পৃথিবীর সব দেশে, সব জাতির মধ্যেই বিপ্লবের হাওয়া বয়। মেক্সিকোও এর ব্যতিক্রম না। সে দেশটিতে বিপ্লব এসেছিল ১৯১০ সালে। এর ১৫ বছর আগে লুমিয়ের সিনেমাটোগ্রাফ আসে। বলা যায় সিনেমার সূচনা হওয়ার পর ফিল্মে ধরে রাখার মতো এটিই প্রথম সংঘর্ষ বা বড় রাজনৈতিক ঘটনা। এর আগে স্প্যানিশ আমেরিকান যুদ্ধ (১৮৯৮) ও বোয়ার যুদ্ধ (১৮৯৯-১৯০২) হলেও ১৯১০ সালে শুরু হয়ে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত চলা মেক্সিকান যুদ্ধ অনেক বড় প্রভাব ফেলেছিল সিনেমার মানুষের মধ্যে। তারা ওই সময়কার পরিস্থিতি বড় পরিসরেই ক্যামেরায় তুলেছেন এবং তা বিশ্বাবাসীর কাছে পৌঁছেও দিয়েছেন। এসব মেক্সিকো ও তার বাইরের মানুষের মনেও প্রভাব ফেলেছে।
এমন না যে কেবল মেক্সিকোর বিপ্লব নিয়ে সিনেমা হয়েছে। বরং মেক্সিকোর বিপ্লবই এ অঞ্চলের সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। মেক্সিকোর বিপ্লব এ অঞ্চল ও তার আশপাশের সিনেমার নির্মাতাদের প্রভাবিত করেছে। তারা সিনেমা নির্মাণ করেছেন এবং সিনেমা পেয়েছে নতুন ভাষা, ইমেজ, গল্প বলার ধরন ইত্যাদি।
১৯১০ সালে জেনারেল পোর্ফিরিও ডায়াজের একনায়কতান্ত্রিক শাসকের বিরুদ্ধে ফ্রান্সিসকো আই মাদেরো প্রতিবাদ করেন। এর পরই শুরু হয় দেশজুড়ে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সরকারের অত্যাচার। এসব বিষয় প্রভাবিত করেছিল ক্যামেরাম্যান ও সিনেমা বিপণনকারী জেজাস এইট অ্যাবিটিয়া, সালভাদর তোসকানো ও অ্যালভা ব্রাদার্সকে। তারা মেক্সিকোর নানা প্রান্ত ঘুরে ছবি তুলেছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের এ দ্রুত পরিবর্তনশীল অবস্থার নথি হিসেবে এসব রাখা। এর মধ্যে দিয়ে তারা বেশ কয়েকজন বিপ্লবী নেতার প্রচার প্রসারেও অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন মাদেরো, ভেনুসিয়ানো ক্যারানজা ও আলভারো ওব্রেগন। মানুষের কাছেও এ চলচ্চিত্রগুলো প্রামাণ্য হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছিল। ফলে সিনেমার নির্মাতারও কাজ এগিয়ে নিতে থাকেন। তারা সাধারণ থেকে আরো জটিল গল্প বলার চেষ্টা করতে শুরু করেন। ফলে সিনেমা নতুন ভাষা পায়।
১৯১১ সালে সালভাদর তোসকানো নির্মাণ করেছিলেন দ্য টেকিং অব সুয়াদেদ জুয়ারেজ অ্যান্ড দ্য জার্নি অব ডন ফ্রান্সিসকো আই মাদেরো, হিরো অব দ্য রেভল্যুশন। সিনেমাটি হারিয়েই গিয়েছিল এক রকম, তবে সম্প্রতি এটির সংস্কার করা হয়েছে। তোসকানো নিজে এ বিষয়ে সিনেমা নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তার সিনেমা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টাব্যাপীও দীর্ঘ।
তার পরবর্তী সিনেমা নির্মাতারা বিষয়টিকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে আছে কারমেন তোসকানোর মেমোরিয়াস দে আন মেক্সিকো (মেমোয়ার্স অব মেক্সিকো, ১৯৫০) ও এপোপেয়াস দে লা রেভল্যুশন (এপিকস অব দ্য রেভল্যুশন, ১৯৬৩)।
এখন পর্যন্ত উল্লিখিত সিনেমাগুলো মেক্সিকান বিপ্লবের কম্পাইলেশন বলা চলে। এ ধারার সিনেমা মেক্সিকোর বিপ্লব চলাকালীন প্রায় ১৯২০ সাল পর্যন্ত নির্মাণ হতো নিয়মিত বিরতিতে। এরপর ধীরে ধীরে তা দর্শকপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে। এ সময় হলিউড ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং মেক্সিকোর দর্শকও হলিউডের দেখানো স্বপ্নে বিভোর হতে থাকে। এদিকে ১৯৩০-এর দশকে মেক্সিকো মোটামুটি শান্ত থাকার কারণে অতীত সামলে নিয়ে মেক্সিকান সিনেমা আরো সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। এ সময় ফার্নান্দো দে ফুয়েন্তেস তিনটি সিনেমা নির্মাণ করেন, যা রেভল্যুশনারি ট্রিলজি নামে পরিচিত। এগুলো হলো এল প্রিসিওনেরো ট্রিস (প্রিজোনার থার্টিন, ১৯৩৩), এল কমপাদ্রে মেন্দোজা (ফ্রেন্ড মেন্দোজা, ১৯৩৩) ও ভামোনোস কন পাঞ্চো ভিয়া (লেটস হো উইথ পাঞ্চো ভিয়া, ১৯৩৫)।
এ সিনেমাগুলোকে মেক্সিকান বিপ্লবের ওপর নির্মিত সেরা সিনেমার তালিকায় রাখা হয়। শৈল্পিক গুণের পাশাপাশি সিনেমাগুলোয় শারীরিক সহিংসতা, মানসিক অস্থিরতা, বিপ্লবের সময়ে সমাজে চলমান বৈরী পরিস্থিতি, হিংসা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রসঙ্গ এসেছে। সিনেমাগুলো ভিক্টোরিয়ানো হুয়ের্তার সময়কার কয়েকটি মিলিটারি ব্যারাকের পটে নির্মিত। সিনেমায় দেখা যায় ব্যারাকের ভেতরকার অবস্থা। এছাড়া তৎকালীন সরকার ও বিপ্লবীদের মধ্যে কোন পক্ষকে বেছে নেয়া হবে তা নিয়েও এদের মধ্যে দোটানার বিষয়টি সিনেমায় এসেছে।
তিনটি সিনেমার মধ্যে ভামোনোস কন পাঞ্চো ভিয়াকে সিনেমা হিসেবে এবং মেক্সিকান বিপ্লবের পুরো সময়, রাজনীতি ইত্যাদি বোঝানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল বলে মনে করা হয়। সিনেমার প্রধান চরিত্রদের মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিপ্লবকালীন বাস্তবতা, তাদের কর্তব্য ও ভালোবাসার মানুষের মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নেয়ার দ্বন্দ্ব সিনেমায় উঠে এসেছে। এ রেভল্যুশনারি ট্রিলজি মেক্সিকান বিপ্লব ও তার পরবর্তী সময়ের মেক্সিকোর মানুষ, জীবন, রাজনীতি ও জীবন বাস্তবতার কথা বলে। এমনকি ভামোনোস কন পাঞ্চো ভিয়া রীতিমতো একজন বিপ্লবীকেই সরাসরি দেখিয়েছে। তার এ সিনেমার আগে আমেরিকান, এমনকি মেক্সিকান সিনেমায়ও বিপ্লব ও বিপ্লবীদের দেখানো হতো পৌরাণিক রূপে। এ সিনেমায়ই তাদের মানবিক উপস্থাপন দেখা যায়।
ত্রিশের দশকের শেষে বিপ্লব-পরবর্তী শাসন ব্যবস্থার আনুকূল্য কামনা করে মেক্সিকোর সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। ফলে সিনেমায় বিপ্লবকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখার আর সুযোগ ছিল না। এর মধ্যেও ১৯৪৩ সালে নির্মিত এমিলিও ফার্নান্দেজের ফ্লর সিলভেসট্রে (ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার) মেক্সিকান বিপ্লবের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু সেটা করা হয়েছে উপমা দিয়ে। ত্রিশের দশকের শুরুর মতো সরাসরি না। ফার্নান্দেজের সিনেমায় পরিবার, পরিবারের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয় উঠে আসে। সিনেমায় তিনি সরাসরি কথা বলার বিষয়ে বেশ রক্ষণশীল। ফ্লর সিলভেসট্রেতে হোসে লুইয়ের গল্প বলেছেন তিনি। লুই প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন ও আঘাত করে। সিনেমাটি নাটকীয়ভাবে গল্প বলে। সেখানে মেক্সিকান বিপ্লব থাকে আসলে মূল গল্পের পেছনে। সরাসরি বিপ্লবের কথা আসেনি।
ষাটের দশকের একটি সিনেমার নাম করা যায়। হোসে বোলানস ১৯৬৬ সালে নির্মাণ করেন লা সোলদাদেরা। এ সিনেমায় বিপ্লবে অংশ নেয়া নারীদের গল্প বলা হয়েছে। ষাটের দশকে এ গল্প বলতে পারার কারণ সে সময় মেক্সিকান সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আর্থিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী হয়েছিল। এ সিনেমায় এক ফেডারেল সৈন্যর স্ত্রীর গল্প বলা হয়েছে। সৈন্যটি মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী বিপ্লবী নারীদের সঙ্গে যুক্ত হন। সিনেমায় বেশকিছু নৃশংসতার দৃশ্য আছে। এছাড়া দৃশ্যায়ন ও চিত্রায়নে সিনেমাটি বেশ এগিয়ে থাকে।
১৯৭০ সালে সিনেমা রিড: মেক্সিকো ইনসার্জেন্টে (রিড: ইনসার্জেন্ট মেক্সিকো)। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন পল লেদু। এটি ওই সময়কার একটি স্বাধীন চেষ্টা। সিনেমাটিতে নির্মাতা যথাসম্ভব স্পষ্ট ও সত্য উচ্চারণ করেছেন। এর মধ্যে বিপ্লবকালীন নস্টালজিয়ার পাশাপাশি আছে বিপ্লবের কাব্যিক বিনির্মাণ। সিনেমাটিতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনাও দেখা যায়।
আর্জেন্টাইন তথ্যচিত্রেও মেক্সিকোর বিপ্লব এসেছে। তেমনই একটি সিনেমা মেক্সিকো, লা রেভল্যুশন কংগেলাদা (মেক্সিকো, দ্য ফ্রোজেন রেভল্যুশন)। রেমুন্দো গ্লেযেয়ার ১৯৭০ সালে এটি নির্মাণ করেন। হলিউড এপিকের তুলনায় এ সিনেমা অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ছিল। যেমন ১৯৫২ সালে এলিয়া কাযান নির্মাণ করেছিলেন ভিভা জাপাতা। সিনেমাটি ছিল বিপ্লববিরোধী। এমন আরো অনেক সিনেমায়ই বিপ্লবের তুলনায় স্থানীয় সংস্কৃতি ও মিথ তুলে আনা হয়েছে।
এ শতকেও সিনেমা হয়েছে মেক্সিকান বিপ্লব নিয়ে। এর মধ্যে ২০১০ সালে ফেলিপ ক্যাজালস নির্মাণ করেন চিকোগ্রান্দে। জর্জ ফন্স নির্মাণ করেন এল অ্যাটেন্টাদো। কিছু সিনেমা অনেকটা স্মৃতিস্তম্ভের মতো, কেবল ঘটনাকে স্মরণ করে। বাকি সিনেমাগুলো ঘটনাকে মূর্ত করে তোলে।
মাহমুদুর রহমান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা ও লেখক









