লক্ষ্ণৌ শহরের বুকে, নবাবি গন্ধমাখা বাতাসে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল ইউরোপীয়দের এক প্রাসাদ। কালের আবর্তে সে প্রাসাদ রূপ নেয় জ্ঞানের বাতিঘরে। পরিচিত হয় ‘ফিরিঙ্গি মহল’ নামে। ইতিহাসে প্রাসাদ বলে যা কিছু দেখা যায় তা বিলাসের পরিচায়ক, ক্ষমতার ইমারত। কিন্তু এ মহল হয়ে উঠেছে ‘ইলম’ ও ‘হিকমতের’ বাতিঘর। ফিরিঙ্গি মহল কেবল একটি ভবন নয়, বরং ছিল এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্র। এখানে শুধু ধর্ম নয়, সমাজ-সংস্কৃতি, এমনকি রাজনীতিও নির্মিত হয়েছে নীরবে, কখনো সরবে।

ফিরিঙ্গি মহলের অবস্থান লক্ষ্ণৌর চওক এলাকায়। এর ‘ফিরিঙ্গি’ নামটি এসেছে ফরাসি বণিকদের সূত্র ধরে। অবশ্য নামের কারণে অনেকে এখনো এটিকে ব্রিটিশদের নির্মিত প্রাসাদ ভেবে ভুল করেন। কিন্তু ইতিহাস বলে ফিরিঙ্গি মহলের সঙ্গে ব্রিটিশদের কোনো যোগাযোগ নেই।

মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ভবনটি একজন ফরাসি বণিকের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার হতো। পরবর্তী সময়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৯০ সালের দিকে মাওলানা কুতুব-উদ-দীন নামে একজন বিখ্যাত আলেমের পরিবারকে ফিরিঙ্গি মহল উপহার দেন। তখন কোনো এক বিরোধে নিজের জন্মস্থানে মাওলানা কুতুব-উদ-দীনের মৃত্যু হয়। এর পরই তার সন্তানদের বিশাল বাড়িটি উপহার দেন সম্রাট। তবে তখনকার এক সংবাদ মতে, মূল মালিকানার জন্য বিবাদে নাম জড়িয়ে পড়ায় আওরঙ্গজেব এ পুরনো ভবনটি তাদের উপহার দিয়েছিলেন। মাওলানা কুতুব-উদ-দীনের সন্তানদের হাত ধরেই ফিরিঙ্গি মহলের ইতিহাসের নব-অধ্যায় সূচিত হয়।

১৭০১ সালে মাওলানা নিজাম-উদ-দীন ফিরিঙ্গি মহলে ‘দারুল উলুম নিজামিয়া’ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেই ৫০ বছর ছাত্রদের পড়িয়েছেন তিনি। প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী ২০০ বছরে ফিরিঙ্গি মহল হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিদ্যাপীঠ।

নিজাম প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা কেন্দ্র থেকে যুগে যুগে অসংখ্য ইসলামী পণ্ডিতের উত্থান ঘটেছে। মাওলানা নিজাম-উদ-দীন নিজেও ছিলেন বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত। তিনি ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। ‘দারুল উলুম নিজামিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেই তিনি ‘দারস-ই-নিজামী’ পাঠ্যক্রম রচনা করেন। এটি ছিল এক অনন্য পাঠরীতি। এতে গণিত, হাদিস, ফিকহ বা ইসলামী আইন, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, ব্যাকরণসহ নানা বিদ্যা-শাখা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ আর অন্য আলেমরা এ পাঠ্যক্রমের আরো সংস্কার করেন। ফলাফল প্রতিষ্ঠার ৩০০ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার অসংখ্য মাদ্রাসার মূলধারার পাঠ্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে ‘দারস-ই-নিজামী’।

ফিরিঙ্গি মহলের আলেমরা শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি—তারা রচনা করেছেন শত শত গ্রন্থ, বিস্তৃত করেছেন জ্ঞানের দিগন্ত। তারা আরবি, ফারসি ভাষায় অসংখ্য বই লেখেন যা পুরো মুসলিম বিশ্বে তখন পড়ানো হতো এবং এখনো পড়ানো হয়। মাওলানা আব্দুল হাই নামে এক ইসলামী পণ্ডিত ফিরিঙ্গি মহল থেকেই প্রায় ১০০টি বই লিখেছেন। এর মধ্যে আবার ৫০টিই ‘ফিকহ’ বা ইসলামী আইনের ওপর লেখা। ‘ফিরিঙ্গি মহলি’ উপাধিধারী ইসলামী পণ্ডিতদের রচনাবলি আজও সমাদৃত মুসলিম জগতে।

শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি ফিরিঙ্গি মহল ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনেরও আঁতুড়ঘর। এছাড়া ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনেও সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল ফিরিঙ্গি মহলের। ১৯১৯ সালে ফিরিঙ্গি মহলের মাওলানা আবদুল বারী ‘অল ইন্ডিয়া সম্মেলন’ আয়োজন করেন। এর ফলস্বরূপ সমগ্র ভারতীয় কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। আবদুল বারী তখন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে গণতন্ত্র ও খিলাফত সংগ্রামকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। একই বছর মার্চে যখন মহাত্মা গান্ধী ফিরিঙ্গি মহলে প্রথমবারের মতো আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, ছয় মাসের মধ্যে আবদুল বারী তাকে খিলাফত আন্দোলনে সম্মিলিত করেন। আবদুল বারী ও ফিরিঙ্গি মহলের অন্য সদস্যরা অল ইন্ডিয়া কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির সংবিধান প্রস্তুত করেন এবং ১৯২০ সালের এলাহাবাদ সম্মেলনে গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস প্রতিবাদের নীতিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তীকালে তারা কলকাতা কংগ্রেসে মুসলমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন এবং অখিল ভারত শান্তি সংগ্রামের প্রেক্ষিত গড়ে তোলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে এ ধরনের অবদানের কারণে মহাত্মা গান্ধীর কর্মসূচিতে ফিরিঙ্গি মহলের গুরুত্ব ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।

এখন অতীত হলেও ফিরিঙ্গি মহল ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। আওয়াধের (অধুনা লক্ষ্ণৌ) শিয়া নবাবরা ফিরিঙ্গি মহলের আলেমদের অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং তাদের মধ্য থেকে কাজি ও মুয়াফি নিয়োগ দিতেন। অনেক শিয়া তরুণ ফিরিঙ্গি মহলে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। কারণ এখানে দ্বন্দ্বমূলক মতামত থেকে মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হতো। ফিরিঙ্গি মহলের পণ্ডিতরা ওই যুগের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রচারক ছিলেন। ছিলেন অহিংস আন্দোলনের পক্ষেও। এই ঢঙেই ফিরিঙ্গি মহল লক্ষ্ণৌর ‘গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতি’র অংশ হয়ে উঠেছিল এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই ঐক্যবদ্ধ থাকার একটি ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিল।

ব্রিটিশ শাসনামলের শেষের দিকে ভাষা-শিক্ষার পরিবর্তনের ফলে ক্রমশ ফিরিঙ্গি মহলের আভিজাত্য নিম্নগামী হয়। সময়ের প্রবাহে, ভাষা-রাজনীতির পরিবর্তনে এবং ধর্মীয় বিভেদের উত্তাপে ফিরিঙ্গি মহল হারাতে থাকে তার আভিজাত্য। ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এসে মুসলিম সমাজে আরবি-ফারসি শিক্ষার আধিক্য কমে যাওয়ায় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবক্ষয়ের পথে চলে যায়। সেই সঙ্গে একসময় ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠা ফিরিঙ্গি মহলেও বাড়তে থাকে শিয়া-সুন্নি বিরোধ। তাই কালের বিবর্তনে জৌলুস হারিয়েছে ফিরঙ্গি মহল। বর্তমানে এর অনেক ঐতিহাসিক অংশ বিক্রি হয়ে গেছে এবং প্রাথমিক চিরাচরিত স্থাপনার মাত্র একাংশই রয়ে গেছে। ফলে এখানকার পাঠদান ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে এবং অনেক সম্ভাব্য শিক্ষার্থীই অন্য আধুনিক মাদ্রাসায় চলে গেছে। এছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সংকটও এর পতনে ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমানে ফিরিঙ্গি মহলের দায়িত্বে আছেন ইমাম খালিদ রশীদ। ২০০১ সালে তার বাবার নির্মিত ঈদগাহে এখনকার ফিরিঙ্গি মহল স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেখানে ‘ইসলামিক সেন্টার অব ইন্ডিয়া’ নামে একটি এনজিও, ‘দারুল উলুম ফিরিঙ্গি মহল’ নামে একটি মাদ্রাসা, একটি দারুল ইফতা (যেখান থেকে ফতোয়া জারি হয়) ও একটি দারুল কজা (যেখানে ইসলামিক বিচার হয়) রয়েছে। ফিরিঙ্গি মহলের ঐতিহ্য ও শিক্ষা সচল রাখতে মাওলানা খালিদ রশিদ ফিরিঙ্গি মহলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

মাওলানা রশিদ ইসলামী সেন্টার অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগে আদর্শ পাঠদান চালু করেছেন। এতে ‘দারুল উলুম নিজামিয়া’ পুনঃসংগঠিত হয়েছে। আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানে ইংরেজি ও কম্পিউটার শিক্ষাসহ অন্যান্য আধুনিক বিষয় পড়ানো হয়। এছাড়া দরিদ্র ছাত্রদের বিনামূল্যে পাঠদান নিশ্চিত করা হয় এখানে।

ভারতবর্ষের একসময়ের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা কেন্দ্র থেকে ছোট মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে ফিরিঙ্গি মহল, এ কথা সত্যি। তবে ইসলামী সেন্টারের অধীনে বৃত্তি প্রোগ্রাম, উচ্চশিক্ষায় প্রস্তুতি ক্লাস এবং সমাজসেবামূলক কার্যক্রম ফিরিঙ্গি মহলের ঐতিহ্যকে পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে সংগঠিত হচ্ছে।

আবার বর্তমানে ফিরিঙ্গি মহল ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখযোগ্য হলেও তার পুরনো অভিজাত গৌরব অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। তবুও ফিরিঙ্গি মহলের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ্ণৌ এবং ভারতীয় মুসলিম সমাজে ব্যাপক। সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরেই ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওয়াকফ আইন সংশোধনী বিল নিয়ে তাদের অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে ফিরিঙ্গি মহল লক্ষ্ণৌ এবং ভারতের মুসলিম সমাজে একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হিসেবে গুরুত্ব বজায় রেখেছে এবং তার প্রভাব বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রতিফলিত হয়েছে।

ফিরিঙ্গি মহলের গল্প শুধু একটি মাদ্রাসা বা প্রাসাদের ইতিহাস নয়—এটা একটি সভ্যতার বিবর্তনের দলিল। ইউরোপীয় নামধারী এক ভবন কীভাবে মুসলিম জ্ঞানের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, সেটাই দেখায় ইতিহাসের ব্যতিক্রমী মোড়। আজও যখন কেউ ল লক্ষ্ণৌর অলিগলিতে হেঁটে যায় এবং পুরনো দেয়ালের ফাঁক দিয়ে আলো ফোটে, তখন যেন শোনা যায় কোরআনের তিলাওয়াত, যুক্তির শব্দ এবং ইতিহাসের নিঃশব্দ চিৎকার। ফিরিঙ্গি মহল ছিল, আছে এবং থাকবে ইতিহাসের দলিল ও ঐতিহ্য হয়ে!

তথ্যসূত্র: দ্য ফার্স্ট পোস্ট, সিম্যানটিক স্কলার, টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া ও অন্যান্য

শাকেরা তাসনীম ইরা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা