পাঠাতে শুরু করেন। তাতে তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল নিম্নরূপে:
‘ও অদৃশ্য ও বর্তমান! কোথায় তুমি? এসো এবং আমার চোখ ও হৃদয়কে জীবনের জন্য দেখতে দাও, অথবা এ তলোয়ার নিয়ে আমার জীবন শেষ করে দাও।’
আর তিনিও একই রকম প্রেমময় ও কাব্যিক ভাষায় চিঠির উত্তর পেতে থাকেন।
যখন কান্দাহারের শাসক বলখ আক্রমণের চেষ্টা করে, তখন হারিসকে তার উপদেষ্টারা বলেন বক্তাশের সাহায্য ছাড়া তিনি শত্রুকে পরাজিত করতে পারবেন না।
তাই হারিস বক্তাশের সাহায্য চান এবং ওয়াদা করেন বিনিময়ে তিনি যা চাইবেন তাই পুরস্কার দেবেন। বক্তাশ এতে সফল হন কিন্তু তার জীবন সংকটের মধ্যে পড়ে। তিনি যখন যুদ্ধে প্রায় মারা যাচ্ছিলেন সে সময় এক সৈন্য মুখ ঢেকে তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসে। সে সৈন্যটি ছিলেন রাবিয়া।
হারিস যখন তাদের এ ভালোবাসার কথা জেনে যান, স্বাভাবিকভাবেই তিনি তার বোনের সঙ্গে এ সম্পর্ক মেনে নিতে পারছিলেন না। কেননা সে তারই দেহরক্ষী আর যে কিনা আবার একজন ক্রীতদাসও। প্রথমে তিনি বোনকে এ ব্যাপারে সংযত হতে বললেন। কিন্তু রাবেয়া কিছুতেই তা মানতে রাজি হলেন না। অতঃপর হারিসের মাঝে চিরন্তন আফগান শৌর্য জেগে উঠল। তিনি রাবিয়া ও তার প্রেমিক দুজনকেই বন্দি করে রাবিয়াকে একটা হামামখানায় এবং বক্তাশকে একটা শুকনো কূপে নিক্ষেপ করলেন,–যেখান থেকে কারও সাহায্য ছাড়া উঠে আসা সম্ভব ছিল না।
কারো কারো বর্ণনায় পাওয়া যায় হারিস তার বোন রাবিয়ার হাতের শিরা কাটার আদেশ দেন, কিন্তু আবার অনেকে বলে থাকেন রাবিয়া নিজেই তার কবজির শিরা কেটে ফেলেন।
তবে সবাই এ ব্যাপারে একমত যে রাবিয়া তার শেষ কবিতাটি নিজের রক্ত দিয়েই রাজকীয় এ গোসলখানার দেয়ালে লিখে যান।
আমি তোমার ভালোবাসায় বন্দি, আর এ থেকে কোনো মুক্তি নেই—
ভালোবাসা এক অনন্ত সাগর, যেখানে কোনো বুদ্ধিমান লোক সাঁতার কাটার চিন্তাও করে না।
যদি তুমি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসতে চাও, তাহলে যেটা অগ্রহণযোগ্য সেটাও গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকো।
হাসিমুখে প্রতিকূল অবস্থাকে স্বাগত জানাও, মধু মনে করে বিষ পান করে নাও।
এ চরণগুলো থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, ভালোবাসা কখনই একা আসে না, সঙ্গে করে নিয়ে আসে সাহস, ত্যাগ আর এক ধরনের পাগলামি, যা রাবেয়ার ভালোবাসার ক্ষেত্রেও ঘটেছে।
কিছুদিন পর রানার সহায়তায় বক্তাশ কূপ থেকে বের হয়ে আসতে সমর্থ হন এবং হারিসকে হত্যা করেন। তার পরই তিনি দেখতে পান স্নানঘরের শীতল পাথরে পড়ে আছে রাবিয়ার নিথর রক্তমাখা শরীর। দেয়ালের গায়ে রক্তলিপিতে লেখা রয়েছে তার শেষ প্রেম পঙক্তি।
এসব দেখে বক্তাশ নিজেও রাবিয়ার মরদেহের পাশে নত হয়ে পড়ে যান, তখন যেন সব যন্ত্রণা, সব যুদ্ধ, সব ভালোবাসার ভার তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিস্তব্ধ হয়ে আসে চারপাশ, নিঃশব্দে মৃত্যু আলিঙ্গন করে নেয় তাকে, মুহূর্তেই...।
পিওনা আফরোজ: কথাসাহিত্যিক









