মধ্যবিত্ত বা মধ্যশ্রেণী শব্দটির সঙ্গে বাংলা ভাষার পরিচয় ঘটে আঠারো শতকে। ক্রমবর্ধমান সমাজে মধ্যবিত্ত ছিল বিশেষ গোষ্ঠী, যারা ‘অভিজাত’ নয়, আবার ‘সাধারণ মানুষ’ও বলা যাবে না। উনিশ শতকে তারা নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে অভিহিত করত। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা মধ্যবিত্তদের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেন না। তারা মনে করেন এরা হলো এক পদমর্যাদাসম্পন্ন গোষ্ঠী, যাদের অবস্থার নিরন্তর পরিবর্তন ঘটে। মোগল আমলের নানা পেশাজীবীকে এই বর্গে রাখা যায়। অর্থাৎ এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির অবস্থান স্থির নয়। এর মধ্যে কেউ বেরিয়ে যেতে পারে, আবার কেউ এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে যুক্ত হওয়াটা যত সহজ ব্যাপার, বেরিয়ে যাওয়াটা ততটাই কষ্টসাধ্য।

তবে মোগল আমলে মধ্যবিত্তদের অবস্থা আলোচনার সময় ‘মধ্যবিত্ত’র সংজ্ঞা একটু ব্যাপক অর্থে ধরতে হবে। প্রচলিত অর্থে তখন শহর গড়ে ওঠেনি এবং আধুনিক ধারণা অনুযায়ী গবেষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক ও অধ্যাপকও তেমন ছিলেন না। এমনকি সেচ ব্যবস্থা, ডাক ব্যবস্থা, পূর্ত বিভাগ এমনভাবে গড়ে ওঠেনি যে ওসব ক্ষেত্রে আজকের মতো বহুসংখ্যক পেশাজীবী কর্মরত ছিলেন। সুতরাং মোগল আমলে মধ্যবিত্ত বলতে আমরা মূলত বণিক সম্প্রদায় ও মুষ্টিমেয় সরকারি চাকুরেদের বুঝি। যাদের মাঝে কোনো সহযোগিতা ছিল না, নিরন্তর শত্রুতা ছিল অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

মোগল আমলে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে ভিত্তি করে। এর শীর্ষে ছিলেন বাদশাহ বা সম্রাট। অর্থনৈতিক দিক থেকে সমগ্র নাগরিককে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। অভিজাত, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণী। রাজার সুদৃষ্টিপ্রাপ্তরা থাকতেন অভিজাত শ্রেণীর অংশ হিসেবে আর শেষোক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কৃষক, শ্রমিক ও শিল্পীরা।

মধ্যবিত্তদের বড় অংশ তখন প্রধানত ব্যবসায়ী ও বণিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। তারা বিশেষভাবে ধনী ছিলেন না, কিন্তু তারা সফল ছিলেন এবং দারিদ্র্য ছাড়াই একটি মধ্যম জীবনযাপন করতেন। তারা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

মোগল আমলে ভারত ভ্রমণকারীদের বর্ণনা থেকে পরিষ্কার যে মোগল ভারতের বাণিজ্যিক ও আর্থিক কাঠামোও অত্যন্ত উন্নত ছিল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য শ্রেণীবিভাগ ছিল। পাইকারি ব্যবসায়ী, দোকানদার, টাকা বিনিময়কারী-ঋণদাতা (শারফ), গোমস্তা ও দালাল (এজেন্ট) ইত্যাদি প্রত্যেকের আলাদা পেশাদার গোষ্ঠী ছিল। বানজারারা ব্যাপক পণ্যের পরিবহনে বিশেষজ্ঞ ছিল। বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল: যখন কোনো পণ্যের চাহিদা থাকত বা বেশি লাভ অর্জনের সুযোগ আসত, তখন ব্যবসায়ীরা তা দ্রুত কাজে লাগাতেন। সমসাময়িক লেখকদের অনেকেই, যেমন আবুল ফজল তার বিশ্লেষণে সমাজের চার স্তরের মাঝে ব্যবসায়ীদের এবং দক্ষ শিল্পীদের একই কাতারে রেখেছিলেন। তাদের অবস্থান ছিল অভিজাতদের নিচে কিন্তু ধর্মীয় ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ওপরে স্থান দিয়েছিলেন।

পেশাদার শ্রেণীর মধ্যে চিকিৎসক (বৈদ্য, হাকিম), শিক্ষক (পণ্ডিত, মোল্লা), আইনজীবী ইত্যাদি পেশার কিছু মানুষ ছিলেন। তারা ধর্মীয় প্রভাবশালী শ্রেণী যেমন ব্রাহ্মণ ও মোল্লাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেন। যারা ধর্মীয় কার্যক্রমে শিক্ষা দিতেন বা সভাপতিত্ব করতেন তাদের মাঝে বড় অংশের মানুষ সরকারি অনুদান পেতেন। রাজ্য কর্তৃক প্রদত্ত অনুদানগুলো স্বায়ত্তশাসিত রাজা, জমিদারদের মাধ্যমে বিলি-বণ্টন করা হতো। মোগল সাম্রাজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ রাজস্ব সম্পদ এ ধরনের অনুদানের জন্য নির্ধারিত ছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে ছোট জমিদার ও ধনী কৃষকদেরও রাখেন অনেক গবেষক।

গ্রামীণ অভিজাত শ্রেণীর লোকদের সম্পদ জমানোর স্বভাব ছিল, যা তাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচে উৎসাহিত করত। সুরদাস তার লেখায় মথুরার কাছে অবস্থিত ব্রিজ পরগনার শিকদার নন্দের বাড়িতে উৎসবের সময় বাহারি খাবার তৈরির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। তার বাড়িতে বিলাসী আসবাবপত্র এবং নরম বিছানার চাদর ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামের এ শ্রেণীর মহিলারা রঙচঙে শাড়ি পরতেন আর পুরুষরা শহরের লোকের মতো জামা পরতেন। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের পোশাকের জন্য কাপড় স্থানীয় কারিগরদের কাছ থেকে বানাতে পারার কথা না। মূলত যেসব গ্রামে অবস্থাসম্পন্নরা থাকতেন তাদের সঙ্গে শহরের বাজারের যোগাযোগ থাকত। ফলে আর্থিকভাবে উন্নতরা শহরের জীবনধারা অনুসরণ করতেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, মোগলদের একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল। মোগল সরকারের বিস্তারিত ও সূক্ষ্ম রেকর্ড রাখার সংস্কৃতি ছিল অবাক হওয়ার মতো; যার মধ্যে রয়েছে দাম, কর, বাড়ির সংখ্যা, রাজস্ব প্রদানকারীদের এবং বাড়ির মালিকদের নাম ও জাতির বিস্তারিত রেকর্ড। মনসব ও জায়গিরদের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তথ্য সংরক্ষণের এসব কাজে অনেক ক্ষুদ্র কর্মকর্তা কাজ করতেন যেমন দেওয়ান, মুহারির, আমিন, কারকুন ইত্যাদি। মনসবদার, জায়গির ও এই সরকারি কর্মকর্তারা আয়ের দিক থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে পড়েন।

মনসবদারদের জন্য নির্ধারিত বেতনের মাধ্যমে তারা এমন জীবনমান বজায় রাখতেন, যা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক ওপরে। তবে তাদের অবস্থা সতেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জায়গিরের অভাব, বারবার স্থানান্তর এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে অবনতি হতে দেখা যায়।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে ক্ষুদ্র কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে অন্যদের তুলনায় বেশি তথ্য রয়েছে ঐতিহাসিকদের কাছে। শুরুর দিকের মোগল সম্রাটদের আমলে তারা সচ্ছলই ছিল বলা যায়। সুরত সিং নামের একজন, যিনি কখনো ক্লার্কের চেয়ে উচ্চতর কোনো পদে কাজ করেননি তিনি লাহোরের একটি সম্মানজনক স্থানে ৭০০ টাকায় একটি বাড়ি কিনেছিলেন। আরেকজন কর্মকর্তা খাজা উদয় চাঁদ, একটি দরগাহসংলগ্ন কুয়া নির্মাণে ৩ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন। কিছু আমিন ও ফৌজদার জমি কিনে উদ্যান, হাম্মামসহ ছোট ছোট নগরী গঠন করেছিলেন। এ সম্পদশালী রাজস্ব কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ক্ষত্রিয় ও বণিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। রাজস্ব কর্মকর্তারা রাজ্যগুলোয়ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। বাংলার অনেক দেওয়ান এবং বখশী, স্থানীয় রাজাদের তোষামোদি করে বা কানুনগো হিসেবে কাজ করে ধনী জমিদার হয়ে উঠেছিলেন। তাদের এ সমৃদ্ধি বেতনের ফলে নয়, বরং তাদের দুর্নীতি, তোষামোদি, ঘুস গ্রহণ, রাজস্বের হিসাবে গরমিল ইত্যাদির কারণে সম্ভব হয়েছিল।

মধ্যবিত্ত সরকারি চাকুরেদের সবসময় চেষ্টা থাকত কীভাবে সম্রাটের সুনজরে পড়ে পদোন্নতি ঘটানো যায়। কেন্দ্রে যেসব কর্মচারী কাজ করতেন তারা অনেকটা অভিজাতদের মতোই জীবনযাত্রা নির্বাহ করতেন। তবে খুব একটা জাঁকজমক দেখানো থেকে তারা বিরত থাকতেন, কারণ মোগল শাসন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন ও সঞ্চয় করা অপরাধ হিসেবে গণ্য ছিল। তাই বেশির ভাগ অভিজাত ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর অধিকার পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা মোগল আমলে ছিল না। অবশ্য কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কেউ কৃচ্ছ্রসাধন করে প্রচুর অর্থ উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যেতেন।

এ তো গেল কেন্দ্রে বসবাসকারী কর্মচারীদের কথা। এছাড়া আরো বহু কর্মচারী মোগল শাসন ব্যবস্থার অসংখ্য পদে যুক্ত ছিলেন। তাদের আর্থিক অবস্থা সম্বন্ধে এখনো ইতিহাসের সাক্ষ্য কিছুটা নীরব। শুধু জানা যায় এদের অবস্থা কোনোক্রমেই সচ্ছল ছিল না।

কোনো কোনো সম্রাটের শাসনামলে জিনিসপত্রের দাম অপেক্ষাকৃত সস্তা থাকলেও বেতনের স্বল্পতার জন্য কর্মচারীদের তাতে বিশেষ উপকার হতো না। উৎকোচ গ্রহণ সরকারি কর্মচারীদের একটা সাধারণ রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে শুল্ক ও রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীরা তাদের ক্ষমতাকে অসদুপায় অবলম্বনে পূর্ণ ব্যবহার করত। শায়েস্তা খাঁর মতো শাসনকর্তাকেও বাংলার এসব কর্মচারীর ঘুস নেয়ার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করতে হয়েছিল। সৈন্যদের বেতন দেয়ার ভার ছিল যাদের ওপর তারা সৈন্যদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ইচ্ছেমতো তাদের প্রাপ্য বেতন থেকে জরিমানা কেটে নিত। অবস্থা এমনই চরমে উঠেছিল যে সম্রাটকে লিখিতভাবে ওইসব কর্মচারীকে সতর্ক করে নিদের্শনামা জারি করতে হয়। অবশ্য কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থা ও ব্যয় বাহুল্যের দিকটা চিন্তা করলে এ ধরনের দুর্নীতির একটা হদিস মেলে। দু-একজন ছাড়া বেশির ভাগ প্রাদেশিক শাসনকর্তাই নিজ নিজ শাসনসীমার মধ্যে অত্যাবশ্যক সামগ্রীর একচেটিয়া ব্যবসা চালাতেন। ফলে জিনিসপত্রের দাম বেশির ভাগ সময়েই ঊর্ধ্বমুখী থাকত। সম্রাট বাধা দিতেন না—এমনকি শাজাহান নিজেই একচেটিয়া নীলের ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

শায়েস্তা খাঁ বাংলাদেশে আসার আগে আগে শাসকদের শাসনের প্রকৃত চিত্র উদ্‌ঘাটন করতে গিয়ে শিয়াবুদ্দিন তালিশ তার বইতে লিখেছেন যে বাংলাদেশের সব শাসকই খাদ্য ও বস্ত্রের ওপর একচেটিয়া ব্যবসা কায়েম করেছিলেন, জিনিসের দাম হু হু করে চড়ত আর অসহায় জনসাধারণকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সেই দামেই কিনতে হতো। যদুনাথ সরকার তার বাংলার ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) গ্রন্থে বিভিন্ন সমসাময়িক ব্যক্তির লিখিত বিবরণীর সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে শায়েস্তা খাঁও একচেটিয়া ব্যবসার নীতিকে সক্রিয়ভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ইংরেজ ব্যবসায়ী উইলিয়ম ক্ল্যাভেল ১৬৭৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর হুগলি বন্দর থেকে লিখছেন যে শায়েস্তা খাঁ হুগলিকে যেন ব্যক্তিগত জায়গিরে পরিণত করেছেন। তার কর্মচারীরা প্রায় সব পণ্যেরই একচেটিয়া ব্যবসা করছে, এমনকি পশুর খাদ্য ঘাসও রেহাই পায়নি।

লেখাপড়ার চর্চা নিয়ে যারা থাকতেন, অর্থাৎ শিক্ষক ও গ্রন্থকারেরা, তাদের আর্থিক সচ্ছলতা অন্যদের চেয়ে তেমন কিছু ছিল না। কিছু হিন্দু ও মুসলমান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে বৃত্তিলাভ করলেও সরকারি ঔদাসীন্যের ফলে অধিকাংশ পাঠশালা ও মক্তবের শিক্ষকদের জীবনযাপন ছিল কষ্টের। অনেকে মনে করেন এ সময়ে ইসলামী শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এ ধারণাকে ঠিক সমর্থন করে না। সমগ্র গুজরাট প্রদেশে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন, শিক্ষকের সংখ্যাও ছিল তিন, আর বৃত্তিভোগী ছাত্রের সংখ্যা ছিল পঁয়তাল্লিশ। অধিক অর্থের জন্য মসী ছেড়ে তাই অসি ধরার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। গ্রন্থকারদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। সাধারণত সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের লেখাপড়ার চেষ্টা চলত। মধ্যবিত্ত চাকুরেদের সমৃদ্ধি এসব বুদ্ধিজীবীর কাছে পৌঁছেনি, তারা সাধারণভাবে গরিব ছিলেন এবং পৃষ্ঠপোষকদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিছু ব্যতিক্রম ছিল, যেমন আবুল ফজল বা বীরবল। তারা মূলত আকবরের সুনজরে থেকে উন্নতি লাভ করেছিলেন। সত্য হলেও সম্রাটের অপ্রিয় এমন কোনো কথা লেখা সম্ভব ছিল না, আবুল ফজলের মতো প্রশংসা করাই ছিল রীতি।

বিহার প্রদেশের সাপুরমান পরগনার জনৈক পুঁথিকার গোলাম সরফুদ্দীনের ভাই মসিউদ্দীন আর্থিক অভাব মোচনের জন্য বাংলা বিহারের দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁর কাছে বারবার আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। আবেদনপত্রে তিনি দেওয়ানকে বারবার জানাচ্ছেন তার আর্থিক দুরবস্থা এমন চরমে পৌঁছেছে যে নিছক অর্থের অভাবে তিনি জীবিকার সন্ধানে বাইরে বেরুতে পারছেন না, যদি দেওয়ান দয়াপরবশ হয়ে কিছু সাহায্য না করেন তবে পরিবার নিয়ে তাকে পথে বসতে হবে। (পাটনা কলেজ সংরক্ষিত অপ্রকাশিত ফারসী পুঁথি ‘আসরাফুল মুসাওয়াদাৎ’ থেকে সংগৃহীত)। মধ্যবিত্তরাও ঠিক মধ্যবিত্ত হয়ে চিরদিন পার করতে পারেনি, নিম্নবিত্তে ওঠানামা করেছে শাসনকালভেদে।

তুর্ক-আফগান যুগে (এমনকি শাহজাহানের আমল পর্যন্ত) হিন্দু কেরানিদের অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল। বিশেষ করে রাজস্বসংক্রান্ত ব্যাপারে আর জমিদারি পরিচালনায় হিন্দুদের ওপর মুসলমান শাসকরা যথেষ্ট আস্থা রাখতেন। বাংলা অঞ্চলের রাজস্ব বিভাগে যেসব কর্মচারী নিযুক্ত হতেন, তাদের মধ্যে নবীন ও প্রাচীন দুই রকমের পদবি ছিল যেমন নিয়োগী, চৌধুরী ইত্যাদির পাশাপাশি নতুন পদবি প্রচলিত হলো ‘ডিহিদার’ ‘শিকদার’ প্রভৃতি। নিয়োগী, চৌধুরীদের মধ্যে অনেকেই বেশ দুপয়সা গুছিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সময় থেকে হিন্দুদের প্রভাব-প্রতিপত্তি রাজস্ব বিভাগ থেকে কমে যেতে থাকল। ফৌজদার ও সুবাদারের ন্যায় উচ্চ পদ থেকে আরম্ভ করে রাজস্ব বিভাগের নিম্নতম পদগুলোয় অনেক হিন্দুকে চাকরি হারাতে হয়।

তবে মোগল আমল নিয়ে আগের ইতিহাসবিদরা গবেষণার সময় বিদ্রোহ-বিপ্লব বা অভ্যুত্থানে মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা অবহেলা দেখিয়েছেন। উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ ভারতবর্ষে নিম্নবিত্তদের অভ্যুত্থানের কথা বলেছিলেন, কিন্তু যে উদাহরণগুলো তিনি উল্লেখ করেছিলেন তা গবেষকদের বিচারে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেই তুলে ধরে। খসরু, কুতুব, সুবহান কুলি, কিশতওয়ারের জমিদার, মথুরার জাট (বর্তমান উত্তর প্রদেশের একটি স্থান), নার্নাউলের ​​সত্যনাম, রওশন আন্দোলনের পাঠান, মারাঠা ও শিখ বিদ্রোহ প্রধানত স্থানীয় জমিদার বা গ্রামীণ ক্ষমতাসীনদের বিদ্রোহ ছিল। সমাজবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞায়নের সঙ্গে না মিললেও এ সময়ের গবেষকদের বিশ্লেষণ থেকে এটুকু অনুমান করা যায় যে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে অভিজাত ও নিম্নবিত্তদের মাঝেই অবস্থান করত ‘মধ্যবিত্ত’ গোষ্ঠীর জনগণ।

তথ্য কৃতজ্ঞতা: দ্য কেমব্রিজ ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া

ফাহাদ হৃদয়: লেখক ও সাংবাদিক