উমাইয়া রাজবংশের খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। এ উপাধির গৌরব ও তার ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তিনি একটি নতুন শহর নির্মাণের নির্দেশ দেন। তার আদেশে কর্ডোবার পশ্চিম উপকণ্ঠে গড়ে ওঠে মদিনা-তুজ-জাহরা বা ‘দীপ্যমান শহর’। যদিও নগরীটির প্রতিষ্ঠার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক, তবে স্থাপত্য শিল্পের জীবন্ত গবেষণাগারে পরিণত হয়।

শহরটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ৯৩৬-৯৪০ খ্রিস্টাব্দে খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে। পরে তার পুত্র দ্বিতীয় হাকামের শাসনামলে (৯৬১-৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ) একাধিক ধাপে নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে। কালের পরিক্রমায় নগরীটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও এর অবশেষ আজও দাঁড়িয়ে আছে এক মহিমান্বিত অতীতের সাক্ষী হয়ে, যা বর্তমানে ইউনেস্কো ঘোষিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।

সিয়েরা মোরেনার পাদদেশে, কর্ডোবা থেকে ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে, জাবাল আল-আরুস পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠেছিল মদিনা-তুজ-জাহরা শহরটি। শহরটির দৈর্ঘ্য ছিল ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার, পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত। প্রস্থ ছিল ৭৫০ মিটার, উত্তর থেকে দক্ষিণে। শহরটিকে ঘিরে ছিল শক্তিশালী পাথরের প্রাচীর ও বর্গাকৃতির দুর্গ। প্রাচীরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী, যার ১১২ হেক্টর এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছিল এক ঐশ্বর্যের চিত্র। তবে আজকের দিনে, প্রায় এক হাজার বছর পর খনন ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এর মাত্র ১০ হেক্টর এলাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, শহরের সবচেয়ে উঁচু স্থানটি ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২১৫ মিটার ওপরে। ঠিক বিপরীতে, দক্ষিণ প্রান্তে ছিল শহরের সবচেয়ে নিচু এলাকা, যা প্রায় ৭০ মিটার নিচে অবস্থিত। মদিনা-তুজ-জাহরা শহরের একটি প্রান্ত নদীর দিকে ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছিল। অন্যদিকে পাহাড়ি ঢালে তৈরি করা হয়েছিল তিনটি স্তর। প্রতিটি স্তরের উচ্চতা ছিল ১০ মিটারেরও বেশি পার্থক্য।

অন্যান্য ইসলামী রাজধানীর মতো মদিনা-তুজ-জাহরা দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত ছিল—প্রাসাদ (আল-কাসর) ও শহর (আল-মদিনা)। শহরের আল-কাসর অঞ্চল নিজেও ছিল পূর্ব ও পশ্চিম অংশে বিভক্ত। পূর্ব অংশটি ছিল প্রশাসনিক এবং আনুষ্ঠানিক কার্যকলাপের কেন্দ্র, যেখানে অবস্থিত ছিল অভ্যর্থনা কক্ষ ও প্রশাসনিক ভবন। অন্যদিকে পশ্চিম অংশটি ছিল খলিফাদের ব্যক্তিগত আবাসভূমি। সেখানে তাদের বাসস্থানগুলো ছিল শান্ত, বিলাসিতাময় পরিবেশে অবস্থিত। মদিনা-তুজ-জাহরা সর্বোচ্চ স্থানে খলিফার বাসভবন নির্মাণ করা হয়।

একটি সুউচ্চ প্রাচীর প্রাসাদ এলাকা ও নগরীকে আলাদা করে রেখেছিল। প্রাচীরঘেরা প্রাসাদে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের ‘বাব আল-সুদ্দা’, বা ‘রাষ্ট্রের ফটক’-এর মধ্য দিয়ে যেতে হতো। বিশাল প্রবেশদ্বারটি প্রাসাদের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত ছিল। এর সামনে প্রধান প্রবেশপথকে ঘিরে ছিল ১৪টি বিশাল খিলান। মাঝের খিলানটি ছিল অশ্বখুরাকৃতির, যা মূল প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার হতো। সারিবদ্ধ স্তম্ভের এ পথ ধরে সুসজ্জিত অভ্যর্থনা কক্ষের দিকে যাওয়ার সময় এক ধরনের বিস্ময় ও সম্ভ্রমের অনুভূতি সৃষ্টি হতো।

শহরের নিচের স্তরটি তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। এর পূর্ব অঞ্চলটি প্রায় ৭০০ মিটার বিস্তৃত ছিল এবং এটি ছিল মদিনা-তুজ-জাহরা মূল নগর এলাকা ও সাধারণ মানুষের বসতি। সম্প্রতি খননকার্য থেকে জানা গেছে, শহরের নিম্ন অঞ্চলে একাধিক প্রবেশদ্বার ছিল। উত্তরের প্রবেশদ্বারটি সরাসরি প্রাসাদের দিকে নিয়ে যেত। দক্ষিণ প্রাচীরের মাঝামাঝি ছিল ‘বাব আল-কুব্বা’ বা গম্বুজের প্রবেশদ্বার, আর পূর্ব প্রাচীরে ছিল ‘বাব আশ-শামস’ বা ‘সূর্যের প্রবেশদ্বার’।

প্রধান ফটক পেরোলেই প্রাসাদের প্রশাসনিক এলাকা, যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দপ্তর ছিল। উমাইয়া খলিফারা উজির নিয়োগ করতেন। তারা খলিফার উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। যদিও তারা মূল শহরে বসবাস করতেন, তাদের দপ্তর ছিল প্রাসাদের ভেতরে ‘দার আল-উজারা’ বা উজিরদের ভবনে। প্রায় ২০০ মিটার চওড়া পশ্চিম অঞ্চলটিতে ছিল সেনাবাহিনীর ব্যারাক, যেখানে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এ অঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবন ছিল ‘দার আল-জুন্দ’ বা সেনাবাহিনীর ভবন, যা সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক ও কৌশলগত সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার হতো।

sd

মদিনা-তুজ-জাহরা খলিফাদের বাসভবন ছিল নগরের পূর্ব দিকে, যা প্রশাসনিক এলাকা থেকে কিছুটা দূরে। প্রাসাদগুলোর নকশা ছিল নগরের অন্যান্য স্থাপত্যের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। খলিফাদের নিজস্ব রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী এসব প্রাসাদ নির্মাণ হয়েছিল। প্রাসাদগুলো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল আল-আন্দালুসের বিভিন্ন অঞ্চলের চুনাপাথর। অলংকরণে ব্যবহৃত ছিল ‘আতাউরিক’ নকশা, যা জটিল লতাপাতা, জ্যামিতিক ও শিলালিপির নকশার অপূর্ব সমন্বয় উপস্থাপন করেছিল।

তৃতীয় আবদুর রহমানের বাসভবন ছিল ‘দার আল-মুলক’। প্রাসাদটি ছিল দুর্দান্ত অলংকরণে সজ্জিত, যেখানে দরজাগুলোর নকশায় ছিল জ্যামিতিক ও পত্রলতাবিশিষ্ট নকশা। কিছু দরজা ছিল আয়তাকার, আবার কিছু ছিল খিলান আকৃতির। মেঝেগুলো ছিল জ্যামিতিক নকশায় বাঁধানো। প্রাসাদের দক্ষিণ দিকের সম্মুখভাগে ছিল তিনটি অলংকৃত দরজা, আর ওপরের অংশে ছিল প্রতীকী জানালার সারি। হলগুলোর সারিবদ্ধ দরজা উপত্যকার দূরপ্রান্তে বিস্তৃত দৃশ্যের দিকে মুখ করে ছিল। তবে খলিফা দ্বিতীয় হাকাম বাসভবনে গোপনীয়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর কক্ষগুলো একটি প্রশস্ত পাথর বিছানো আঙিনার চারপাশে সাজানো ছিল। সেখানে ফোয়ারা, জলাধার ও বাগান এক শান্ত ও নির্জন পরিবেশ তৈরি করত। এ ঘনিষ্ঠ পরিবেশটি অতিথিদের জন্য এক আদর্শ স্থান।

মদিনা-তুজ-জাহরা অতিথিদের জন্য প্রধান অভ্যর্থনা হল এবং আচার-অনুষ্ঠান কেন্দ্র ছিল সালোন রিকো। ৯৫৩-৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হলটি বাসিলিকাল হলের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এর নির্মাণ তত্ত্বাবধান করেছিলেন খলিফার উজির আবদাল্লাহ ইবনে বদর। খলিফার ব্যক্তিগত সহকারী শুনায়েফ হলটির অলংকরণের দায়িত্বে ছিলেন। সালোন রিকো ছিল খলিফার ক্ষমতার কেন্দ্র, যেখানে খলিফা তার সিংহাসনে বসে বড় বড় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। সালোন রিকো একটি উঁচু প্লাটফর্মের ওপর নির্মিত। মূল হলটির দৈর্ঘ্য ছিল ১৭ দশমিক ৫ মিটার এবং প্রস্থ ২০ দশমিক ৪ মিটার। এটি দুটি আর্চ বা ধনুকাকৃতি স্তম্ভের মাধ্যমে তিনটি কক্ষে বিভক্ত ছিল। দুই পাশের কক্ষগুলো ছিল ৫ দশমিক ৯ মিটার প্রশস্ত, আর মাঝের কক্ষটি ছিল ৬ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত। মূল হলটির আকার ছিল একটি সমবাহু ত্রিভুজের মতো, যা ইসলামী স্থাপত্যে একটি জনপ্রিয় নকশা ছিল।

সালোন রিকোর ঠিক সামনে অবস্থিত বাগানটি স্প্যানিশ ভাষায় ‘‌জার্দিন আলতো’ নামে পরিচিত। পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে বাগানটি ১০ মিটার উঁচু এক প্রশস্ত বারান্দায় বিস্তৃত, এর চূড়ান্ত প্রস্থ ছিল ১৫৩ দশমিক ৫ মিটার। এটি পশ্চিম প্রান্তের বাগানের দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। বাগানটি নিখাদ সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল এবং এটি ছিল ইসলামিক স্থাপত্য ধারার বাগান বা চাহারবাগ ধারার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। বাগানটির উত্তর অংশে ছিল বিশাল একটি জলাধার, যার প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য ছিল ১৯ মিটার এবং গভীরতা দুই মিটার। বাগানের ভূমি উত্তর থেকে দক্ষিণে ঢালু ছিল, ফলে জলাধারের পানি সহজেই সেচের কাজে ব্যবহার হতো। হাঁটার পথ বরাবর ছিল জলপ্রবাহের সরু নালা। জলাধারের দক্ষিণ দিকে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল কেন্দ্রীয় প্রাসাদ, যা ৯৫৬ বা ৯৫৭ সালে নির্মাণ হয়েছিল। সালোন রিকোর ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত ছিল ওয়েস্টার্ন হল, যা ছিল ক্রাউন প্রিন্সের অভ্যর্থনা কক্ষ।

আলজামা মসজিদ ছিল মদিনা-তুজ-জাহরা প্রধান মসজিদ। সালোন রিকোসংলগ্ন বাগানের পূর্ব দিকে মসজিদটির অবস্থান ছিল। বাগানের পূর্ব প্রাচীরে ছাদঢাকা পথটি মসজিদকে প্রাসাদগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করেছিল। এছাড়া শহরের বিভিন্ন দিক থেকে মসজিদে পৌঁছানোর পথও ছিল। মসজিদটির নকশা ছিল আয়তাকার, যা উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বমুখী। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবেশদ্বারের কাছে ছিল ওজুখানা এবং সাহন বা খোলা আঙিনা। সাহন বা আঙিনায় প্রবেশের জন্য ছিল তিনটি ফটক: প্রধান ফটকটি ছিল মধ্য অক্ষ বরাবর (উত্তর-পশ্চিম দিকে) এবং দুটি পার্শ্বদ্বার ছিল উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। প্রধান ফটকের পাশে ছিল একটি বর্গাকৃতির মিনার, যার দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ মিটার। এটি ছিল আল-আন্দালুসে নির্মিত প্রথম মিনার। ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয় যে মিনারটির উচ্চতা ছিল প্রায় ২০ মিটার।

আজকের দিনে মসজিদটির খুব অল্প কিছু অংশই অবশিষ্ট রয়েছে, কারণ মদিনা-তুজ-জাহরা পরিত্যক্ত হওয়ার পর মসজিদটি লুট করা হয়। তবে খননকাজগুলোর মধ্যে কুরআনিক আয়াতসহ কিছু দেয়ালের খোদাই পাওয়া গেছে। একটি টুকরোয় সূরা আল-ফুরকান (কুরআন ২৫:১০)-এর একটি অংশ রয়েছে: ‘‌কত প্রাচুর্যময় তিনি, যিনি ইচ্ছা করলে তোমাকে এ অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর বস্তু দান করতে পারেন—উদ্যানসমূহ; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত এবং দিতে পারেন প্রাসাদসমূহ।’

১৯১১ সালে স্পেনীয় স্থপতি রিকার্ডো ভেলাজকুয়েজ বস্কোর নেতৃত্বে শুরু হয় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। এরপর ১৯২৩-৩৬ ও পুনরায় ১৯৪৩-৭৫ সাল পর্যন্ত খননের দায়িত্বে ছিলেন ফেলিক্স হার্নান্দেজ হিমেনেজ। ১৯৭৫-৮২ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব নেন রাফায়েল মানসানো মার্তোস। এরপর ১৯৮৫-২০১৩ পর্যন্ত নেতৃত্ব দেন আন্তোনিও ভালেহো ত্রিয়ানো। ২০১৩ সাল থেকে কাজ পরিচালনা করছেন হোসে এস্কুদেরো আরান্দা। এখনো এর শৈল্পিক অলংকরণ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। নগরীর প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চল এখনো খনন করা বাকি। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের খনন ও পুনরুদ্ধার স্পেন সরকারের অর্থায়নে চলছে।

মিনহাজুল আবেদীন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা