শিল্প-সাহিত্য আর সৌরভ-সুগন্ধির জন্য বিখ্যাত ফ্রান্স। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের স্লোগানে ১৭৮৯ সালে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ফ্রান্সেই। রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ এ দেশ একে একে দেখেছে পাঁচটি প্রজাতন্ত্র।

ফ্রান্সের সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেকেন্ড রিপাবলিকের সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। তবে ১৯৪৮-৫২ সাল পর্যন্ত মাত্র চার বছর স্থায়িত্বের সেকেন্ড রিপাবলিক ফ্রান্সের সার্বভৌমত্ব ও রাজনীতির ইতিহাসে গভীর দাগ এঁকে গেছে।

সেকেন্ড রিপাবলিকের সময়ে ফ্রান্সে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ, শ্রমিক শ্রেণী ও বুর্জোয়া রাজনীতিবিদরা নতুন ধরনের শাসন ব্যবস্থা গঠনের চেষ্টা করছিল। সেকেন্ড রিপাবলিকের প্রতিশ্রুতি ছিল বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্ত করা এবং তাদের স্বার্থ সংসদে প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে রক্ষা করা। এ সময় প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি এ সময়ে প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়নেরও চেষ্টা করা হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হওয়া ফ্রান্সের সেকেন্ড রিপাবলিক ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গেলে সর্বজনীন ভোটাধিকারের সংক্ষিপ্ত স্থায়িত্ব, শ্রমিক আন্দোলন দমন এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসে। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়ে প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়ন বনাম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিতর্কও তীব্র হয়ে ওঠে।

প্রুশিয়ান বংশোদ্ভূত সাংবাদিক মরিত্স রিটিংহাউজেন এ সময় প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়নের বা ডিরেক্ট লেজিসলেশনের একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেন যে সমাজতন্ত্রের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য, তবে জনগণেরও সরাসরি আইন প্রণয়নের অধিকার থাকতে হবে। তার এ তত্ত্ব সমাজতান্ত্রিক চিন্তকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বামপন্থী রিপাবলিকানদের বেশির ভাগই এটিকে সমর্থন করেন। তবে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক লুই ব্লঁ এ ধারণার বিরোধিতা করেন। লুই ব্লঁ যুক্তি দেন যে সমাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত।

অন্যদিকে ফরাসি আইনজীবী আলেক্সান্দ্রে অগাস্ট লেদ্রু-রোলিন রিটিংহাউজেনের ধারণার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তবে তিনিও সম্পূর্ণরূপে প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বিলোপের ধারণা মেনে নিতে পারেননি।

পাশাপাশি নৈরাজ্যবাদী চিন্তাবিদ পিয়ের-জোসেফ প্রুদোঁ প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়নের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। ১৮৪৮ সালের সংবিধানের পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকার করা মাত্র ৩০ জন প্রতিনিধির একজন ছিলেন তিনি। ওই সময়টায় প্রুদোঁ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়নের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে ব্যাপক মাত্রায় লেখালেখি করেন।

মজার বিষয় হলো প্রত্যক্ষ আইন নিয়ে এ বিতর্কে অংশ নেয়া প্রায় সব নেতাই কোনো না কোনো সময় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছিলেন। তার পরও তারা সবাই প্রশ্ন তুলেছিলেন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং গণতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও নেতাদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে ছিল প্রত্যক্ষ আইন।

মরিত্স রিটিংহাউজেন গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থার তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি যুক্তি দেন যে গণতন্ত্রের জন্য জনগণের সরাসরি আইন প্রণয়নের অধিকার থাকা উচিত। কারণ প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা জনগণের প্রকৃত ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া সংসদ সদস্যরা পক্ষপাতদুষ্ট এবং তারা শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন না বলেও মনে করেন তিনি।

সংসদীয় পরিষদের সদস্য কনসিডেরাঁ রিটিংহাউজেনের সমালোচনাকে আরো দৃঢ় করেন। তিনি বলেন, ‌প্রতিনিধিত্বমূলক পরিষদগুলো শুধুই সামাজিক সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়া ‘শব্দ উৎপাদনের কল’। নির্বাচনের মাধ্যমে সর্বজনীন ভোটাধিকারের আওতায় এক ধরনের আধুনিক দাসত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক সম্পর্কে প্রবেশ করতে হলে জনগণকে একপ্রকার প্রভু-দাস সম্পর্ক মেনে নিতে হয়। এখানে জনগণকে একপ্রকার ফাঁদে ফেলে তাদের বোঝানো হয়, তারা তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করেছে এবং এখন তাদের জন্য তৈরি আইন মেনে চলতে হবে। এ প্রভু-দাস সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় প্রকৃত গণতন্ত্র, যেখানে সার্বভৌমত্বকে বাস্তবিকভাবে সর্বজনীন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ দ্বারা কার্যকর করতে হবে।

রিটিংহাউজেন বিশ্বাস করতেন প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রতিনিধিত্বকে প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি আইন প্রণয়নের ধারণা গ্রহণ করা উচিত। তিনি ফ্রান্সকে এক হাজার নাগরিকের সমান অংশে বিভক্ত করেন, যেখানে প্রতিটি অংশের নাগরিকরা একজন সভাপতি নির্বাচন করবে। এ সভাপতি অধিবেশন পরিচালনা করবে, আলোচনা পরিচালনা করবে এবং চূড়ান্ত ভোটের তত্ত্বাবধান করবে। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি বিভক্ত সভাগুলোর আলোচনার মাধ্যমে গঠন হবে। এরপর খসড়া প্রস্তুত করা হবে এবং একটি মন্ত্রণালয় অন্য পরিষদগুলোকে আহ্বান জানাবে, যাতে তারা প্রস্তাবিত আইন বা সংশোধনী নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। রিটিংহাউজেন বিশ্বাস করতেন আলোচনাই এ ব্যবস্থার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

তবে লেদ্রু-রোলিন রিটিংহাউজেনের চরমপন্থী উপসংহারের সঙ্গে একমত হননি। তিনি একটি মধ্যপন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তিনি প্রতিনিধিত্বের বিপক্ষে ছিলেন, তবে সরাসরি আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী ও প্রশাসনিক কার্যাবলির জন্য প্রতিনিধিদের কিছু দায়িত্ব অর্পণের সমন্বিত ব্যবস্থা সমর্থন করতেন। তিনি প্রস্তাব করেন, জনগণ স্থানীয় পরিষদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করবে। হয় তারা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে বা গণভোটের মতো সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে। আইনটি একটি কেন্দ্রীয় পরিষদ দ্বারা খসড়া করা হবে, যেটি প্রতি বছর জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন হবে। প্রতিনিধিরা আইন খসড়া তৈরি করবে, নির্বাচনী পরিষদে অনুমোদনের জন্য জমা দেবে এবং এর বাস্তবায়ন তদারকি করবে। মূলত তিনি প্রতিনিধিত্ব এবং প্রতিনিধি কর্তৃত্বের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেন।

তবে রিটিংহাউজেন এবং কনসিডেরাঁ লেদ্রু-রোলিনের এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, যদি লেদ্রু-রোলিনের প্রকল্প সফল হয় তাহলে প্রতিনিধি কর্তৃত্বের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব বিলীন হয়ে যাবে।

অন্যদিকে প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করা লুই ব্লঁর যুক্তি ছিল, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক গড়তে হলে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রুদোঁ আরো কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সরাসরি আইন প্রণয়ন শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করবে এবং একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সেক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এসব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই জনগণের সরাসরি আইন প্রণয়নের লক্ষ্য অর্জনে সেকেন্ড রিপাবলিকের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হয়। কিন্তু প্রুদোঁ বলেছিলেন, সরাসরি আইন প্রণয়ন শুধু জনগণের সার্বভৌমত্বের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ছিল না, এটি এর জ্ঞাতিক সক্ষমতা সম্পর্কেও বিভ্রান্ত ছিল। জনগণের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার ওপর অগাধ আস্থা রাখা নিয়ে প্রুদোঁর দুটি প্রধান উদ্বেগ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে না এবং প্রতিনিয়ত আলোচনার ফলে অবিরাম বিতর্ক সৃষ্টি হবে।

এদিকে বাস্তব প্রেক্ষাপটেও সরাসরি আইন প্রণয়নের তত্ত্ব রীতিমতো ভুল প্রমাণিত হয়েছিল সেকেন্ড রিপাবলিকে। ১৮৫১ সাল পর্যন্ত সরাসরি আইন প্রণয়ন নিয়ে ফরাসি সমাজতান্ত্রিক প্রকাশনাগুলোয় একটি প্রাণবন্ত বিতর্ক চলছিল, কিন্তু এটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় লুই নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ১৮৫১ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

সর্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯২ শতাংশ ভোট নেপোলিয়নের পক্ষে পড়ে। মূলত নির্বাচনে রক্ষণশীল ও মধ্যপন্থী বুর্জোয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করে। চিন্তাবিদদের বাধ্য করে সরাসরি আইন প্রণয়নের মুক্তিকামী প্রকৃতি সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস পুনর্বিবেচনা করতে। একই সঙ্গে এটি শ্রমজীবী শ্রেণীর রাজনৈতিক পছন্দ সম্পর্কে তাদের অনুমানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। সীমাবদ্ধ করা হয় সর্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকারও। এ ঘটনার পর লেদ্রু-রোলিন এবং কনসিডেরাঁ সরাসরি আইন প্রণয়নের পক্ষে যুক্তি দেয়া বন্ধ করেন, কিন্তু রিটিংহাউজেন একাই এ তত্ত্বের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যান।

এরপর বেতন বৃদ্ধি, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, শ্রমিক অধিকারের স্বীকৃতি নিয়ে বাড়তে থাকে শ্রমিক অসন্তোষ, যা শেষ পর্যন্ত বড় শ্রমিক বিদ্রোহের জন্ম দেয়। বিদ্রোহ দমনে আবার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ফরাসি সরকার। এতে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত ও গ্রেফতার হয়। রাজনৈতিক চরম অস্থিরতার মধ্যে লুই বোনাপার্ট অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শাসন ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। ফলে গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। প্রজাতন্ত্র কি আদৌ সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?

এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের সেকেন্ড রিপাবলিকের সময়ে উত্থিত প্রত্যক্ষ আইন প্রণয়ন বনাম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিতর্ক আজও গণতন্ত্রের মূল প্রশ্নগুলোর একটি। সেকেন্ড রিপাবলিকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছিল যে রাজনীতির বাস্তবতা কঠিন এবং জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ সর্বদা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আনতে পারে না। তবে এটি গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল, যা আজও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে।

শাকেরা তাসনীম ইরা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা