আমাকে দেখো। যতদিন আমি আমাদের পবিত্র পূর্বসূরিদের পথে আছি, আমাকে অনুসরণ করো। আমি তাদের পথ থেকে বিচ্যুত হলে তোমরাও আমাকে ছেড়ে যেয়ো। পূর্বসূরিরা আমাদের চেয়ে ভালো মানুষ ছিলেন, কারণ তারা রাসুলের সময়ের বেশি কাছে জীবিত ছিলেন।
মাওলানা আবদুল রাজ্জাক এভাবেই বলেছিলেন ফিরিঙ্গি মহল পরিবারকে। তিনি তাদের বলেছিলেন নিখুঁত ও ভালো জীবনযাপনের জন্য তাকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে। এটাকে তিনি তাদের কোড অব কনডাক্ট বা পারিবারিক আদব হিসেবে তুলে ধরেন। শুধু আবদুল রাজ্জাকই নন, ফিরিঙ্গি মহলের আরো অনেক বিদ্বান বুজুর্গ এমন পারিবারিক আদবকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফিরিঙ্গি মহল পরিবারকে অনেক ইতিহাসবিদ অন্তত ৩০০ বছরের জন্য ভারতের সবচেয়ে বিদ্বান মুসলিম পরিবার হিসেবে বিবেচনা করেন। তারা তাদের পূর্বপুরুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন হেরাতের বিখ্যাত পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক পুরুষ খাজা আবদুল্লাহ আনসারিকে। পরিবারটি যখন প্রথম ভারতের মাটিতে পা রেখেছিল তখন তারা নিজেরা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। পরিবারের একজন সদস্য তাদের সুলুকসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছেন চতুর্দশ শতাব্দীতে একজন আলা আদ-দীন অওধের সিহালিতে থিতু হন। তার বংশধর মোল্লা হাফিজকে সম্রাট আকবর একজন বিশিষ্ট আলেম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। আকবর তাকে ১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দে বেশ মোটা অংকের অনুদান দিয়েছিলেন। ১৬৯২ সালে জমি নিয়ে বিরোধে খুন হন মোল্লা হাফিজের বংশধর মোল্লা কুতুব-উদ-দীন। কুতুব সে সময়ের অন্যতম আলেম হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তার গ্রন্থাগারটি পুড়িয়ে দেয়া হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেব কুতুবের চার পুত্রকে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ লক্ষ্ণৌতে এক ইউরোপীয় বণিকের বাড়ি উপহার দেন। এছাড়া তাদের জন্য শিক্ষাবৃত্তিরও ব্যবস্থা করা হয়। আনুমানিক ১৬৯৫ সালে পরিবারটি সিহালি থেকে বর্তমান ফিরিঙ্গি মহলে চলে আসে।
মূলত কুতুব-উদ-দীনের বংশধররা ফিরিঙ্গি মহলকে একটি জ্ঞান চর্চাকেন্দ্রে পরিণত করেন। এটি এত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে শুধু ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত নয়, আরব ও চীন থেকেও পণ্ডিতরা এখানে আসতেন। ফিরিঙ্গি মহলিদের বেশির ভাগের পেশা ছিল শিক্ষকতা। এদের মধ্যে প্রথম বিখ্যাত শিক্ষক ছিলেন নিজাম-উদ-দীন। তিনি ছিলেন কুতুব-আদ-দীনের তৃতীয় সন্তান। আঠারো শতকের শুরুর দিকে নিজাম ফিরিঙ্গি মহলকে ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত করেন। লক্ষ্ণৌর বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ার জন্য পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। আবার অনেক শহরের তিলা মসজিদে উঠতেন, এখানে ৭০০ ছাত্রের বসবাসের সুযোগ ছিল। এ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যয়ের একটি অংশ বহন করতে মোগল প্রশাসন। তবে তখনো ফিরিঙ্গি মহলে কোনো মাদ্রাসা ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো কেন্দ্রীয় কাঠামোও ছিল না। পরিবারের সদস্যরা তাদের কাছে যারাই শিখতে চাইতেন তাদের ঘরে বসে পড়াতেন। এ ছিল সরল রীতি। ১৯০৫ সালে ফিরিঙ্গি মহলি আবদুল বারী তার আত্মীয়দের শিক্ষাদানের পুরো প্রক্রিয়াটিকে সমন্বয় করে একটি মাদ্রাসার কাঠামো তৈরি করেন। ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত মাদ্রাসাটি আলিয়া নিজামিয়া নামে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল।
ফিরিঙ্গি মহল পরিবারের সদস্যদের মূল কর্মস্থল হলেও অনেক সদস্য শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন। আবদ আবদুল বারী ও আবদুল বাকি মদিনায় শিক্ষাদান করেছেন। অন্যরা ভারতের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসা স্থাপন করেছেন। এনাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মোল্লা হাসান (মৃ. ১৭৯৪-৯৫), তিনি যুক্তিবিদ্যার পণ্ডিত হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তার প্রভাব রামপুর এলাকায় এমন গভীর ছিল যে সে সুবাদে ফিরিঙ্গি মহলি শিক্ষকরা পরবর্তী ২০০ বছর ধরে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছেন। পরিবারের আরেকজন সফল শিক্ষক ছিলেন মালিক আল-উলামা মোল্লা হায়দার (মৃ. ১৮৪০-৪১)। তিনি হায়দরাবাদে পরিবারের একটি কেন্দ্র গড়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে তখনকার সময়ে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাজ্যে ফিরিঙ্গি মহলিদের পদচিহ্ন পড়ে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন আবদ আল-আলি বাহার আল-উলুম। ১৮১০-১১ সালে মৃত্যুর ৬০ বছর আগে লক্ষ্ণৌ, শাহজাহানপুর, রামপুর, বুহার ও শেষমেশ মাদ্রাজ শহরে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি তার শিক্ষাদান ও মাদ্রাসার মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার নবজাগরণ সৃষ্টি করেন।
ফিরিঙ্গি মহলিরা লক্ষ্ণৌ বা যেখানেই গেছেন সেখানেই দারস-এ-নিজামী পাঠ্যক্রমকে সঙ্গে রেখেছেন। ভারতের মাদ্রাসা শিক্ষার বড় ভিত্তি এ পাঠ্যক্রম। এটি তৈরি করেছিলেন মোল্লা নিজাম-উদ-দীন। তিনি সব বিষয়ের গভীর ও বিস্তৃত বইগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে চেয়েছেন। যার মাধ্যমে ছাত্ররা গভীরভাবে চিন্তা এবং ১৬ বা ১৭ বছরের বছর বয়সে তাদের শিক্ষা সমাপ্ত করতে সমর্থ হয়।
ফিরিঙ্গি মহলিদের অনেকে প্রচুর লিখেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মোল্লা মুবিন (মৃ. ১৮১০-১১) এবং আবদুল বারী (মৃ. ১৯২৫-২৬)। শেষের জন ১১১টি গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্যই তাদের বেশির ভাগ রচনা তাদের শিক্ষা দেয়া বিষয়গুলোরই নিজস্ব রূপ। অনেকে অবশ্য অধ্যাত্মবাদ ও কাব্যচর্চাও করেছেন।
এখানেই শেষ না। তাদের থেকে জীবনীগ্রন্থও এসেছে। এর মধ্যে আছে সিবগাত আল্লাহ শহীদের ‘সদর আল-মুদাসসিরিন’। ওয়ালিউল্লাহ কোরআনের তাফসির করেছেন সাত খণ্ডে। এর নাম ‘আদব আল-সালাতিন’। এছাড়া যুক্তিবিদ্যার ওপর মোল্লা হাসানের লেখাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০০ বছর তার লেখা জনপ্রিয় ছিল। বইটি পড়ানো হতো দারস-এ-নিজামী ও বাহার-উল-উলুম ঘরানায়। এর সঙ্গে মাওলানা রুমির মসনবিও পড়নো হতো। মোল্লা নিজাম-উদ-দীনের বন্ধু ও পীর ছিলেন বানসার সৈয়দ আবদুর রাজ্জাক। তার ‘মানাকিব-ই-রাজ্জাকিয়া’ও গুরুত্ব বহন করে।

মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গি মহলি ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
আরেকজন ইসলামী পণ্ডিতের লেখা নিয়ে কথা না বললেই নয়। আবদুল হাই লিখেছিলেন ‘আল-সিইয়া ফি কাশ ফি সারহ উল-ওয়াকিয়া’। এ বইয়ের পাশাপাশি ‘আল-তালিক আল-মুমাজ্জাদ’ ও ‘জাফর আল-আমানী’ তাকে তৎকালীন সেরা পণ্ডিতদের একজন হিসেবে জায়গা করে দিয়েছিল। তার ‘ফতোয়া’র পাশাপাশি এ বইগুলো দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরের মুসলিমদের মধ্যেও জনপ্রিয়। তার বইয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে লক্ষ্ণৌকে আবদুল হাইয়ের শহর বলেও অনেকে চেনে।
ফিরিঙ্গি মহলিরা কেবল পণ্ডিতই ছিলেন না। তারা আধ্যাত্মিকও ছিলেন। তারা কেবল নিজেরা অধ্যাত্মচর্চা করতেন না। সেই সঙ্গে সুফিদের মাজার দর্শন, সেখানে নানা আয়োজন, বিশেষত ওরস পালন করতেন। বানসায় আবদুল হাইয়ের মাজারেও অনেকে যান এখনো। অবশ্য সে কবরটি মাজার নয়। সাধারণ একটি কবর। ফিরিঙ্গি মহলের মানুষকে (বলা ভালো, এ পণ্ডিত ও অধাত্মবাদীদের) মাজার দুভাবে বিন্যস্ত। একদিকে লক্ষ্ণৌ মাওলানা নিজাম-উদ-দীনের চারপাশ ঘিরে অন্যদের কবর। এ জায়গায় মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই যান। অন্যটি মাওলানা আনোয়ার উল-হকের মাজারের কাছাকাছি অন্যান্য ফিরিঙ্গি মহলিদের কবর। জায়গাটিতে নিয়মিত কাওয়ালির আয়োজন ও ওরস পালন করা হয়। সৈয়দ আবদুল রাজ্জাকও এ আলাপে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কাদেরিয়া তরিকার একজন সাধক ছিলেন। প্রায় সব ফিরিঙ্গি মহলিই তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বিষয়টা অধাত্মবাদের ক্ষেত্রে।
বিশ শতকে ফিরিঙ্গি মহলি অধ্যাত্মবাদীরা ভারতের সাধকদের মধ্যে জনপ্রিয় ও পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারতের বেশির ভাগ প্রধান মাজারের সঙ্গেই তারা নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। তারা মাদ্রাসা-ই আলিয়া নিজামিয়ার বহু ছাত্রদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। এ কারণেই তারা ভারতের একটা বড় অংশের মানুষের কাছে সম্মানিত। এ পরিবারের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন আবদুল বারী। ভারতের সমাজে তিনি দারুণ জনপ্রিয়। তবে যতটা না অধ্যাত্মবাদী, তিনি তার চেয়ে বেশি ছিলেন একজন রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী। মাওলানা আবদুল বারী রীতিমতো মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীও তার অনুসারী ছিলেন। অধ্যাত্মবাদের ক্ষেত্রেও তিনি অবদান রেখেছিলেন। ১৯১৬ সালে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর দরগায় ‘বাজম-এ-সুফিয়ানা-এ-হিন্দ’ আয়োজনের মাধ্যমে ভারতের অধ্যাত্মবাদে নতুন চর্চা শুরু হয়েছিল।
ফিরিঙ্গি মহলের প্রায় সব পুরুষই শিক্ষিত ছিলেন। সেই সঙ্গে তারা ধার্মিক জীবনযাপন করতেন। কেউ অবশ্য কিছুটা আলাদাও ছিলেন। তবে এ পরিবারের বেশির ভাগ পুরুষই আওয়াধ, ভোপাল ও হায়দরাবাদ স্টেটের চাকরি করতেন। এ প্রতিটি স্টেটেই আসলে উত্তর ভারতের বহু আশরাফ ব্যক্তি চাকরি করতেন। স্বল্পসংখ্যক সদস্য ব্রিটিশ সরকারের হয়েও কাজ করেছেন। পরিবারের একটি অংশের অবশ্য এতে আপত্তি ছিল। বাকিরা হেকিমি (চিকিৎসা), সংবাদপত্র সম্পাদনা, ছোটখাটো জমিদারি পরিচলনা করতেন। দুজন এমনিক সেনাদলেও যোগ দিয়েছিলেন। তবে ১৯০০ সাল পর্যন্ত মাওলানা কুতুব-উদ-দীনের ২৪৬ জন পুরুষ উত্তরসূরির মধ্যে ১৫০ জনই ধর্ম পালন ও ধর্ম প্রচারে নিজেদের নিবেদন করেছিলেন।
১৮৭০ সাল থেকে এ পরিবারে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তারা জনমানুষের মধ্যে ইসলামকে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৮৭৮ সালে তাদের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠা হয় মজলিস মুইদ উল ইসলাম। এ সংঘের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অর্থ সংগ্রহ করে তুরস্ককে দেয়া যেন তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারে। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠা হয় আঞ্জুমান-ই খুদাম-ই কাবা। এ সংঘের কাজ ছিল ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনার নিরাপত্ত বিধান। প্রতিষ্ঠার পর পরই তারা কানপুর মসজিদ সংরক্ষণে নিজেদের নিবেদন করেন।
এ পরিবারের সবচেয়ে বড় কাজ বা অবদান ছিল খেলাফত আন্দোলন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খেলাফত আন্দোলন শুরু হয়। ১৯১৮ সালে মূলত ফিরিঙ্গি মহলিদের হাত ধরেই খেলাফত আন্দোলন শুরু হয়। তাদের চেষ্টায় বসেছিল অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সেশন। পরের বছর মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গি মহলির চেষ্টায় মহাত্মা গান্ধী গিয়েছিলেন ফিরিঙ্গি মহলে। ১৯২০ সাল থেকে খেলাফত ও অসহযোগ একসঙ্গে চলতে শুরু করে। এভাবেই একটু একটু করে ফিরিঙ্গি মহল ও তার অধিবাসীরা নিজেদের প্রাসঙ্গিক করেছিল ভারতীয় রাজনীতিতে।
ফ্রান্সিস রবিনসনের The Ulama of Farangi Mahall and Islamic Culture in South Asis বইয়ের ‘The Ulama of Farangi Mahall and Their Adab’ অধ্যায়ের ভাবানুবাদ







