স্বৈরশাসক পোরফিরিও দিয়াজ কখনো মেক্সিকোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার পরিকল্পনা করেননি; বরং ক্ষমতা সুরক্ষিত করার জন্য অভিজাতগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। দেশের বেশির ভাগ ভূমি ছিল অভিজাতদের মালিকানায়। সাধারণ নাগরিকদের জন্য জমির অধিকার বা সেখান থেকে জীবিকা উপার্জন ছিল অসম্ভব। যারা বড় ঋণে ডুবে ছিলেন, তারা ভূমির মালিকদের কাছে গেলে আরো ঋণগ্রস্ত হতেন। ছোট কৃষকরা ছিলেন আর্থিকভাবে সুবিধাহীন, ব্যাংকঋণও পেতেন না। দিয়াজের কর্তৃত্ববাদী শাসনের কঠোর অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে নাগরিকরা ক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তিনি অভিজাতদের সমর্থন পেয়েছিলেন ঠিক। কিন্তু কৃষকরা গোটা ব্যবস্থার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এমন পরিস্থিতিতেই ফ্রান্সিসকো মাদেরো দিয়াজের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ আহ্বান করেন ও অভূতপূর্ব সাড়া পান। ১৯১১ সালের মে মাসেই দিয়াজ পদত্যাগ করেন ও মাদেরো হন প্রেসিডেন্ট। দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর ছিল কৃষকশ্রেণীর প্রত্যাশা।
মাদেরো নিজেকে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পর অভিজাত ভূস্বামীদের জমি ভূমিহীনদের কাছে বণ্টন করে দেয়ার আহ্বান জানান। জনগণের জন্য শুরু হয় স্বপ্নপূরণের পর্ব। কিন্তু মাদেরো পূর্বতন প্রেসিডেন্ট দিয়াজের মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যদেরও অভ্যুত্থানের পর নিজের মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দিয়েছিলেন। ফলে অন্য বিপ্লবী নেতারা মাদেরোর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। মেক্সিকোকে পুনর্গঠনের সদিচ্ছা প্রমাণ করতে মাদেরো একটি সংস্কার কর্মসূচি প্রকাশ করেছিলেন। গ্রামীণ কৃষকদের জন্য ঋণ সিস্টেম পুনর্গঠনের মতো কিছু সংস্কারের পরিকল্পনাও ছিল। এ নীতি কিছুটা সহায়ক হলেও দুঃখজনকভাবে জমি জনগণের কাছে ফেরত যায়নি। ক্রমে ধারণা জন্মাতে থাকে মাদেরো দিয়াজের সাবেক সমর্থকদের প্রতি অতিরিক্ত নরম। ১৯১১ সালের নভেম্বরেই বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এমিলিয়ানো জাপাতা তার আইয়ালা পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি মাদেরোকে সংস্কারের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করার জন্য দায়ী করেন। জাপাতার ভূমি সংস্কারের ধারণা ছিল যথেষ্ট গভীর। তার প্রস্তাবে বলা হয়, ‘মেক্সিকোর জনগণের অধিকাংশই তাদের চলার পথ ছাড়া আর কোনো জমির মালিক নয়। দারিদ্র্যের কষ্ট সহ্য করে তারা কোনোভাবেই নিজেদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করতে সক্ষম নয়। শিল্প বা কৃষিতে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারছে না, কারণ ভূমি, কাঠ ও পানি কিছু অভিজাতগোষ্ঠীর হাতে বন্দি। এসব মুনাফা অর্জনকারী শক্তিশালী মালিকদের কাছ থেকে মুনাফার এক-তৃতীয়াংশ জাতীয়করণ করা হবে, যাতে মেক্সিকোর জনগণ জমি পায়।’
মেক্সিকোর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হিসেবে জাপাতা পরামর্শ দেন, নাগরিকদের নিজের জমি কেনার জন্য ঋণের সুযোগ পাওয়া দরকার। সে জমি বীজ বপন ও কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার হবে। নতুন জমির মালিকরা নতুন আয়ের উৎস পাবেন। তার সমর্থকরাও বিশ্বাস করতেন যে বিপ্লব ছিল তাদের প্রভুদের সঙ্গে হিসাব মেটানোর এবং নিজেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নীত করার একটি সুযোগ। এভাবে এমিলিয়ানো জাপাতার জনপ্রিয়তা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কৃষকরা তার প্রস্তাবের পক্ষে এগিয়ে আসেন। তখনকার পরিস্থিতে এটা কেবল ছিল মাত্র সময়ের ব্যাপার। এদিকে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মাদেরোকে সরিয়ে নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন হোসে ভিক্তোরিয়ানো হুয়ের্তা। তার সরকার দ্রুত বুঝতে পারল যে বিপ্লবটি সেসব মানুষের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে, যারা ভূমি সংস্কার দাবি করছিল। শুধু সরকার না, ততদিনে সবাই বুঝে গেছেন মেক্সিকোর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ আর অস্থিরতার প্রধান কারণ ভূমি সমস্যা আর প্রধান অনুঘটক কৃষক। ভূমি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিবর্তন ছাড়া বিদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না কোনো প্রকার স্থায়ী সামাজিক শান্তি।
বিপ্লবের পুরো সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মেক্সিকোর কৃষক। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের বেশিরভাগই উত্তরাঞ্চলে গেরিলা কায়দায় সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিল। কিছু কৃষক স্বাধীন দল গঠন করে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ করতে থাকেন। তাদের হাতে কিছু জমি ছিল, কিন্তু কোনো কার্যকর উপস্থিতি ছিল না। যদিও জনগণ বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, তবু এ বিভক্ত গ্রুপগুলো যে পরিবর্তনগুলো আনতে চেয়েছিল, প্রতিষ্ঠিত করার কোনো উপায় ছিল না। যৌথ বাহিনী দেশের দুই-তৃতীয়াংশ দখল করতে সক্ষম হলেও তারা নিজেদের ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অস্থিরতার মধ্যেই ১৯১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন ভেনুসতিয়ানো কারানজা। তিনি বিপ্লবী নেতা ফ্রান্সিসকো পাঞ্চো ভিয়া ও এমিলিয়ানো জাপাতার সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন কৃষক বিদ্রোহকে ঠেকানোর জন্য। কিন্তু বিদ্রোহে কৃষকশ্রেণীর সমর্থনের কারণে অচলাবস্থা নিরসন সহজ ছিল না। ১৯১৯ সালে এমিলিয়ানো জাপাতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। অবশ্য এর মধ্যেই সংবিধানটি সামাজিক শ্রেণীর জন্য কিছু পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কৃষকরা তখনো বিপ্লবে তৎপর, যা পরবর্তী দিনগুলোর রাজনৈতিক গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে মেক্সিকোকে পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। মেক্সিকোকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে পদক্ষেপগুলো প্রয়োজন ছিল। আলভারো ওব্রেগনের প্রেসিডেন্সির সময়ে দেখা যায়, শহুরে ও গ্রামীণ সমাজগুলোর সংযোগ সাধন ঘটছে। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্রের জনগণকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়। জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে প্রবেশ করে আধুনিকতার ধারণা।
বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে, যখনই নতুন নেতা সামনে এসেছে, মেক্সিকোর জনগণ কোনো না কোনোভাবে বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের পথে চলে গেছে। এটি ছিল একটি চলমান প্রবণতা। গৃহযুদ্ধের বহু আগেই মেক্সিকো বিদ্রোহের প্রমাণ দিয়েছে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার প্রমাণ হিসেবে সীমিত আকারে কার্যকরী সংবিধানও প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিপ্লব ও বিদ্রোহের এ চিরন্তন চক্রটি বিভিন্ন প্রজন্মের মেক্সিকান জনগণের মধ্যে পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বিপ্লব ছিল সে পুনরাবৃত্তি প্রবণতার মধ্যে একটি, যার রেশ আরো পরেও ছিল। বিপ্লবের ঠিক পর পরই গির্জা ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত মেক্সিকোকে সংঘাতের পথে নিয়ে যায়। তাতে যুক্ত হয় মন্দার প্রভাব। ফলে সমস্ত দেশ ও কৃষিজ আয় দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। ১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে দুর্নীতি আবার সরকারের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে থাকে। সে সময় কৃষি সংস্কার বন্ধ করার দিকে মনোযোগ দেয়া হয়। তখন বিপ্লবী প্রেসিডেন্ট ওব্রেগনের মৃত্যু হয়েছে, ক্ষমতা পেয়েছেন প্লুটারকো এলিয়াস ক্যালেস। তার কাছে গুরুত্ব পেয়েছিল মন্দা। তার এ নীতির কারণে ফের ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। ফের দানা বাঁধতে শুরু করে অসন্তোষ। তৈরি হয় অস্থিরতা; যদিও এবার গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়নি। তবে মেক্সিকোর ইতিহাসে লাজারো কার্দেনাসের আমল ছিল একটি মাইলফলক। তার ছয় বছরের পরিকল্পনা ছিল শ্রমিক সংগঠন, ট্রেনকর্মী ও কৃষকদের শক্তিশালী করার জন্য। তার লক্ষ্য ছিল সহজ: জনগণের সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে গণসমর্থন স্থাপন করা। তার নীতিগুলো কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল; তিনি যে একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা জনগণের শক্তি তাদের নিজের হাতে ফিরে আসে। ফলে জমি আবার পুনরায় বণ্টন হতে থাকে। বিষয়টি তার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট বিরোধিতা করেছিলেন, যিনি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি পছন্দ করতেন না।
কৃষকদের একত্রিত ও সরকারে তাদের বিশ্বাস স্থাপন করার প্রয়োজন ছিল বিপ্লবের সময়ে। সেটা বারবার ব্যর্থ হয়েছে বলেই মেক্সিকোয় অস্থিরতা থামেনি। নতুন মেক্সিকো সংবিধান ভূমি সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বিধি প্রদান করেছিল। জনগণের জন্য অর্থনৈতিক সাফল্য ও সামাজিক সমৃদ্ধি আনার কথা ছিল বিপ্লবের ইশতেহার। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছিল ধীরগতিতে। বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে বিপ্লবটি আরো খারাপ মোড় নেয়। এজন্যই মেক্সিকোর বিপ্লব কেবল মেক্সিকোর ইতিহাসেই না, সম্ভবত দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী ও ধ্বংসাত্মক ঘটনার একটা। মানুষ নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। কৃষকরা হতাশাজনকভাবে নিপীড়িত হচ্ছিলেন। সরকার এতটাই অস্থিতিশীল ছিল যে ক্ষমতার লড়াই বিপ্লবের পর দীর্ঘ এবং টানা ঘটনাগুলোয় প্রভাব বিস্তার করেছিল। অবশ্য নেতিবাচকতাও বিপ্লবেরই অংশ। ফ্রান্সিস্কো মাদেরো, এমিলিয়ানো জাপাতা ও লুইস কাব্রেরার মতো বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতারা জনগণের ভূমি সংস্কারের দাবির প্রতি খোলাখুলি সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফলে মেক্সিকান সমাজের সব দিকেই এ সংস্কারগুলো অর্জন করার আলোচনা ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছিল।
বিপ্লব মেক্সিকোর ভূমিগুলো পুনরুদ্ধারের প্রেরণা নিয়ে আসে। বিপ্লবোত্তর নেতারাও ভূমি সংস্কারের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রেখেছিলেন। ২০ বছর ধরে নাগরিকদের দৃঢ়ভাবে দাবিকৃত ভূমি সংস্কার অর্জনের প্রচেষ্টা চলছিল, কিন্তু এর মধ্যেই অনেক কিছু ঘটেছিল। মানুষ তাদের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পেয়েছিল, কারণ তাদের ভালো ভূমি কৃষিকাজের জন্য প্রদান করা হয়। এতে স্থিতিশীল আয় আনার সুযোগ দেয়। তাদের সামাজিক অবস্থাও পরিবর্তন হয়েছিল, কারণ আর ধনী ও গরিবের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল না। ভূমিহীন কৃষকরা ভূমির মালিক হওয়ার সুযোগ পান সংস্কারের জন্য। বিপ্লবের প্রাথমিক লক্ষ্য কার্দেনাসের প্রেসিডেন্সির মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছিল, কারণ মেক্সিকোয় গণতন্ত্র ছিল তখন। এমন নেতাদের দ্বারা চালিত হচ্ছিল, যারা মেক্সিকোর নাগরিকদের উন্নতির পক্ষে সমর্থন জানাতেন। বিপ্লবের সময়ে প্রস্তাবিত ও পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়িত ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে মেক্সিকোর অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়। রাজনৈতিক নেতারা একটি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করেন। মেক্সিকোর বিপ্লব তাই অনেকটাই কৃষক বিপ্লব, যা মেক্সিকোর রাজনৈতিক প্রবাহকে পর্যালোচনা করার জন্য সুযোগ তৈরি করেছিল। তার ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে আধুনিক মেক্সিকোর পাটাতন।
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









