ফ্রান্সিসকো ‘পাঞ্চো’ ভিয়া মেক্সিকো বিপ্লবের এক অমর নায়ক, যার দৃঢ় নেতৃত্বে পোরফিরিও দিয়াজের দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসন শেষ হয়ে মেক্সিকোয় একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। কিন্তু নতুন সরকারও যখন জনগণের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে ওঠে, তখন তিনি আবারো এক বিপ্লবী সৈনিকের ভূমিকায় ফিরে আসেন। রবিন হুড"খ্যাত এ নেতা শোষিত জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন জনবিরোধী হোসে ভিক্টোরিয়ানো হুয়ের্তা মার্কেজ ও ভেনুস্তিয়ানো কারানজাদের বিরুদ্ধে।
তার সংগ্রাম ও আপসহীন মনোভাব আজও মেক্সিকোর জনগণের হৃদয়ে এক মহান বিপ্লবীর পরিচয়ে জীবন্ত রয়েছে। তিনি সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর জন্য চেয়েছিলেন ন্যায়, সমতা ও মুক্তির পথ। পাঞ্চো ভিয়ার অবদান আজও ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস।
১৮৭৮ সালের ৫ জুন। মেক্সিকোর সান হুয়ান দেল রিও শহরে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হোসে আরাঙ্গো আরামবুলা। তিনি ইতিহাসের পাতায় অধিক পরিচিত ফ্রান্সিসকো"‘পাঞ্চো’ ভিয়া নামে। ছোটবেলায় কৃষক জীবনের কঠোরতা তিনি প্রত্যক্ষ করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি তার বাবাকে হারান। পরিবারের হাল ধরতে শুরু করেন কৃষিকাজ।
সাল ১৮৯৪। একদিন পাঞ্চো ভিয়া বাড়ি ফিরে দেখেন তার ১২ বছর বয়সী বোনের ওপর এক ব্যক্তি অমানবিকভাবে আক্রমণ করছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সী ভিয়া কোনো দ্বিধা না করে বোনকে রক্ষা করতে সে আক্রমণকারীকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর নিজের জীবন রক্ষা করতে তাকে পালিয়ে যেতে হয়।
১৮৯৪-১৯১০ সাল পর্যন্ত এ সময়টুকু ভিয়া বেশিরভাগ সময় পাহাড়ে কাটান। এ সময়ে তিনি ডাকাতের দলে যোগ দেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই তাদের নেতা হয়ে ওঠেন। আসল নাম হোসে আরাঙ্গো আরামবুলা বাদ দিয়ে নতুন পরিচয়ে পরিচিত হন—ফ্রান্সিসকো ‘পাঞ্চো’ ভিয়া। ভিয়া ও তার ডাকাতের দল মূলত মেক্সিকোর ধনীদের বিরুদ্ধেই নানা অপরাধ করত। ধনীদের অর্থ লুট করে প্রায়ই তা গরিবের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন বলে অনেকেই ভিয়াকে এক ধরনের আধুনিক ‘রবিন হুড’ হিসেবে দেখত।
পাঞ্চো ভিয়ার ডাকাত হিসেবে খ্যাতি এবং ধরা পড়ার হাত থেকে পালানোর দক্ষতা মেক্সিকোর কিছু বিপ্লবী ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারা বুঝতে পেরেছিল ভিয়ার দক্ষতা তাকে একজন চমৎকার গেরিলা যোদ্ধা বানিয়ে তুলবে।
সাল ১৯১০। পাঞ্চো ভিয়া তখনো একজন পলাতক হিসেবে জীবনযাপন করছিলেন। তিনি ফ্রান্সিসকো মাদেরোর নেতৃত্বে মেক্সিকান স্বৈরশাসক পোরফিরিও দিয়াজের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহে যোগ দেন। ভিয়ার যুদ্ধ ও ভূমির প্রতি জ্ঞানের দক্ষতার কারণে তিনি বিপ্লবী নেতা হিসেবে অভিষিক্ত হন। তার নেতৃত্বে ১৯১১ সালে সিউদাদ জুয়ারেজের প্রথম যুদ্ধে বিদ্রোহীরা জয়লাভ করে। ধীরে ধীরে তারা পোরফিরিও দিয়াজকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ফ্রান্সিসকো মাদেরো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ভিয়াকে কর্ণেল পদে অধিষ্ঠিত করেন।
পাঞ্চো ভিয়ার বিপ্লবী জীবনের এটি ছিল শুরুমাত্র। মাদেরো সরকারের অধীনে মেক্সিকোর শান্তিকাল দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। শিগগিরই মাদেরোর ক্ষমতা আরেকটি বিদ্রোহের মুখে পড়ে। ১৯১২ সালে পাসকুয়াল ওরোস্কো নামে এক বিপ্লবী নেতা মাদেরোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মাদেরোর পক্ষে অতীতে কাজ করা ওরোস্কো তার শাসনে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তাকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহে নামেন।
জেনারেল হোসে ভিক্টোরিয়ানো হুয়ের্তা মার্কেজ ও পাঞ্চো ভিয়া মিলে মাদেরোর শাসন রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিলেন। তবে ভিয়ার সঙ্গে ক্রমেই ভিক্টোরিয়ানো হুয়ের্তার মতবিরোধ শুরু হয়। ঘোড়া চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করে ভিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। যদিও ওরোস্কো মাদেরো শেষ মুহূর্তে ভিয়াকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেয়ার ব্যবস্থা করেন, তবু তাকে ১৯১২ সালের জুনে কারাগারে বন্দি করা হয়। তবে সে কারাগার বেশি দিন পাঞ্চো ভিয়াকে আটকে রাখতে পারেনি। ডিসেম্বরেই কারাগার থেকে পালিয়ে যান তিনি।
২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৩। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো মাদেরোকে হত্যা করে ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেন জেনারেল হোসে ভিক্টোরিয়ানো হুয়ের্তা মার্কেজ। হুয়ের্তার শাসন বৃদ্ধি পেলে ভিয়া তার সাবেক সঙ্গী এমিলিয়ানো জাপাতা ও ভেনুস্তিয়ানো কারানজার সঙ্গে একত্র হয়ে নতুন প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করার উদ্যোগ নেন। অভিজ্ঞ বিপ্লবী নেতা ভিয়া উত্তরের মেক্সিকোর অধিকাংশ সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন বিদ্রোহের সময়।"‘ডিভিশন ডেল নর্তে’ বা উত্তরের ডিভিশন" নামে পরিচিত সৈন্যদের বিশাল দল নিয়ে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন ভিয়া। পরবর্তী কয়েক বছরে একের পর এক যুদ্ধে জয়লাভ করেন।
সাল ১৯১৪। বিপ্লবী নেতা পাঞ্চো ভিয়া ও ভেনুস্তিয়ানো কারানজা একে অন্যের শত্রুতে পরিণত হন। তাদের মধ্যে মূলত ভূমি মালিকানার মৌলিক সংস্কার, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রম ও সামাজিক আইন প্রণয়নের বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। একদিকে জনগণের অধিকার ও ভূমি সংস্কারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন ভিয়া, অন্যদিকে ধনীদের স্বার্থে কাজ করতে থাকা নতুন প্রেসিডেন্ট কারানজা তার অবস্থান তৈরি করেন।
এ অমিলের ফলে মেক্সিকো এক গৃহযুদ্ধে নিপতিত হয়, যেখানে ভিয়া ও কারানজা একে অন্যের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। ওই সময় দেশজুড়ে বিশাল রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং দুই বিপ্লবী নেতা তাদের নিজ নিজ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে তীব্র লড়াইয়ে নামেন।
কারানজার নেতৃত্বের প্রতি হতাশ হয়ে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে ভিয়া জোট বাঁধেন এমিলিয়ানো জাপাতার সঙ্গে। একই সঙ্গে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের সমর্থন নিয়ে কারানজাকে উৎখাত করার চেষ্টা করেন। তবে ভেনুস্তিয়ানো কারানজা মেক্সিকোকে গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ১৯১৭ সালে উইলসন ভিয়ার প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন।
প্রেসিডেন্ট উইলসন যখন ভিয়ার বিরুদ্ধে জেনারেল জন পারশিংকে মেক্সিকোয় পাঠান, তখন কারানজার সহযোগিতায় ১৯১৬ ও ১৯১৯ সালে ভিয়াকে ধরার জন্য দুটি অভিযান চালানো হয়। কিন্তু এসব অভিযানে কোনো ফল আসেনি। পাঞ্চো ভিয়া তার গেরিলা কৌশল বজায় রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। একাধারে মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে তার প্রভাব ও নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
সাল ১৯২০। মেক্সিকোর গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ফেলিপ অ্যাডলফো দে লা হুয়ের্তা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশকে শান্তিপূর্ণ করতে তিনি পাঞ্চো ভিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং তাকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। ভিয়া এ প্রস্তাব গ্রহণ করে ১৯২০ সালে তার বিপ্লবী জীবন থেকে অবসর নেন। তিন বছর পর ২০ জুলাই, ১৯২৩ মেক্সিকোর পারাল শহরে তাকে হত্যা করা হয়। আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেও ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে যান ফ্রান্সিসকো ‘পাঞ্চো’ ভিয়া।
মেক্সিকান বিপ্লবে তার ভূমিকার জন্য ভিয়া জনগণের নায়ক হয়ে ওঠেন। তার জীবনকাহিনী বহু সিনেমায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্য লাইফ অব জেনারেল ভিয়া (১৯১৪), ভিভা ভিয়া! (১৯৩৪) ও পাঞ্চো ভিয়া রিটার্নস (১৯৫০)। তার জীবনের নানা ঘটনার ওপর ভিত্তি করে দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব পাঞ্চো ভিয়া বইটি লিখেছেন ফ্রেডরিক কাটজ।
মিনহাজুল আবেদীন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা





