হেগেল একস্থানে মন্তব্য করেছেন যে বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা ও ব্যক্তি যেন দুবার হাজির হয়। সেই সঙ্গে এ কথাটা বলতে তার ভুল হয়েছিল: প্রথমবার আসে বিয়োগান্ত নাটকের রূপে, দ্বিতীয়বারে প্রহসন হিসেবে। দাঁতোর পরিবর্তে কসিদিয়ের, রবেসপিয়ারের বদলে লুই ব্লাঁ, ১৭৯৩-৯৫ সালের ‘পর্বতের’ জায়গায় ১৮৪৮-৫১ সালের ‘পর্বত’, খুড়োর পরিবর্তে ভাইপো। আঠারোই ব্রুমেয়ারের দ্বিতীয় সংস্করণের পরিস্থিতিতেও সে একই ব্যঙ্গচিত্র!
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ইতিহাসের সংক্ষিপ্তসার বিবৃত করা যাক:
প্রথম কালপর্যায়: ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মে, ১৮৪৮। ফেব্রুয়ারি কালপর্যায়। প্রস্তাবনা। সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধাপ্পা।
দ্বিতীয় কালপর্যায়: প্রজাতন্ত্র গঠন ও জাতীয় সংবিধান-সভার কালপর্যায়।
১. ৪ মে থেকে ২৫ জুন, ১৮৪৮। প্রলেতারিয়েতের বিরুদ্ধে সব শ্রেণীর সংগ্রাম। জুনের দিনগুলোয় প্রলেতারিয়েতের পরাজয়।
২. ২৫ জুন থেকে ১০ ডিসেম্বর, ১৮৪৮। বিশুদ্ধ বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রীদের একনায়কত্ব। সংবিধানের খসড়া রচনা। প্যারিসে অবরোধের অবস্থা ঘোষণা। ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি বোনাপার্ট নির্বাচিত হওয়ার ফলে বুর্জোয়া একনায়কত্ব নাকচ।
৩. ২০ ডিসেম্বর, ১৮৪৮ থেকে ২৮ মে, ১৮৪৯। বোনাপার্টের বিরুদ্ধে এবং তার সঙ্গে জোট বেঁধে শৃঙ্খলা পার্টির বিরুদ্ধে সংবিধান-সভার সংগ্রাম। সংবিধান-সভার তিরোভাব। প্রজাতন্ত্রী বুর্জোয়াদের পতন।
- তৃতীয় কালপর্যায়: নিয়মতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং জাতীয় বিধান-সভার কালপর্যায়।
১. ২৮ মে, ১৮৪৯ থেকে ১৩ জুন, ১৮৪৯। বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে এবং বোনাপার্টের বিরুদ্ধে পেটি বুর্জোয়াদের সংগ্রাম। পেটি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পরাজয়।
২. ১৩ জুন, ১৮৪৯ থেকে ৩১ মে ১৮৫০। শৃঙ্খলা পার্টির পার্লামেন্টীয় একনায়কত্ব। সর্বজনীন ভোটাধিকার লোপ করে এরা নিজেদের শাসন সম্পূর্ণ করল, কিন্তু খোয়ালো পার্লামেন্টীয় মন্ত্রিসভা।
৩. ৩১ মে, ১৮৫০ থেকে ২ ডিসেম্বর, ১৮৫১। পার্লামেন্টীয় বুর্জোয়া ও বোনাপার্টের মধ্যে সংগ্রাম।
(ক) ৩১ মে, ১৮৫০ থেকে ১২ জানুয়ারি, ১৮৫১। সৈন্যবাহিনীর ওপর সর্বাধিনায়কত্ব হারাল পার্লামেন্ট।
(খ) ১২ জানুয়ারি থেকে ১১ এপ্রিল, ১৮৫১। প্রশাসন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় পার্লামেন্ট ব্যর্থ হলো। পার্লামেন্টে শৃঙ্খলা পার্টি স্বতন্ত্র সংখ্যাগুরুত্ব হারাল। প্রজাতন্ত্রীদের ও ‘পর্বতের’ সঙ্গে তাদের মিত্রতা স্থাপন।
(গ) ১১ এপ্রিল থেকে ৯ অক্টোবর, ১৮৫১। সংশোধন, সম্মিলন ও মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা। বিভিন্ন অঙ্গ-উপাদানে বিয়োজিত হয়ে গেল শৃঙ্খলা পার্টি। বুর্জোয়া পার্লামেন্ট আর পত্রপত্রিকার সঙ্গে সাধারণ বুর্জোয়াদের বিচ্ছেদ সুনির্দিষ্ট হয়ে গেল।
(ঘ) ৯ অক্টোবর থেকে ২ ডিসেম্বর, ১৮৫১। পার্লামেন্ট ও নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে প্রকাশ্য কাটান-ছিড়েন। নিজ শ্রেণী, সৈন্যবাহিনী ও বাদবাকি সব শ্রেণী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে পার্লামেন্ট সেটার অন্তিম কৃত্য করে প্রাণত্যাগ করল। পার্লামেন্টীয় আমল ও বুর্জোয়া শাসনের তিরোভাব। বোনাপার্টের জয়। সাম্রাজ্য পুনঃস্থাপনের প্যারোডি।
***
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সূত্রপাতে সামাজিক প্রজাতন্ত্র কথাটা উঠেছিল একটি বচন হিসেবে, একটা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে। ১৮৪৮-এর জুনের দিনগুলোয় প্যারিসের প্রলেতারিয়েতের রক্তে ডুবে গেলেও নাটকের পরবর্তী অংকগুলোয় সেটা প্রেতের মতো অধিষ্ঠান করতে থাকে। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নিজ পৌঁছ ঘোষণা করল। ১৮৪৯ সালের ১৩ জুন সেটা ছত্রভঙ্গ হলো সেটার পেটি বুর্জোয়ারাসুদ্ধ, তারা পিঠটান দিল, কিন্তু পালাতে পালাতেই দ্বিগুণ বড়াই করে নিজেদের ঢাক পিটিয়ে গেল। গোটা রঙ্গমঞ্চ দখল করে বসল বুর্জোয়ারা সমেত পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্র; এটা নিজ অস্তিত্ব ব্যবহার করল পূর্ণমাত্রায়; কিন্তু ১৮৫১ সালের ২ ডিসেম্বর সেটাকে কবর দিল, তার সঙ্গে সঙ্গে উঠল সম্মিলিত রাজতন্ত্রীদের সকাতর ধ্বনি: ‘প্রজাতন্ত্রের জয়’।
ফরাসি বুর্জোয়া শ্রেণী প্রলেতারিয়েতের প্রাধান্য প্রতিহত করে; তারা নিয়ে এল ১০ ডিসেম্বর সমিতির দলপতির লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের প্রাধান্য। লাল নৈরাজ্যের ভবিষ্য বিভীষিকা দেখিয়ে বুর্জোয়ী শ্রেণী ফ্রান্সকে শ্বাসরোধী আতঙ্কের অবস্থায় রেখে দিল; সে ভবিষ্যতের সঙ্গে বোনাপার্ট আগেভাগে হিসাবনিকাশ করে নিলেন: ৪ ডিসেম্বর বুলভার ম’মার্ত্র এবং বুলভার ডেস ইতালিয়েনের বিশিষ্ট বুর্জোয়াদের তাদের জানালায় শৃঙ্খলা বাহিনীর পানোন্মত্ত সৈন্যদের দিয়ে গুলি করালেন। তারা তরবারিকে মহিমান্বিত করেছিল, তরবারিই তাদের ওপর কর্তৃত্ব করল। তারা বৈপ্লবিক পত্রপত্রিকা ধ্বংস করেছিল; তাদের নিজস্ব পত্রপত্রিকা ধ্বংস হয়ে গেল। তারা জনসভার ওপরে চাপিয়েছিল পুলিশি তত্ত্বাবধান; তাদের বৈঠকখানাগুলো পুলিশের তত্ত্বাবধানে। তারা গণতান্ত্রিক জাতীয় রক্ষী দল ভেঙে দিয়েছিল, তাদের নিজস্ব জাতীয় রক্ষী দল ভেঙে দেয়া হলো। তারা অবরোধের অবস্থা চাপিয়েছিল; তাদের ওপর চাপান হলো অবরোধের অবস্থা। তারা জুরিপ্রথা হঠিয়ে সামরিক কমিশন চালু করেছিল; তাদের জুরিকে স্থানচ্যুত করে এল সামরিক কমিশনগুলো। তারা জনশিক্ষা ব্যবস্থাকে পাদরিদের নিয়ন্ত্রণাধীন করেছিল; পাদরিরা তাদের নিল নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে। তারা বিনা বিচারে লোককে নির্বাসন দিয়েছিল; তারা বিনা বিচারে নির্বাসিত হচ্ছে। রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে তারা সমাজে প্রতিটি আলোড়ন দমন করেছিল; তাদের সমাজে প্রতিটি আলোড়ন রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে স্তব্ধ করা হচ্ছে। টাকার থলি সম্পর্কে উৎসাহবশত নিজেদের রাজনীতিক আর বিদ্বানের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করেছিল; তাদের রাজনীতিক আর বিদ্বানেরা দূর হয়েছে, কিন্তু মুখ বন্ধ হয়ে এবং কলম ভেঙে যাওয়ায় তাদের টাকার থলিই লুঠ হচ্ছে।
খ্রিস্টানদের প্রতি সন্ত আর্সেনিয়স যা হাঁকতেন সেটা বুর্জোয়া শ্রেণী অক্লান্তভাবে হেঁকেছে বিপ্লবের প্রতি: ‘Fuge, tace, quiesce! পালাও, চুপ করো, স্থির হয়ে থাকো!’ বোনাপার্ট বুর্জোয়াদের উদ্দেশে হাঁক ছাড়ছেন: ‘Fuge, tace, quiesce! পালাও, চুপ করো, স্থির হয়ে থাকো!’
২ ডিসেম্বরের পরে প্যারিসের প্রলেতারিয়েত বিদ্রোহ করল না কেন?
তখন অবধি বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ সাধনের কেবল রায় জারি করা হয়েছিল: রায়টাকে বলবৎ করা হয়নি। প্রলেতারিয়েতের যেকোনো গুরুতর অভ্যুত্থান তৎক্ষণাৎ বুর্জোয়া শ্রেণীতে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত করত, সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে বুর্জোয়াদের মিলমিশ ঘটিয়ে শ্রমিকদের দ্বিতীয় জুনের পরাজয় সুনিশ্চিত করে তুলত।
৪ ডিসেম্বর বুর্জোয়ারা এবং ছোটো দোকানিরা (epicier) প্রলেতারিয়েতকে লড়তে প্ররোচিত করেছিল। সে সন্ধ্যায় জাতীয় রক্ষী দলের কয়েকটা বাহিনী সশস্ত্র ও সজ্জিত হয়ে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দেখা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কারণ বুর্জোয়ারা এবং ছোট দোকানিরা খবর পেয়ে যায় যে ২ ডিসেম্বর তারিখের একটা ডিক্রিতে বোনাপার্ট গোপন ব্যালট বাতিল করে সরকারি তালিকায় নামের পাশে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ লিখার হকুম দেন। ৪ ডিসেম্বরের প্রতিরোধে বোনাপার্ট ভয় পান। সে রাত্রে তিনি প্যারিসের সব রাস্তার মোড়ে গোপন ব্যালট আবার চালু হওয়ার ঘোষণা লটকানোর ব্যবস্থা করেন। বুর্জোয়ারা ও ছোট দোকানিরা মনে করল তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হলো। পরদিন সকালে যাদের দেখা গেল না তারা হলো বুর্জোয়ারা এবং ছোট দোকানিরা।
১-২ ডিসেম্বর রাত্রিতে বোনাপার্ট একটা আচমকা হামলায় প্যারিসের প্রলেতারিয়েতের নেতাদের, ব্যারিকেডের অধিনায়কদের কেড়ে নেন। অফিসারবিহীন এক বাহিনী, ১৮৪৮ সালের জুন আর ১৮৪৯ সাল এবং ১৮৫০ সালের মে মাসের স্মৃতির কারণে ‘পর্বতের’ লোকদের পতাকাতলে দাঁড়িয়ে লড়তে বিমুখ এ প্রলেতারিয়েত তাদের সেনামুখ, অর্থাৎ গুপ্ত সমিতিগুলোর হাতে ছেড়ে দিল প্যারিসের অভ্যুত্থানিক সম্মান রক্ষার দায়িত্ব, যে সম্মান বুর্জোয়া শ্রেণী সৈন্যদলের হাতে এতই নির্বিবাদে সমর্পণ করেছিল, যাতে পরে জাতীয় রক্ষী দলকে নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্য হিসেবে বোনাপার্ট মুখ সিটকে বলতে পেরেছিলেন যে জাতীয় রক্ষী দলের অস্ত্র তাদেরই বিরুদ্ধে নৈরাজ্যবাদীরা ঘুরিয়ে ধরবে এ আশঙ্কা তার ছিল।
‘এটা হলো সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বিজয়।’ গিজো ২ ডিসেম্বরের চরিত্র নির্দেশ করেছিলেন এভাবে। কিন্তু পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্রের উচ্ছেদের মধ্যে প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবের জয়ের বীজ নিহিত যদি থাকেও, সাক্ষাৎ ও স্পষ্টপ্রতীয়মান ফল হলো পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে বোনাপার্টের জয়, বিধানিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে নির্বাহী ক্ষমতার জয়, বাক্যবলের বিরুদ্ধে বিনাবাক্য বলের জয়। পার্লামেন্টে জাতি সেটার সাধারণ অভিপ্রায়কে আইনে পরিণত করত, অর্থাৎ শাসক শ্রেণীর আইনকে করে তুলত জাতির সাধারণ অভিপ্রায়। নির্বাহী ক্ষমতার কাছে সেটা নিজস্ব সব অভিপ্রায় পরিত্যাগ করে বশ্যতা স্বীকার করল একটা অভিপ্রায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের কাছে, কর্তৃপক্ষের কাছে। বিধানিক ক্ষমতা থেকে বিসদৃশভাবে নির্বাহী ক্ষমতায় প্রকাশিত হয় জাতির স্বায়ত্তশাসন থেকে, যা বিসদৃশ সে পরকীয় শাসন (heteronomy)। কাজেই, ফ্রান্স যেন শ্রেণীবিশেষের স্বৈরতন্ত্র এড়িয়ে গেল শুধু ব্যক্তিবিশেষের স্বৈরতন্ত্রের অধীনে, উপরন্তু কর্তৃত্বহীন এক ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীনে পড়ার জন্যে। সংগ্রামের মীমাংসা যেন এমনভাবে হলো যাতে সমানই অক্ষম এবং সমানই মূক সব শ্রেণী বন্দুকের কু’দোর সামনে নতজানু হলো।
কিন্তু বিপ্লব চলে শেষ অবধি। এখনো সেটার চলছে আত্মশুদ্ধি প্রায়শ্চিত্ত। বিপ্লব কাজ করে যায় প্রণালিবদ্ধভাবে। ১৮৫১ সালের ২ ডিসেম্বর অবধি সেটার প্রস্তুতির কাজ সারা হয়েছিল শুধু অর্ধেকটা; এখন বাকি অর্ধেকটা সমাধা করছে। প্রথমে বিপ্লব পার্লামেন্টীয় ক্ষমতা উচ্ছেদ করতে সমর্থ হওয়ার জন্য সেটাকে সুসম্পূর্ণ করে তোলে। এ কার্যসিদ্ধির পর এখন নির্বাহী ক্ষমতাকে নিখুঁত করার কাজ চলেছে, তাকে একেবারে তার বিশুদ্ধতম রূপে নিয়ে এসে, বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, একমাত্র লক্ষ্যস্থল হিসেবে নিজের বিরুদ্ধেই তাকে দাঁড় করাচ্ছে, যাতে তার বিরুদ্ধেই সংহত করা যায় তার সমগ্র বিধ্বংসী শক্তি। এ প্রাথমিক কাজের দ্বিতীয়ার্ধ সমাধা হলে ইউরোপ আসন ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে সোল্লাসে চিৎকার করবে: ‘ধেড়ে ছুঁচো, বেশ খুঁড়েছ!’
বিশাল আমলাতান্ত্রিক এবং সামরিক সংগঠন, বিভিন্ন বিস্তৃত স্তরব্যাপী সুনিপুণ রাষ্ট্রযন্ত্র, পাঁচ লাখ কর্মচারীর বাহিনী এবং আরো পাঁচ লাখ সৈন্য, এসব নিয়ে এ নির্বাহী ক্ষমতা, এই যে-ভয়াবহ পরগাছা সংস্থাটা ফরাসি সমাজদেহে জালের মতো জড়িয়ে সব রন্ধ্রমুখ রুদ্ধ করে রেখেছে, এর উদ্ভব হয়েছিল নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের যুগে, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার যে অবক্ষয় এটা ত্বরান্বিত করেছিল সে অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে। ভূস্বামীদের ও নগরগুলোর সামন্ততান্ত্রিক বিশেষ অধিকারগুলো রাষ্ট্রক্ষমতার বিশেষক উপাদানে পরিণত হলো; হোমরা-চোমরা সামন্তরা বেতনভোগী কর্মচারিতে পর্যবসিত হলো, আর মধ্যযুগের পরস্পরবিরোধী পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতার বিচিত্র বিন্যাসটা রূপান্তর হয়ে গড়ে উঠল রাষ্ট্র-কর্তৃত্বের নিয়মিত পরিকল্পনা, তাতে কাজ কারখানার মতো বিভক্ত ও কেন্দ্রীকৃত। প্রথম ফরাসি বিপ্লবের কাজটা ছিল সব পৃথক পৃথক স্থানীয়, আঞ্চলিক, নগরভিত্তিক এবং প্রাদেশিক ক্ষমতা চূর্ণ করে জাতির নাগরিক ঐক্য গড়া, কাজেই সেটা চলল নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের আরদ্ধ কাজ আরো সম্প্রসারণ করার দিকে, সেটা হলো কেন্দ্রীকরণ, কিন্তু সেই সঙ্গে সরকারি ক্ষমতার পরিধি, বিভিন্ন বিশেষ লক্ষণ এবং সহায়ক বৃদ্ধির দিকে। নেপোলিয়ন এ রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিখুঁত করে তুলেছিলেন। লেজিটিমিস্ট রাজতন্ত্র আর জুলাই রাজতন্ত্র এতে যোগ করল শুধু অধিকতর শ্রম-বিভাগ, সেটা বেড়ে চলল বুর্জোয়া সমাজের ভেতরে শ্রম-বিভাগ থেকে নতুন নতুন স্বার্থগোষ্ঠী এবং তার ফলে নতুন নতুন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক উপাদান উদ্ভবের সমান পরিমাণে। প্রতিটি সাধারণী স্বার্থকে তৎক্ষণাৎ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার বিপরীতে উচ্চতর সার্ব স্বার্থ হিসেবে দাঁড় করানো হলো, সমাজের সদস্যদের ক্রিয়াকলাপের আওতা থেকে কেড়ে নিয়ে সেটাকে করে তোলা হলো সরকারি কর্মপরিধির বিষয়ীভূত একটা সাঁকো, স্কুলবাড়ি এবং গ্রামগোষ্ঠীর সাধারণী সম্পত্তি থেকে রেলপথ, জাতীয় সম্পদ আর ফ্রান্সের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্র দমন-পীড়ন ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে শাসনক্ষমতার সামর্থ্য এবং কেন্দ্রীকরণ দৃঢ়তর করতে বাধ্য হয়। প্রতিটি বিপ্লবই যন্ত্রটিকে চূর্ণ না করে আরো নিখুঁতই করেছে। যেসব পার্টি পালা করে আধিপত্যের জন্য লড়েছে, সেগুলো সবই এ বিরাট রাষ্ট্রসৌধটাকে বিজয়ীর প্রধান লাভ বলে গণ্য করেছে।
কিন্তু নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের আমলে, প্রথম বিপ্লবের সময়ে, নেপোলিয়নের আমলে আমলাতন্ত্র ছিল বুর্জোয়াদের শ্রেণী-শাসন প্রস্তুতির উপায় মাত্র। পুনঃস্থাপিত রাজতন্ত্রের অবস্থায়, লুই ফিলিপের আমলে, পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্রের পরিস্থিতিতে সেটা ছিল শাসক শ্রেণীর হাতিয়ার—সেটা নিজস্ব ক্ষমতার জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন।
একমাত্র দ্বিতীয় বোনাপার্টের অধীনেই মনে হতে পারে রাষ্ট্র নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে নিল। নাগরিক সমাজের বিপক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রের অবস্থিতি এতই পুরোপুরি সংহত হলো যাতে সেটার নেতৃত্ব চলে ১০ ডিসেম্বর সমিতির সর্দারকে দিয়েই, বিদেশ থেকে ভেসে আসা এ ভাগ্যান্বেষীকে দিয়ে, যাকে ঢালের ওপরে তুলে ধরেছে মাতাল সৈন্যের দল, যাদের সে মদ আর সসেজ দিয়ে কিনেছে, আর যাদের সে ক্রমাগতই সসেজ-ভোগ দিতে বাধ্য। তাই একটা গুরুভার হতাশা, একটা নিদারুণ অপমান আর গ্লানিবোধ বুক চেপে ধরেছে ফ্রান্সের। লাঞ্ছিত বোধ করছে দেশটি।
তবু রাষ্ট্রক্ষমতা তো শূন্যে ঝুলে থাকে না। বোনাপার্ট একটা শ্রেণীর প্রতিনিধি, তায় আবার ফরাসি সমাজে যারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি সে খুদে জোত-জমার (Parzellen) কৃষিজীবী শ্রেণীর প্রতিনিধি।
বুরবোঁরা যেমন ছিল বৃহৎ ভূমিসম্পত্তির রাজবংশ, অর্লিয়ান্স যেমন ছিল অর্থজগতের রাজবংশ, তেমনই বোনাপার্টরা হলো কৃষকদের, অর্থাৎ ফরাসিদের প্রধান অংশের রাজবংশ। বুর্জোয়া পার্লামেন্টের কাছে আত্মসমর্পণকারী বোনাপার্ট নয়, বুর্জোয়া পার্লামেন্টকে যিনি ছত্রভঙ্গ করেন সেই বোনাপার্টই কৃষককুলের বৃত মানুষ। তিন বছর ধরে শহরগুলো ১০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের অর্থের মিথ্যাকরণে এবং সাম্রাজ্যের পুনঃস্থাপনা সম্বন্ধে কৃষকদের ঠকাতে কৃতকার্য হয়েছিল। ১৮৪৮-এর ১০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে চূড়ান্ত রূপ দিল কেবল ১৮৫১ সালের ২ ডিসেম্বরের ক্যু-দেতা।
খুদে জোত-জমার কৃষক সম্প্রদায় একটি বিশাল জনসমষ্টি, তাদের জীবনযাত্রার পরিবেশ অনুরূপ, কিন্তু তাদের মধ্যে বহুধা পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এ খুদে জোত-জমার কৃষকদের মধ্যে পরস্পর-সংযুক্তি যে-পরিমাণে স্থানীয় মাত্র, এবং স্বার্থের অভিন্নতা তাদের মধ্যে পয়দা করে না কোনো যৌথসত্তা, জাতীয় পরিসরের বন্ধন, রাজনৈতিক সংগঠন, সে পরিমাণে তারা শ্রেণী নয়। কাজেই তারা নিজেদের নামে নিজেদের শ্রেণী-স্বার্থ পার্লামেন্টে অথবা কনভেনশনে জোর দিয়ে তুলে ধরতে অপারগ। তারা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না, তাদের হয়ে কাউকে প্রতিনিধিত্ব করা চাই। তাদের প্রতিনিধিকে আবার সেই সঙ্গে আসা চাই তাদের কর্তা হিসেবে, তাদের ওপর একটা কর্তৃত্ব হিসেবে, একটা নিরঙ্কুশ শাসনক্ষমতা হিসেবে, যা অন্যান্য শ্রেণীর বিরুদ্ধে তাদের রক্ষা করে, ওপর থেকে তাদের জন্য পাঠায় রোদ, পাঠায় বর্ষা। কাজেই যে নির্বাহী ক্ষমতা সমাজকে অধীন করে রাখে তারই মধ্যে প্রকাশ পায় খুদে জোত-জমায় কৃষকদের রাজনৈতিক প্রভাবের চরম অভিব্যক্তি।
নেপোলিয়ন নামধারী এক ব্যক্তি তাদের সব পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনবে, এ মর্মে একটা অলৌকিক কাণ্ডে ফরাসি কৃষকদের বিশ্বাস জন্মেছিল কিংবদন্তি থেকে। একজন দেখা দিলও বটে, সে নিজেকে সেই ব্যক্তি বলে জাহির করল, কারণ তার নাম নেপোলিয়ন, আর যেহেতু ‘নেপোলিয়ন-সংহিতায়’ লেখা আছে la recherche de la paternité est interdite* (পিতৃবংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা নিষিদ্ধ)। ২০ বছরের ভবঘুরের জীবন এবং একের পর এক উৎকট অ্যাডভেঞ্চারের পরে জনশ্রুতিটা বাস্তব হয়ে উঠল, লোকটা হয়ে দাঁড়াল ফরাসিদের সম্রাট। ভ্রাতুষ্পুত্রের বদ্ধভাব বাস্তবে পরিণত হলো, কারণ সেটা মিলে গিয়েছিল ফরাসিদের সবচেয়ে সংখ্যাবহ, শ্রেণীর বদ্ধভাবের সঙ্গে।
আপত্তি উঠতে পারে, ফ্রান্সের অর্ধেক অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহ, কৃষকদের ওপর সৈন্যবাহিনীর হামলা, ব্যাপকভাবে কৃষকদের জেলে দেয়া আর নির্বাসন তবে কেন?
চতুর্দশ লুইয়ের আমল থেকে ফ্রান্সে ‘বক্তৃতাবাজির জন্যে’ কৃষকদের ওপর এ রকম উৎপীড়নের দৃষ্টান্ত আর নেই।
কিন্তু কথাটার যেন ভুল অর্থ না হয়। বোনাপার্ট বংশ যাদের প্রতিনিধি তারা বিপ্লবী কৃষক নয়, রক্ষণশীল কৃষক; যে কৃষক তাদের সামাজিক জীবনের পরিবেশ, অর্থাৎ খুদে জোত-জমা ছাড়িয়ে রেরোতে চেষ্টা করে তারা নয়, সে জোত-জমা যারা মজবুত করতে চায় সেই কৃষক; যে গ্রামীণ জনতা শহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে নিজেদের উদ্যমে পুরনো ব্যবস্থার উচ্ছেদ করতে চায় তারা নয়, বরং উলটে সেসব লোক যারা সেই সাবেক ব্যবস্থার ভেতরে হতবুদ্ধিকর বিচ্ছিন্নতার মাঝে থেকে সাম্রাজ্যের ভূতের কাছ থেকে নিজেদের এবং নিজেদের ছোট জোত-জমাগুলোর জন্যে নিরাপত্তা আর আনুকূল্য পেতে চায়। বোনাপার্ট রাজবংশ প্রতিফলিত করছে কৃষকের জ্ঞানালোক নয়, তার কুসংস্কার; তার বিচারশক্তি নয়, তার অন্ধ বিশ্বাস; তার ভবিষ্যৎ নয়, তার অতীত; তার আধুনিক সেভেন নয়, তার আধুনিক ভাঁদে।
পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্রের তিন বছরের কঠোর শাসনে ফরাসি কৃষকদের একাংশের নেপোলিয়নীয় মোহ কেটেছিল, শুধু ভাসা ভাসা হলেও আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল তাদের মধ্যে; কিন্তু যতবারই তারা সচল হয়ে উঠেছে বুর্জোয়ারা হিংস্র উপায়ে তাদের দমন করেছে। পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্রের আমলে ফরাসি কৃষকদের নবচেতনা এবং সাবেকী মানসের মধ্যে প্রাধান্যের জন্য দ্বন্দ্ব চলেছিল। স্কুল শিক্ষক ও যাজকদের মধ্যে অবিরাম সংঘাতের আকার ধারণ করেছিল এ অগ্রগতি। বুর্জোয়ারা স্কুল শিক্ষকদের ঘায়েল করল। সরকারি কার্যকলাপের স্বাধীনভাবে চলার চেষ্টা কৃষকরা করেছিল এ প্রথমবার। গ্রামপ্রধান (maires) এবং জেলা শাসকদের (prefects) মধ্যে ধারাবাহিক দ্বন্দ্বে সেটা প্রকাশ পায়। বুর্জোয়ারা গ্রামপ্রধানদের বরখাস্ত করে। শেষে পার্লামেন্টীয় প্রজাতন্ত্রের আমলে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা তাদের আপন সন্তান সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। অবরোধের অবস্থা ও পিটুনি অভিযান দিয়ে বুর্জোয়ারা তাদের শাস্তি দেয়। সে একই বুর্জোয়া শ্রেণী আজ জনগণের, ইতর জনতার নির্বুদ্ধিতার কথা বলে চেচাচ্ছে, তারা নাকি বেইমানি করে বোনাপার্টের হাতে তুলে দিয়েছে বুর্জোয়াদের। বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেই জোর করে কৃষক শ্রেণীর মধ্যে সাম্রাজ্য-ভাবালুতা [Imperialis-mus] সুদৃঢ় করেছে, এ কৃষক ধর্মটি পয়দা হওয়ার পরিবেশটাকে সংরক্ষিত করে রেখেছিল। অবশ্য জনগণ যতদিন রক্ষণশীল থাকে ততদিন তাদের নির্বুদ্ধিতাকে বুর্জোয়া শ্রেণী ভয় পেতে বাধ্য, এবং জনগণ বিপ্লবী হয়ে উঠলেই ভয় পেতে বাধ্য তাদের অন্তর্দৃষ্টিকে।
ক্যুদেতার পরবর্তী বিদ্রোহগুলোয় ফরাসি কৃষকদের একাংশ ১৮৪৮-এর ১০ ডিসেম্বরে দেয়া তাদের নিজেদের ভোটের বিপক্ষেই অস্ত্র হাতে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ১৮৪৮ সালের পরে তারা যে শিক্ষার ভেতর দিয়ে গিয়েছিল সেটাই তাদের বুদ্ধিকে তীক্ষ্ণতর করে। কিন্তু তারা যে নিজেদের তুলে দিয়েছিল ইতিহাসের দুর্বৃত্ত জগতের হাতে; ইতিহাস তাদের প্রতিশ্রুতির মূল্যদানে বাধ্য করল; তখনো তাদের অধিকাংশের অন্ধসংস্কার ছিল এতই প্রবল যে সবচেয়ে লাল জেলাগুলোয়ই কৃষকজনতা প্রকাশ্যে বোনাপার্টের পক্ষে ভোট দেয়। এদের মতে, জাতীয় সভা তার অগ্রগতি ব্যাহত করেছিল। গ্রামাঞ্চলের অভিপ্রায়ের ওপর শহর যে বেড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল সেটাকে তিনি ভেঙে দিলেন মাত্র। কয়েকটি এলাকায় কৃষকরা নেপোলিয়নের পাশাপাশি কনভেনশনের একটা কিম্ভূত ধারণা পর্যন্ত পোষণ করত।
***
বোনাপার্ট সব শ্রেণীর পিতৃপ্রতিম হিতকারী রূপে প্রতীয়মান হওয়ার ইচ্ছা রাখেন। কিন্তু একটি শ্রেণীকে বঞ্চিত না করে অন্য কোনো শ্রেণীকে কিছু দেয়া তার অসাধ্য। ফ্রোন্দের আমলে যেমন ডিউক অব গিজ সম্বন্ধে বলা হতো তিনি ফ্রান্সে সবচেয়ে দায়বান ব্যক্তি (obligeart), কারণ নিজের সব ভূমিসম্পত্তিকে তিনি তার প্রতি নিজ পক্ষাবলম্বীদের দায়ে পরিণত করেন, ঠিক তেমন বোনাপার্টও ফ্রান্সে সবচেয়ে দায়বান ব্যক্তি হিসেবে ফ্রান্সের সব সম্পত্তি, সব শ্রমকে নিজের প্রতি ব্যক্তিগত দায়ে পরিণত করতে ব্যগ্র। তিনি গোটা ফ্রান্স চুরি করতে চান তা ফ্রান্সকেই উপহার দিতে পারার জন্য, অথবা বলা ভালো, ফরাসি মুদ্রা দিয়ে ফ্রান্সকে নতুন করে কিনে নিতে পারার জন্য, কারণ ১০ ডিসেম্বর সমিতির সর্দার হিসেবে তার প্রাপ্য সামগ্রী তাকে কিনতেই হবে। যাবতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সেনেট, রাষ্ট্রীয় পরিষদ, বিধানিক সংস্থা, ‘লিজিয়ন অভ অনার’, সৈনিকদের পদক, ধোবিখানা, পূর্তকর্ম’, রেলপথ, সাধারণ সভ্যদের বাদ দিয়ে জাতীয় রক্ষী দলের জেনারেল স্টাফ এবং অর্লিয়ান্স রাজবংশের বাজেয়াপ্ত ভূমিসম্পত্তি—সবকিছুই হয়ে পড়েছে ক্রয় ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। সৈন্যবাহিনীর ও সরকারি যন্ত্রের প্রতিটি পদ কেনাবেচার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ফ্রান্সকেই তা দান করার জন্য ফ্রান্স কেড়ে নেয়ার এ প্রক্রিয়ার সর্বপ্রধান দিকটা হলো এ কারবারের সময়ে যে শতাংশটা পড়ে ১০ ডিসেম্বর সমিতির সর্দার এবং সভ্যদের পকেটে।
লুই বোনাপার্টের দরবার এবং ঘোঁট প্রসঙ্গে রিজেন্সি অথবা পঞ্চদশ লুইকে স্মরণ করাটা ভুল হবে। কারণ ইতিপূর্বে বহুবার রক্ষিতাদের শাসনের অভিজ্ঞতা ফ্রান্সের হয়েছে, কিন্তু রক্ষিতা পুরুষদের শাসন আগে কখনো দেখা যায়নি।
নিজ অবস্থার পরস্পরবিরোধী চাহিদাগুলোর তাড়নায় এবং তার সঙ্গে ভেলকিবাজের মতো ক্রমাগত চমক লাগিয়ে নেপোলিয়নের বদলি হিসেবে নিজের প্রতি সাধারণের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার প্রয়োজনের তাগিদে, অর্থাৎ প্রতিদিন এক-একটা ছোটখাটো ক্যুদেতার কাণ্ড ঘটানোর প্রয়োজনের তাগিদে বোনাপার্ট সমগ্র বুর্জোয়া অর্থনীতিকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন, ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের পক্ষে, যা অলঙ্ঘ্য মনে হয়েছিল তা সবই লঙ্ঘন করছেন, কিছু লোককে করছেন বিপ্লব সম্পর্কে সহিষ্ণু, আর কিছু লোককে বিপ্লবকামী করে তুলছেন, শৃঙ্খলার নামে বাস্তব অরাজকতা সৃষ্টি করছেন, আর তার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের জ্যোতি ঘুচিয়ে সেটাকে কলুষিত করছেন, সেটাকে একাধারে ঘৃণা আর উপহাসের পাত্রে পরিণত করছেন। ট্রিভসের পবিত্র পরিচ্ছদ পূজার অনুকরণে তিনি প্যারিসে নেপোলিয়নের সম্রাটবেশ পূজার আয়োজন করেছেন। কিন্তু অবশেষে যেদিন সম্রাটের রাজবেশে লুই বোনাপার্ট সজ্জিত হবেন সেদিন ভাঁদোম স্তম্ভের ওপর থেকে নেপোলিয়নের ব্রোঞ্জের মূর্তিটা মাটিতে আছড়ে পড়বে।
[ডিসেম্বর ১৮৫১ থেকে মার্চ ১৮৫২-এর মধ্যে মার্ক্সের লেখা। Die Revolution পত্রিকায় প্রকাশিত, নিউইয়র্ক, ১৮৫২। জার্মান থেকে অনুবাদ। প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৯]







