সিয়েরা মরেনা পর্বত চূড়া আর গোয়াদালকিভির নদীর স্রোতধারায় সিক্ত এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে যে স্থাপত্যকীর্তি সব মুসলিম সভ্যতাকে সগৌরবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করে তার নাম কর্ডোভা। অষ্টম থেকে প্রায় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানরা স্পেন জয় করে ইউরোপে ইসলাম প্রতিষ্ঠাই করেননি; বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শনের মতো জ্ঞানচর্চায় অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন। আজ বিজ্ঞানের যে প্রাপ্তিগুলোকে ইউরোপীয়দের কৃতিত্ব বলে দাবি করা হয়, তার অনেকগুলোর পেছনেই সে যুগের মুসলমানদের অবদান আছে।
মধ্যযুগে যেসব স্থানে আরব সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এর মধ্যে স্পেন অন্যতম। ৭১১ সালে অঞ্চলটি মুসলিম শাসনাধীনে আসে। মুসলিমরা এর নাম দিয়েছিল আন্দালুসিয়া বা আল-আন্দালুস। শুরুতে স্পেন দামেস্কের উমাইয়া খিলাফতের অধীনে একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হয়েছিল। ৭৫৬ সালে আবদুর রহমান আদ-দাখিল এখানে একটি স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। ৯২৯ সালে তৃতীয় আবদুর রহমান এ আমিরাতকে খিলাফতে উন্নীত করেন। এ সুদীর্ঘ সময়ে মুসলিমরা স্পেনে স্থাপত্য, শিল্পকলা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজ্যে তাদের অবদান স্মরণীয় করে তোলেন। তখন থেকেই রচিত হয় কর্ডোভার এক কিংবদন্তি গৌরবোজ্জল ইতিহাসের! এরপর কয়েক শতাব্দী কর্ডোভা ছিল মুসলমান স্পেনের রাজধানী। জ্ঞান-বিজ্ঞান, স্থাপত্য, নগর উন্নয়ন সবদিক দিয়েই কর্ডোভা দুনিয়ার সব শহরকে ছাড়িয়ে যায়। বিরাট বিরাট ভবন, সুন্দর রাজপথ, মজবুত সেতু, সড়ক বাতি, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, উন্নত শিল্পকারখানা ও নতুন নতুন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সবই ছিল এ নগরে। তাই কর্ডোভাকে বলা হতো—the ornament of the world (দুনিয়ার অলংকার)।
এককালের ইউরোপের মুসলিম সভ্যতার প্রতীক কর্ডোভার অন্যতম রাজধানী শহর মদিনা-তুজ-জাহরা। একদিকে সিয়েরা মরেনা পর্বত চূড়া, অন্যদিকে স্রোতস্বিনী গোয়াদালকিভির নদীর পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকায় মুসলিম স্মারক ঐতিহ্যে নির্মাণ হয়েছিল মদিনা-তুজ-জাহরা। তৎকালে স্থাপত্য নিদর্শনের বিবেচনায় পৃথিবীর সব শহরকে ছাড়িয়ে যায় তৃতীয় আবদ আর রহমান (৯১২-৯৬১ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত রাজধানী শহর মদিনা-তুজ-জাহরা। এ শহরেই কর্ডোভার খিলাফতের রাজধানী এবং সরকারের কেন্দ্র হিসেবে নতুন যাত্রাপথের শুরু হয়। ইউরোপে মুসলিম শাসকদের হাতে রচিত হয় এক কিংবদন্তি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের! সাহিত্যিক সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী কর্ডোভার ইতিহাসে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘প্রাচীনকালে সভ্যতা, সৌন্দর্য ও শিক্ষার বিচিত্র লীলাভূমি ও কীর্তি মন্দির বলিয়া যে সমস্ত মহানগরী খ্যাতিলাভ করিয়াছিল, তন্মধ্যে গৌরবোন্নত, সৌন্দর্য-সমালঙ্কৃত, সমৃদ্ধিসম্পন্ন স্পেনের কর্ডোভা মহানগরী অন্যতম। বোগদাদ ব্যতীত কর্ডোভা মহানগরীর সহিত অপর কোনও নগরীর নামও উল্লেখিত হইবার যোগ্য নহে। স্পেনকে পরী বলিয়া কল্পনা করিলে কর্ডোভাকে তাহার চক্ষু বলিয়া স্থান দিতে হয়। প্রাচীন আরব ঐতিহাসিকরা কর্ডোভাকে স্পেনের পাত্রী বা কনে (Bride) বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। গৌরবের দিনে কর্ডোভার ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য, শিক্ষা ও সভ্যতা, শিল্প ও বাণিজ্য, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য, আমোদ-প্রমোদ ও বিলাস-উল্লাস, একত্র পুঞ্জীভূত হইয়া ইহাকে কবি-চিত্ত-সম্মোহন কল্পনাতীত সুন্দরী ও সুখময়ী করিয়া তুলিয়াছিল।’
স্পেনে উমাইয়া শাসকরা বিশেষ করে ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় আবদুর রহমান নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তার এ নতুন উপাধির মর্যাদার জন্য একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। স্পেনের উমাইয়া খলিফারা ছিলেন উত্তর আফ্রিকার ফাতেমীয় ও বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। সুতরাং তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ফলে নতুন রাজধানী শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কর্ডোভা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে সিয়েরা মরেনার ঢালে নির্মিত এ ঐতিহাসিক স্থাপত্য শহর যুগে যুগে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জলপাই, ওক ও পাইন বৃক্ষে আচ্ছাদিত নতুন নগরীর প্রতিষ্ঠাতা খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান প্রিয়তমা পত্নী আজ জাহরার নামানুসারে এর নামকরণ করেন। গবেষকরা মনে করেন মদিনা-তুজ-জাহরা নামকরণ করা হয়েছিল, কারণ এর অর্থ ফুলের শহর"বা উজ্জ্বল শহর।
খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। তার প্রতিষ্ঠিত মদিনা-তুজ-জাহরাকে সুন্দর ও পরিকল্পিত শহর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এ নগরীর পরিকল্পনা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। শহরটি তিনটি ধাপে নির্মিত হয়েছিল: প্রথম ধাপে ছিল খলিফার প্রাসাদ, দ্বিতীয় ধাপে উদ্যান ও তৃতীয় ধাপে মসজিদ, অভ্যর্থনা কক্ষ ও দাসদাসীদের আবাসগৃহ। ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে এ প্রাসাদনগরী নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণসামগ্রী আনা হয়েছিল আলজেরিয়া, কনস্টান্টিনোপল, রোম, কার্থেজ, সাফেক্স, নারবোন ও র্যাটিকা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে। জাহরা প্রাসাদের জন্য কনস্টান্টিনোপল সম্রাট অনেকগুলো সুরম্য স্তম্ভও প্রেরণ করেছিলেন। এ প্রাসাদের জন্য সুদৃশ্য কারুকাজ করা কাঠ, লোহা ও তামা দিয়ে নির্মিত হয়েছিল দরজা,
যার সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। তৃতীয় আবদুর রহমান তার রাজত্বকালের সুদীর্ঘ ২৫ বছরের বার্ষিক আয়ের এক-তৃতীয়াংশ প্রতি বছর এ নগরীর নির্মাণকাজে ব্যয় করতেন। তিনি এর কাজ শেষ করতে না পারায় তার পুত্র দ্বিতীয় আল-হাকামের শাসনামলজুড়ে (৯৬১-৯৭৬) শহরের নির্মাণকাজ অব্যাহত ছিল। উভয় খলিফার অধীনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শহরের নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
মদিনা-তুজ-জাহরায় যে প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল তা এক মাইল দীর্ঘ এবং অর্ধ মাইল প্রস্থ নিয়ে আয়তাকারবিশিষ্ট। এতে ছিল কৃত্রিম ও স্বাভাবিক স্রোতস্বিনী ও ঝরনা, ফলফুল সম্ভারে পরিপূর্ণ মনোরম উদ্যান, কর্মচারী ও সেনাবাহিনীদের জন্য সুবিন্যস্ত বাসভবন। আরো ছিল স্নানাগার, কর্মচারীদের বাসগৃহ, বাজার, সরাইখানা, বিদ্যালয় সবকিছুই। প্রফেসর এবিএম হোসেন তার আরব স্থাপত্য গ্রন্থে ঐতিহাসিকদের বরাত দিয়ে দেখিয়েছেন, শহরের পানির ফোয়ারাগুলো ছিল অন্যতম শোভাবর্ধনকারী। তিনি বলেছেন, শোভাবর্ধন ব্যতীত ফোয়ারা অজুখানারূপেও ব্যবহার হতো বলে অনুমিত হয়। জাহরা নগরী নির্মাণে যারা পরিকল্পনাকারী ও স্থপতি হিসেবে কাজ করেছিলেন, তারা হলেন আবদ আল্লাহ বিন ইউনুস, হাসান বিন মুহম্মদ, আলী বিন সফর ও সুনাইফ।
কর্ডোভায় নতুন নির্মিত জাহরা প্রাসাদের দরবার কক্ষটি ছিল ইউরোপের সর্বাপেক্ষা জাঁকজমকপূর্ণ দরবারগুলোর অন্যতম। সে দরবারে বাইজেন্টাইন সম্রাট এবং জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের রাজাদের পক্ষ থেকে দূত আনাগোনা করত। পিকে হিট্টি এ দরবারের বিবরণে বলেছেন, ‘আজ-জাহরা প্রাসাদে যখন খলিফা বসতেন, তখন ৩ হাজার ৭৫০ জন স্লাভ দেহরক্ষী তাকে ঘিরে থাকত। তার এক লাখ সুশিক্ষিত সৈন্য ছিল। দেহরক্ষীরা তাদের আগে চলত। জার্মান ও অন্যরা স্লাভোনিক জাতির লোকদের বন্দি করে এনে আরবদের কাছে বিক্রি করত। কেবল এদেরই স্লাভ বলা হতো। পরবর্তীকালে ফিরিঙ্গি, গ্যালিসিয়ান, লম্বার্ড ও অন্যান্য জাতি থেকে যত দাস কেনা হতো, তাদের সবাইকে স্লাভ নাম দেয়া হয়। এদের সাধারণত অল্প বয়সে কিনে আরবীয়করণ করা হতো। স্পেনের এ জেনিসারি বা মামলুকদের সাহায্যে কেবল যে রাজদ্রোহ ও দস্যুতা দমন রাখা হতো এমন নয়, প্রাচীন আর অভিজাত সমাজের প্রভাবকেও আয়ত্তে রাখা হতো।’ দরবারের হলঘরের মধ্যভাগে ছিল পারদ দিয়ে ভরা মার্বেলের চৌবাচ্চা। খলিফা নিজ ইচ্ছানুসারে এ জলাধারের পারদকে সময়ে সময়ে আন্দোলিত করে সম্মানিত অতিথিদের হতবাক করে দিতেন।
মোটামুটি দশম শতাব্দীতে কর্ডোভা সমস্ত ইউরোপের মধ্যে সংস্কৃতির দিক দিয়ে সবচেয়ে উন্নত শহর এবং বাগদাদ ও কনস্টান্টিনোপলের সঙ্গে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তিনটি সংস্কৃতি কেন্দ্রের অন্যতম ছিল। কর্ডোভার পরিবার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার, শহরতলি ছিল ২১টি, কুতুবখানা ছিল ৭০টি, মসজিদ ও প্রাসাদ ছিল অসংখ্য। স্বভাবতই এর খ্যাতি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর দৃশ্য ভ্রমণকারীদের মনে বিস্ময়-সম্ভ্রমের উদ্রেক করে। শহরে বহু মাইল বিস্তৃত ইট বাঁধানো পাকা রাস্তা ছিল এবং দুপাশের বাড়ির দীপের প্রভায় গলিগুলো আলোকোজ্জ্বল হয়ে থাকত। এ সময়ের ৭০০ বছর পর লন্ডনে একটি সরকারি বাতি দেখা যায়নি। এর অনেক শতাব্দী পর পর্যন্ত প্যারিসে কোনো বৃষ্টির দিনে কেউ সিঁড়ি বেয়ে ঘরে উঠলে তাকে এক হাঁটু কাদা নিয়ে উঠতে হতো। নবম-দশম শতাব্দীতে অসংখ্য মসজিদ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পুষ্পোদ্যান, স্নানাগার, বিপণি, দুর্গ, প্রাসাদসহ কর্ডোভার রাজধানী শহর জাহরা নগরীকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করেছিল। মদিনা-তুজ-জাহরা নগরীর নির্মাণ আজও বিশ্ববাসীর মনে বিস্ময়ের উদ্রেক সৃষ্টি করে। পুরনো এ শহরের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে শুধু ইতিহাস নয়, সাহিত্যের একটা অংশেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। El Embajador de Medina Azahara উপন্যাসে Mileham যেমন বলেছেন, the lost city of Medina Azahara, including its gardens, which are considered the earliest well-preserved example of a Paradise garden in the Muslim world।
ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়







