মোগল আমলে গ্রামীণ জীবনকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যেত—জমিদার, ভাসমান কৃষক ও ভাড়াটে কৃষক। এছাড়া চর্মকার, মৃৎশিল্পী ও ভূমিহীন কৃষকদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তারা কায়িক শ্রমের বিনিময়ে ফসলের একটা নির্দিষ্ট অংশ পেতেন। জমির উর্বরতা, অবস্থান ও ফসল উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে তখনকার রাজস্ব আহরণের কাজ পরিচালনা হতো। অর্থ সমাগমের ভিন্নতার দরুন মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণেও স্বতন্ত্র পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনমান যে উঁচু স্তরে ছিল না সেটা তাদের পোশাকের স্বল্পতা থেকে প্রমাণিত। ঐতিহাসিক রালফ ফিচ বিষয়টি নিয়ে দাবি করেন, সাধারণত পুরুষদের কোমরের চারপাশে সামান্য একটু কাপড় দেয়া থাকত। অবস্থাসম্পন্নদের অবস্থা ছিল আপেক্ষিক। তারা নানা ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদের পাশাপাশি গহনা ব্যবহার করত।

বসতবাড়ি নির্মাণেও মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ছাপ সুস্পষ্ট ছিল। দক্ষিণ ভারতের মানুষের খেজুর পাতায় নির্মিত ঘর এতটাই ছোট আর অমার্জিত ছিল মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ফুরসতও পেত না। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ গ্রামগুলো ব্যতিরেকে কেউই একাধিকবার খাবারের সুযোগ পায়নি। রান্না করার উপকরণ সহজলভ্য ছিল না। লবণসহ যাবতীয় রান্নার উপকরণ ব্যবহার বিলাসী জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করত। তবে অনেক ঐতিহাসিক জমির গড় আকার বড় ও বাড়তি উৎপাদনকে বিবেচনা করে সে সময়কার খাদ্যাভাব স্বীকার করেন না। সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা নানা ধরনের অনুঘটকের ওপর নির্ভর করত। তার মধ্যে খরা, বন্যা ও মহামারী সবচেয়ে ভয়ানক আর আতঙ্কের। এ আপৎকালে রাষ্ট্র ভূমি রাজস্ব মওকুফ ও ঋণ প্রদানের মাধ্যমে মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করত।

মোগল আমলে নগরায়ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে বিবেচিত। বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক ছাড়াও এখানে সৈন্য, চাকর ও সেবক নিয়োগ মানুষের সচ্ছলতার পরিচয় দেয়। দক্ষিণ ভারতীয় অঞ্চলে পরিসংখ্যান পরিচালনা, রাজস্ব রেকর্ড সংরক্ষণসহ মোটামুটি সব ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো তৎকালীন মোগল শাসনে ছিল। দিওয়ান, আমিল ও কারকুনসহ নানা প্রশাসনিক পদ-পদবি মোগল শাসনের কাঠামোর পরিচয় দেয়। সে সময়কার শহুরে পেশায় নানা বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রভাবশালী হিসেবে চিকিৎসক, শিক্ষক ও আইনজীবী অন্যতম ছিলেন। এছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপস্থিত দক্ষিণ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। অভিজাতদের শৈল্পিক কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা গিয়েছিল, বিশেষ করে সংগীতপ্রীতি অনেক ছিল। সে সময় চিত্রশিল্পও দারুণ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। মোগল অভিজাতরা সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিল। এটি কতটা গ্রামীণ ‘ধনী’দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা একটি অনুমানের বিষয়।

গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকার বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে জীবনযাত্রার মানে একটি বড় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মধ্যযুগীয় দক্ষিণ ভারতের মানুষের নিয়মিত জীবনমান সাধারণত একটি স্থিতিশীলতা মাত্রায় পৌঁছেছিল। কিন্তু এ স্থিতিশীলতা প্রায়ই দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ ও অন্যান্য বিপর্যয়ের কারণে ব্যাহত হয়ে নানাভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা তৈরি করত। মধ্যযুগীয় দক্ষিণাত্যে প্রথম বড় খরা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় মোটামুটি ১৬৩০-৩১ সালের দিকে। এছাড়া ১৬৫৫, ১৬৮২ ও ১৬৮৪ সালেও আঞ্চলভেদে আরো কিছু ছোট খরার পুনরাবৃত্তি ঘটে। খরাগুলো সাধারণত প্লেগের উপদ্রব বাড়াত। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং ক্ষুধার্ত মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রির মতো ঘটনাও ঘটেছিল। যখন বড় খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটত তখন সাধারণত সরকারকে রাজস্ব মওকুফ করতে হতো। খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করে সরকারি দোকানে রেশন ব্যবস্থাপূর্বক ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হতো।

সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মোগল ও মারাঠাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। এ যুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির পতন ঘটায়। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগগুলো ঘন ঘন ঘটলেও সেগুলো মধ্যযুগের ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক ইতিহাসের জন্য কেবল অস্থায়ী বলে মনে হয়। এগুলো অর্থনীতির মৌলিক স্বরকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায়নি। যত তাড়াতাড়ি বিপর্যয় কেটে যেত তারা তাদের পুরনো স্থানে ফিরে যেত এবং নতুন স্থানে বসবাস করত, অথবা শুধু উভয় স্থানেই যাযাবর হয়ে উঠত। তাদের জীবনমান প্রায় আগের মতো করে পুনরায় শুরু করত।

ইমরান নাফিস: লেখক